খুব দ্রুতই দেয়া হলো কাদের মোল্লার ফাঁসি অতঃপর দাফন

December 13, 2013 0

শীর্ষবিন্দু নিউজ: সুপ্রিম কোর্টে রিভিউ আবেদন খারিজের পর সব প্রক্রিয়া সেরে বৃহস্পতিবার রাতের মধ্যেই খুব দ্রুতই ফাঁসির রশিতে ঝোলানো হয় আব্দুল কাদের মোল্লাকে। রাত সোয়া ১১টার দিকে কারাগার থেকে অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে র‌্যাব-পুলিশ-বিজিবির ১৪টি গাড়ি বেরিয়ে আসে কাদের মোল্লার লাশ নিয়ে। পরপর বের হওয়া দুটি অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে কালো রঙেরটিতে ছিল লাশ। এর সামনে পেছনে পুলিশের আটটি, র‌্যাবের দুটি, বিজিবির দুটি গাড়ি ছিল। কীভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে- তা জানতে আনুষ্ঠানিক ব্রিফিংয়ের অপেক্ষায় সাংবাদিকরা থাকলেও তা হবে না বলে কারা কর্মকর্তারা জানিয়ে দেন।

মৃত্যু নিশ্চিত করতে ২২ মিনিট ঝুলিয়ে রাখা হয় কাদের মোল্লার মুতদেহ। পরদিন শুক্রবার থাকায় অনাকাংকিত পরিস্থিতি এড়াতে সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী রাত ১২:০১ মিনিটে ফাসি দেয়ার কথা থাকলে তা ২ ঘন্টা আগে রাত ১০:০১ সম্পন্ন করা হয়। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাত ১০টা ১ মিনিটে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর কড়া পাহারায় ভোররাতের মধ্যেই লাশ নিয়ে যাওয়া হয় ফরিদপুরের সদর উপজেলার ভাষানপুর ইউনিয়নের আমিরাবাদে তার গ্রামের বাড়িতে। সেখানে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় কাদের মোল্লাকে, একাত্তরের নৃশংসতার জন্য যিনি প্রথম ফাঁসির কাষ্ঠে উঠলেন।

এই যুদ্ধাপরাধীকে ফাঁসিতে ঝোলানোর প্রায় সোয়া এক ঘণ্টা পর রাত সোয়া ১১টার দিকে কারাগার থেকে র‌্যাব-পুলিশ-বিজিবির পাহারায় অ্যাম্বুলেন্স বের হয়, বোঝা যায় এর একটিতে রয়েছে লাশ। রাত ৪টার দিকে ফরিদুপরের আমিরাবাদ গ্রামে লাশ পৌঁছানোর পর জানাজা শেষে লাশ দাফন করা হয়। এই কাজের তদারককারী ফরিদপুরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মামুন শিবলী গণমাধ্যমকে জানান, ঠিকঠাকভাবেই সব আনুষ্ঠানিকতা সারার পর দাফনকাজ সম্পন্ন হয়েছে। মাওয়া পেরিয়ে রাত ২টার দিকে লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে ফেরি কলমীলতা মাদারীপুরের শিবচরের কাওড়াকান্দি ঘাটে পৌঁছলে সেখান থেকে বহরের সঙ্গে ছিলেন মামুন শিবলী।

ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার পর কাদের মোল্লার লাশ দাফনের প্রস্তুতি চলছিল। পারিবারিক কবরস্থানে লাশ দাফন করা হবে বলে কাদের মোল্লার ছোটভাই ভাষানচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোল্লা মাঈনউদ্দিন আহমেদ আগেই জানিয়েছিলেন। তিনি জানান, তার (কাদের মোল্লা) শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী মা ও বাবার কবরের পাশে দাফন করা হবে। ফাঁসির তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় মাঈনুদ্দিন বলেন, আল্লাহর কাছে বিচার দিয়ে রেখেছি, আল্লাহ যা করেছেন ভাল করেছেন। এছাড়া আমাদের আর কিছু বলার নাই। সদরপুরের ইউএনও লোকমান হোসেন কবর খোঁড়াসহ আনুষঙ্গিক কাজ তদারক করতে আগেই ওই বাড়িতে যান, সঙ্গে ছিল পুলিশও।

যেভাবে ফাসির প্রস্তুতি হলো:

রাত ৯টার দিকে কারাগারে ঢুকতে দেখা যায় ঢাকার ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন আব্দুল মালেক মৃধাকে, তার সঙ্গে মনির হোসেন নামে এক মৌলভীকেও ঢুকতে দেখা যায়। নিয়ম অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে আসামিকে তওবা পড়ানো হয় এবং ফাঁসিতে ঝোলানোর পর পরীক্ষা করে মৃত্যু নিশ্চিত করেন চিকিৎসক। সিভিল সার্জন ও মৌলভীকে নিয়ে ঢোকেন ডিআইজি (প্রিজন্স) গোলাম হায়দার, অতিরিক্ত ডিআইজি ইফতেখার আহমেদ ও র‌্যাব-১০ এর অধিনায়ক ইমরান হোসেন। এর কিছুক্ষণ পর ঢোকেন ঢাকার জেলা প্রশাসক শেখ ইউসুফ হারুনও। এর মধ্যেই কারাগারের ভেতর থেকে খবর আসে, ফাঁসির মঞ্চ প্রস্তুত। শাহজাহানের নেতৃত্বে ছয়জন জল্লাদ ফাঁসিতে ঝোলাবেন কাদের মোল্লাকে। রাত ১০টার কিছু সময় পরই কারা সূত্র জানায়, ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছে যুদ্ধাপরাধীকে।

সন্ধ্যায় পরিবারের সদস্যরা কাদের মোল্লার সঙ্গে দেখা করে আসার পর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার এলাকায় নিরাপত্তা ক্রমেই বাড়তে থাকলে মঙ্গলবারের আবহ খুঁজে পাওয়া যায়। গত মঙ্গলবার আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলামের বাড়িতে সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু ওই রাতের মধ্যেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কথা বলেছিলেন। পরে চেম্বার বিচারপতির এক আদেশে তা আটকে যায়। রিভিউ আবেদন খারিজের পর সেদিনের মতো বৃহস্পতিবারও আইন উপদেষ্টা শফিক আহমেদের উপস্থিতিতে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের এক বৈঠক হয়।  তবে সেদিনের মতো এদিন কোনো কর্মকর্তাই মুখে খোলেননি। সন্ধ্যা সোয়া ৭টায় কাদের মোল্লার স্বজনরা দেখা করে আসার পর তার আইনজীবীরা দেখা করার আবেদন নিয়ে গিয়েছিলেন কারা কর্তৃপক্ষের কাছে।

তবে তা নাকচ করা হয় বলে কাদের মোল্লার আইনজীবী তাজুল ইসলাম জানান। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, আমাদের এক জুনিয়র আইনজীবী আজিমুদ্দিন পাটওয়ারি আবেদনটি নিয়ে কারাগারে যান। কিন্তু কারা কর্তৃপক্ষ ওই আবেদন নাকচ করে দিয়ে বলেছে, এখন আর দেখা করা সম্ভব নয়। রাত পৌনে ৯টার দিকে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে র‌্যাব-পুলিশের তিন শতাধিক সদস্যের অবস্থান দেখা যায়, যা পরে আরো বাড়তে থাকে। কারাগারের সামনে অনেক মানুষের উপস্থিতি সন্ধ্যার পর থাকলেও পুলিশ তাদের সরিয়ে দিতে থাকে। বন্ধ করে দেয়া হয় নাজিমউদ্দিন রোডে গাড়ি চলাচলও।

দাফন সম্পন্ন:

আব্দুল কাদের মোল্লার লাশ তারে গ্রামের বাড়িতে পৌছার পর দাফন সম্পন্ন হয়েছে। শুক্রবার ভোর রাত সোয়া চারটার দিকে ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার আমিরাবাদে পারিবারিক কবরস্থানে বাবা-মার পাশে তাঁকে দাফন করা হয়। জানাজা শেষে দাফন প্রক্রিয়া সোয়া চারটার মধ্যেই শেষ হয়।

এর আগে রাত দুইটা ১০ মিনিটে আব্দুল কাদের মোল্লার লাশ ফরিদপুর জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মামুন শিবলী গ্রহণ করেন। ১৫টি গাড়ি বহরযোগে রাত তিনটা ২৫ মিনিটে কাদের মোল্লার গ্রামের বাড়িতে তাঁর লাশ নিয়ে যাওয়া হয়। পরে কাদের মোল্লার লাশ গ্রহণ করেন তাঁর ছোট ভাই ও ভাষানচর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মাঈনুদ্দিন মোল্লা। শেষ ইচ্ছানুযায়ী মা-বাবার কবরের পাশে তাঁর কবর দেয়া হয়। তিনটা ৪৮ মিনিটে বাড়ির আঙিনায় তাঁর নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার নামাজ পড়ান ফরিদপুর ট্যাপাখোলা জামে মসজিদের ইমাম মওলানা আবু তালেব। এতে পুলিশী বাধার মধ্যেও হাজার হাজার মানুষ জানাজায় অংশ নেয়।

তবে কাদের মোল্লার স্ত্রী ও সন্তানদের কেউই সে সময় উপস্থিত থাকতে পারেন নি। তারা যখন ফরিদপুর যাবার জন্য তৈরী হচ্ছেন ঠিক তখনই কাদের মোল্লার ছোট ছেলে হাসান মওদুদসহ ১১ জনকে পুলিশ আটক করে রমনা থানায় নিয়ে যায়। পরে অবশ্য তাদেরকে ছেড়ে দেয় রমনা থানা। পুলিশ। দাফন অনুষ্ঠানে কাদের মোল্লার ভাই মাঈনুদ্দিন মোল্লা, ভাগ্নে মনি মৃধা এবং মাইনুদ্দিন মোল্লার ছেলে সজীব মোল্লা উপস্থিত ছিলেন।