রবিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২১, ০৬:৫২

মোনাজাত থেকে রবীন্দ্রনাথ

মোনাজাত থেকে রবীন্দ্রনাথ

এখানে শেয়ার বোতাম
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

 

 

 

 

 

 

 

 

 

কাজল ঘোষ: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূল কংগ্রেস সভানেত্রী। ভারত কাঁপানো নারীনেত্রীদের একজন। টাইম ম্যাগাজিন ২০১২ সালে বিশ্বের ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় স্থান দিয়েছিলেন তাকে।

পশ্চিমা এই প্রভাবশালী সাময়িকী মমতাকে রগচটা ও অস্থিরমতির বললেও দীর্ঘ লড়াই শেষে তাকে একজন পরিণত রাজনীতিবিদের অভিধা দিতে ভোলেনি। পারিবারতান্ত্রিক রাজনীতিতে নিম্ন মধ্যবিত্ত তকমা মমতার কোন বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। ৩৪ বছরের  বাম শাসনকে পরাস্ত করে ঠাঁই করে নিয়েছেন রাইটার্স বিল্ডিংয়ে।

রাজ্যসভার নির্বাচনে জয়ের প্রথম দিন থেকেই আলোচনায়। ময়দান থেকে হেঁটে নিরাপত্তার চৌহদ্দি ভুলে জনতাকে সঙ্গে করে গিয়েছিলেন রাইটার্সে। নিজের চেম্বারে রেখেছেন এ্যকুরিয়াম। অবসরে মাছের খাবার দেয়া তার শখ। কাজের জট কাটাতে ঢুকে পড়েন পাশের অ্যান্টি চেম্বারে। বসে পড়েন ইজেল নিয়ে ছবি আঁকতে। সরকারে যোগ দিতে আসা তরুণদের বলেছেন একই দাওয়াই কাজে লাগাতে। রাফ অ্যান্ড টাফ মমতা কখনও মায়ের ভূমিকায় ছুটছেন অশান্ত পাহাড়কে শান্ত করতে। আবার এনাফ ইজ এনাফ বলে বিমল গুরুংকে হুঁশিয়ার করছেন। প্রতিনিয়ত ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিচ্ছেন সর্বভারতীয় রাজনীতি নিয়ে। জনসভা বা মিটিংয়ে বসেই দিচ্ছেন মুঠোফোনে বার্তা। সমানতালে টাইপ করছেন মেসেজ। দমদম থেকে জওয়াহর লাল নেহরু রোড ধরে নিউ মার্কেট দিয়ে মার্কুইস স্ট্রিট পৌঁছতেই চোখে পড়লো বড় বড় বিলবোর্ড। মমতার নমস্কার ভঙ্গিতে ছবি। উন্নয়নের পথে মানুষের সঙ্গে। রাজধানী ঢাকায়ও ঈদের আগে ছেয়ে গিয়েছিল সরকারের গুণকীর্তন লেখা পোস্টারে। ব্যতিক্রম শুধু ওখানে ভাড়া নিয়ে আর আমাদের এখানে জবরদখল।

পুরো কলকাতার বিভিন্ন সড়কে আরেকটি পোস্টার চোখে পড়লো- মমতা মোনাজাত করছেন, হিজাব পরে। খোঁজ নিয়ে জানলাম, এখন পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের প্রায় ৩০ শতাংশ মুসলিম। সুতরাং পুরসভা থেকে রাইটার্স বিল্ডিং সবখানেই আঞ্চলিক রাজনীতিতে এই ভোটাররা এখন ফ্যাক্টর। তার প্রমাণ পেলাম ঈদের দিন সকালে। রেডরোডের সবচেয়ে বড় জামাতে হাজির মমতা। ঘোমটা মাথায় দুই হাত তুলে সহযোগিতা চাইলেন সবার। বললেন, আমি হিন্দু বা মুসলমান নই। আমি সবার জন্যই কাজ করতে চাই। ক’দিন বাদেই পত্রিকায় দেখলাম ছুটেছেন বেলুড় মঠে। গিয়ে স্বামীজীর মন্দিরে পূজা দিচ্ছেন।

এত বিচিত্র চরিত্রের মমতাকে নিয়ে নানা কথা। দিন শুরু করেন আটটায়। হাত-মুখে পানি দিয়েই ট্রেডমিলে পা রাখেন। ৭০-৮০ কিলোমিটার হাঁটা। নয়টার মধ্যে চা-মুড়ি হাজির। ফোনে নির্দেশনা দিতে দিতে অফিসে চলা শুরু। এরই মধ্যে চোখ বুলিয়ে নেন রোজকার পত্রিকায় কি আছে। তর তর করে সবার আগেই সিঁড়ি ভাঙেন তিনি। নেননি সরকারি বাড়ির সুবিধা। কালীঘাটের বাড়ি থেকে রাইটার্স বিল্ডিং। প্রতিদিন ঠিক সময়ে অফিসে হাজিরা। আর একসঙ্গে কাজ সারেন অনেক। টানা ১৬-১৭ ঘণ্টা কাজ করেন। একের পর এক মিটিং। নির্দেশনা। বিলাসী কোনও গাড়ি নেননি। কালো স্যান্ট্রো গাড়িতে দাপড়ে বেড়ান পশ্চিমবঙ্গের এমাথা থেকে ওমাথা। সংবাদকর্মী হিসেবে গত দু’বছরে মমতার শাসনের নানা খবরাখবর পাচ্ছিলাম।

ঢাকায় আমাদের প্রতিনিধি পরিতোষ পাল যখনই এসেছেন জানতে চেয়েছি, পরিবর্তনের দৃশ্যমান অগ্রগতি কিছু আছে কিনা। নানা ঝুট-ঝামেলা পেরিয়ে ৬ই আগস্ট রাত সাড়ে দশটায় দমদমের সুভাষ বোস ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে পা রেখেই পরখ করছিলাম দিদির স্বরাজ। টার্মিনালের বহির্গমনে অপেক্ষায় থাকা পরিতোষ দা ও স্‌্েরাতস্বী শ্রাবণের ঝর ঝর বাদল দিনে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষায়। থিতু হবো জনবহুল মার্কুইস স্ট্রিটের সম্রাটে। আগেও কলকাতায় এসেছি আটানব্বইতে। জ্যোতি বসু তখন মুখ্যমন্ত্রী। বাম শাসনের রমরমা সময়। তখন পত্রিকার দাম ছিল এক রুপি। এখন তিন থেকে চার রুপি। মুম্বইয়ের রেকর্ড পরিমাণ ব্যবসা সফল ছবি ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস’ আর টালিউডের বস ছবির রগরগে পোস্টারে ছেয়ে আছে চারপাশের দেয়াল। আধো আলো আর অন্ধকারে কলকাতাকে জানছি নানাভাবে।

কেমন চলছে দিদির শাসনে কলকাতা- এমন প্রশ্নে চালকের আসন থেকে জবাব আসে, ‘উনি তো পারলে সিগন্যাল বাতির রেড লাইটকেও নীল রঙে মুড়ে দেন। দেখুন না, দিদি চপ্পলের রঙও বদল করেছেন। সবকিছুই নিজ দলের প্রতীকের আদলে দেখছেন।’ দিদির শাসনে কলকাতা সংস্কার হচ্ছে ব্যাপকভাবে। কলকাতায় ভারতীয় জাদুঘর সংস্কারের কারণে সীমিত অংশই দেখার সুযোগ মিলেছে। ২৩৭ বছরের পুরনো রাইটার্স বিল্ডিং ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে ৩০শে সেপ্টেম্বরের মধ্যে। মমতা নিজেও পয়লা অক্টোবর থেকে বসবেন হাওড়ার এইচএসবিসি ভবনের ১৪ তলায়। বিতর্কেও কম জড়াননি।

সামপ্রতিক চিট ফান্ড বিতর্ক, পার্ক স্ট্রিটে একটি ধর্ষণের ঘটনায় মমতার দেয়া বক্তব্যে তোলপাড় চলছে সর্বত্র। যে কোন তদন্তকেই আগাম সাজানো নাটক বলে মন্তব্য করাকে ভালভাবে নিচ্ছে না কলকাতার মানুষ। বেশ কিছু উন্নয়ন কাজের নমুনা দেখা গেছে। নির্মানাধীন রয়েছে বেশ কিছু উড়াল পথ। সেই ট্রাম, মেট্রোরেল, হলুদ ট্যাক্সির বাহার কলকাতা দিয়েছে নতুন আদল। পুঁজিবাদের আওয়াজের ঝাঁঝ টের পাওয়া যায় সর্বত্র। বাম শাসনে সব কিছু ছিল নিয়ন্ত্রিত। খাদ্যের মূল্যতালিকা এখন প্রায় বাংলাদেশী টাকার সমান। কেনাকাটা, সিনেমা, পানিপুড়ি, আলুচাট আর লেম্বু পানির শহরে মলগুলোতে উপচে পড়া ভিড়। অল্প ক’দিনের ভ্রমণে কলকাতা রপ্ত কঠিন কাজ। আচমকা মনে গাঁথলো ২২শে শ্রাবণ রবীন্দ্রপ্রয়াণ দিবসের অনুষ্ঠান আছে জোড়াসাঁকোতে। যেখানে রবীন্দ্রনাথের বাল্য, কৈশোর আর শেষবেলা কেটেছে। সেখানে রবীন্দ্র স্মরণ কোনভাবেই বাদ দেয়া যাবে না।

ছুটলাম কলেজ স্ট্রিট, কফি হাউজ আর প্রেসিডেন্সি কলেজের পথ ধরে মদন চ্যাটার্জি লেনে। সহকর্মী পরিতোষ পাল ইতিবৃত্ত বুঝিয়ে দিচ্ছেন। গলি পেরিয়ে ঠাকুরবাড়ির অন্দরে প্রবেশ করবো এমন সময় নারীকন্ঠের আওয়াজ। বক্তৃতা হচ্ছে। গেটে নিরাপত্তা তল্লাশি দেখে বুঝতে বাকি রইলো না ভেতরে সিএম। দিদি কথা বলছেন, রবীন্দ্রনাথ-কাজী নজরুল-স্বামী বিবেকানন্দ নিয়ে। মিডিয়াকর্মীদের ভিড়। মঞ্চে বসেই ইশারা করছেন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের। হঠাৎ উপস্থাপিকা চমকে দিলেন ঘোষণা দিয়ে। দিদি আমাদের গান গেয়ে শোনাবেন। মমতা দর্শকদের করজোড়ে বলে ওঠেন, পঞ্চায়েত নির্বাচনে বাংলা জুড়ে চেচিঁয়ে গলা ভেঙে গেছে। তবু গাইছি।

সামনের সারিতে বসা শ্রাবণী সেন ও ইন্দ্রানী সেনদের লক্ষ্য করে বললেন, ভুলভাল যা করবো ক্ষমা করতে হবে। এই বলেই পরিবেশের সঙ্গে মিল রেখে গেয়ে ওঠেন ‘ঝরে ঝরে বরিষে বারিধারা’ গানটি। রাজনীতির পাঠে কত পথ মাড়াতে হয় তা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে না দেখলে বুঝে উঠতাম না। রেড রোডে ঈদের নামাজ থেকে বেলুড় মঠে বিবেকানন্দের পূজায়, জোড়াসাঁকোয় রবীন্দ্রনাথের গানে…।

 


এখানে শেয়ার বোতাম
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  






পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০  
All rights reserved © 2021 shirshobindu.com