l

শনিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২১, ১২:৩২ অপরাহ্ন

করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি ডিজাস্টার অ্যাট রানার প্লাজা

করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি ডিজাস্টার অ্যাট রানার প্লাজা

এখানে শেয়ার বোতাম

বৃটেনের প্রভাবশালী সাপ্তাহিক দি ইকোনমিস্ট ৪ঠা মে প্রকাশিত ‘করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি ডিজাস্টার অ্যাট রানার প্লাজা’ শীর্ষক রিপোর্টে বাংলাদেশ সরকারের সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরে।

সম্প্রতি সাভারের ভয়াবহ ভবন ধসের পর সব গার্মেন্ট মালিককেই এই বিষয়টি নিয়ে আরও গুরুত্বসহকারে ভাবা উচিত বলে মন্তব্য করেছে বৃটেনের প্রভাবশালী এই সাপ্তাহিক। আর দায়বদ্ধতা বর্তমান সরকারের ওপর বর্তায় বলেও এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। বাংলাদেশ বিষয়ক এই রিপোর্টে বলা হয়, ১৯৮৬ সালে ভূপাল বিপর্যয়ের পর একেই দক্ষিণ এশিয়াতে সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা বলে উল্লেখ করে গার্মেন্ট খাতে সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা বলে অভিহিত করেছে। যা ঢাকার অদূরে সাভারের রানা প্লাজার আটতলা ভবনে গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি ধসে কমপক্ষে ৫০০ ওপরে ব্যক্তি নিহত এবং অনেকেই পঙ্গুত্ব সহ মারাত্নকভাবে আহত হয়েছেন।

রিপোর্টে আরো বলা হয়, স্থানীয় পুলিশ এবং ব্যবসায়ী সংগঠন ভবনটি নিরাপদ নয় বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছিল। কিন্তু গার্মেন্ট মালিকরা সেটা উপেক্ষা করে শ্রমিকরা যথারীতি কাজে যোগ না দিলে বরখাস্ত করার হুমকি দিয়েছিল। এতে বলা হয়েছে এ দুর্ঘটনার প্রায় গোটা দায়ই বাংলাদেশ সরকারের ওপর বর্তায়। সরকারই এখন রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ভূমি মালিকদের বিরুদ্ধে জাতীয় ভবন কোড অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে। এখন সেই ভবন নির্মাণ বিধি প্রয়োগ করা হলে সেখান থেকে কেউ তেমন কিছু আশা করে না। এখন তাই আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছেন বাংলাদেশের গার্মেন্ট মালিকদের কাছ থেকে তৈরী পোশাক কেনা বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ওপর। গার্মেন্ট শিল্পের কল্যাণেই এখাতে বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধি বেড়ে চীনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরী পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। পরিচিত ব্রান্ডগুলোর বিরুদ্ধে পোশাক শ্রমিকদের কম মজুরি দেয়ার মাধ্যমে ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ উঠেছে।

নিবন্ধে উল্লেখ বলা হয়েছে, রাজধানী ঢাকার কাছে শিল্প এলাকা সাভারে ২৪শে এপ্রিল একটি ভবন ধসে পড়ে যেখানে একটি শপিং সেন্টার ও ৫টি পোশাক কারখানা ছিল। এক সপ্তাহ পর মৃত্যুর সংখ্যা ৪২৭ হয় যা ছোট করে দেখা হয়েছে। ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রায় দুই হাজার ৪শ’ জন বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয় বা উদ্ধার করা হয়েছে। কিন্তু নিকটবর্তী হাসপাতাল ও বিদ্যালয়গুলোতে গগনবিদারী কান্নারত স্বজনদের ঝুলানো নিখোঁজদের তালিকা বলছে, আরও ১৫০ জন নিহত হতে পারে। বিশেষ করে ইউরোপের জন্য রপ্তানি পোশাক তৈরিতে নিয়োজিত ছিল অধিকাংশ শ্রমিক। ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রাপ্ত পোশাক ও তথ্যাদিই বলছে, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার ব্র্যান্ড যেমন প্রাইমার্ক, জো ফ্রেশ, কি ও বেনেটন ওইসব কারাখানা থেকে পোশাক কিনত বলে ইকোনমিস্টের নিবন্ধে বলা হয়েছে।

নিবন্ধে বলা হয়েছে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের যুব শাখার একটি প্রভাবশালী ব্যক্তি রানা ওই ভবনের মালিক সোহেল রানা। তার নামানুসারে ভবনটির নাম করা হয়েছে রানা প্লাজা। ভবন ধসের ঘটনার চার দিন পর ভারতের সীমান্তবর্তী বেনাপোল থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে অপরাধজনিত উদাসীনতার অভিযোগ আনা হয়েছে। নিয়ম ভঙ্গ করে ভবন নির্মাণের বিষয়টিও উঠে এসেছে নিবন্ধে। বলা হয়েছে, পাঁচ তলার অনুমতি নিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে আটতলা ভবন। নিবন্ধে চালানো উদ্ধার অভিযানকে পুরোপুরি সফল হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। বলা হয়েছে, উদ্ধার অভিযান ছিল ব্যর্থ, এমনকি ঘটনাস্থল ঘিরে রাখা হয়নি। হাজার হাজার প্রত্যক্ষদর্শী ঘটনাস্থলকে ঘিরে রেখেছিল, অনেকে ধ্বংসস্তূপের ভেতরে ঢুকেছে। সৈন্য ও দমকল বাহিনীর কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে জীবিত বা নিহতদের মরদেহ উদ্ধার করেছে স্থানীয়রা। এক পর্যায়ে প্রত্যক্ষদর্শীরা উদ্ধারকাজের ধীর গতি দেখে, উদ্ধারকর্মীদের ওপর পাথর ছুড়ে মারে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে। বাংলাদেশে পোশাক কারখানার বিস্ফোরণ ঘটেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে নিবন্ধে। আর এর অন্যতম কারণ হিসেবে সস্তায় শ্রমিকের সহজ লভ্যতাকে উল্লেখ করেছে ইকোনমিস্ট।

রানা প্লাজার ধ্বংস স্তূপের ভেতর প্রাপ্ত দুটি কোম্পানির মধ্যে একটি হচ্ছে বৃটেনের প্রাইমার্ক এবং অপরটি হচ্ছে কানাডার লবলো। উভয় কোম্পানিই দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি এবং তাদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু এতেই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। এর মূল আরও গভীরে। তৈরী পোশাক কোম্পানিগুলোকে এবার সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়টির মুখোমুখি হতে হবে। বিভিন্ন গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে কাজের পরিবশে নিয়ে এর আগে সমালোচনার প্রেক্ষিতে এর আগে নাইক এবং গ্যাপের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো শিশুশ্রম মোকাবিলায় চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়েছিল।

ইকনোমিস্টের রিপোর্টে বলা হয়েছে, এখন ঢাকার দুর্ঘটনায় প্রতীয়মান হচ্ছে আপনার পণ্য নৈতিকভাবে সঠিক পরিবেশে তৈরি হয়েছে- এটা দাবি করা কতটা কঠিন। সরবরাহের সারি (সাপ্লাই লাইন) খুব লম্বার কারণে এমনটা হচ্ছে তা নয়। এক্ষেত্রে তৈরী পোশাক সরবরাহকারীকে যিনি পোশাক সরবরাহ করছেন তার বিষয়টিও নিরীক্ষার আওতায় আনা উচিত। এছাড়া তারা এমন একটি পরিবেশে প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছেন যেখানে কাউকেই বিশ্বাস করা যায় না। উদাহরণ হিসেবে পশ্চিমা একটি বহুজাতিক কোম্পানি হিসেবে বাংলাদেশের কোন কোম্পানির ভবনের সার্টিফিকেট দেখাই কি যথেষ্ট? নাকি সেই ভবনের প্রতিটি পিলার পরীক্ষা করার জন্যও তাদের প্রতিনিধি পাঠানো উচিত? সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়টিতে নৈতিকতা সম্পর্কিত বিবেচনা করা হলেও বিষয়টি এখন কোম্পানিগুলোর জন্য সুনাম এবং হুমকির ইঙ্গিত বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। পশ্চিমা কোম্পানিগুলো এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনটির মধ্যে যে কোন একটি পন্থা বেছে নিতে পারে।

প্রথমত, সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা একেবারে ভুলে গিয়ে শ্রমিকদের বঞ্চনা করে যেভাবে সম্ভব সর্ব নিম্ন মজুরির মাধ্যমে নিজেদের পণ্য তৈরি করতে পারে। শ্রমিকদের দুঃখ, কষ্ট, কান্না নিয়ে তাদের কোন মাথা ব্যথার প্রয়োজন নেই। এটি অনেক ছোট প্রতিষ্ঠানের গোপন কৌশল হতে পারে কিন্তু কোন বড় বহুজাতিক কোম্পানির জন্য এ ধরনের কাজ করা কথা কল্পনাই করা যায় না।

দ্বিতীয়ত, কোম্পানিগুলো বাংলাদেশ পরিহার করে যেসব দেশে বা যেখানে এ ধরনের ঝুঁকি কম রয়েছে সেখান থেকে পণ্য কিনতে পারে। ছোট আন্তর্জাতিক কোম্পানির পক্ষে প্রত্যেকটি জিনিস খুটিয়ে খুটিয়ে পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। এটা বেশ সহজেই বোধগম্য। তারা স্বাস্থ্য এবং নিরাপত্তার ঝুঁকি পরীক্ষা করতে বাংলাদেশকে চাপ দিয়ে এক্ষেত্রে ঝুঁকি হ্রাস করতে পারে। তবে পশ্চিমা কোন বড় কোম্পানি বাংলাদেশ ছেড়ে গেছে সেটা কেবল বাংলাদেশের জন্যই ক্ষতির কারণ হবে না। এতে তাদের সুনামেও আঘাত লাগবে।

আর তৃতীয় পন্থাটি হচ্ছে বাংলাদেশের সঙ্গেই থেকে অবস্থার পরিবর্তন করার চেষ্টা করা। এবারের এ দুর্ঘটনার আগেই ওয়ালমার্ট বাংলাদেশে একটি অগ্নি নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ একাডেমী স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছিল। আর গ্যাপ গার্মেন্ট মালিকদের তাদের স্থাপনা উন্নত করার সহযোগিতার ঘোষণা দিয়েছিল। বাংলাদেশের ৫০০০ গার্মেন্ট ফ্যাক্টরির নিরাপত্তা উন্নত করার কৌশল নির্ধারণে গার্মেন্ট শিল্প জার্মানি এবং আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশের সরকার এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেছে। তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যা-ই করা হোক, আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর ভদ্রোচিত নৈতিক প্রতিশ্রুতি আর দুর্নীতি পরায়ন রাজনীতি ও বিতর্কিত ভবনের বাস্তবতার মধ্যে ব্যাপক ব্যবধান রয়েছে। সামাজিক দায়বদ্ধতার মধ্যে সবসময়ই কাল্পনিক কিছু বিষয় থাকে। বাংলাদেশের দুর্ঘটনায় সেটাই বেরিয়ে এসেছে।

 

বাংলাদেশে একজন শ্রমিকের বেতন মাত্র তিন হাজার টাকা যা চীনের চেয়ে এক-পঞ্চমাংশ। বাংলাদেশের পোশাক খাতে ঘন ঘন বিপর্যয় রোধের পরামর্শও দেয়া হয়েছে নিবন্ধে। অন্যদের বিশেষ করে বিদেশী ক্রেতাদের চাপ ছাড়া পরিবর্তন খুব কমেই আসবে। ঢাকায় বিজিএমইএ’র ১৫ তলা বিশিষ্ট সদর দপ্তরকে অবৈধ বলে আদালত রুল জারি করেছে। এ রুলের কারণে চলতি মাসটি একটি পরীক্ষার মাস। আদালতের নির্দেশ, ১৬ই জুনের মধ্য ভবনটি ভেঙে ফেলতে হবে।যদি বিজিএমইএ নিজের ভবন ভাঙতে ব্যর্থ হয়, তাহলে অন্যদের কেন ভবন ভাঙা উচিত? তবে বিজিএমইএ নির্দেশ মানবে বলে কেউ আশা করছে না।

প্রসঙ্গত: ইকনোমিস্ট অপর এক প্রতিবেদনে সাভারের রানা প্লাজার ধসকে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে ভয়াবহ বিপর্যয় হিসেবে উল্লেখ করেছে। গতকাল ইকোনমিস্টের অনলাইন সংস্করণের এশিয়া বিভাগে ‘বাংলাদেশে বিপর্যয়: ধ্বংসস্তূপে ছিন্নবস্ত্র’ শিরোনামে সাভার ভবন ধসের ঘটনাকে ১৯৮৪ সালে ভুপালের বিপর্যয়ের পর দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে ভয়াবহ শিল্প দুর্ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, ভারতের মধ্য প্রদেশের ভুপালে ইউনিয়ন কারবাইড ইন্ডিয়া লিমিটেডে ১৯৮৪ সালের ২ ও ৩রা ডিসেম্বর গ্যাস বিস্ফোরণে ৩ হাজার ৭৮৭ জন নিহত হয়েছিল।

 


এখানে শেয়ার বোতাম






পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

All rights reserved © 2021 shirshobindu.com