মঙ্গলবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২২, ০৮:৩৩

সূরা আন-নাহল

ইমাম মাওলানা নুরুর রহমান / ১৩১
প্রকাশ কাল: শুক্রবার, ১১ নভেম্বর, ২০২২

আজ শুক্রবার পবিত্র জুমাবার আজকের বিষয়সূরা আন-নাহল শীর্ষবিন্দু পাঠকদের জন্য এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেনইসলাম বিভাগ প্রধান ইমাম মাওলানা নুরুর রহমান

নামকরণ
৬৮ আয়াতের বাক্যাংশ থেকে এ নামকরণ করা হয়েছে । এও নিছক আলামত ভিত্তিক, নয়তো নাহল বা মৌমাছি এ সূরার আলোচ্য বিষয় নয়।

নাযিল হওয়ার সময়-কাল
বিভিন্ন আভ্যন্তরীণ সাক্ষ্য – প্রমাণ এর নাযিল হওয়ার সময় – কালের ওরর আলোকপাত করে । যেমন, ৪১ আয়াতের বাক্যাংশ থেকে এ কথা পরিস্কার জানা যায় যে, এ সময় হাবশায় হিজরত অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

১০৬ আয়াতের বাক্য থেকে জানা যায়, এ সময় জুলুম – নিপীড়নের কঠোরতা অত্যন্ত বেড়ে গিয়েছিল এবং এ প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল যে, যদি কোন ব্যক্তি নির্যাতনের আধিক্যে বাধ্য হয়ে কুফরী বাক্য উচ্চারণ করে ফেলে তাহলে তার ব্যাপারে শরীয়াতের বিধান কি হবে।

১১২ – ১১৪ আয়াতে বাক্যগুলো পরিস্কার এদিকে ইংগিত করছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াত লাভের পর মক্কায় যে বড় আকারের দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল এ সূরা নাযিলের সময় তা শেষ হয়ে গিয়েছিল।

এ সূরার ১১৫ আয়াতটি এমন একটি আয়াত যার বরাত দেয়া হয়েছে সূরা আন’আমের ১১৯ আয়াতে । আবার সূরা আন’আমের ১৪৬ আয়াতে এ সূরার ১১৮ আয়াতের বরাত দেয়া হয়েছে । এ থেকে প্রমাণ হয় যে, এ সূরা দুটির নাযিলের মাঝখতানে খুব কম সময়ের ব্যবধান ছিল।

এসব সাক্ষ্য প্রমাণ থেকে একথা পরিস্কার জানা যায় যে, এ সূরটিও মক্কী জীবনের শেষের দিকে নাযিল হয় । সূরার সাধারণ বর্ণনাভংগীও একথা সমর্থন করে।

বিষয়বস্তু ও কেন্দ্রীয় আলোচ্য বিষয়
শিরককে বাতিল করে দেয়া, তাওহীদকে সপ্রমাণ করা, নবীর আহবানে সাড়া না দেবার অশুভ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করা ও উপদেশ দেয়া এবং হকের বিরোধিতা ও তার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার বিরুদ্ধে ভীতি প্রদর্শন করা এ সূরার মূল বিষয়বস্তু ও কেন্দ্রীয় আলোচ্য বিষয়।

আলোচনা
কোন ভূমিকা ছাড়াই আকস্মিকভাবে একটি সতর্কতামূলক বাক্যের সাহায্যে সূরার সূচনা করা হয়েছে । মক্কার কাফেররা বারবার বলতো, “আমরা যখন তোমার প্রতি মিথ্যা আরোপ করেছি এবং প্রকাশ্যে তোমার বিরোধিতা করছি তখন তুমি আমাদের আল্লাহর যে আযাবের ভয় দেখাচ্ছো তা আসছে না কেন?

তাদের এ কথাটি বারবার বলার কারণ ছিল এই যে, তাদের মতে এটিই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবী না হওয়ার সবচেয়ে বেশী সুস্পষ্ট প্রমাণ । এর জবাবে বলা হয়েছে, নির্বোধের দল, আল্লাহর আযাব তো তোমাদের মাথার ওপর তৈরী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এখন তা কেন দ্রুত তোমাদের ওপর নেমে পড়ছে না এ জন্য হৈ চৈ করো না। বরং তোমরা যে সামান্য অবকাশ পাচ্ছো তার সুযোগ গ্রহণ করে আসল সত্য কথাটি অনুধাবন করার চেষ্টা করো।

এরপর সংগে সংগেই বুঝবার জন্য ভাষণ দেবার কাজ শুরু হয়ে গেছে এবং নিম্নলিখিত বিষয়বস্তু একের পর এক একাধিকবার সামনে আসতে শুরু করেছে।

(১) হৃদয়গ্রাহী যুক্তি এবং জগত ও জীবনের নিদর্শনসমূহের সুস্পষ্ট সাক্ষ – প্রমাণের সাহায্যে বুঝানো হয়েছে যে, শিরক মিথ্যা এবং তাওহীদই সত্য।

(২) অস্বীকারকারীদের সন্দেহ, সংশয়, আপত্তি, যুক্তি ও টালবাহানার প্রত্যেকটির জবাব দেয়া হয়েছে।

(৩) মিথ্যাকে আঁকড়ে ধরার গোয়ার্তুমি এবং সত্যে মোকাবিলায় অহংকার ও আষ্ফালনের অশুভ পরিণামের ভয় দেখানো হয়েছে।

(৪) মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে জীবন ব্যবস্থা এনেছেন, মানুষের জীবনে যে সব নৈতিক ও বাস্তব পরিবর্তন সাধন করতে চায় সেগুলো সংক্ষেপে কিন্তু হৃদয়গ্রাহী করে বর্ণনা করা হয়েছে । এ প্রসংগে মুশরিকদেরকে বলা হয়েছে, তারা যে আল্লাহকে রব হিসেবে মেনে নেবার দাবী করে থাকে এটা নিছক বাহ্যিক ও অন্তসারশূন্য দাবী নয় বরং এর বেশ কিছু চাহিদাও রয়েছে । তাদের আকীদা – বিশ্বাস, নৈতিক – চারিত্রিক ও বাস্তব জীবনে এগুলোর প্রকাশ হওয়া উচিত।

(৫) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সংগী – সাথীদের মনে সাহস সঞ্চার করা হয়েছে এবং সংগে সংগে কাফেরদের বিরোধিতা, প্রতিরোধ সৃষ্টি ও জুলুম – নিপীড়নের বিরুদ্ধে তাদের মনোভাব, দৃষ্টিভঙ্গী ও কর্মনীতি কি হতে হবে তাও বলে দেয়া হয়েছে।

(কিয়ামত সম্পর্কে) আল্লাহর আদেশ আসবেই। সুতরাং তা ত্বরান্বিত করতে চেয়ো না। তিনি (আল্লাহ) মহিমান্বিত এবং তারা যা (আল্লাহর সঙ্গে) শরিক করে, তিনি তার ঊর্ধ্বে। (সুরা : নাহল, আয়াত : ১)
তাফসির : সুরা নাহল পবিত্র কোরআনের ১৬তম সূরা।

এ সুরায় মোট ১২৮টি আয়াত ও ১৬টি রুকু রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ৪০ আয়াত মহানবী (সা.)-এর মক্কিজীবনের শেষ দিকে এবং বাকি ৮৮ আয়াত মদিনার জীবনে অবতীর্ণ হয়। এই সুরার ৬৮-৬৯ নম্বর আয়াতে মৌমাছি সম্পর্কে আলোচনা রয়েছে। রয়েছে মধুর উপকারিতার কথা। তাই নাহল বা মৌমাছি নামে এর নামকরণ হয়েছে। আল্লামা কুরতুবি (রহ.) লিখেছেন, এ সুরার অন্য নাম ‘সুরাতুন নিআম’। ‘নিআম’ অর্থ নিয়ামতরাজি। এই নামে এ সুরার নামকরণের কারণ হলো, এ সুরায় মানুষের ওপর আল্লাহ প্রদত্ত অসংখ্য নিয়ামতের কথা তুলে ধরা হয়েছে।

কোরআনের প্রতিটি আয়াত ও সুরার মধ্যে সামঞ্জস্য ও নিবিড় সম্পর্ক থাকে। এটা কোরআনের স্বাতন্ত্র্য রীতি। সে ধারাবাহিকতায় এ সুরার সঙ্গে আগের সুরারও নিবিড় সংযোগ আছে। আগের সুরার শেষ আয়াতে মৃত্যুর প্রসঙ্গ আছে। আলোচ্য সুরার প্রথম আয়াতে কিয়ামত সম্পর্কে আলোচনা আছে। উভয়ের মধ্যে রয়েছে সুসম্পর্ক। কেননা মৃত্যুর পর থেকেই কিয়ামতের জীবন বা পরকালের জীবন শুরু হয়ে যায়।

উভয় সুরার মধ্যে অন্য আরেকটি দিক থেকে সামঞ্জস্য আছে। আগের সুরার শেষের দিকে ৯২ নম্বর আয়াতে পরকালীন জবাবদিহির কথা বলা হয়েছে। আলোচ্য সুরার সূচনায়ও একই বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে।

এ সুরার কেন্দ্রীয় আলোচনা শিরক, তাওহিদ ও নবীদের দাওয়াত ঘিরে। এখানে শিরকের অসারতা তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহর একত্ববাদ সপ্রমাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি নবীদের দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করার অশুভ পরিণতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

আল্লামা ওহাবা জুহাইলি (রহ.) লিখেছেন, এ সুরায় ইসলামের মৌলিক আকিদা ও বিশ্বাস নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এখানে আল্লাহর উপাস্য হওয়া, তাঁর একক সত্তা ও পুনরুত্থান বিষয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। শুরুতেই রয়েছে পরকাল প্রসঙ্গ। নবীর মুখে আজাবের কথা শুনে উপহাসচ্ছলে মক্কার কাফিররা দ্রুত আজাব কামনা করেছিল। এ বিষয়ে আলোচ্য আয়াত নাজিল হয়।

এরপর অহি বা আসমানি প্রত্যাদেশ বিষয়ে আলোচনা রয়েছে। তারপর আসমান ও জমিনে ছড়িয়ে থাকা আল্লাহর নিয়ামতরাজির কথা তুলে ধরে আল্লাহর অস্তিত্বের প্রমাণ দেওয়া হয়েছে। এ সুরার মাঝামাঝি কোরআনের সর্বাধিক অর্থপূর্ণ আয়াতগুলোর একটি আয়াত উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতি জুমার খুতবায় খতিবরা সে আয়াত পাঠ করেন।

সে আয়াতে ন্যায়পরায়ণতা, পরোপকার ও আত্মীয়স্বজনের অধিকার আদায়ে সচেষ্ট হতে বলা হয়েছে। পাপ-পঙ্কিলতা ও অশ্লীলতা থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ওয়াদা ও অঙ্গীকার পূরণ করতে বলা হয়েছে এবং দায়িত্ব ও কর্তব্যপরায়ণ হতে বলা হয়েছে। এরপর কোরআন পাঠের কিছু রীতিনীতি তুলে ধরা হয়েছে। কোরআন পাঠের আগে ‘আউজু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম’ পাঠ করতে বলা হয়েছে। পরে কোরআন আল্লাহর পবিত্র কালাম হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।

এ সুরায় কিছু উদাহরণও টেনে আনা হয়েছে, যেগুলো আল্লাহর একত্ববাদ অনুধাবনে সহায়ক এবং শিরকের অসারতা নির্ণায়ক। সুরার শেষের দিকে বিভিন্ন জীবজন্তুর কথা তুলে ধরে সেগুলোর হালাল-হারামের বিধান বর্ণনা করা হয়েছে।

সূরাটির শেষ রুকুতে হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর প্রসঙ্গ টেনে আনা হয়েছে। কেননা তিনি ছিলেন বিশুদ্ধ একত্ববাদের অন্যতম প্রবক্তা। সুরার একেবারে শেষ কয়েকটি আয়াতে আল্লাহর পথে মানুষকে আহ্বান করার মূলনীতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

মহান আল্লাহ তায়ালা প্রায় সাড়ে ১৪ শ’ বছর আগে পবিত্র কোরআনে মৌমাছি ও মধু সম্পর্কে যা বলেছেন, আধুনিক বিজ্ঞান সেগুলো আজ আবিষ্কার করছে। মৌমাছি ও মধু উৎপাদন বিষয়ে আল কোরআন যে ব্যাখ্যা দিয়েছে-
মৌমাছি মহান আল্লাহর অপূর্ব সৃষ্টি। যাকে আরবিতে বলা হয় ‘নাহল’।

পবিত্র কোরআনে ‘নাহল’ নামে একটি সূরা অবতীর্ণ হয়েছে। এই সূরাটি পবিত্র কোরআনের ১৬তম সূরা। সূরাটি মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে এবং এর আয়াত সংখ্যা ১২৮টি। এই সূরার ৬৮ আয়াতের থেকে এর নামকরণ করা হয়েছে।

আমরা আগে জানতাম মৌমাছি মধু সংগ্রহ করে বিভিন্ন ফুল থেকে অতঃপর তা মৌচাকে মজুদ করে রাখে সরাসরি। আসলে তা নয়, বিজ্ঞান কিছুদিন আগে প্রমাণ করেছে মৌমাছির শরীর থেকে মধু বের হয়। অথচ পবিত্র কোরআন প্রায় সাড়ে ১৪ শ’ বছর আগেই বলে দিয়েছে মধু মৌমাছির শরীর থেকে বের হয়।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  
All rights reserved © shirshobindu.com 2022