শুধু আপনার ফেসবুক আইডি নয়: এ দফায় একটি মাত্র ভুল ক্লিকে পুরো সিস্টেমের নিয়ন্ত্রন দিচ্ছেননা তো হ্যাকারকে?

December 4, 2017 0

রবিউল ইসলাম রবি: সাম্প্রতিক সময়ে ফেসবুকে নানারকমের ভাইরাস দেখা দিয়েছে। আর ফেসবুকের এসব ভাইরাস নিয়ে বিব্রত কোটি গ্রাহক। হঠাৎ করে ফেসবুকে বিরক্তিকর ভাইরাসের কারণে বিড়ম্বনায় পড়েছেন অনেক ব্যবহারকারী।

শুধু ‘বিড়ম্বনা’ কথাটি হয়তো যথেষ্ট নয় বরং বলা যায় ভয়াবহ বিপদেও পড়েছেন অনেকেই। আজ সময়ের কণ্ঠস্বরের পাঠকদের জন্য দুটি এমন কেসস্টাডি সহ তানসুম রাব্বী নামের একজন শিক্ষার্থীর ভয়াবহ বিড়ম্বনার শিকার হবার গল্প ও তার প্রতিকার নিয়ে থাকছে বিস্তারিত।

অনেকেই হয়তো নিতান্তই শখের বশে ফেসবুকে একাউন্ট রেখেছেন কিন্তু অধিকাংশ মানুষের কাছেই ফেসবুকের একাউন্ট একটি গুরুত্বপুর্ন অংশ । যার কাছে যেমনটাই হোক এই সামাজিক যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যমে আপনার একাউন্ট নিঃসন্দেহে ব্যক্তিগত তথ্যের ভান্ডার। মোটেও কাম্য নয়, যে আপনার ব্যক্তিগত তথ্যে হানা দিক কোন অনাকাংখিত মানুষ। তাই সাবধান থাকা জরুরী বলার অপেক্ষা রাখেনা ।

ফেসবুকে বন্ধুর সঙ্গে চ্যাট করছেন, হুট করে আপনার কাছে একটি লিংক এল। কিসের লিংক, কেন দিল, না জেনেই ক্লিক করেই সর্বনাশের লেজে পা দিলেন নিজের অজান্তেই ! এখন এমন লিংক আপনার অন্য বন্ধুদের মেসেজেও চলে যাবে। কখনো-বা অপ্রীতিকর ছবি ফেসবুকের ওয়ালে টিউন হবে এবং অন্য বন্ধুদের ট্যাগ করবে।

বেশকিছুদিন ধরেই ফেসবুকে এক ধরনের বিরক্তিকর ভাইরাসের দেখা মিলছে। তবে বলে রাখা ভালো এসবের জন্য মোটেও কিন্তু দায়ী নয় ফেসবুক। অন্যতম সামাজিক যোগাওগের এই মাধ্যমটি বিশ্বজুড়ে তাদের কোটি কোটি গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা প্রদানে সারাক্ষন কাজ করে চলেছে নিরলসভাবেই।। সত্যি কথা বলতে এমন নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে আসলে আমাদের নিজেদেরই অসতর্কতাই ।

ফেসবুকের ডিফল্ট এপস থেকে এমন ক্ষতির স্মভাবনা নেই বললেই চলে, কিন্তু বিড়ম্বনা শুরু হয় যখন আমরা থার্ড পার্টি এপস ব্যবহার বা ইনস্টল করি তখনই।

কেস স্টাডি ১

হোম ইকোনমিক্সের ছাত্রী নাসরীন সুলতানা নেহা তার ল্যাপটপ চালু করে গত মঙ্গলবার রাতে ফেসবুকে ঢোকেন। হঠাৎ তার এক বন্ধুর আইডি থেকে প্রোফাইল পিকচারসহ একটি ভিডিও লিংক আসে মেসেজের ইনবক্সে।

কৌতুহলবশত তিনি ওই লিংকে ক্লিক করতেই অন্য একটি ট্যাব খুলে যায় তাকে বলা হয় ফ্ল্যাশ প্লেয়ার ইনস্টল করতে হবে, কারন তার ব্রাউজারের ফ্ল্যাশ প্লেয়ারটি পুরোনো ভার্সনের। নির্দেশনা অনুযায়ী সাতপাঁচ না ভেবেই নেহা আপডেট দেয় নির্দেশনা অনুযায়ী। এর কিছুক্ষণ পর ফেসবুকের আইডিতে সমস্যা শুরু হয় ।

এর পর একটি নোটিফিকেশন আসে তার কম্পিউটারটি ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। এখন কিছু সিকিউরিটি চেক দিয়ে আইডি রিকভারি করতে হবে। এর পর ক্যাশপারেস্কি দিয়ে কম্পিউটার স্ক্যান করার একটি অপশন দেওয়া হয়। আইডি বাঁচাতে নেহা পরবর্তি নির্দেশনাগুলো ফলো করার পর ফেসবুক থেকে আবার নোটিফিকেশন আসে শক্তিশালী পাসওয়ার্ড দিয়ে তাকে আইডিতে ঢুকতে হবে। (যদিও এটি ফেসবুকের নোটিফিকেশান নয়! ততক্ষনে হ্যাকার নিয়ন্ত্রন নিয়েছে আপনার সিস্টেমের)।

এর পর নেহা পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করে নিজের আইডির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে কিছুটা হাফ ছেড়ে ফেসবুক চালাতে শুরু করেন। সবকিছুর পর নেহা অবশ্য জানতেনইনা তার শক্তিশালী পাসওয়ার্ড শুধু তার কাছেই নয় রয়েছে অন্য একজনের কাছেও !! (এমন বিষয়ের সমাধান এই ফিচারের পরের অংশেই দেয়া হয়েছে)

কেস স্টাডি -২

এমন ভাইরাসে আক্রান্ত ভয়াবহ বিড়ম্বনার শিকার ঢাকার একটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী তানসুম রাব্বী জানান তার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা ,রাব্বীর বক্তব্যমতে, ‘প্রথমে আমার ইনবক্সে একটা একটি ঝাপসা ভিডিওর লিংক আসে এক বন্ধুর আইডি থেকে, কৌতুহল্বশত লিংকে ক্লিক করার পর যা ঘটলো তার জন্য আমি একদমই প্রস্তুত ছিলাম না।

তারপর একের পর এক বিব্রতকর মেসেজ যেতে থাকে ফ্রেন্ডলিস্টে থাকা সবার কাছেই! এসব মেসেজে আমার ব্যক্তিগত ভিডিও দেখুন এমন শিরোনামে একটি ঝাপসা ভিডিওর থাম্বনিল সহ লিংক যেতে শুরু করে আমার অজান্তেই।

অনেকেই আমাকে ফোন করে জানতে চেয়েছেন, আবার অনেকেই স্ক্রিনশট পাঠিয়েছেন। তানসুম জানান, আমার ফ্রেন্ডলিস্টে শিক্ষক হতে শুরু করে অনেক বিশিষ্টজনও রয়েছেন। তাদের কাছে এরকম স্প্যাম মেসেজ যাওয়াটা সত্যিই ভীষণ দু:খজনক বিষয়।

নেহা এবং তানসুমের মতো বাংলাদেশের ফেসবুক ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশই গত কিছুদিন ধরেই এ ধরনের ম্যালওয়্যার বা ভাইরাসের শিকার হয়েছেন, যা কম্পিউটারকেও আক্রান্ত করছে।

কিন্তু ভুক্তভোগীদের বেশিরভাগই জানেন না তাদের করণীয় কী। এই ম্যালওয়্যার বা ভাইরাস ছড়িয়ে অনেকের আইডির তথ্যও চুরি করা হচ্ছে। ভাইরাসটির কাজ হলো প্রোফাইল পিকচারসহ একটি ভিডিও লিংক আপনার মেসেজের ইনবক্সে প্রেরণ করা। আপনি তাতে ক্লিক করলে ম্যালওয়্যার ভাইরাস অটোমেটিক আপনার ফেসবুক বন্ধুদের ইনবক্সে চলে যাবে। ফলে আপনার সাধের ফেসবুক আইডিটি হ্যাক হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

ম্যালওয়্যার ভাইরাসটি আপনার প্রোফাইলের সব তথ্য হাতিয়ে নিতে পারে। অর্থাৎ আপনার ইউজার নেম, পাসওয়ার্ড, ইমেইল ইত্যাদি। এই ম্যালওয়্যার ভাইরাসটির দ্বারা আপনার অনেক স্পর্শকাতর তথ্য হ্যাকাররা হাতিয়ে নিয়ে আপনাকে সেই স্পর্শকাতর তথ্যের জন্য ব্ল্যাকমেইলও করতে পারে বলে সতর্ক করছেন আইসিটি বিশেষজ্ঞরা।

এই বিষয়ে বিশিষ্ট প্রযুক্তিবিদরা বলেছেন, ‘ফেসবুকে নানা সময়ে নানা অ্যাপস বের হয়, যেগুলো আসলে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ দ্বারা সমর্থিত নয়। বিভিন্ন স্প্যামার গ্রুপের সদস্যরা এই ধরনের কাজ করে সাধারণ ফেসবুক ব্যাবহারকারীদের বিড়ম্বনায় ফেলার মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে। সে কারণে অযাচিত ফেসবুক অ্যাপস ইন্সটল করা যাবে না। একটু সতর্ক হলেই এরকম স্প্যামিং বিড়ম্বনা হতে মুক্তি পাওয়া সম্ভব বলে মন্তব্য করা হয়েছে।

এ সম্পর্কে আইসিটি বিশেষজ্ঞ আলতাফ হোসেন সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন, সন্দেহজনক কোনো লিংক দেখলে প্রথমেই ক্লিক না করা উত্তম। তাছাড়া ফেসবুকের সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টধারীকে অবশ্যই একটি শক্তিশালী পাসওয়ার্ড দিতে হবে। কোনো লিংকে কিক করার আগে নিশ্চিত হতে হবে সেটি সম্পর্কে। যার ইনবক্স থেকে লিংকটা এসেছে প্রয়োজনে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা, যদি ফ্রেন্ডলিস্টে থাকে।

তিনি বলেন, এভাবে ভাইরাস ছড়িয়ে হ্যাকাররা আপনার কম্পিউটারের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করতে পারে। এটা বিভিন্ন অ্যান্টিভাইরাস কোম্পানির বিজনেস। তারা নিজেরা অনেক সময় এ ধরনের ম্যালওয়্যার বা ভাইরাস ছড়িয়ে অ্যান্টিভাইরাসের ব্যবসা করে থাকে।

প্রতিকার কি ?

যা করা জরুরি: ফেসবুকের পাসওয়ার্ড পরিবর্তন এবং আজেবাজে অ্যাপস মুছে ফেলা, ব্রাউজারের অব্যবহৃত ও সন্দেহজনক ছোট প্রোগ্রাম বাদ দেওয়া এবং হালনাগাদ করা।

পাসওয়ার্ড ও অ্যাপস মুছতে: ফেসবুকের ভাইরাসের কবলে পড়লে সঙ্গে সঙ্গে অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করতে হবে এবং Activity Log থেকে আক্রান্ত টিউন মুছতে হবে।

ফেসবুকের অ্যাকাউন্টে লগইন করে ডান পাশের তির চিহ্নে ক্লিক করে Settings-এ যান।

এখানে General Account Settings-এর Password লেখায় ক্লিক করে পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করুন।

পরিবর্তন সফল হলে Log me Out of other devices বার্তা দেখিয়ে অন্য যন্ত্র থেকে অ্যাকাউন্ট সরাতে বলবে।

অ্যাপস সরাতে Settings-এর বাঁয়ের তালিকার Apps-এ ক্লিক করে যে অ্যাপস আগে ব্যবহার করেননি, সেটি মুছে (রিমুভ) ফেলুন।

এখানে থাকা Apps, Websites and Plugins ও Apps Others Use-এ ক্লিক করে আগের সেটিংসগুলো পুনরায় নির্ধারণ করুন।

ফলে পরবর্তী সময়ে ভাইরাস আক্রমণ করার সুযোগ কমে যাবে।

ব্রাউজারের ছোট প্রোগ্রাম মুছতে: একেক ব্রাউজারে একেক রকম সেটিংস দেওয়া থাকে। তাই নিয়মিত যে ব্রাউজার ব্যবহার করে ফেসবুক চালান…

সেই ব্রাউজারের Tools বা Option বা Preferences-এ গিয়ে Add-ons, Extensions, Plug-ins-এর অব্যবহৃত ও সন্দেহজনক ছোট প্রোগ্রামগুলো মুছে ফেলুন।

অ্যান্টিভাইরাস ব্যবহার: ম্যালওয়্যার বা ভাইরাস সরাতে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ কিছু অনলাইন অ্যান্টিভাইরাস সুপারিশ করে। তার মধ্যে…

• Facebook CheckPoint-1

• Facebook CheckPoint-2

এসকল চেকপয়েন্ট গিয়ে ফেসবুককে অনলাইনে স্ক্যান করে নেওয়া যায়।

ফেসবুক অ্যাকাউন্টে লগইন থাকা অবস্থায় যেকোন চেকপয়েন্ট লিংকে যান।

অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড চাইলে তা লিখে Continue চাপুন।

এরপর Secure Your Account নামের বক্স এলে এখানে আবার Continue চেপে ডাউনলোড করে ইনস্টল করুন।

স্ক্যান শেষে অ্যাকাউন্টের বর্তমান অবস্থা একটি নোটিফিকেশনের মাধ্যমে জানিয়ে দেবে।

আর সবার শেষে সবচেয়ে জরুরী বিষয়টি মনে রাখুন, ফেসবুকের সেটিংসে Account Settings অপশনে গিয়ে Security and Login অংশে ক্লিক করে দেখুন কোন কোন ব্রাউজারে কখন লগিন করেছেন আপনি।

সেখানে অপরিচিত কোন ডিভাইস অথবা পুরোনো কোন ডিভাইস দেখলে লগআউট করে দিন। শুধু কারেন্ট লগিন ডিভাইস লগিন রেখে নিশ্চিত হোন। এই সিকিউরিটি অপশন মাঝে মাঝেই চেক করুন পরবর্তি সতর্কতার জন্য।