l

বৃহস্পতিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২১, ১২:০১ পূর্বাহ্ন

রমজানে সৌদিতে ভিন্ন রকম জীবনযাত্রা

রমজানে সৌদিতে ভিন্ন রকম জীবনযাত্রা

এখানে শেয়ার বোতাম

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মোহাম্মদ আল-আমীন: আরবি সালের একটি মাস রজমান। বিভিন্ন কারণে এই রমজান মাসটি ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এ মাসকে বলা হয় ত্যাগ ও আত্মশুদ্ধির মাস। আর রমজান মাসেই নাজিল হয় মহাপবিত্র আল কোরআন। আর এ মাসের শেষ দশদিনের বেজোড় এক রাতকে হাজার মাসের চেয়েও উত্তম হিসেবে পবিত্র কোরআনে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আর সেই রাতে কোটি কোটি মুসলমান সারারাত ইবাদত বন্দেগি করে আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়ার আশায় এবং সারা জীবনের পাপ মোচনের জন্য আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ জানায়।

সারা জাহানের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তায়ালা এই মাসটি উত্তম হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন তাই মুসলমানরা এই মাসটিকে অতি সম্মানের মাস হিসেবে বিবেচনা করে। বিভিন্ন দেশের সরকারি থেকে শুরু করে সব অফিস আদালতে এই মাসে প্রণয়ন করা হয় নতুন সময় সূচি। ইবাদত বন্দেগীকে প্রধান্য দিয়ে অন্য মাসের তুলনায় কমিয়ে আনা হয় কর্মঘণ্টা। তাকওয়া অর্জনের এই মাসটি পালিত হয় উৎসবমুখর পরিবেশে।

এখন আসি এই মাসে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ আর বর্তমান কর্মস্থল সৌদি আরবের জীবনযাত্রার ভিন্নতার বিষয়ে। বাংলাদেশে রমজান মাসে সাধারণত হাটে বাজারে, মহল্লার চায়ের দোকানে রাতের আড্ডা খুব বেশি দেখা যায় না। সঠিক সময়ে সেহরি খাওয়ার জন্য একটু আগেভাগে ঘুমাতে যাওয়ার চেষ্টা কমবেশি সবাই করে। তারাবির নামাজের পর রাতের খাবার খেয়ে সেহরির আগ মুহূর্ত পর্যন্ত একটা ঘুম দেওয়া চাই ই চাই। তা না হলে পরের দিন অফিস বা কর্মপালন অসম্ভব হয়ে পড়বে। সেহরি খেয়ে ফজরের নামাজের পর আবারো অন্তত এক/দুই ঘণ্টা ঘুম হলে ভালো হয়।

সারাদিন রোজা রাখার পর চলে ইফতার করার প্রস্তুতি। যারা অফিস আদালতে চাকরি করেন, তারা অফিস শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সঙ্গে ইফতার করা রুটিনে পরিণত করেন। অন্যদিকে, বাংলাদেশের ছোট-বড় প্রায় সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ইফতারের আয়োজন করা হয়। বাজার ছাড়াও মহল্লার মোড়ে মোড়ে বসানো হয় ইফতারির দোকান। যারা বিভিন্ন কারণে বাসায় ইফতার বানাতে পারেন না তাদের জন্য ওই সব দোকানই ভরসা।

সারা দুনিয়ার মানুষের কাছে সবচেয়ে পবিত্রতম স্থানের নাম সৌদি আরব। মুসলমানদের কাছে বেশ কয়েকটি কারণে সৌদি আরব একটি সম্মানজনক স্থান। পবিত্র মক্কা ও মদীনা এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। হজ ও উমরাহকে উদ্দেশ্য করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে এখানে সমবেত হয় লাখ লাখ মুসলমান। পবিত্র রমজান মাসে এখানে থাকে ভিন্নতা। আমি সৌদি আরবে এসেছিলাম রোজার মাস খানেক আগে। তখন অপরিচিত দেশকে জানার জন্য, দেখার জন্য সময় পেলেই বেরিয়ে যেতাম। বিশেষ করে সকালে একা একা বেরিয়ে যেতাম রাস্তায়। বাংলাদেশের মতো সৌদি আরবের দোকানপাটের সাইনবোর্ডে স্থানটা উল্লেখ থাকেনা তাই সাইনবোর্ড পড়ে স্থানের নাম জানা সম্ভব না। তার চেয়েও বড় কথা এখানকার ৯০ শতাংশ সাইনবোর্ডে শুধুমাত্র আরবি ভাষা ব্যবহৃত হয়।

প্রথম রমজান। সেহরি খেয়ে ঘণ্টা তিনেক ঘুমালাম। তখন আমার একদিন পর পর ডিউটি। ওই দিন আমার ডিউটি ছিল না। সকাল ১০টার দিকে রাস্তায় বের হলাম। হায় একি? এক/দু’টি ছাড়া সব দোকানপাট বন্ধ। আগ্রহ নিয়ে সামনের দিকে আগাতেই একই অবস্থা। সবখানেই সুনসান নীরবতা। একেবারে জনমানব শূন্য পরিবেশ। অন্যদিনের তুলনায় গাড়ি চলাচলও খুব কম। বেশি দূর না এগিয়ে বাসার দিকে ফিরে এলাম। রুমে সবাই লাইট বন্ধ করে ঘুমাচ্ছে।  ২৫/৩০ সদস্যের বিশাল মেস। বরিশালের মেস হিসেবে দাম্মামের কাতিফ শহরের অনেক বাংলাদেশির কাছেই এটি অতিপরিচিত। আসরের নামাজের পর চলছে ইফতার বানানোর প্রস্তুতি। ছয়/সাত সদস্যের একটি দল বেশ কিছু খালি ড্রাম নিয়ে পিকআপ ভ্যানে উঠে বসলো। কৌতূহল নিয়ে আমিও গেলাম তাদের সঙ্গে।   বাসা থেকে প্রায় আট/১০ কিলোমিটার দূরে একটি পানির ট্যাংক। দাম্মাম সিটি করপোরেশনের ব্যবস্থাপনায় এখান থেকে বিনা পয়সায় বিশুব্ধ খাবার পানি বিতরণ করা হয়। শ`খানেক কল থেকে যে যার ইচ্ছামত ড্রাম ভর্তি করে গাড়িতে উঠাচ্ছে। পানি নিয়ে বাসায় ফিরলাম।

বাসায় এসে জানতে পারলাম বস (যার অধীনে চাকরি করতাম) আমাকে খুঁজছেন। দেখা করলাম তার সঙ্গে। তিনি আমাকে তৈরি হতে বললেন। প্রস্তুত হয়ে বেরিয়ে পরলাম তার সঙ্গে। গাড়িতে বসে জিজ্ঞেস করলাম “কোথায় যাবেন” তিনি বললেন, ইফতার করতে। বাসায় ইফতার বানাচ্ছে আবার তিনি যাচ্ছেন ইফতার করতে বিষয়টা কেমন খটকা লাগলো। রাস্তায় অনেক মানুষ দল বেধে হাঁটছে। কিছু দূর পর পর মসজিদের পাশে অথবা খোলা জায়গায় খেমা (তাবু টানানো) বানিয়ে রাখা হয়েছে।  যেখানে গিয়ে গাড়ি থামলো জায়গাটির নাম নাইনটিনাইন। বিশাল মসজিদ। সারি সারি কার্পেট বিছানো। বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের মতো আমরাও বসে গেলাম। বেশ কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক একদিক থেকে পানি, লেবন (মাঠা), খেজুর, জুস, কলা, আপেল, মালটা আর খেপছা (আরাবিয়ান খাবার) দিচ্ছে। এ এক নতুন অভিজ্ঞতা।

এছাড়াও সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার সিগনালে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন কোম্পানির লোকজন পথচারীদের মাঝে ইফতারের প্যাকেট বিতরণ করে। মক্কা এবং মদীনায় ইফতার করানোর প্রতিযোগিতায় নামেন ধণাঢ্য ব্যক্তিরা। ইফতারের জন্য প্রস্তুত করা খেমাগুলিতে ইফতার করতে আসা বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের মাঝে ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় রোজার গুরুত্ব ও তাৎপর্য তুলে ধরে আলোচনা করেন মসজিদের ইমাম এবং অভিজ্ঞ আলেম উলামারা।   অন্যদিকে, বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকাগুলোর হোটেল-রেস্টুরেন্টে বিভিন্ন প্যাকেজে সাজানো হয় দেশি স্বাদের ইফতার সামগ্রী। এই সমস্ত হোটেল-রেস্টুরেন্টে প্রায় প্রতিদিনই থাকে ছোট-বড়, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ইফতার পার্টি। ইফতার সেরে বাসায় ফিরলাম। বিশ্রাম দূরে থাক সবাই প্রস্তুতি নিচ্ছে ডিউটিতে যাওয়ার। আরেকবার অবাক হলাম। ওইদিন আমার ডিউটি না থাকায় একটু বিশ্রাম নিয়ে তারাবির পরে বেরিয়ে আবার রাস্তায় বেরুলাম।

অন্যদিন রাত ১০/১১টায় যেসব দোকানপাট বন্ধ হয়ে যেতো, সেসব দোকানে ওই সময়ে রীতিমতো ক্রেতায় ঠাসা।

এভাবেই চলতে থাকলো রাত ২টা/আড়াইটা পর্যন্ত। তখন আর বুঝতে বাকি রইলো না যে সৌদি আরবে রমজান মাসে দিনে নয় স্বাভাবিক কাজ কর্ম হয় রাতে।   শুধু দোকানপাট আর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নয় সরকারি-বেসরকারি অফিসগুলোতেও কাজ হয় রাতেরই। লোডশেডিং মুক্ত আলো ঝলমল সৌদি আরবে রমজান মাসের রাত যেনো অন্যরকম দিন।
বছর পেরিয়ে বুধবার আবারো শুরু হচ্ছে পবিত্র মাহে রমজান। সবাইকে রমজানের শুভেচ্ছা।


এখানে শেয়ার বোতাম






পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

All rights reserved © 2021 shirshobindu.com