শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৪, ০৮:২০

দেশে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট!

দেশে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট!

শীর্ষবিন্দু নিউজ, ঢাকা / ১২৯
প্রকাশ কাল: সোমবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২

দেশে চাহিদার বিপরীতে সব সময়ই কম বেশি গ্যাস সংকট বিদ্যমান ছিল এবং এখনও তা অব্যাহত আছে। দেশের এই গ্যাস-সংকট দীর্ঘকালের।

২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের সরকার গঠনের সময় দেশে গ্যাস সরবরাহ ছিল দৈনিক ১৭৫ কোটি ঘনফুট। আর ওই সময়ে গ্যাসের চাহিদা ছিল ২০০ কোটি ঘনফুট। এতে দৈনিক ঘাটতি পড়ে ২৫ কোটি ঘনফুট।

এরপর সরকারের উদ্যোগের ফলে ২০১২ সাল নাগাদ গ্যাস উত্তোলন দৈনিক ১০০ কোটি ঘনফুট বৃদ্ধি পেয়ে সরবরাহ সক্ষমতা হয় ২৭৫ কোটি ঘনফুট। কিন্তু এ সময়ে গ্যাসের চাহিদা ৩০০ কোটি ঘনফুট ছাড়িয়ে যাওয়ায় দৈনিক ২৫ কোটি ঘনফুটের বেশি ঘাটতি পড়তে থাকে।

অবশ্য পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান বলেছেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে আমরা কিছুটা নাজুক অবস্থায় রয়েছি এ কথা ঠিক, তবে আমরা বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করায় ভবিষ্যতে বেশি খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

সূত্র মতে, এ সেক্টরে তেমন কোনো উদ্যোগ বাস্তবায়িত না হওয়ায় দেশের ক্ষেত্রগুলো থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে গ্যাস উত্তোলন বাড়েনি। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্স ওয়ার্কওভার (বিদ্যমান কূপ সংস্কার) করে এবং কয়েকটি নতুন কূপ খনন করে মাঝেমধ্যে দুই থেকে আড়াই কোটি ঘনফুট পর্যন্ত উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম হয়।

তবে তা ঘাটতি পূরণে যথেষ্ট ছিল না। পাশাপাশি দেশের ক্ষেত্রগুলোতে গ্যাসের চাপ কমে আসা এবং আরও কিছু কারিগরি কারণে প্রায় ৪০ কোটি ঘনফুট কমে বর্তমানে দৈনিক ২৩৫ কোটি ঘনফুটে দাঁড়িয়েছে।

এরপর সরকার ২০১০ সালে এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নিলেও ২০১৮ সালের শেষ দিকে প্রথমে সরকারি মালিকানার একটি ভাসমান টার্মিনাল (ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রি-গ্যাসিফিকেশন ইউনিট, সংক্ষেপে এফএসআরইউ)-এর মাধ্যমে ও পরে বেসরকারি খাতের আরেকটির মাধ্যমে এলএনজি আমদানি শুরু হয়।

মহেশখালীতে বঙ্গোপসাগরে স্থাপিত এই এফএসআরইউ দুটি ব্যবহার করে দৈনিক মোট ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে দেওয়া সম্ভব হলেও পাইপ লাইনের সীমাবদ্ধতার কারণে দৈনিক ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়। পরে দৈনিক ৯০ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে আমাদের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৪০০ কোটি ঘনফুটের বেশি। আর সেখানে দৈনিক সরবরাহ করা যাচ্ছে ২৯০ কোটি ঘনফুটের মতো। এর মধ্যে ৫৫ কোটি ঘনফুট পাওয়া যাচ্ছে এলএনজি থেকে। ৮৫ কোটির মতো পাওয়া যাচ্ছে দেশীয় তিনটি উত্তোলন কোম্পানি থেকে। আর ১৫০ কোটি ঘনফুট আসছে পিএসসির অধীনে দুটি বিদেশি কোম্পানির পরিচালিত দেশীয় ক্ষেত্র থেকে। এতে দৈনিক ঘাটতি থাকছে ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার রাষ্ট্রীয় মালিকানার এফএসআরইউটির ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য এর অপারেটর এক্সিলারেট এনার্জিকে বলেছে। তারা হয়তো এই ক্ষমতা দৈনিক ২০ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত বাড়াতে পারবে। কিন্তু তাতে বছর দু-এক সময় লাগবে। এ ছাড়া সরকার আরও একটি এফএসআরইউ করার বিষয়ে কার্যক্রম শুরু করেছে। সেটা হতে বছর পাঁচেক লাগতে পারে।

এর বাইরে সরকার দেশের ক্ষেত্রগুলো থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দৈনিক ৬১.৮ কোটি ঘনফুট (৬১৮ মিলিয়ন) গ্যাস উত্তোলন বাড়ানোর সর্বাত্মক চেষ্টা শুরু করেছে। যদি এই ৬১.৮ কোটি ঘনফুট উত্তোলন বাড়ে, বিশ্ববাজার স্বাভাবিক হলে এলএনজি থেকে ৪৫ কোটি ঘনফুট সরবরাহ বাড়ে, এক্সিলারেট এনার্জি এফএসআরইউর ক্ষমতা ২০ কোটি ঘনফুট বাড়ায়, তাহলেও ২০২৫ সালে আমাদের সর্বমোট গ্যাস সরবরাহ হতে পারে ৪১৭ কোটি ঘনফুট।

কিন্তু ২০২৫ সালে আমাদের দৈনিক চাহিদা ৫০০ কোটি ঘনফুট ছাড়িয়ে যাবে। তাতেও দৈনিক প্রায় ৮৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস ঘাটতি পড়বে। অর্থাৎ গ্যাসের ঘাটতি দিনদিন বাড়তেই থাকবে।

এ প্রসঙ্গে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান জানিয়েছেন, গ্যাস সেক্টরে ভবিষ্যৎ শঙ্কা নেই। তিনি বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে আমরা কিছুটা নাজুক অবস্থায় রয়েছি সত্য। আমরা বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছি, তাতে ভবিষ্যতে বেশি খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ জাইকা প্রাক্কলন করেছিল ২০২২ সালে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে ১৯০০ এমএমসিএফ (মিলিয়ন ঘনফুট) এ নেমে আসবে।

এখন আমরা উত্তোলন করছি ২৩৫০ এমএমসিএফ। তার চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছি। বিবিয়ানা গ্যাস ফিল্ডে যে পরিমাণ গ্যাস থাকার আশা করা হচ্ছিল তার চেয়ে বেশি ধারনা করা হচ্ছে। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে সরকার স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করেছে। ৪৬টি কূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যেখান থেকে জাতীয় গ্রিডে অন্তত ৬১৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস বাড়ানো হবে। এরমধ্যে নতুন নতুন গ্যাস আবিষ্কার করেছি, কিন্তু মজুদ কম।

তিনি বলেন, স্বাভাবিক সময়ে স্পট মার্কেটের প্রায় ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজিসহ গড়ে দৈনিক প্রায় ৩ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো। এখন প্রায় দুই হাজার ৮৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। তার মধ্যে দেশীয় কূপগুলো থেকে আসছে দৈনিক প্রায় দুই হাজার ৩৫০ মিলিয়ন

ঘনফুট গ্যাস এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে আসছে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি। আমরা গভীর সমুদ্রে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি গুছিয়ে এনেছি। আশা করছি আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ২৪টি ব্লকের জন্য দরপত্র আহ্বান করতে পারবো। দরপত্র আহ্বানের জন্য মডেল পিএসসি-২০১৮ সংশোধন করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ভোলায় ৩টি কূপ খননের কাজ শুরু হয়েছে। আমরা নদীগর্ভে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা দেখছি। সুনেত্র থেকে শুরু করে কিশোরগঞ্জের নিকলী হয়ে ভোলা পর্যন্ত গ্যাস প্রাপ্তির সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে। আমাদের গ্যাসের চাহিদা আরও বাড়বে, উৎপাদনও বাড়বে।

কাতার ও ওমান থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে এই এলএনজি আমদানি করা হয়। তাতে বিশ্ববাজারে স্বাভাবিক মূল্য পরিস্থিতিতে প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম পড়ে সর্বনিম্ন ৬ মার্কিন ডলার। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে দাম বাড়ার বিষয়টি জ্বালানি তেলের দামের সঙ্গে যুক্ত করা থাকে। ফলে বিশ্ববাজারের যখন জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে থাকল, তখন এলএনজির দামও একপর্যায়ে প্রতি ইউনিট ৩৬ ডলারে ওঠে।

দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির বাইরে সরকার খোলাবাজার (স্পট মার্কেট) থেকে কিছু এলএনজি আমদানির ব্যবস্থা রেখেছে। কারণ স্বাভাবিক বাজার পরিস্থিতিতে খোলাবাজারে আরও কম দামে পাওয়া যায়। কিন্তু এবার খোলাবাজারে এলএনজির দাম ওঠে ৪০ ডলারের ওপরে। এ কারণে সরকার এলএনজি আমদানিও কমিয়ে দেয়। এতে দেশব্যাপী গ্যাস সংকট বেড়ে গেছে। উল্লেখ্য, দেশের ক্ষেত্রগুলো থেকে তোলা গ্যাসের দাম পড়ে যেকোনো পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ ৩ ডলার।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০  
All rights reserved © shirshobindu.com 2024