শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৪, ০৭:৪৬

সূরা আল মায়েদাহ

ইমাম মাওলানা নুরুর রহমান / ৫৯৭
প্রকাশ কাল: শুক্রবার, ২৬ আগস্ট, ২০২২

আজ শুক্রবার পবিত্র জুমাবার আজকের বিষয় সূরা আল মায়েদাহ শীর্ষবিন্দু পাঠকদের জন্য এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেনইসলাম বিভাগ প্রধান ইমাম মাওলানা নুরুর রহমান

নামকরণ: تسمية الكل باسم الجزء -এর নিয়মানুযায়ী একে সূরা আল মায়িদাহ’ নামে নামকরণ করা হয়েছে। কেননা এ সূরার পঞ্চদশ রুকূ’তে ১১৪ নং আয়াতে ‘মায়িদাহ’ শব্দের উল্লেখ রয়েছে। যেমন-  قال عيسي بن مريم اللهم ربنا انزل علينا ماءدة من السماء মায়িদাহ’ শব্দের অর্থ হলাে- খ্যাদ্যদ্রব্য, দস্তরখান, খাদ্যাধার ও ভােজপানীয় ইত্যাদি।

ইমাম রাযী ও ইমাম রাগেব (র.)-এর মতে, “:” শব্দের অর্থ- অনুগ্রহ ও কল্যাণ। ফলে হযরত ঈসা (আ.)-এর প্রতি অবতারিত অনুগ্রহ ও কল্যাণসমূহ অত্র সূরায় আলােচিত হয়েছে। বিধায় এ সূরাকে ‘মায়িদাহ’ নামে নামকরণ করা হয়েছে। অথবা বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যের বৈধতা ও অবৈধতা এ সূরায় আলােচিত হয়েছে, তা হতেই এ নামকরণ করা হয়েছে। কিছু সংখ্যক তাফসীর কারকের মতে, এ সূরাটির অপর নাম হলাে সূরাতুল উকুদ’ ।

যেহেতু এ সূরাতে আল্লাহর সাথে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করার কথা বর্ণিত হয়েছে, আর সূরার শুরুতে ‘উদ’ [প্রতিজ্ঞা- প্রতিশ্রুতি]-এর কথা উল্লিখিত হয়েছে। আর কোনাে কোনাে তাফসীরকার বলেন, এর নাম সূরাতুল মুনকিাহ’ [আযাব হতে মুক্তিদানকারী]। কেননা এ সূরার নির্দেশাবলির উপর আমল করলে আজাব হতে রক্ষা পাওয়া যায় ।

বিষয়বস্তু: মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের সর্ববৃহৎ সূরাগুলাের অন্যতম হলাে সূরা আল-মায়িদাহ’। এর বিষয়বস্তুগুলাে নিম্নরূপ-

১. মুসলমানদেরকে তাদের ধর্মীয় ও তমদুনিক বিষয়াবলি যথাযথভাবে মান্য করার নির্দেশ : মহান আল্লাহর সাথে কৃত প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করার নির্দেশ, হজের সফরের নিয়ম-কানুনের বর্ণনা, আল্লাহর নিদর্শনসমূহের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা এবং বাইতুল্লাহ জেয়ারতকারীদের প্রতি কোনােরূপ বাধা সৃষ্টি না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

২, খাদদ্রব্য সম্পর্কীয় হালাল হারামের বর্ণনা : খাদ্য ও পানীয় দ্রব্যাদিতে হালাল-হারামের সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। জাহিলিয়া যুগের বিভিন্ন উদ্দেশ্যে জবাইসমূহ হারাম করা হয়েছে। আহলে কিতাবদের সাথে পানাহার করা ও তাদের কন্যাদেরকে বিবাহ করার অনুমতি প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহর নামে কৃত শপথ ভঙ্গের কাফফারা নির্দিষ্ট করা হয়েছে। ব্যভিচার গােপন প্রণয়ের নিমিত্তে গ্রহণ করতে নিষেধ করা হয়েছে।

৩. বিভিন্ন বিধিবিধান ; অজু, গােসল ও তায়াম্মুমের বিস্তারিত বিধান, ন্যায়সঙ্গতভাবে সাক্ষ্য প্রদান ও সঙ্কর্ম করার নির্দেশক বিষয় আলােচিত হয়েছে। ইহুদি জাতির হীন প্রকৃতি, ধর্মীয় গ্রন্থের পরিবর্তন, আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদার ভঙ্গ, খ্রিস্টান জাতির ভ্রান্তি ও অধঃপতন, প্রতিমাপূজকদের অন্ধ বিশ্বাস, অজ্ঞতা এবং তাদেরকে সৎ পথে আনার জন্য রাসূল প্রেরণের বিষয় উল্লিখিত হয়েছে।

৪, ভ্রান্ত কার্যকলাপের বর্ণনা ; আদম (আ.)-এর পুত্রদ্বয় হাবীল ও কাবীলের ঘটনা, চুরি, ডাকাতি ও খুন-খারাবির বিধিবিধান, রাসূলের সাথে ইহুদিদের মন্দ আচরণ, কিসাসের বিধান, ইহুদি ও নাসারাদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ না করার নির্দেশ এবং ধর্মদ্রোহীদের কার্যকলাপের কথা বর্ণিত হয়েছে।

৫. ইসলাম ও বাতিল ধর্মের বিষয়ে বর্ণনা : পবিত্র ইসলামের পূর্ণ পরিণতি, মুসলমান জাতির স্বাতন্ত্র ও কথা আলােচিত হয়েছে। মুসলমানগণ সে সময় শাসক গােষ্ঠীতে পরিণত হয়েছিল। তাদের হাতে ক্ষমতা ও শাসনদণ্ড ছিল আর তা পূর্ববতী জাতিসমূহের গােমরাহী ও ভ্রষ্টতার কারণে হয়েছে। ফলে তাদেরকে উপদেশের মাধ্যমে সতর্ক কর হয়েছে। ইহুদিশক্তি যখন চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গিয়েছে, আরবদের উত্তরাঞ্চলের প্রায় সমগ্র ইহুদি বসতি মুসলমানদের অধিকারে চলে এসেছে, এ সময় অনুসৃত ভ্রান্তনীতি সম্পর্কে তাদেরকে আর একবার সাবধান করে দেওয়া হয় এবং সত্য পথ অনুসরণ করার আহ্বান জানানাে হয়। বস্তুত এ সূরায় হালাল-হারাম সম্পৰ্কীয় বিভিন্ন বিধিবিধান, তাওরাতের বিকৃতি, ইহুদিদের ভ্রান্তনীতি ও ধ্বংস, ইনজীলের বিলুপ্তি, হযরত ঈসা (আ.)-এর নির্দেশাবলি, খ্রিস্টানদের চরম পরিণতি, কুরআনের শ্রেষ্ঠত্ব, পারলৌকিক সুবিচার, শান্তি ও পুরস্কার ইত্যাদিসহ বহু সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বিধানাবলি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে আলােচিত হয়েছে।

শানে নুযূল: এ সূরা বিশেষ কোনাে ঘটনাকে কেন্দ্র বা উদ্দেশ্য করে অবতীর্ণ হওয়ার কোনাে প্রমাণ পাওয়া যায় না। কেননা হযরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর এক বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, সূরা মায়িদাহ্-এর কিয়দংশ হুদায়বিয়ার সফরে, কিয়দংশ মক্কা বিজয়ের সময়, আর কিয়দংশ বিদায় হজের সময় অবতীর্ণ হয়। -(মা’আরিফুল কুরআন

অবতীর্ণের সময়কাল: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত আছে যে, ব্যতীত এ সূরার সমস্ত আয়াত মদীনায় অবতীর্ণ হয়েছে। মুহাম্মদ আল-কুরাযী (র.) হতে বর্ণিত যে, বিদায় হজ্জে যখন রাসূল মক্কা ও মদীনার মাঝখানে ছিলেন, তখন সূরা মায়িদাহ্ অবতীর্ণ হয়েছে।

ঐ সময় রাসূল উস্ত্রীর উপর আরােহণ করছিলেন, ওহীর ওজনের কারণে উষ্ট্রীর কাঁধ ভেঙ্গে যাবার উপক্রম হয়েছিল। তা দেখে নবী করীম কােনাে উন্ত্রী হতে নেমে গিয়েছিলেন। -রূহুল মাআনী]

হযরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন যে, পবিত্র কুরআনের সূরাসমূহের নাজিল হওয়ার দিক থেকে সূরা মায়িদাহ্ সর্বশেষ নাজিল হয়েছে। এ জন্য এতে যা কিছু হালাল পাও, তাকে হালাল মনে করাে; আর যা কিছু হারাম পাও, তাকে হারাম মনে করাে ।

অর্থাৎ সূরা মায়িদাহ-এর বর্ণিত কোনাে বিধান বাতিল হয়নি। -আহমদ, নাসায়ী] এতে ১২০ টি আয়াত ও ১৬ টি রুকূ’ রয়েছে।

সূরা আল মায়েদা।
পবিত্র কুরআনের ৫ নম্বর সূরা। এর আয়াত সংখ্যা ১২০টি এবং এর রূকুর সংখ্যা ১৬টি। সূরাটি মদিনায় অবতীর্ণ হয়েছে। মায়িদাহ শব্দের অর্থ ‘খাবার টেবিল’ বা ‘এমন একটি টেবিল যাতে খাবার পরিবেশিত আছে’।

হুদাইবিয়ার সন্ধির পর ৬ হিজরীর শেষের দিকে এ সূরাটি নাযিল হয়। আল ইমরান ও আন নিসা সূরা দুটি যে যুগে নাযিল হয়, সে যুগ থেকে এ সূরাটির নাযিলের যুগে পৌঁছতে বিরাজমান পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে অনেক বড় রকমের পরিবর্তন সূচিত হয়েছিল।

উহুদের যুদ্ধের বিপর্যয় যেখানে মদীনার নিকটতম পরিবেশও মুসলমানদের জন্য বিপদসংকুল করে তুলেছিল। সূরা- মায়েদা পড়তে চাইলেঃ সুরা-মায়েদা কুরআনের তাফসির ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে শানে নুযুলের অনেক গুরুত্ব ও প্রয়োজন রয়েছে।

এজন্য ইমাম মাহদি (রহ.) বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো আয়াতের শানে নুযুল অথবা সংশ্লিষ্ট ঘটনা জানা না থাকে, ততক্ষণ সে আয়াতের অর্থ ও মর্ম বর্ণনা করা সম্ভব নয়।মদ হারাম হওয়ার পূর্বে একদিন হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) কিছু সাহাবিকে নিজ বাসায় খাওয়ার দাওয়াত দিলেন। সেখানে খাবারের পর মদ পরিবেশন করা হয়। মদ খাওয়ার পর নামাযের সময় হওয়ায় সাহাবারা টলতে টলতে নামাযে দাঁড়ালেন।

এক সাহাবি নামাযের ইমামতি করছিলেন, তিনি নেশার কারণে সূরা ভুল পড়লেন। সে প্রেক্ষিতে এ আয়াত নাযিল হয়। সূরা মায়েদার ৯০ ও ৯১নং আয়াত যখন মদ ও জুয়া হারাম হওয়া সম্পর্কিত হুকুম নাযিল হল। যেসব সাহাবি মদ ও জুয়া হারাম হওয়ার পূর্বে ইন্তেকাল করেছেন তারা তো জীবদ্দশায় মদ ও জুয়াতে লিপ্ত ছিলেন, এখন তাদের পরিণাম কী হবে? তারা কি ক্ষমা পাবে? এর প্রতি উত্তরে সূরা মায়েদার উপর্যুক্ত আয়াত নাযিল হয় যে, যারা মদ ও জুয়া হারাম হওয়ার পূর্বে এগুলোতে লিপ্ত ছিল সে কারণে তাদের ওপর কোনো আজাব হবে না। (সুবাহানাল্লাহ)

ষষ্ঠ হিজরীর যিলকদ মাসের ঘটনা। চৌদ্দশ মুসলমানকে সাথে নিয়ে নবীজি (স.) উমরাহ সম্পন্ন করার জন্য মক্কায় উপস্থিত হয়েছেন। কিন্তু কুরাইশ কাফেররা শক্রতার বশবর্তী হয়ে আরবের প্রাচীনতম ধর্মীঁয় ঐতিহ্যের সম্পূর্ণ বিরুদ্ধাচরণ করে তাঁদের উমরাহ করতে দিল না। অনেক তর্ক বিতর্ক ও বাদানুবাদের পর তারা এতটুকু মেনে নিল যে, আগামী বছর আপনারা আল্লাহর ঘর যিয়ারত করার জন্য আসতে পারেন। ইসলামের শক্তিকে দমন করার জন্য কুরাইশরা সর্বশেষ প্রচেষ্টা চালিয়েছিল খন্দকের যুদ্ধে। এতেও তারা শোচনীয় ভাবে ব্যর্থ হয়। এরপর আরব বাসীদের মনে এ ব্যাপারে আর কোন সন্দেহই রইলো না যে, ইসলামের ও আন্দোলনকে খতম করার সাধ্য দুনিয়ার আর কোন শক্তির নেই।

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)’র জীবনের শেষের দিকে সূরা মায়েদা নাজিল হয়। এ সূরার ১১৪ ও ১১৫ নম্বর আয়াত থেকে সূরাটির নামকরণ ‘মায়েদা’ করা হয়েছে। এ দুই আয়াতে বলা হয়েছে, হযরত ঈসা (আ.)’র দোয়ার বরকতে আকাশ থেকে খাদ্যভর্তি খাঞ্চা বা মায়েদা নাজেল হয়েছিল।

রাসুল (সা.) বিদায়-হজ্জ শেষে- মদিনায় প্রত্যাবর্তনের পথে গাদীরে-খোম নামক স্থানে পৌছালেন। ১০ম হিজরীর জিলহাজ্জ্ব মাসের আঠারো তারিখে এই আয়াত-শরিফ নাযিল হয়। তখন হযরত জিবরাঈল (আ.) এসে বলেন- হে মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহতাআলা আপনার প্রতি যে ভাবে দুরুদ পাঠিয়ে থাকেন, সেভাবেই দুরুদ পাঠিয়েছেন।

অতপর বলেন, `হে আল্লাহর রাসুল! প্রচার করুন যা কিছু আপনার প্রতিপালকের নিকট থেকে, আলী (আ.) এর সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। যদি আপনি এই নির্দেশ পালন না করেন তবে যেন আপনি রেসালাতের কোন দায়িত্বই পালন করলেন না!’

মারিয়াম-পুত্র ঈসা বলল, ‘হে আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ, আমাদের প্রতি আকাশ থেকে খাদ্যভর্তি খাঞ্চা অবতীর্ণ করুন। তা আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সবার জন্য আনন্দোৎসব স্বরূপ হবে এবং আপনার পক্ষ থেকে একটি নিদর্শন হবে। আর আমাদের জীবিকা দান করুন; আপনিই তো শ্রেষ্ঠ জীবিকাদাতা।’ আল্লাহ বললেন, ‘অবশ্যই আমি তোমাদের কাছে সে খাঞ্চা প্রেরণ করব; কিন্তু এরপর তোমাদের মধ্যে কেউ কুফরি করলে তাকে এমন শাস্তি দেব, যে শাস্তি বিশ্বজগতের অন্য কাউকে দেব না।’ (সুরা আল মায়েদা : ১১১-১১৫)

আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বিশ্বনবী (সা.)-কে বলছেন, আহলে কিতাব বা ইহুদি ও খ্রিস্টান ধর্মগুলোর মত ধর্মের বহু অনুসারী পবিত্র কোরআনকে মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। এ ধরনের চিন্তা ও ধর্ম বিরোধিতা তাদেরকে কাফের বা অবিশ্বাসীতে পরিণত করছে। কারণ, তারা জেনে-শুনেই এ ধরনের পথ বেছে নিয়েছে। তাই হে নবী (সা.) আপনি তাদের কুফরির ব্যাপারে দুঃখিত হবেন না। আল্লাহই তাদের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবেন।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০  
All rights reserved © shirshobindu.com 2024