শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:০০

স্মৃতিময় শীতের সকাল

স্মৃতিময় শীতের সকাল

একখন্ড বাংলাদেশ ডেস্ক: ষড়ঋতুর অপরুপ রুপবৈচিত্রের দেশ বাংলাদেশ। শীতকাল দেশের ঋতুচক্রের পঞ্চম ঋতু। দরিদ্র দেশ হিসেবে এই শীত নানা দূর্ভোগ ও সমস্যা নিয়ে আগমন করলেও সংগে নিয়ে আসে বিশাল এক আনন্দ উল্লাসের নানা উপকরন।

কুয়াশা মোড়া শীতের সকাল! চোখ বুজলেই মনের পর্দায় ভেসে ওঠে একটি দৃশ্য। হাড় কনকনে শীতে জবুথবু একটি গ্রামের ভোর। কুয়াশা ঢাকা কিষান বাড়ির উঠোনের একপ্রান্তে গনগনে জলন্ত উনুন। সে আগুনের আঁচে উনুনের ধার ঘেষে বসে আছে বাড়ির ছেলেবুড়ো সকলে। হাসিখুশী কিষানী বৌটির সুনিপুন হাতের পটুতায় ঢাকনা ঢাকা হাড়ির উপরে, একরতি কাপড়ের ভাজে ভাজে উঠছে আতপচালের গুড়ো ঢাকা, নতুন খেঁজুর গুড় আর নারকেল কোরা দেওয়া ছোট বাটি। নামছে গরম ধোঁয়া ওঠা ভাপা পিঠা হয়ে একেকবার একেকজনের পাতে।

এ ছবি পরম মমতার, স্নেহ ও ভালোবাসার এবং পাবিরাবিক অটুট বাঁধনের এক চিরায়ত গ্রামবাংলার চিরচেনা শীতকালীন ছবি। মোড়ের চা দোকান ঘিরে ভোর হতেই জমতে থাকে জটলা। সবার গায়েই যার যার সাধ্যমত শীতের চাদর, সোয়েটার, কিংবা ছেড়াখোড়া কাঁথাকানি! গল্পে গল্পে একের পর এক খালি হয় চা’য়ের কাপ! জমে ওঠে আড্ডা! চিরাচরিত গ্রাম-বাংলার এই তো শীত ঋতু!

শৈশবে আমার শীতের এক আলাদা অনুভূতি ছিল। কুয়াশায় আচ্ছন্ন শীতের সকাল! মুখ খুললেই ধোঁয়া বের হওয়া দেখে অবাক হয়ে যাওয়া। ভাপা, চিতই, পাটিসাপটা, পুলি, কুলি নানা ধরনের পিঠা। ঘুম ভাঙ্গলেও বিছানা ছেড়ে উঠতে মন না চাওয়া। তুলে রাখা তোরঙ্গের লেপ কাঁথা কম্বলের সে এক দারুন মজা। রোদে দেওয়া ওম। তুলোর ফাঁকে ঢুকে থাকা রোদের গন্ধ। সন্ধ্যাকাশে দিগন্ত জুড়ে সারি বেঁধে উড়ে চলা অতিথি পাখির দল। কিচির-মিচির শব্দ শীতের প্রকৃতিকে করে তুলতো অন্যন্য রুপবতী নারীরুপে।

যদিও নগর জীবনে শীতের আবেদন আলাদা। তবে গ্রামে যেন প্রতি পদক্ষেপে আলাদা করে অনুভব করা যায় শীত ঋতুর তাৎপর্য্য। বাংলার পথে-প্রান্তরে, মাঠেঘাটে তাকালেই চোখে পড়ে খেজুরগাছের আগায় ঝুলছে ছোট্ট রসের হাড়ি। কোথাও গাছ থেকে রস নামানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন গাছিরা। আর ফসলের মাঠজুড়ে সোনালি আভায় সকাল সন্ধ্যা জমে হিম হিম কুয়াশা। শীতে জ্বাল দেওয়া গরম রস বা কাঁচা রস দুই এর স্বাদই অতুলনীয়! আর রসে ভেজানো রসের পিঠার তো জুড়িই নেই কোনো।

শুস্ক এ ঋতুতে এ সময়টা শুকিয়ে আসে খাল বিলের পানি। কোথাও হাঁটুজল, কোথাও বা খটখটে চর জাগে। আর তাই গ্রামের দূরন্ত কিশোর-কিশোরীরা মেতে ওঠে অল্প পানিতে মাছ ধরার উৎসবে। সেইসঙ্গে খাবারের খোঁজে খাল-বিল আর মাঠে-ঘাটে ঝাঁকে ঝাঁকে নামে সাদা বকের ঝাঁক। ঝাঁকে ঝাঁকে সাদাফুলের মত বসে থাকা বকের শুভ্রতা সেও এক অপরূপা দৃশ্য। গ্রামও শহরের হাঁট বাজারগুলোতে সব্জীপসারীর ডালায় ডালায় থরে থরে সাজানো শীতের সব্জী ফুলকপি, বাঁধাকপি, মূলা, শালগম, ওলকপি, গাজর, টমেটো চোখ জুড়ায়, মন ভরায়।

শীতের আরেক স্বর্গীয় সৌন্দর্য্য বিরাজ করে সরিষা ক্ষেতে। মাঠের পর মাঠ জুড়ে ফুটে থাকা হলুদ সরিষার ফুল যেন বিছিয়ে রাখে হলুদ ফুলেল চাদর। আর সেই ফুল কলিদের উপর উড়ে চলা রঙ্গিন প্রজাপতি আর মৌমাছিদের মেলা মন হরন করে।

মটরশুঁটি আর সবুজ ঘাসের ডগায় ঝুলে থাকে শিশির বিন্দু। সকালের রোদের আলোকচ্ছটার নানা রঙ ছড়ায় তাতে হীরক দ্যুতি। একসময় সেই রঙিন জলমোতি টুপ করে ঝরে পড়ে মাটির কোলে।

পৃথিবীর যেখানেই যাই না কেনো সে সৌন্দর্য্যের তুলনা হয়না বুঝি আর কিছুর সাথেই এই মর্ত্যলোকে! তবে এই অপরুপ শীতের সৌন্দর্য্য অনুভবে ও উপভোগে ভুলে যাওয়া যায়না সেইসব ছিন্নমূল মানুষদের কথা। একটুকরো শীতের কাপড় বা মাথা গোঁজার ঠাই নেই যাদের তাদের জীবনে শীত আনন্দের নয়, অভিশাপের আর তাই যে যার সাধ্যমত কাছের দরিদ্র মানুষটির প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেই ও পৃথিবীকে করে তুলি সুন্দর ও মঙ্গলময়।




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 ১২৩৪৫৬
৭৮৯১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০  
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2026