ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লড়তে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের তিন লাখ রিজার্ভ সেনা তলবের পর এ থেকে নিষ্কৃতি পেতে দেশটির নাগরিকরা মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালাচ্ছেন।
পুতিনের ভাষণ শেষ হতেই রাশিয়ার বড় বড় শহরগুলোর বাসিন্দারা এই যুদ্ধের আঁচ পাচ্ছেন। রুশ নাগরিকরা কিভাবে এ যুদ্ধ এড়িয়ে চলবেন এখন এটাই তাদের মাথাব্যথা। সিএনএন
সেন্ট পিটার্সবার্গের চাকরিজীবী ২৮ বছরের দিমিত্রি। তিনি বলেন, কর্মীরা অফিস করতে পারছেন না। সবার নজর টেলিভিশন, কম্পিউটার আর মুঠোফোনের স্ক্রিনে। তারা সেনাবাহিনীতে যোগ না দিয়ে দেশ ছাড়ছেন। রাশিয়ার বিভিন্ন শহরে হাজারো মানুষ যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ অংশ নিয়েছেন। এ সময় সহস্রাধিককে গ্র্রেপ্তার করা হয়েছে।
দিমিত্রি বিবিসিকে বলেন, পরিস্থিতি অনেকটা আশির দশকের সায়েন্স ফিকশননির্ভর সিনেমার মতো। মধ্যাহ্নভোজের পর অফিস থেকে বের হয়ে যেতে দেখা যায় দিমিত্রিকে। পাশের ব্যাংকে তিনি রুবল দিয়ে ডলার কিনতে যান।
যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেওয়ায় পুলিশ দিমিত্রিকে খুঁজছে। পুলিশের নজর এড়াতে বাসা পাল্টে ফেলেন দিমিত্রি। ভেবেছিলেন, তাঁকে খুঁজে বের করাটা কর্তৃপক্ষের জন্য কঠিন হবে। তিনি বলেন, কী করা উচিত, ঠিক করতে পারছি না। পরের উড়োজাহাজেই কি লাফ দিয়ে চড়ে বসব নাকি রাশিয়ায় আরও কিছুদিন থেকে যুদ্ধবিরোধী সমাবেশে যোগ দিয়ে পুলিশের দাবড়ানি খাব।
২৬ বছর বয়সী সের্গেই (ছদ্মনাম) রাশিয়ার নামকরা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তিনি পিএইচডির ছাত্র। পুতিনের ভাষণ দেওয়ার আগের রাতে বাসায় মুদিদোকানের হোম ডেলিভারির অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। কলিং বেল বেজে ওঠার পর দরজা খুলতেই সাদা পোশাকের দুই ব্যক্তি তার হাতে সামরিক কিছু কাগজপত্র ধরিয়ে দেন এবং তাতে স্বাক্ষর করতে বলেন। এতে তাকে গত বৃহস্পতিবার যোদ্ধাদের তালিকা প্রস্তুতের কেন্দ্রে যেতে বলা হয়েছিল।
ক্রেমলিন বলছে, যারা সামরিক প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন এবং যাদের বিশেষ দক্ষতা ও যুদ্ধ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাদেরই শুধু ডাকা হবে। কিন্তু সের্গেইর কোনো সামরিক অভিজ্ঞতা নেই। এ নিয়ে তার সৎবাবা চিন্তিত। কারণ, তালিকায় নাম তুলতে ফাঁকি দেওয়া রাশিয়ায় ফৌজদারি অপরাধ।
সব রুশ পুরুষ এমনটা না করলেও অনেকেই যোদ্ধার খাতায় নাম তোলা এড়ানোর উপায় খুঁজছেন। মস্কোর বাসিন্দা ভিচেস্লাভ ও তার বন্ধু যুদ্ধ এড়াতে নিজেকে অসুস্থ দেখানোর চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, মাদকাসক্তির জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা অথবা চিকিৎসা গ্রহণ ভালো উপায় হতে পারে; কম খরচ, এমনকি বিনা মূল্যেও পাওয়া যেতে পারে।
তার বোনজামাই অল্পের জন্য তালিকায় নাম তোলা থেকে বেঁচে গেছেন। কারণ, কর্মকর্তারা যখন বাসায় এসেছিলেন, তখন তিনি ছিলেন না। তার মা কাগজপত্র দেখেছেন। যদিও ১৯ থেকে ২৩ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তাঁকে তথ্য দিতে বলা হয়েছে। ভিচেস্লাভ বলেন, ‘তিনি এখন নিজেকে ঘরবন্দী রেখেছেন । সেখান থেকে বের হতে চাইছেন না। তার তিন বছর ও এক বছরের দুই সন্তান রয়েছে। তিনি আর কী করতে পারতেন?
যুদ্ধ এড়াতে কালিনিনগ্রাদের এক বাসিন্দা আরও মরিয়া। তিনি বলেন, যোদ্ধার তালিকায় নাম তোলা এড়াতে তিনি সবকিছু করবেন। তিনি বলেন, আমি আমার হাত–পা ভেঙে ফেলব। কারাগারে যাব। গোটা প্রক্রিয়াটা এড়াতে সবকিছু করব।
গত বুধবার রাতে রাশিয়ার বিভিন্ন শহরে হাজারো মানুষ যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ অংশ নিয়েছেন। তাদের অনেকেই বলেছেন, তালিকায় নাম দিতে সড়কে অথবা থানায় আটক অবস্থায় তাদের হাতে কাগজপত্র ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন ওভিডি–ইনফো মস্কোর ১০টি থানার তালিকা করেছে। এসব এলাকায় বিক্ষোভকারীদের হাতে তালিকায় নাম তোলার কাগজপত্র ধরিয়ে দেওয়া হয়। মস্কোর ভেরনাদস্কি এলাকায় অন্তত একজন কাগজে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানান। তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলার হুমকি দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ৪ বছরে প্রতিরক্ষা খাতে ৩৪ লাখ কোটি রুবল খরচ করবে রাশিয়া। রাশিয়ার সর্বশেষ ব্যয়পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এসব অর্থ ব্যয় করা হবে। নতুন ব্যয়পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাশিয়া এ সময়ে জাতীয় প্রতিরক্ষা খাতে ১৮ লাখ ৫০ হাজার কোটি রুবল ব্যয় করবে। এর মধ্যে চলতি বছর খরচ করা হবে ৪ লাখ ৭০ হাজার কোটি রুবল।
এর আগে চলতি বছর জাতীয় প্রতিরক্ষা খাতে ৩ লাখ ৫০ হাজার কোটি রুবল খরচের পরিকল্পনা করেছিল মস্কো। আর ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মোট ১০ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন রুবল খরচ করার কথা ছিল।
তবে এ বছর নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা খাতে ২ লাখ ৮০ হাজার কোটি রুবল খরচের যে পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তা অপরিবর্তিত থাকছে। ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এ খাতে ১৫ লাখ ৬০ হাজার কোটি রুবল বরাদ্দ ছিল। তবে নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৮ লাখ ৭০ হাজার কোটি রুবল খরচ করা হবে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই সূত্র এই ব্যয়পরিকল্পনার ব্যাপারে বিস্তারিত উল্লেখ করেনি। রাশিয়ার অর্থ মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ইউক্রেনে গত ফেব্রুয়ারি থেকে ব্যয়বহুল সামরিক অভিযান চালাচ্ছে মস্কো।
Leave a Reply