যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ায় সবচেয়ে বড় বিপদের মুখে শৈশব। কেউ শেষ হয়ে যাচ্ছে চিরতরে, কারও স্থায়ী শারীরিক ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। যাদের ক্ষেত্রে ক্ষতি শারীরিক নয়, এক দুঃসহ পরিস্থিতি মানসিক ভাবে শেষ করে দিচ্ছে তাদের।
রক্তাক্ত, ধুলোয়-কাদায় মাখামাখি, তীব্র আতঙ্কে বাক্যহারা একটা মুখ। যন্ত্রণার তীব্রতায় যেন কাঁদতেও ভুলে গিয়েছে বছর পাঁচেকের ছেলেটা। যে চিত্রসাংবাদিক শিশু ওমরানের ভিডিওটি শুট করেছিলেন, তিনিই সেই ফুটেজ সোশ্যাল মিডি
য়ায় পোস্ট করেন।
ভিডিওয় দেখা গিয়েছে, বিধ্বস্ত ওমরান আনমনেই নিজের বাঁ হাতের দু’পিঠ দিয়ে মুছে নিচ্ছে কপাল আর গাল পেয়ে গড়িয়ে আসা রক্ত। হাতের দিকে চেয়ে দেখছে এক ঝলক। তার পর অ্যাম্বুল্যান্সের সিটে মুছে নিচ্ছে হাতটা।
ছবিগুলো এখনও টাটকা। সিরিয়ায় শান্তি ফেরাতে বৈঠক হয়েছে, চুক্তি হয়েছে, চেষ্টা হয়েছে সংঘর্ষ বিরতিরও। কিন্তু আতঙ্কের রেশ এতটুকু ফিকে হয়নি। সেখানকার শৈশব যে এখনও বিপর্যস্ত তা ফের স্পষ্ট করে দিল ‘ভাইরাল’ হওয়া আরও এক মুখ!
চিকিৎসাকেন্দ্রে বসে আট বছরের মেয়েটা। কপাল থেকে গড়িয়ে পড়া রক্ত আর চোখের জলে চপচপে মুখ। এলোমেলো চুল। সারা গায়ে ধুলো। তালবিসে প্রদেশের একরত্তি কাঁদতে কাঁদতেই জানাল, তার নাম এয়া। বলল, ‘‘বাড়িতে ছিলাম। হুড়মুড় করে ছাদটা ভেঙে পড়ল।’’
অবিরাম কেঁদে যাচ্ছে খুদে। তার মধ্যেই গায়ের ধুলোবালি-রক্ত সাফ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন চিকিৎসক-নার্সেরা। এই ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়েছে ইন্টারনেটে।
তালবিসে মিডিয়া সেন্টার থেকে ছবিটি প্রথম আপলোড করা হয় সোশ্যাল মিডিয়ায়। ওই সেন্টারের দাবি, সোমবার বিমান হামলায় ধসে পড়ে এয়াদের বাড়ি। ধ্বংসস্তূপ থেকেই উদ্ধার করা হয় এয়া ও তার পরিজনদের। এয়ার আরও একটি ছবি ফেসবুকে পোস্ট করেছেন সমাজকর্মীরা। সেটা যুদ্ধের আগের ছবি। আঁচড়ানো চুল, পরিপাটি চেহারা।
আজকের এয়ার সঙ্গে পুরনো এয়ার দৃশ্যতই অনেক তফাত। সোশ্যাল মিডিয়ায় এই দু’টো ছবি পাশাপাশি পোস্ট করছেন অনেকে। লিখছেন, ‘‘যুদ্ধবিমান ওর চুল এলোমেলো করে দিয়েছে। রক্তে রাঙিয়ে দিয়েছে মুখ!’’
সমীক্ষায় বলা হচ্ছে, বছরের পর বছর ধরে আইএস জঙ্গিরা ইয়াজিদি নারীদের ভোগ্যপণ্য হিসেবে ব্যবহার করে চলেছে। চলছে নির্বিচারে অত্যাচারও।
একটা লোক পর পর চারটি মেয়েকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করল। একটি মেয়েকে পর পর দু’বার ধর্ষণ করল আধ ঘণ্টার মধ্যেই! আর একটি মেয়েকে ধর্ষণ করল তার ঘুম ভাঙিয়ে তুলে নিয়ে গিয়ে।
ফরিদা দেখেছে, মায়ের বুকের দুধ খাওয়া শিশুটিকে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে ওই মেয়েটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল একটি লোক। তার পর আরও তিনটি লোক ঝাঁপিয়ে পড়ল ওই মেয়েটির ওপর। ’
ইরাক, সিরিয়াসহ মধ্য প্রাচ্যের দেশগুলিতে গত কয়েক বছর ধরেই চলছে আইএসের অত্যাচার। দিনের পর দিন হত্যালীলা চালানোর পাশাপাশি, নারীদের প্রতিও চলছে অকথ্য অত্যাচার। বিশেষ করে ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের নারীদের ওপরই এই অত্যাচারের মাত্রা অতিরিক্ত।
দিন কয়েক আগের ঘটনা। বাড়িতে দুই বোন। অত্যন্ত সুন্দরী। বড় বোনের বয়স কিঞ্চিত বেশি। ছোট জনের বয়স ১৫ কী ১৬। বড় বোন বিবাহিতা। একদিন হঠাত্ই বাড়িতে আক্রমণ হল আইএস জঙ্গিদের। দুই বোনকেই তুলে নিয়ে গেল তারা।
বড় বোনকে প্রথম দিনই ধর্ষিতা হতে হয়েছিল ৩ জঙ্গির হাতে। তারপর থেকে এক হাত থেকে দুই হাত…সেখান থেকে বাড়তে বাড়তে ৫ নম্বর হাত। সকলেই ভোগ করে বেঁচে দিয়েছে তাঁকে। একদিন সেই ‘নরখাদক’-দের প্রয়োজন মিটতে তাঁকে সেখান থেকে মুক্তি দেয়া হয়।
তার মুখেই শোনা। এখনো কী নরক যন্ত্রণা সহ্য করতে হচ্ছে তাঁর ছোট্টো বোনটিকে। প্রতিদিন ৩ থেকে ৪ জন জঙ্গি ছিঁড়ে ছিঁড়ে ‘খাচ্ছে’ তাকে। তারা প্রত্যেকেই তার স্বামী। চমকে উঠলেন তো? সেটাই স্বাভাবিক। ১৫ বছরের ওই কিশোরীকে বিয়ে করেছে ৭ জন আইএস জঙ্গি। আর প্রতি রাতেই তাদের যৌন খিদের শিকার হতে হচ্ছে তাকে।
একসঙ্গে তিন, কখনো আবার চারজন স্বামীর শয্যাসঙ্গী হতে হচ্ছে তাকে। নিস্তার নেই কোনোভাবেই।আইএস জঙ্গিরা এই দুই বোনের দাদাদের কুপিয়ে কুপিয়ে খুন করেছে বলে অভিযোগ বড় বোনের। শুধু এই দুই বোনই নয়, এই ধরনের ঘটনার সম্মূখিন ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের হাজার হাজার নারী।
লেখক: এবিএম ফরিদ আহমেদ, বিশ্লেষক।