l

রবিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২১, ০১:২৬ অপরাহ্ন

সিলেট সিটি নির্বাচন- আওয়ামীলীগ প্রার্থী নির্ধারণ হলেও বিএনপি অনিশ্চিত

সিলেট সিটি নির্বাচন- আওয়ামীলীগ প্রার্থী নির্ধারণ হলেও বিএনপি অনিশ্চিত

এখানে শেয়ার বোতাম

সুমন আহমেদ: নির্বাচন কমিশন ঘোষিত সিলেটসহ দেশের চার সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন একেবারেই দোরগোরায়। ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করায় সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের তারিখ ঘোষিত হলে ঘোষণার সঙ্গে সাঙ্গেই শুরু হয়ে গেছে প্রচার প্রচারণা ও প্রার্থী হওয়ার তোড়জোড়। সিলেটে আওয়ামী লীগ অবশ্য তাদের দলীয় প্রার্থী হিসেবে আওয়ামীলীগের প্রার্থী হিসেবে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা বর্তমান মেয়রকে সমর্থন দিলেও বিএনপি এখনো সিদ্ধান্তহীনতায় রয়েছে।

গতবারের ন্যায় এবারও প্রায় ডজন খানেক মেয়র প্রার্থী হিসেবে নিজেদের তুলে ধরেছেন জনসমক্ষে। অনেকে বিএনপির সমর্থন পেতে কেন্দ্রের দিকে তাকিয়ে আছেন। প্রভাবশালীদের অনেকে কেন্দ্রের সাথে লবিংও চালিযে যাচ্ছেন।

বিশেষভাবে প্রধান দুই পক্ষ সাইফুর গ্রুপ নামে পরিচিত যা পরবর্তীতে সাইফুর রহমানের মুত্যুর পর লন্ডন প্রবাসী কেন্দ্রিয় বিএনপির আন্তজার্তিক সম্পাদক ও যুক্তরাজ্য বিএনপির ত্ৎকালীন সভাপতি কমর উদ্দিন গ্রুপ নামে পরিচিত পায়। সাইফুর রহমানের মৃত্যুর পর লন্ডন থেকে দেশে ফিরে বি্এনপির এই আন্তর্জাতিক সম্পাদক তার প্রিয় নেতার অস্থিত্ব টিকিয়ে রাখতে গ্রুপের হাল ধরেন। কিন্তু বেশি দিন যেন কমর উদ্দিন গ্রপের নেতা কর্মীরা তাদের এই অভিভাবককেও ক্ষমতায় পেলেন না। যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম শহরে দলীয় এক জনসভায় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে অকাল মুত্য বরণ করেন তিনি।

অপর দিকে বিরোধী পক্ষ নামে সিলেটে পরিচিত ইলিয়াস আলী গ্রুপ। প্রায় এক বছর আগে দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইলিয়াস আলী ঢাকার বনানী থেকে গুম হলে সিলেটে ইলিয়াস অনুসারীদের নেমে আসে এক কালো ছায়া। যা ফলস্বরুপ দুই গ্রুপই আজ তাদের নেতাদের হারিয়ে ছিটকে পড়েছেন সিলেটের রাজনীতির মাঠ থেকে। এক ধরনের অভিভাবকহীন অবস্থায় তারা কোন রকমে চালিয়ে যাচ্ছেন দলীয় কর্মকান্ড। এক ধরনের অভিভাবকহীনভাবে চলছে সিলেট বিএনপির কর্মকান্ড।

সিলেট বিএনপির দুই মেয়র প্রার্থী  মহানগর বিএনপি’র সাবেক আহ্বায়ক ও কেন্দ্রীয় সদস্য ডা. শাহরিয়ার হোসেন চৌধুরী ও মহানগর সাংগঠনিক সম্পাদক কাউন্সিলর রেজাউল হাসান কয়েস লোদী বর্তমানে জেলে রয়েছেন। নির্বাচনের আগে যদি এই দুই জন বের হতে না পারেন তবে বিএনপির প্রার্থী বহর একটু হলেও হালকা হবে।

তবে কে হচ্ছেন এবার বিএনপি’র মেয়র প্রার্থী? তা নিশ্চিত কেউই বলতে পারছেন না এখনও। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, বিগত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সিলেট বিএনপির একাধিক প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেন। এবারও কি তার ব্যতিক্রম হবে না, এ নিয়ে চলছে আলোচনা। এদিকে, একক প্রার্থী না দিতে পারলে নির্বাচনে ভরাডুবি নিশ্চিত বলে মনে করছেন সাধারণ মানুষ। দুই দুই বারের মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের সাথে লড়তে হলে একক প্রার্থীর বিকল্প নেই বলে মনে করেন স্বয়ং বিএনপি’র নেতারা।

বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, নেতারা কৌশলে প্রচারণা চালাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে অন্যরাও পিছিয়ে নেই। তারা দলের ভেতরে, পরিচিতমহলে, নেতাকর্মীদের কাছে প্রচারণা চালাচ্ছেন। অনেকে ছুটে যাচ্ছেন কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে। সেই সঙ্গে সিলেট নগরীর পাড়ায় পাড়ায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন মেয়র প্রত্যাশী নেতারা। বিগত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নিলেও বিএনপি’র একাধিক প্রার্থী অংশ নেন। তাদের কেউই নির্বাচিত বর্তমান মেয়রের অর্ধেক ভোটের কাছাকাছিও যেতে পারেননি। এবারও দলীয় বিরোধের কারণে কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি নন।

অন্যদিকে, গত শুক্রবার সিলেট আওয়ামী লীগের এক কর্মী সভায় অর্থমন্ত্রী স্বয়ং বর্তমান মেয়রকে আগামী নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেন। ওই সভায় আওয়ামী লীগের নেতারা বিএনপিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, শক্তি থাকলে প্রার্থী দেন। আমরাও প্রার্থী দিচ্ছি। দেখা হবে নির্বাচনী মাঠে। কিন্তু আওয়ামী লীগের ছুঁড়ে দেয়া ওই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে পারবেন কী বিএনপি নেতারা? নাকি অতীতের মতো নিজেদের বারে গোল দিবেন নিজ দলের একাধিক প্রার্থী। সে প্রশ্নই এখন সর্বত্র, সবার মুখে মুখে।

জানা গেছে, সিলেট সিটি কর্পোরেশনের পাঁচ লাখ ভোটারের অধিপতি হতে সিলেট বিএনপির তৃণমূল কর্মী থেকে কেন্দ্রীয় নেতারা আগ্রহী। এর সংখ্যা ইতিমধ্যে ডজন ছাড়িয়ে গেছে। এ তালিকায় রয়েছেন বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, মহানগর বিএনপি’র সাবেক সভাপতি ও সিলেট নগর উন্নয়ন কমিটির সাবেক সভাপতি আরিফুল হক চৌধুরী, সিলেট মহানগর বিএনপি’র বর্তমান সভাপতি এম এ হক, সাবেক পৌর মেয়র এডভোকেট আ ফ ম কামাল হোসেন, মহানগর বিএনপি’র সাবেক আহ্বায়ক ও কেন্দ্রীয় সদস্য ডা. শাহরিয়ার হোসেন চৌধুরী (বর্তমানে জেলে), মহানগরীর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাইয়ূম জালালী পংকি, সিনিয়র সহ-সভাপতি নাসিম হোসাইন, সহ-সভাপতি বদরুজ্জামান সেলিম, সাংগঠনিক সম্পাদক কাউন্সিলর রেজাউল হাসান কয়েস লোদী (বর্তমানে জেলে), স্বেচ্ছাসেবকদলের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ও মহানগর বিএনপি’র সিনিয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট শামসুজ্জামান জামান।

এছাড়াও প্রার্থী তালিকায় আছেন মহানগর বিএনপি’র কোষাধ্যক্ষ পদ হারানো ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফরহাদ চৌধুরী শামীম, ওয়ার্ড কাউন্সিলর দিনার খান হাসু, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আজমল বখত সাদেক, ওয়ার্ড যুবদল নেতা সালাউদ্দিন লিমনও নিজেদের ইচ্ছার কথা জানাচ্ছেন বিভিন্ন ক্ষেত্রে। নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে তাদের ইচ্ছার কথা ব্যক্ত করছেন বিভিন্নভাবে। বিএনপির একান্ত কিছু নেতা কর্মীদরে সাথে আলাপকালে জানা যায়, যদিও বিএনপি’র একাধিক নেতা মেয়র হতে চান। কিন্তু তাদের একজন ছাড়া কারোরই ভোটের পুঁজি অর্ধলাখ ছাড়ার সম্ভবনা নেই। তিনি হচ্ছেন নগর উন্নয়ন কমিটির সাবেক সভাপতি ও বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নেতা আরিফুল হক চৌধুরী। সাইফুর রহমান অর্থমন্ত্রী থাকাবস্থায় সিলেট সিটি কর্পোরেশনের সকল কাজ যার হাত ধরেই হয়েছে। ভোটারদের কাছেও তার রয়েছে পরিচিতি।

বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, মেয়র পদ প্রত্যাশী হিসেবে এ পর্যন্ত যেসব নেতার নাম শোনা যাচ্ছে তাদের অনেকেইে নেতাকর্মীদের সঙ্গে দফায় দফায় মিটিংয়ে অংশ নিচ্ছেন এবং নিজেরা মেয়র প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করছেন। এরইমধ্যে আরিফুল হক চৌধুরী ইতিমধ্যে শহরের মুরব্বিদের ডেকেছেন শুক্রবার। সিলেট মালঞ্চ সেন্টারে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় তিনি তার প্রার্থী হওয়ার কথা তুলে ধরেন।

প্রসঙ্গত, বর্তমান নির্বাচিত মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়কালে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন-২০০৮ এ জেলে থেকে নির্বাচন করেছিলেন। এ নির্বাচনে তিনি লক্ষাধিক ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তবে ওই নির্বাচনে বিএনপি কিংবা জামাযাত অংশ নেয়নি। বর্তমান তফশীল ঘোষিত নির্বাচনে এতনও মেয়র প্রার্থী ঘোষণার ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেয়নি বিএনপি। ওই নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে কি না- তার ওপর নির্ভর করছে এ সিদ্ধান্ত। তবে তার চেয়ে বড় কথা হচ্ছে বিএনপি কী একক প্রার্থী ঘোষণা করতে পারবে?

পূর্বের নির্বাচন বিশ্লেষনে দেখা যায়, সিলেট সিটি কপোরেশনের প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০০৩ সালের ২০ মার্চ । সে নির্বাচনে ৫৭ হাজার ৫৫৮ ভোট পেয়ে প্রথম বারের মতো মেয়র নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী বদর উদ্দিন আহমদ কামরান। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্ধী প্রার্থী ছিলেন বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী এম এ হক। তার প্রাপ্ত ভোট সংখ্যা ছিলো ৩৫ হাজার ৫৭ ভোট। ১৫ হাজার ২০০ ভোট পেয়ে তৃতীয় হন বিএনপির আরেক নেতা সাবেক পৌর চেয়ারম্যান আ ফ ম কামাল । ৪ হাজার ৪৯৪ ভোট পেয়ে চতুর্থ হন বিএনপির অপর নেতা সামসুজ্জামান জামান। অবশ্য ওই নির্বাচনে আরো ৯ জন মেয়র প্রার্থী ছিলেন। ২০০৮ সালের ৪ আগস্ট অনুষ্ঠিত সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ২য় নির্বাচনে বিএনপি সরাসরি অংশ না নিলেও দলের একাধিক নেতাকর্মী মেয়র প্রার্থী ছিলেন। নির্বাচনে মেয়র পদে কারাগার থেকে প্রতিদ্বন্ধিতা করে ১ লাখ ১৫ হাজার ৪০৯ ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হন বদর উদ্দিন আহমদ কামরান। আ ফ ম কামাল পান ৩২ হাজার ৯৭ ভোট আর এম এ হক পান ২৩ হাজার ৪শ ৮৭ ভোট। যুবদলের সালাউদ্দিন লিমন পান ৪৭০ ভোট। দলীয় নেতাকর্মী থেকে স্থানীয় জনসাধারণ মনে করেন- এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্ধিতার জন্য বিএনপিকে একজন শক্ত প্রার্থী এবং দলীয় একক প্রার্থী ঘোষণা করতে হবে। অন্যথায় অতীতের মতো বিএনপি’র ভরাডুবি হবে।

 


এখানে শেয়ার বোতাম






পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

All rights reserved © 2021 shirshobindu.com