শনিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২১, ১১:২৫

রায়হান হত্যার এক বছর পূর্ন হলেও শুরু হয়নি বিচারকার্য

রায়হান হত্যার এক বছর পূর্ন হলেও শুরু হয়নি বিচারকার্য

শীর্ষবিন্দু নিউজ, সিলেট / ৪৬
প্রকাশ কাল: সোমবার, ১১ অক্টোবর, ২০২১

আজ সোমবার (১১ অক্টোবর) সিলেটে পুলিশি হেফাজতে রায়হান আহমদ হত্যার এক বছর পূর্ণ হচ্ছে। নগরীর আখালিয়া এলাকার যুবক রায়হান আহমদকে গত বছরের ১০ অক্টোবর দিবাগত রাতে ধরে নিয়ে যায় কোতোয়ালি ধানাধীন বন্দরবাজার ফাঁড়ির পুলিশ। পরে তাকে নির্যাতন করে মেরে ফেলার অভিযোগ ওঠে পুলিশের বিরুদ্ধে।

করোনা পরিস্থিতির কারণে বিচারকার্য শুরু বিলম্বিত হলেও পুলিশের বিভাগীয় মামলার তদন্তও শেষ হতে বছর গড়িয়েছে। রায়হানের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নি বাদি হয়ে হত্যা মামলা দায়েরের প্রায় ১ বছর পর গত ৩০ সেপ্টেম্বর চার্জশিট (অভিযোগপত্র) গ্রহণ করেন আদালত। তবে এখনও শুরু হয়নি বিচারকাজ।

ফাঁড়ির ইনচার্জের দায়িত্বে থাকা এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াসহ চারজনকে ১২ অক্টোবর সাময়িক বরখাস্ত এবং তিনজনকে প্রত্যাহার করা হয়। এরপর কনস্টেবল হারুনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে মামলার তদন্তকারী সংস্থা পিবিআই। তবে প্রধান অভিযুক্ত আকবর ১৩ অক্টোবর পুলিশি হেফাজত থেকে পালিয়ে ভারতে চলে যান। ৯ নভেম্বর সিলেটের কানাইঘাট সীমান্ত থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার পরপরই আকবরসহ পাঁচ পুলিশ ও সিলেট কোতোয়ালি থানায় মামলার প্রথম তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই আবদুল বাতেনসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে ৯টি বিভাগীয় মামলা হয়। এ মামলার তদন্তও বছর গড়িয়েছে। বিভাগীয় মামলা চলা ৯ পুলিশ সদস্যের মধ্যে ৫ জন রায়হান হত্যা মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি। এসআই আবদুল বাতেন, এএসআই কুতুব আলী ও দুজন কনস্টেবল সাময়িক বরখাস্ত আদেশে মহানগর পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত আছেন।

বিভাগীয় মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পিআরবি (পুলিশ আইন) অনুযায়ী, কোনো পুলিশ সদস্য অপরাধমূলক কাজে জড়ালে তাঁর বিরুদ্ধে দুই ধরনের বিভাগীয় শাস্তির (লঘু-গুরু) বিধান আছে। গুরুদণ্ডের আওতায় চাকরি থেকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত। লঘুদণ্ডে শুধু দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার বা পদাবনতি। বিভাগীয় মামলায় অভিযোগপত্রভুক্ত পাঁচ পুলিশ সদস্যদের মধ্যে শুধু আকবর গুরুদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। হত্যা মামলায় অভিযোগপত্রভুক্ত পাঁচ পুলিশ সদস্যের মধ্যে চলতি মাসে শুধু আকবরের বিষয়ে তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে আছে। আরও বাকি চারজনের তদন্ত চলতি মাসের মধ্যেই শেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এ ব্যাপারে রোববার জানতে চাইলে সিলেট মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) আজবাহার আলী শেখ বলেন, পুলিশের বিভাগীয় তদন্ত কার্যক্রম ফৌজাদারি মামলার মধ্যে নেই। এর মাধ্যমে পুলিশের অভ্যন্তরীণ তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো আসছে, সেগুলো বিশ্লেষণ ও তদন্ত করা হচ্ছে। এরই মধ্যে কয়েকজনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে পুলিশ ও সাধারণ মানুষও রয়েছে। এ ছাড়া অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্যও নেওয়া হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন পুলিশ বিভাগেই পাঠানো হবে। পরে বিভাগীয় আইন অনুযায়ী তাঁদের শাস্তি দেওয়া হবে।

রায়হান হত্যা মামলার বাদি পক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার এম.এ ফজল চৌধুরী জানান, আদালত পিবিআই’র দেওয়া অভিযোগপত্র গ্রহণ করেছেন। এখন বিচারিক কার্যক্রম শুরু হবে।

এদিকে, রায়হান হত্যার বছর পূর্ণ হবার আগেরদিন রাস্তায় নেমে বিচারকাযে বিলম্ব হওয়ার জন্য হতাশা প্রকাশ করেছন তার মা সালমা বেগম ও স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নি এবং পরিবারের সদস্যরা। সেই সঙ্গে খুনিদের ফাঁসি দাবি করেছেন তারা। এ সময় রায়হানের স্ত্রী তান্নিকে তপ্ত রোদে দাঁড়িয়ে তাদের একমাত্র সন্তান ১৫ মাসের আলফাকে কোলে নিয়ে নিরবে চোখের জল ফেলতে দেখা যায়।

রবিবার (দুপুরে) নগরীর চৌহাট্টাস্থ শহিদ মিনার প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন সালমা বেগম ও তাহমিনা আক্তার তান্নিসহ রায়হানের পরিবারের সদস্যরা। এ সময় তারা রায়হান হত্যার মামলার বিচারকাজ দ্রুত শুরু করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন, পলাতক আসামি আবদুল্লাহ আল নোমানকে গ্রেফতার এবং সকল আসামির ফাঁসি দাবি করেন।

মানববন্ধনে বক্তৃতাকালে রায়হানের মা সালমা বেগম বলেন, একজন ছাড়া বাকি সব আসামিকে গ্রেফতার করায় পুলিশ প্রশাসনের প্রতি আমরা সন্তুষ্ট। আমরা মনে করি- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনের সুনজর আমাদের প্রতি আছে। এ কারণেই ৫ আসামিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। পলাতক আসামি নোমানকেও এই ৫ জনের মতো যেন দ্রুত গ্রেফতার করা হয়, এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী-পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সিলেটের সকল মন্ত্রীর সুদৃষ্টি কামনা করছি। তিনি বলেন, আসামিরা গ্রেফতার হলেও মামলার চার্জশিট দিতে অনেকে দেরি হয়েছে। এতে আমরা কিছুটা হতাশ। প্রয়োজনে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলা হস্তান্তর করে মামলার বিচারকাজ দ্রুত শেষ করা হোক এবং আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা হোক।

মানববন্ধনে উপস্থিত রায়হানের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নি বলেন, আমার স্বামীর খুনিদের সহায়তাকারী নোমান এখনও মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সে যে দেশেই থাকুক না কেন, তাকে সে দেশের প্রশাসনের সহায়তায় দ্রুত গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় নিয়ে আসা হোক।

প্রসঙ্গত, ২০২০ সালের ১০ অক্টোবর দিবাগত রাতে সিলেট নগরীর আখাললিয়া নেহারীপাড়ার মৃত রফিকুল ইসলামের ছেলে রায়হান আহমদকে বন্দরবাজার ফাঁড়িতে ধরে এনে নির্মম নির্যাতন করার অভিযোগ ওঠে পুলিশের বিরুদ্ধে। ফাঁড়িতে আটকে রেখে রাতভর রায়হানকে নির্যাতন করেন তৎকালীন ইনচার্জ এসআই আকবরসহ তার সহযোগীরা। পরদিন ১১ অক্টোবর ভোরে রায়হানের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে তাকে ওসমানী হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানেই তার মৃত্যু হয়। তবে পরিবারের দাবি- নির্যাতনের ফলে ১১ অক্টোবর ভোররাতে ফাঁড়িতেই মৃত্যু হয় রায়হানের। পরে হাসপাতালে নেওয়ার নাটক করে পুলিশ।

ঘটনার পর ‘ছিনতাইকারীদের গণপিটুনিতে রায়হানের মৃত্যু হয়েছে’ মর্মে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে পুলিশ। তবে পরিবারের সদস্যদের অভিযোগও গণমাধ্যমকর্মীদের তৎপরতায় মূল রহস্য উদ্ঘাটন হয়। এ ঘটনায় নিহত রায়হানের স্ত্রী বাদি হয়ে ১২ অক্টোবর কোতোয়ালি থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পরে তদন্তে এসআই আকবরসহ পুলিশের ৫ সদস্যের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাদের আসামি করা হয়।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১
All rights reserved © shirshobindu.com 2021