l

সোমবার, ০১ মার্চ ২০২১, ০৭:৫৭ অপরাহ্ন

তবু আমরা আশাবাদী থাকতে চাই

তবু আমরা আশাবাদী থাকতে চাই

এখানে শেয়ার বোতাম

 

 

 

 

 

 

 

 

 

আলী ইমাম মজুমদার: আশাবাদ মানুষের স্বভাবধর্ম। মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তিও ভাবতে থাকেন, তিনি বেঁচে যাবেন। কপর্দকশূন্য ব্যক্তি ভাবেন, এ দুর্দিন স্থায়ী হবে না। কোনো একপর্যায়ে তিনি সম্পদশালী হবেন। আর এই আশাবাদী মানুষদের প্রচেষ্টার ফলই আজকের এ মানবসভ্যতা।

ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি জন মিলটন বাইবেলের ঘটনা অবলম্বনে লিখেছিলেন তাঁর অমর কাব্য প্যারাডাইস লস্ট। এ কাব্যে কবি তাঁর সীমাহীন কল্পনা মেলে দিয়েছেন স্বর্গ, মর্ত্য, পাতালে। কাব্যের কাহিনি শয়তান ও মানুষের পতনের। এর পরবর্তী অংশেই কবি লেখেন প্যারাডাইস রিগেন্ড। মানুষের শক্তির প্রতি মিলটনের ছিল গভীর আস্থা। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ কখনো পরাজিত হতে পারে না। ওপরের প্রসঙ্গটি আলোচিত হলো বর্তমান বাংলাদেশে বিরাজমান পরিপ্রেক্ষিত সামনে রেখে।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন আগামী নির্বাচনের সময় মন্ত্রিসভা ও সংসদ বহাল থাকবে। এ ঘোষণা পূর্বকার বক্তব্যগুলোর আংশিক ব্যত্যয়। আগের বক্তব্য ছিল ২৫ অক্টোবর সংসদ ভেঙে দেওয়া হবে। সর্বশেষ ঘোষণা আবার প্রমাণ করল, রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। আর বাস্তবতা সদা পরিবর্তনশীল। এ ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় প্রধান বিরোধী দলের বক্তব্য; আলোচনার রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। বিশিষ্টজনেরা বলছেন দেশ সংঘাতের দিকে যাচ্ছে। তবে একটি বিষয়ই বারবার স্মৃতিতে আসছে।

সেটি হলো বাঙালি জাতির অগ্রযাত্রা বিভিন্ন ঘটন-অঘটনের জন্য কখনো থেমে থেকেছে। কখনো বা কিছুটা পিছু হটেছে। কিন্তু আবার জোর কদমে তার চেয়ে বেশি রাস্তা পাড়ি দিয়েছে। প্রকৃত প্রস্তাবে বাঙালি কখনো নিরঙ্কুশভাবে পশ্চাদমুখী হয়নি। আবার ইতিহাস বলে, আমরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিই না। তা নিই আর না নিই, ইতিহাস কিন্তু তার আপন গতিতেই চলবে।

সরকারের সর্বশেষ ঘোষণা অনুযায়ী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে ২৪ জানুয়ারি ২০১৪-এর পূর্বে ৯০ দিনের মধ্যে যেকোনো দিন নির্বাচনের দিনক্ষণ-সংক্রান্ত সংবিধানের নির্দেশনাও তাই। খুঁটিনাটি বিষয়াদি চূড়ান্ত করবে নির্বাচন কমিশন। সংসদ বহাল রেখে নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা যাবে কি না, তার আইনগত দিক নির্বাচন কমিশন খুঁটিয়ে দেখছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের কথাও তারা ভাবছে বলে খবরে জানা যায়। আবার এটাই প্রধানমন্ত্রীর শেষ কথা কি না, এ বিষয়ে কমিশন নিশ্চিত নয় বলে জনৈক নির্বাচন কমিশনার মন্তব্য করেছেন। আরেকজন কমিশনার বলেছেন, সংসদ রেখে নির্বাচন করা কঠিন। সংসদ ভেঙে দেওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত কমিশনের আওতায় নেই।

অন্যদিকে গত রোববার নরসিংদীর জনসভায় বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন বর্জন ও প্রতিহত করার আহ্বান জানিয়েছেন বিরোধী দলের নেতা। এ অবস্থায় নির্বাচন কীভাবে হবে কিংবা আদৌ হবে কি না, তা নিয়ে দেশবাসীর মনে গভীর সংশয় রয়েছে। এটা সবাই জানেন ও মানেন যে জাতির প্রত্যাশা একটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড আর সব দলের অংশগ্রহণে জাতীয় নির্বাচন। বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা থেকে অন্তত এখনকার মতো উত্তরণের এটাই একমাত্র পথ। দৃশ্যমান লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড যদি তৈরি না হয় আর যদি প্রধান বিরোধী দল অংশ না নেয়; সেটা উপরিউক্ত স্থিতিশীলতা আনতে অবদান রাখবে না।

বরং এ ধরনের একটি নির্বাচন পরিস্থিতিকে আরও তিক্ত ও সংঘাতময় করবে। অস্থিতিশীলতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে। তাই প্রত্যাশা ছিল প্রধান দলগুলো আলোচনার মাধ্যমে নিজ অবস্থানে অনড় না থেকে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আয়োজন করা। আপাতত সে আশায় গুড়ে বালি পড়ল। সরকার ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করলে সুষ্ঠু নির্বাচনে কী কী অসুবিধা হয়, এটা বহুজন আলোচনা করেছেন। ১৯৯৫-৯৬-এর দিকে সবচেয়ে বেশি আলোচনা করেছে আজকের সরকারি দল।

একপর্যায়ে তারা সফলও হয়েছিল নির্বাচনকালে একটি নিরপেক্ষ সরকার রাখার সাংবিধানিক ব্যবস্থা করাতে। আর সে সময় এর বিপরীতে সবচেয়ে বেশি বক্তব্য দিয়েছে আজকের বিরোধী দল। ক্ষমতার পালাবদলে তাদের বক্তব্য আমূল পাল্টে গেছে। কিন্তু দৃশ্যপট পাল্টেছে কি না, এটা পাঠক খুব ভালো করে জানেন। নির্বাচন অনুষ্ঠানের পৌরহিত্যে থাকে নির্বাচন কমিশন। বেশ কিছু দলের কাছে তাদের নিরপেক্ষতা আজ প্রশ্নবিদ্ধ। নির্বাচনের মূল চালিকাশক্তি মাঠ প্রশাসন ও পুলিশ।

প্রতিষ্ঠান দুটো বিগত দুই দশকে অব্যাহত দলীয়করণের ফলে অনেকটা বিপর্যস্ত। দীর্ঘকালীন চাপের মুখে তাদের মনোবল আজ তলানিতে। নিরপেক্ষ অবস্থান নেওয়ার তেমন কোনো চেষ্টাই তারা করতে পারবে না। তাদের নিত্যকার কাজকর্মেই নিরপেক্ষতা সদা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। এ প্রতিষ্ঠানগুলোকে সঠিক পথে চলতে দিলে তারা কিন্তু অবস্থান নিতে সক্ষম হতো এবং নিতও। তাঁদের অনেকের মাঝে দেশপ্রেম ও যোগ্যতার তেমন ঘাটতি নেই। পরিস্থিতি তাঁদের এ পর্যায়ে ঠেলে দিয়েছে। অনুকূল পরিবেশ পেলে এ কর্মকর্তারাই আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে বিস্ময়কর সাফল্য দেখাতে সক্ষম হন। এটা অতীতে বারংবার প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু এ যাত্রায় সম্ভবত তা হওয়ার পালা চুকে গেল। বিচ্ছিন্নভাবে কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা আর গণমাধ্যমের নিশ্ছিদ্র উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত কয়েকটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বা জাতীয় সংসদের আসনের উপনির্বাচন সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের নজির হিসেবে নেওয়া যথাযথ নয়।

কেননা, এক দিনে প্রায় ৬০ হাজার ভোটকেন্দ্রে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ঠুনকো নিরাপত্তাব্যবস্থায়। পর্যবেক্ষণব্যবস্থা আর গণমাধ্যমের উপস্থিতিও অনুল্লেখ্যই হবে। এরপর থাকছে সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন। বলা বাহুল্য বর্তমান সংসদ সদস্যদের অনেকেই প্রার্থী হবেন। কেউ কেউ তা না হলেও তাঁদের দলের প্রার্থী থাকবে। ১৯৯১-তে গণতন্ত্রে পুনরায় উত্তরণের পর, বিশেষ করে গত এক যুগ সাংসদদের আমরা স্থানীয় পর্যায়ে মূলত প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্বাহী দায়িত্ব পালন করতে দেখছি। উপজেলা পরিষদে তাঁরা উপদেষ্টা। আর আইন করা হয়েছে পরিষদ তাঁদের উপদেশ অনুসারে চলবে। বলার অপেক্ষা রাখে না সে উপদেশ নির্দেশের নামান্তর। প্রাথমিক থেকে স্নাতক পর্যায়ের প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান তাঁরা স্বয়ং কিংবা তাঁদের সুপারিশে নিযুক্ত ব্যক্তি। সরকারি দান-অনুদান অনেকগুলো তাঁদের পরামর্শে (বাস্তবে নির্দেশে) ব্যয় করার সরকারি আদেশ রয়েছে।

সর্বোপরি থাকছে অঘোষিতভাবে তাঁদের নির্বাচনী এলাকায় তাঁরা কিংবা তাঁদের নিযুক্ত প্রতিনিধি, প্রশাসনযন্ত্রের প্রতিটি স্তরে হস্তক্ষেপ করেন। থানায় কোন মামলা নেওয়া হবে, কোনটিতে হবে চার্জশিট বা ফাইনাল রিপোর্ট আর খাসজমি কিংবা ত্রাণসাহায্য কাকে দেওয়া হবে—এসব কিছু অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের নিয়ন্ত্রণে। সম্মানজনক ব্যতিক্রম অবশ্যই আছেন। তবে সংখ্যায় খুবই কম। টিআইবি জরিপের তথ্যের অনুপাত সে কথাই বলছে। সাম্প্রতিককালের একটি খবর। চুয়াডাঙ্গার এক উপজেলায় সাংসদ বরাবর সরকার থেকে বরাদ্দকৃত বিশেষ টেস্ট রিলিফের তথ্যাদি জানতে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) বরাবর এক সংবাদদাতা আবেদন করেন দুই মাস আগে। কিন্তু তিনি তা দেননি। তাঁর ভাষায় ‘এমপি স্যারের অনুমতি ছাড়া আমার পক্ষে তথ্য দেওয়া সম্ভব নয়। আমি ফাইল নোট দিয়ে ইউএনও ম্যাডামের মাধ্যমে এমপি স্যারের কাছে পাঠিয়েছি। অনুমতি মিললেই তথ্য পাওয়া যাবে।’ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জানান, আবেদন পেয়ে তথ্য দেওয়ার জন্য সাংসদের কাছে নির্দেশনা চেয়ে লিখিতভাবে জানানো হয়।

তবে তিনি পিআইওকে তথ্য সরবরাহের জন্য অনেক আগেই বলে দিয়েছেন। এটা ইউএনওর স্ববিরোধী বক্তব্য। তিনি কিংবা পিআইও এ বিষয়ে সাংসদের নির্দেশনা চাওয়ারই কথা নয়। তাঁরা উভয়ে তথ্য অধিকার আইন লঙ্ঘন করেছেন। আর স্বভাবতই সাংসদের বক্তব্য, তিনি পিআইওকে বারণ করেননি। কোথায় আছি আমরা? কোথায় টেনে নামানো হয়েছে প্রশাসনকে? কর্মকর্তাদের আইনগত কর্তব্য সম্পাদন, অলিখিত নির্দেশমূলে নিয়ন্ত্রণ করা হয় প্রায় প্রতিটি স্তরে।

এ সাংসদেরা পদ-পদবিসহ নির্বাচনকালে কী আচরণ করেন দেখার অপেক্ষায় রইলাম। অবশ্য তাঁদের খুব কষ্ট করতে হবে বলে মনে হয় না। প্রধান বিরোধী দলসহ তাদের জোট নির্বাচনে অংশ না নিলে কার্যকর প্রতিদ্বন্দ্বিতাই থাকবে না। ক্ষমতার পালাবদলকালে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরল ব্যতিক্রম ব্যতিরেকে গত দুই যুগ এমনটিই ঘটে চলছে। ১৯৯০-এর শেষ দিকে এরশাদ জেদ ধরেছিলেন। জেদ টেকেনি। তেমনি ১৯৯৬-এ বিএনপির জেদ হালে পানি পায়নি।

উভয় ক্ষেত্রে প্রবল আন্দোলনের মুখে তারা পিছু হটেছে। ২০০৬-এর শেষ আর ২০০৭-এর শুরুতে সদ্য ক্ষমতাত্যাগী বিএনপি একটি আস্থাভাজন তত্ত্বাবধায়ক সরকার আর নির্বাচন কমিশনের জন্য কূটকৌশল অবলম্বন করেছিল। একটি একতরফা নির্বাচন হওয়ার মুখে এক-এগারোর সামরিক হস্তক্ষেপে তা বন্ধ হয়। গঠিত হয় সেনা-সমর্থিত একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার। ভবিষ্যতে এর প্রকৃত মূল্যায়ন হয়তো বা হবে। তবে একটি গৃহযুদ্ধরূপ পরিস্থিতি থেকে এটি যে তখনকার মতো জাতিকে পরিত্রাণ দিয়েছিল, এটা বললে অসংগত হবে না। সে সরকারের সময়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বর্তমান মহাজোট মহা বিজয় লাভ করে সরকার গঠন করে।

মহাজোট প্রথম দিকে সে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে সমর্থন দিলেও পরে সুর পাল্টে যায়। আর এখন তো এটাকে একটি বিভীষিকারূপেই চিহ্নিত করা হচ্ছে। অথচ এর কুশীলবদের একজন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি আজতক চুক্তিতে একটি মর্যাদাশীল কূটনীতিক পদে বহাল আছেন। তারা বিষয়টির ওপর একটি বিপরীতমুখী অবস্থান বরাবর নিয়ে চলছে।

উল্লেখ্য, সে সময়কালে হঠকারী আচরণের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ সাংসদ সূচনায় সংসদে জোরালো বক্তব্য রাখলেও অল্প সময় পরেই এ বিষয়ে নীরব হয়ে যান। আজকের সৃষ্ট পরিস্থিতিতে জনমনের শঙ্কা অবশ্যই যৌক্তিক। গণতন্ত্র কক্ষচ্যুত হওয়ার আশঙ্কাও করছেন কেউ কেউ। এ ধরনের আশঙ্কাকে যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করার সুযোগ নেই বটে। তবে অতীত ইতিহাস ভিন্ন।

এ জাতীয় প্রতিটি সংকটের একপর্যায়ে একটি সমাধান বেরিয়ে এসেছে। এবারও আসবে, এ আশাবাদ ব্যক্ত করাও অযৌক্তিক হবে না। তবে সে সমাধানটা রাজনীতিকেরা রাজনৈতিকভাবেই করুন—এ কামনা আমাদের। আর তা করা দরকার যত দ্রুত সম্ভব।

আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব। majumder234@yahoo.com


এখানে শেয়ার বোতাম






পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

All rights reserved © 2021 shirshobindu.com