মঙ্গলবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২২, ০৭:২৩

সূরা ইউনুসের শানে নুযুল, বিষয়বস্তু ও প্রেক্ষাপট

সূরা ইউনুসের শানে নুযুল, বিষয়বস্তু ও প্রেক্ষাপট

ইমাম মাওলানা নুরুর রহমান / ২০৮
প্রকাশ কাল: শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২২

আজ শুক্রবার পবিত্র জুমাবার আজকের বিষয় ‘সূরা ইউনুসের শানে নুযুল, বিষয়বস্তু ও প্রেক্ষাপট’ শীর্ষবিন্দু পাঠকদের জন্য এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেনইসলাম বিভাগ প্রধান ইমাম মাওলানা নুরুর রহমান

সমগ্র বিশ্বের মুসলিমদের জন্য দোয়া ইউনুস খুবই ফজিলতপূর্ণ। যেকোনো বিপদের সময় ও অস্থিরতা দূরীকরণে এই দোয়া পড়া সুন্নত। আল্লাহর প্রিয় নবী হযরত ইউনুস (আ.) জোকলহং বিপদে পড়তেন তখন এই দোয়া বেশি বেশি পড়তেন । আর এই দোয়ার ফলে আল্লাহ তার দোয়া কবুল করে তাকে সংকট থেকে মুক্তি দিতেন । বিভিন্ন সহীহ হাদিসে দোয়া ইউনূস ও এর ফজিলত সম্পর্কে বর্ণনা পাওয়া যায়।

দোয়া ইউনুস নাজিলের পূর্ব ঘটনা: হজরত ইউনুস (আ.) নিনেভা নামক জনপদে প্রেরিত হন। কিন্তু নিনেভার লোকজন তার ডাকে সাড়া না দেওয়ায় তিনি তাদের আল্লাহর গজবের খবর দিয়ে আল্লাহর নির্দেশের অপেক্ষা না করে নিনেভা ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যাওয়ার জন্য রওনা হন। পথিমথ্যে সমুদ্র পড়লে তা পাড়ি দেওয়ার জন্য একটি জাহাজে ওঠেন। জাহাজটি মাঝ সমুদ্রে ঘূর্ণিঝড়ে পড়ে।

তখন জাহাজের চালক ধারণা করে যে, জাহাজে কোনো অপরাধী আছে, যে কারণে জাহাজটি বিপাকে পড়েছে। পরে সেকালের নিয়ম অনুযায়ী অপরাধীকে চিহ্নিত করতে লটারির ব্যবস্থা করা হয়। লটারিতে বার বার হজরত ইউনুস (আ.)-এর নাম ওঠে। তখন বাধ্য হয়ে তাকে সমুদ্রে ফেলে দিলে জাহাজটি বিপাক থেকে রক্ষা পায়, আর একটি বিরাট মাছ তাকে গিলে ফেলে।

এ প্রসঙ্গে কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘ইউনুসও ছিল রাসূলদের একজন। স্মরণ করো, যখন সে পালিয়ে বোঝাই নৌযানে পৌঁছল, অতঃপর সে লটারিতে যোগদান করল এবং পরাভূত হলো। পরে এক বৃহদাকার মাছ তাকে গিলে ফেলল। তখন সে নিজেকে ধিক্কার দিতে লাগল। সে যদি আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা না করত, তাহলে তাকে কিয়ামত পর্যন্ত ওই উদরে থাকতে হতো।’ –সুরা আস সাফ ফাত ১৩৯-১৪৪

হজরত ইউনুস (আ.) অক্ষত অবস্থায় ৪০ দিন সেই বৃহদাকার মাছের উদরে বসে তাসবিহ-তাহলিল, তওবা-ইস্তিগফার করেছিলেন এবং আল্লাহর বিনানুমতিতে স্বদেশ ত্যাগ করার জন্য অনুশোচনা ব্যক্ত করে কান্নাকাটি করেছিলেন। এ বিষয়ে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘এবং স্মরণ করো যুন্নূনের কথা যখন সে রেগেমেগে বের হয়ে গিয়েছিল এবং মনে করেছিল আমি তাকে পাকড়াও করব না। অতঃপর সে (ইউনুস) অন্ধকার হতে আহবান করেছিল, আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, আপনি পবিত্র সুমহান। নিশ্চয়ই আমি সীমা লঙ্ঘনকারী।’- সকাল আমবিয়া ৮৭

আল্লাহতায়ালা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নবীকে পরীক্ষা করেছেন। পরীক্ষার অংশ হিসেবে মাছের উদরের সেই নিকষকালো অন্ধকারে ৪০ দিন ভীষণ কষ্টের মধ্যে থেকে হজরত ইউনুস (আ.) আল্লাহর প্রেমের এবং আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘তখন আমি তার (ইউনুসের) ডাকে সাড়া দিয়েছিলাম এবং তাকে উদ্ধার করেছিলাম দুশ্চিন্তা থেকে এবং আমি মুমিনদের নাজাত দিয়ে থাকি।’ -সূরা আম্বিয়া : ৮৮

হজরত ইউনুস (আ.) ৪০ দিন মাছের উদরে ছিলেন। এর পর আল্লাহ তার দোয়া কবুল করেন এবং আল্লাহর হুকুমে মাছটি তাকে সমুদ্রের কিনারে উগরে দেয়। কোরআনে কারিমে হজরত ইউনুস (আ.)-এর মুক্তি পাওয়ার ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে, ‘অতঃপর আমি ইউনুসকে নিক্ষেপ করালাম এক তৃণহীন প্রান্তরে এবং সে ছিল রুগ্ন। আর আমি তার ওপর একটি লাউগাছ গজালাম।’ -সূরা সাফফাত : ১৪৫-১৪৬

উল্লেখ যে, হজরত ইউনুস (আ.) দীর্ঘ ৪০ দিন মাছের পেটে পানি-খাদ্যবিহীন অবস্থায় থাকায় ফ্যাকাসে এবং ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন, যে কারণে এই অবস্থা থেকে নিরাময়ের জন্য আল্লাহ্তায়ালা পরিবেশ দূষণমুক্তকারী এবং নির্মল ছায়াদানকারী লাউগাছ সেখানে গজিয়ে দেন। সেই লাউগাছটি এত দ্রুত গজিয়ে ওঠে যে, মুহূর্তের মধ্যে ঘন লতাপাতায় তা তাঁবুর আকার ধারণ করে। তিনি কচি লাউ খাবার হিসেবে গ্রহণ করেন।

দোয়া ইউনুস- লাইলাহা ইল্লা আন্তা সুব্হানাকা ইন্তি কুন্তু মিনাজজলিমীন এর মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব অপরিসীম। আল্লাহর নবী হজরত ইউনুস (আ.) এই দোয়া পাঠ করেই আল্লাহর রহমতে মাছের পেট থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন।

দোয়া ইউনূসের প্রেক্ষাপট: হযরত ইউনুস আলাইহিস সালাম আল্লাহর অন্যান্য প্রেরিত নবীদের মতোই একজন সম্মানিত নবী। কোরআনের সর্বমোট ১১৪ সূরার ১০ নম্বর সুরার নাম তার নামে। সকল নবীদের মতো তারও সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ছিল, এক আল্লাহর দিকে তার জাতিকে আহ্বান করা। মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়া। আল্লাহর একত্ববাদ ও ইনসাফের কথা প্রচার করা। মৃত্যুর পরের যোবন সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা।

অন্যান্য নবী রাসূলগণের মতো তার ক্ষেত্রেও আল্লাহর দিকে মানুষকে আহব্বান করা হয়ে উঠে বিপদের কারণ। দেব দেবীর মূর্তি পূজা ছেড়ে ইসলামের ছায়াতলে ফায়ার আসতে তিনি তার কওমকে আহ্বান করেছিলেন। কিন্তু পূর্বের ন্যায় তারও আল্লাহকে চিনে না এবং ইউনুস (আ:) এর ডাকে সাড়া দেয়নি। এর ফলে তিনি নিরাশ হয়ে দেশ ত্যাগ করেন। (তুরুকুল ইসলাম, লা-ইলা-হা ইল্লা আনতা; ২০-০৮-২০২০)

যাওয়ার পথে আল্লাহ তাআলা তাকে পরীক্ষার ব্যবস্থা করেন। তাকে সমুদ্রে ফেলা হয়। তিনি সমুদ্রে নিক্ষিপ্ত হলে একটি বিশাল মাছ তাকে গিলে ফেলে। তবে আল্লাহ তাআলার রহমতে সেই বিশাল সমুদ্রের সেই দানবাকৃতির ম্যাচটিও আল্লাহর নবীকে কোন ক্ষতি করতে পারেনি।

সেই সময় মাছের পেটের অন্ধকারে বসে এই বিপদ থেকে রক্ষা পেতে আল্লাহর নবী অনবরত আল্লাহর কাছে বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য দোয়া করতে থাকেন। এই দোয়ায় ” দোয়ায়ে ইউনুস ” বা বিপদ থেকে মুক্তি লেভার দোয়া হিসেবে পরিচিত ইউনুস (আ.)-এর সেই দোয়াটি হলো: لَا إِلَـٰهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ

উচ্চারণ : লা ইলাহা ইল্লা আংতা, সুবহানাকা ইন্নি কুংতু মিনাজ জ্বালিমিন।’

অর্থ : ‘তুমি ব্যতীত সত্য কোনো উপাস্য নেই; তুমি পুতঃপবিত্র, নিশ্চয় আমি জালিমদের দলভুক্ত।’

দোয়া ইউনুস-এর উপকারিতা: হাদিসে এবং কুরআনের তাফসীরে এই দোয়া ইউনূসের অনেক ফজিলত বর্ণিত আছে, আল্লাহ তাআলা মুমিন মুসলমানদের জন্য সেই মাছের পেটের ঘটনা উল্লেখ করে বলেন:
‎وَذَا النُّونِ إِذ ذَّهَبَ مُغَاضِبًا فَظَنَّ أَن لَّن نَّقْدِرَ عَلَيْهِ فَنَادَىٰ فِي الظُّلُمَاتِ أَن لَّا إِلَـٰهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ – فَاسْتَجَبْنَا لَهُ وَنَجَّيْنَاهُ مِنَ الْغَمِّ ۚ وَكَذَٰلِكَ نُنجِي الْمُؤْمِنِينَ

‘আর মাছ ওয়ালার (ইউনুস আলাইহিস সালাম) কথা স্মরণ করুন। তিনি রাগ করে চলে গিয়েছিলেন। অতঃপর মনে করেছিলেন যে, আমি তাঁকে ধরতে পারব না। অতঃপর তিনি অন্ধকারের মধ্যে (মাছের পেটে থাকা অবস্থায়) এ কথা বলে আহ্বান করলেন- ‎ لَا إِلَـٰهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ

‘লা ইলাহা ইল্লা আংতা, সুবহানাকা ইন্নি কুংতু মিনাজ জ্বালিমিন।’

অর্থ : তুমি ব্যতীত সত্য কোনো উপাস্য নেই; তুমি পুতঃপবিত্র, নিশ্চয় আমি জালিমদের দলভুক্ত।’

অতপর আমি তাঁর আহবানে সাড়া দিলাম এবং তাঁকে দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দিলাম। আমি এমনি ভাবে বিশ্ববাসীদেরকে মুক্তি দিয়ে থাকি।’ (সুরা আম্বিয়া : আয়াত ৮৭)

দোয়া ইউনুস পাঠের ফজিলত: দোয়া ইউনুসের গুরুত্ব ও ফজিলত অপরিসীম। মহান আল্লাহর প্রিয় নবী হযরত ইউনুস আলাহিস সালাম এই “দোয়া ইউনুস” পাঠ করেই আল্লাহর রহমতে মাছের পেট এর বিপদ থেকে থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন।

যদি কোন মুসলমান যদি বিপদে পরে সেটা থেকে রক্ষার জন্য খাস নিয়তে দোয়া ইউনুস কয়েকবার পড়ে দোয়া করে তবে মহান আল্লাহ তার নিজ কুদরতে সেই ব্যক্তির বিপদ দূর করে তাকে বিপদমুক্ত করেন।

সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) বলেন, আমি রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! এই দোয়ার গ্রহণযোগ্যতা কি কেবল ইউনুস (আ.)-এর জন্যই প্রযোজ্য, না সমস্ত মুসলিম উম্মাহর জন্য?

জবাবে প্রিয়নবী
হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেন, তাৎক্ষণিকভাবে তার জন্য দোয়াটি বিশেষভাবে কবুল হলেও এটা সব মুসলিমের জন্য সবসময় কবুলের ব্যাপারে প্রযোজ্য। তুমি কি কোরআনে পাঠ করোনি, ‘ওয়া কাজালিকা নুনজিল মুমিনিন- আর এভাবেই আমি আল্লাহ মুমিনদের উদ্ধার করে থাকি। (তিরমিজি, হাদিস : ৩৫০৫)

বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে , যে ব্যক্তি দৈনিক এক হাজার বার দোয়া ইউনুস পড়বে আল্লাহ তার পদমর্যাদা সমুন্নত করবেন। আল্লাহ তার কামাই রোজগারে বরকত দান করেন। বিপদ -আপদ, বালা- মুসিবত, মানসিক অশান্তি ও কষ্ট দূর করেন। তার জন্য সব রকম কল্যাণের দ্বার খুলে দেন। শয়তানের প্ররোচনা থেকে তাকে রক্ষা করেন।

আমাদের মুসলিম সমাজে প্রচলিত: এ দোয়া এক লাখ পঁচিশ হাজার বার পড়লে (যেটা খতমে ইউনুস হিসেবে পরিচিত) সব ধরনের অপকার থেকে রক্ষা, বিপদ-আপদ থেকে দূরে থাকা এবং রোগ-শোক থেকে রক্ষা পাওয়া যায় বলে বিভিন্ন বর্ণনায় রয়েছে।

তবে সঠিক নিয়ম হল: খতমে ইউনুস পড়া সুন্নাহ দ্বারা সাব্যস্ত হয়নি। সবাই মিলে এক লাখ ২৫ হাজার বার খতমে ইউনুস নাম দিয়ে পড়া, এটা সঠিক নয়। আপনি ব্যক্তিগতভাবে পড়তে পারেন কিন্তু সেটাকে সংখ্যায় নির্দিষ্ট করা যাবে না। সংখ্যার মধ্যে নির্দিষ্ট করতে হলে এর দলিল সম্পর্কে আপনাকে জানতে হবে। এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ দোয়া। কিন্তু এটি সংখ্যার মধ্যে নির্দিষ্ট করা দলিল সাপেক্ষ।

আল্লাহ আমাদেরকে বেশী করে আমল করার তৌফিক দান করুন।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  
All rights reserved © shirshobindu.com 2022