সোমবার, ২৯ নভেম্বর ২০২১, ০৪:৫০

ইলিয়াস (আঃ) এর জীবনী

ইলিয়াস (আঃ) এর জীবনী

ইমাম মাওলানা নুরুর রহমান / ১৫৪
প্রকাশ কাল: শুক্রবার, ৫ নভেম্বর, ২০২১

আজ শুক্রবার পবিত্র জুমাবার আজকের বিষয়ইলিয়াস (আঃ) এর জীবনী’ শীর্ষবিন্দু পাঠকদের জন্য এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন ইমাম মাওলানা নুরুর রহমান

ইলিয়াস (আঃ) ছিলেন বনী ইসরাইলদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নবী। ছিলেন বড়ইবাদাত গুজার,আল্লাহভীরু এবং বিশালব্যক্তিত্বের অধিকারী।কুরআন মাজীদে তাঁর নামতিন বার উল্লেখ করাহয়েছে। উল্লেখ হয়েছে সূরা আনয়ামের ৮৫ আয়াতে এবং সূরা সাফফাতের ১২৩ ও ১৩০ আয়াতে।

তিনি আল্লাহর কাছে বড় মর্যাদাবান ও সম্মানিত ছিলেন। কুরআন মাজীদে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর উপর সালাম বর্ষিত হয়েছে। বাইবেলে তাঁর নাম বলা হয়েছে ‘ইলিয়া’। হযরত ইলিয়াসের কাল ও এলাকা আধুনিক কালের গবেষকগন খৃরিষ্টপূর্ব ৮৭৫ থেকে ৮৫০ এর মাঝামাঝি সময়টাকে তাঁর নবুয়্যত কাল বলে চিহ্নিত করেছেন। হযরত ইলিয়াস ছিলেন জিল’আদের অধিবাসী। সেকালে জিল’আদ বলা হত জর্ডানের উত্তরাঞ্চলকে এলাকাটি ইয়ারমুক নদীর দক্ষিনে অবস্থিত। আপনি কি কখনো সে এলাকায় গিয়েছেন? কুরআনে তাঁর মর্যাদার বর্ণনা কুরআনে হযরত ইলিয়াস(আঃ) –কে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর বংশধর শ্রেষ্ঠ নবীদের একজন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সূরা আল আনয়ামে বলা হয়েছে– “ইব্রাহীমকে আনি ইসহাক ও ইয়াকুবের মতো সন্তান দিয়েছি। তাঁদের সবাইকে সত্য পথ প্রদর্শন করেছি, যা প্রদর্শন করেছিলাম ইতোপূর্বে নূহকে।

তাছাড়া তাঁর বংশধরদের মধ্যে দাইদ, সুলাইমান, আইয়ুব, ইউসুফ, মুসা এবং হারুনকে সঠিক পথ দেখিয়েছি। উপকারী লোকদের আমি এভাবেই প্রতিদান দিয়ে থাকি। তাঁর সন্তানদের মধ্য থেকে যাকারিয়া, ইয়াহিয়া, ঈসা এবং ইলিয়াসকেও সঠিক প্রদর্শন করেছি। এরা প্রত্যেকেই ছিলো যোগ্য সংস্কারক। তাঁরই বংশ থেকে ইসমাঈল, আলইয়াসা, ইউনুস এবং লুতকেও সঠিক পথ দেখিয়েছি। এদের প্রত্যেককে আমি বিশ্ববাসীর উপর মর্যাদা দিয়েছি।” (সূরা আল আনয়াম, ৮৪-৮৬) তাঁর সংস্কারমুলক কাজ কুরআনের বর্ণনা থেকেই আপনারা জানতে পারলেন হযরত ইলিয়াস (আঃ) কতো বিরাট মর্যাদার অধিকারী নবী ছিলেন এবং আল্লাহর কতটা প্রিয় ছিলেন? সূরা আস-সাফফাতে তাঁর সংস্কারমুলক আন্দোলনের একটি সংক্ষিপ্ত অথচ চমৎকার বর্ণনা দেয়া হয়েছে– “আর ইলিয়াসও ছিলো একজন রাসুল। স্মরণ করো, সে তাঁর জাতিকে যখন বলেছিলো, তোমরা কি সতর্ক হবেনা? তোমরা কি তোমাদের এবং তোমাদের পূর্ব পুরুষদের প্রভু মহামহিম স্রষ্টা আল্লাহকে পরিত্যাগ করে বা’আলের পূজা অর্চনা করবে? কিন্তু তারা তাঁকে অস্বীকার করলো। কাজেই এখন অবশ্য তাঁদের হাজির করা হবে শাস্তি ভোগের জন্যে, তবে আল্লাহর নিষ্ঠাবান দাসদের নয়। আর পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আমি ইলিয়াসের সুখ্যাতি অব্যাহত রেখেছি।

ইলিয়াসের প্রতি সালাম। উপকারী লোকদের আমি এভাবেই প্রতিফল দিয়ে থাকি। সে ছিলো আমার একনিষ্ঠ মুমিন দাসদেরই একজন।” (সূরা ৩৭, আস- সাফফাত, আয়াত ১২৩-১৩২) বা’আল কে? আল্লাহর উপরোক্ত বানী থেকে আমরা জানতে পারলাম হযরত ইলিয়াসের জাতি বা’আলের পূজা অর্চনা করতো। বা’আলের কাছেই প্রার্থনা করতো এবং তাকেই খোদা বলে ডাকতো। তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে বা’আলকে মাবুদ বানিয়ে নিয়েছিলো। আপনারা কি জানেন এই বা’আল কে? ‘বা’আল’ এর আভিধানিক অর্থ স্বামী বা পতি। প্রাচীনকালে সিরিয়া ও জর্ডান অঞ্চলে পূজনীয়, উপাস্য, প্রভু এবং দেবতা অর্থে এ শব্দটি ব্যবহার করা হতো। সেকালে লেবাননের ফিনিকি সম্প্রদায়ের লোকেরা তাঁদের সবচে’ বড় দেবতাটিকে বলতো বা’আল। এ ছিলো পুরুষ দেবতা। এ মূর্তিটির স্ত্রীর নাম ছিলো আশারাত। এ ছিল সবচে’ বড় দেবী। আবার কোন কোন সম্প্রদায় সূর্য পূজা করতো। তারা সূর্যকেই বা’আল বলতো। আর চন্দ্র অথবা শুক্রগ্রহ ছিল এদের আশারাত। ইতিহাস থেকে জানা যায় সেকালে বেবিলন থেকে নিয়ে মিশর পর্যন্ত গোটা মধ্যপ্রাচ্যে বা’আলের পূজা বিস্তার লাভ করে।

বিশেষ করে লেবানন,সিরিয়া এবং ফিলিস্তিন অঞ্চলের মুশরিক জাতিগুলো বা’আলের পুজায় আপাদমস্তক ডুবে গিয়েছিলো। এবার আপনারা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন বা’আল কে? বনী ইসরাইলের বা’আল পূজা হযরত মুসা (আঃ) এর পর বনী ইসরাইলদের মধ্যে বা’আল পুজার প্রবনতা শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত তারা বা’আল পুজায় চরম আসক্ত হয়ে পড়ে।জানা যায় তারা কোন একস্থানে বা’আলের যজ্ঞবেদী তৈরি করে নিয়েছিল এবং সেখানে তারা বা’আলের নামে বলিদান করতো। একবার একজন খাঁটি মুমিন এই বেদীটি ভেঙ্গে ফেলে। পরদিন লোকেরা সমাবেশ লরে তাঁর মৃত্যুদণ্ড দাবী করে। অবশেষে হযরত সামুয়েল, তালুত, দাউদ এবং সুলাইমান বনী ইসরাঈলকে মূর্তি পুজার কলুষতা থেকে মুক্ত করেন। তারা মধ্যপ্রাচ্যে বিরাট শক্তিশালী ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। সে রাষ্ট্র থেকে শিরক ও মূর্তি পূজা উচ্ছেদ করেন।

কিন্তু সুলাইমান (আঃ) এর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র রহুবমের অযোজ্ঞতার কারনে বনী ইসরাইল রাজ্য ভেঙ্গে দু’ভাগ হয়ে যায়। একভাগে ছিল বাইতুল মাকদাস সহ দক্ষিন ফিলিস্তিন নিয়ে গঠিত ইহুদী রাষ্ট্র। আর উত্তর ফিলিস্তিনের নাম থাকে ইসরাইল রাষ্ট্র। ইসরাইল রাষ্ট্রের লোকেরা আবার মূর্তি পুজায় নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। তারা শিরক, মূর্তিপূজা, ফাসেকী, চরিত্রহীনতা এবং যাবতীয় বদ আমলের মধ্যে নিমজ্জিত হয়। বা’আল কে তারা দেবতা বানিয়ে নেয়। তারা নবীদের বংশধর হয়েও আল্লাহকে বাদ দিয়ে বা’আলের উপাসনায় লিপ্ত হয়ে পড়ে। মুক্তির বানী নিয়ে এলেন ইলিয়াস বনী ইসরাইল শিরক ও চরম পাপাচারের কারনে ধ্বংসের মুখোমুখি এসে দাড়ায়। এ সময় মহান আল্লাহ ইলিয়াসকে নবুয়্যত দান করেন। বনি ইসরাইলকে সতর্ক করার নির্দেশ দেন। তাঁদেরকে মুক্তি এবং কল্যাণের পথে আসার আহবান জানাতে বলেন। ইলিয়াস শাসকবর্গ ও জনগনের সামনে হাজির হন। তাঁদের সতর্ক করতে বলেন। আল্লাহকে ভয় করতে বলেন।

মূর্তিপূজা ও পাপাচার ত্যাগ করতে বলেন। বা’আলকে পরিত্যাগ করতে বলেন। তাঁদেরকে আল্লাহর বিধানের ভিত্তিতে জীবন যাপন করতে বলেন। তখন ইসরাইলের রাজা ছিলেন আখিয়াব। আখিয়াব লেবাননের (সেকালে লেবাননকে বলা হত সাঈদা) মুশরিক রাজ কন্যাকে বিয়ে করে নিজেও মুশ্রিক হয়ে পড়েন হযরত ইলিয়াস আখিয়াবের কাছে এসে বলে দেন, তোমার পাপের কারনে এখন আর ইসরাইল রাজ্যে এক বিন্দু বৃষ্টিও হবেনা। শিশির এবং কুয়াশাও পড়বে না। আল্লাহর নবীর উক্তি অক্ষরে অক্ষরে সত্য হলো। সাড়ে তিন বছর পর্যন্ত ইসরাইল রাষ্ট্রে বৃষ্টিপাত বন্ধ হয়ে থাকলো। এবার আখিয়াবের হুশ হলো। সে হযরত ইলিয়াসকে সন্ধান করে আনলো। অনুনয় বিনয় করে হযরত ইলিয়াসকে বৃষ্টির জন্যে দোয়া করতে বললো। হযরত ইলিয়াস এই সুযোগে বা’আলকে মিথ্যা প্রমান করে দেবার সিদ্ধান্ত নিলেন।

তিনি আখিয়াবকে শর্ত দিলেন, একটি জনসমাবেশ ডাকতে হবে। সেখানে বা’আলের পূজারীরা বা’আলের নামে বলিদান করবে এবং আমি আল্লাহর নামে কুরবানী করবো। গায়েবী আগুন এসে যে পক্ষের কুরবানীকে জালিয়ে ভস্মীভূত করে দিয়ে যাবে সে পক্ষের মা’বুদকেই সত্য বলে মেনে নিতে হবে। আখিয়াব এ শর্ত মেনে নিলো, তারপরকি হলো? তারপর আখিয়াব সাধারন জনসমাবেশ ডাকলো। সেখানে সাড়ে আটশো বা’আল পূজারী একত্রিত হলো। কুরবানী হলো, বলিদান হলো। তারপর? অতপর আকাশ থেকে আগুন এসে হযরত ইলিয়াসের কুরবানীকে ভস্মীভূত করে দিয়ে গেলো। সমস্ত জনগনের সামনে বা’আল মিথ্যা খোদা বলে প্রমানিত হলো। জনগন বা’আল পূজারীদের হত্যা করলো। হযরত ইলিয়াস সেখানেই আল্লাহর কাছে বৃষ্টির জন্যে দোয়া করলেন। সাথে সাথেই আকাশে মেঘ করলো। প্রচুর বৃষ্টিপাত হলো। জনগন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। নবীর উপর নির্যাতন কিন্তু আখিয়াব ছিলো স্ত্রৈণ। স্ত্রৈণ মানে স্ত্রীর অনুগত। সে স্ত্রীর গোলামী থেকে মুক্ত হতে পারেনি। তাঁর মুশরিক স্ত্রী হযরত ইলিয়াসের ঘোরতর শত্রু হয়ে পড়ে। স্ত্রীর খপ্পরে পড়ে আখিয়াব আল্লাহর নবীর উপর নির্যাতন শুরু করে। তাঁর স্ত্রী ইসাবেলা ঘোষণা করে দেয়, বা’আল পূজারীদের যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, ইলিয়াসকেও সেভাবে হত্যা করা হবে। তারা অত্যাচার নির্যাতনের দাপটে জনগনের মুখ বন্ধ করে দিলো। ইলিয়াস একাকী হয়ে পড়লেন। তিনি বাধ্য হয়ে দেশ থেকে হিজরত করেন এবং সিনাই পর্বতের পাদদেশে আশ্রয় নেন। সংস্কার কাজ চালিয়ে যান হযরত ইলিয়াস কয়েকবছর সিনাইর পাদদেশে অবস্থান করেন। এরি মধ্যে দক্ষিন ফিলিস্তিনের ইয়াহুদী শাসক ইয়াহুরাম ইসরাইল রাজ্যের শাসক আখিয়াবের মুশরিক কন্যাকে বিয়ে করেন। তাঁর প্রভাবে ইহুদী রাজ্যেও ব্যাপক ভাবে মূর্তিপূজার প্রচলন শুরু হয়। ইলিয়াস এখানে আসেন। তাঁদের সতর্ক করেন। তাদের আল্লাহর পথ দেখান। মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করতে বলেন। মর্মস্পর্শী অনেক উপদেশ দিয়ে রাজা ইয়াহুরামকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পত্রও প্রদান করেন। কিন্তু তারা শিরক, মূর্তিপূজা ও পাপাচার থেকে বেরিয়ে আসেনি। শেষ পর্যন্ত রাজা ধ্বংস হয়ে যায়। কয়েকবছর পর ইলিয়াস আবার ইসরাইল রাষ্ট্রে ফিরে আসেন। আখিয়াব ও তাঁর পুত্র আখযিয়াকে সঠিক পথে আনার আপ্রান চেষ্টা চালান। কিন্তু তাঁরাও আল্লাহর পথে ফিরে আসেনি।

অবশেষে হযরত ইলিয়াসের বদদোয়ায় আখিয়াব রাজ পরিবার ধ্বংস হয়ে যায়। হযরত ইলিয়াসের সুখ্যাতি জীবদ্দশায় হযরত ইলিয়াসের প্রতি চরম অত্যাচার নির্যাতন চালালেও তাঁর মৃত্যুর পর বনী ইসরাইল তাঁর ভক্ত অনুরক্ত হয়ে পড়ে। বাইবেল থেকে জানা যায়, বনি ইসরাইল ধারনা করতো, ইলিয়াসকে আল্লাহ তায়ালা উঠিয়ে নিয়ে গেছেন এবং তিনি আবার পৃথিবীতে আসবেন। তারা ইলিয়াসের আগমনের প্রতীক্ষায় ছিলো। তাঁর আটশো বছর পরে হযরত ঈসা (আঃ) এর জন্ম হয়। তিনি তাঁর সাথীদের বলে যান, ইলিয়া (ইলিয়াস) আটশো বছর আগে অতীত হয়ে গেছেন। তিনি আর পৃথিবীতে আসবেননা। যাই হোক, পরবর্তী লোকদের মাঝে হযরত ইলিয়াসের প্রচুর সুখ্যাতি ছরিয়ে পড়ে। সেকথাই মহান আল্লাহ কুরআনে এভাবে বর্ণনা করেছেন- “আর পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে আমি ইলিয়াসের সুখ্যাতি ছড়িয়ে দিয়েছি।” (সুরা আস সাফফাত, আয়াত ১২৯) ‘সালামুন আ’লা ইলিয়াসিন।’

যে, চারজন নবী জীবিত আছেন। তন্মধ্যে খিযির ও ইলিয়াস দুনিয়াতে এবং ইদরীস ও ঈসা আসমানে রয়েছেন। কিন্তু হাকেম ও ইবনু কাছীর এসব বর্ণনাকে বিশুদ্ধ বলেননি। সারকথা, হযরত ইলিয়াস (আঃ)-এর জীবিত থাকার বিষয়টি কোন ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত নয়। অতএব এসব বর্ণনার প্রতি কর্ণপাত করার কোন প্রয়োজন নেই। ইলিয়াস (আঃ) স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় মৃত্যুবরণ করেছেন বলেই আমরা বিশ্বাস করব।

লেখক: ইসলাম বিভাগ প্রধানশীর্ষবিন্দু নিউজ। ইমাম খতিবমসজিদুল উম্মাহ লুটন, সেক্রেটারিশরীয়া কাউন্সিল ব্যাডফোর্ড মিডল্যন্ড ইউকে। সত্যায়নকারী চেয়ারম্যাননিকাহনামা সার্টিফিকেট ইউকে। প্রিন্সিপালআর রাহমান একাডেমি ইউকে, পরিচালকআররাহমান এডুকেশন ট্রাস্ট ইউকে




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

All rights reserved © shirshobindu.com 2021