রবিবার, ১৬ জুন ২০২৪, ০৭:৩৫

গাজায় নরক যন্ত্রণায় হাজারো এতিম শিশুর আর্তনাদ

গাজায় নরক যন্ত্রণায় হাজারো এতিম শিশুর আর্তনাদ

যুদ্ধের ভিতর জন্ম। এমন হাজারো শিশু পিতা-মাতাকে হারিয়েছে। এমনও আছে অনেক শিশু ইনকিউবেটরে। তাকে বুকে তুলে আলিঙ্গন করার জন্য পিতা বা মাতা কেউই বেঁচে নেই। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।

ইসরাইলের বিমান হামলায় মারা যান হান্না নামের এক মাতা। সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে তার একটি কন্যা সন্তান ভূমিষ্ঠ করানো হয়। তার এই সন্তানকে গাজার কেন্দ্রস্থলে দিয়ের আল বালাহতে অবস্থিত আল আকসা হাসপাতালে দেখাশোনা করছেন নার্স ওয়ারদা আল আওয়াহদা। তিনি বলেন, এই সন্তানটিকে আমরা হান্না আবু আমশা নামে ডাকি। চলমান যুদ্ধে বহু শিশু এভাবে পিতামাতাকে হারিয়েছে।

এমনকি তাদের পরিবারের কেউই বেঁচে নেই। তাদেরকে লালনপালনের দায়িত্ব কে নেবে, তা নিয়ে চিন্তায় থাকতে হচ্ছে চিকিৎসক এবং উদ্ধারকারীদের। ওই নার্স বলেন, হান্না আবু আমশার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলেছি আমরা। কোনো আত্মীয়ের সাক্ষাত মেলেনি। তার পিতার কি হয়েছে আমরা জানি না।

চেকপয়েন্টে বিলম্বের কারণে গাজার খান ইউনুসে মারাত্মক খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে নাসের হাসপাতালে খাদ্য সরবরাহ দিতে পারছে না বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। অবশ্য পুরো গাজারই এক চিত্র। এর ফলে এক নরকযন্ত্রণা ভোগ করছেন গাজাবাসী।

গাজার উত্তরাঞ্চলে খাদ্য সরবরাহ দেয়ার পর মার্সি করপোরেশনের একজন ত্রাণকর্মী বলেছেন, বিরল এই খাদ্য সরবরাহ দেয়া। এ সময়ে অতিরিক্ত ভিড়ে শ্বাস বন্ধ হয়ে দু’জন মানুষকে মারা যেতে দেখেছি। রাফায় ইসরাইলিরা কয়েক ডজন ফিলিস্তিনির মৃতদেহ হস্তান্তর করেছে।

এরপর ড. ওমর আবু তাহা বলেছেন, এসব মানুষ আহত হয়েছিলেন কিনা জানি না। এমনকি তাদের নাম পর্যন্ত জানিনা। রেড ক্রিসেন্ট বলেছে, ইসরাইলি সেনাবাহিনী ঝড়ো গতিতে খান ইউনুসের আল আমাল হাসপাতালে প্রবেশ করে। তারা চিকিৎসক ও বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদেরকে হাসপাতাল থেকে চলে যেতে বলে।

ওদিকে ৭ই অক্টোবর হামাসের রকেট হামলার পর ইসরাইল হামলা চালিয়ে কমপক্ষে ২৬ হাজার ৭৫১ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে। গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধ নিয়ে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম অব জাস্টিস (আইসিজে) যে রায় দিয়েছে তা নিয়ে আলোচনা করতে নিউ ইয়র্কে বুধবার স্থানীয় সময় ১১টায় বৈঠকে বসার কথা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের।

গাজায় যেসব ভূ-গর্ভস্থ টানেল আছে তাতে বিপুল পরিমাণ পানি ঢেলে দেয়ার কথা নিশ্চিত করেছে ইসরাইল। আইসিজেতে ইসরাইলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার মামলা করার তথ্যপ্রমাণের একটি উদাহরণ এটি। দক্ষিণ আফ্রিকা তার অভিযোগে বলেছে, গাজায় টানেলে বিপুল পরিমাণ সমুদ্রের পানি যোগ করা চরম উদ্বেগের বিষয়।

এর মধ্য দিয়ে গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের গণহারে পালানোর কারণ সৃষ্টি করছে তারা।  দক্ষিণ আফ্রিকার দাবি, এর মধ্য দিয়ে গাজার মাটিতে দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ সৃষ্টি করা হয়েছে। গাজায় পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার আরও ক্ষতি হবে এতে।  অন্যদিকে চলমান এই যুদ্ধে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জনপ্রিয়তা কমে গেছে।

নতুন এক জরিপে দেখা গিয়েছে, শতকরা ২৩ ভাগ মানুষ চান যে, নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকুন। অন্যদিকে শতকরা ৪১ ভাগ মানুষ সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও যুদ্ধকালীন মন্ত্রিপরিষদের সদস্য বেনি গান্টস ক্ষমতা নিন তা দেখতে চায়। মঙ্গলবার ৩৫টি দেশ গাজা ইস্যুতে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করে।

এ সময় জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক এজেন্সিকে (ইউএনআরডব্লিউএ) অর্থ সহায়তা নতুন করে শুরু করতে বড় সব দাতাদের প্রতি আহ্বান জানান জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরাঁ। ৭ই অক্টোবর ইসরাইলে হামাসের রকেট হামলায় এই এজেন্সির ১২ জন স্টাফ জড়িত ছিলেন বলে তাদের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ ব্যবস্থা নিয়েছে বলে রাষ্ট্রদূতদের ব্রিফ করেছেন মহাসচিব গুতেরাঁ।

ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, ১৮ বছরের নিচে বয়স এমন কমপক্ষে ১১ হাজার ৫০০ শিশু নিহত হয়েছে এই যুদ্ধে। আরও বেশি আহত হয়েছে। অনেকের জীবন বদলে গিয়েছে। এমন শিশুর যথার্থ সংখ্যা পাওয়া কঠিন।

ইউরো মেডিটারেনিয়ান হিউম্যান রাইটস মনিটর নামের একটি অলাভজনক গ্রুপ বলেছে, কমপক্ষে ২৪ হাজার শিশু তার পিতামাতার একজনকে অথবা উভয়কেই হারিয়েছে। ১০ বছর বয়সী ইব্রাহিম আবু মোস পায়ে মারাত্মক ক্ষতে ভুগছে। তার পেটে আঘাত লেগেছে ক্ষেপণাস্ত্রের। বাড়িতে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করলে সে তাতে আহত হয়। মারা যান মা, দাদা ও বোন। তাদের কথা স্মরণ করে হাউমাউ করে কাঁদে সে।

হোসেনের পরিবারের কাজিনরা একসঙ্গে খেলাধুলা করতো। কিন্তু এখন তারা বালুতে দাফন করা কবরস্থানের কাছে গিয়ে বসে থাকে। স্কুলকে আশ্রয়কেন্দ্র বানানো হয়েছে। তার কাছেই দাফন করা হয়েছে মৃতদেহ। পরিবারের শিশুরা সবাই পিতা বা মাতাকে অথবা উভয়কেই হারিয়েছে।

আল বুরেইজ শরণার্থী শিবিরে বসবাস করা আবেদ হোসেন বলেন, আমার মায়ের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র এসে পড়ে। এতে তার দেহ খণ্ড বিখণ্ড হয়ে যায়। কয়েক দিন ধরে বাড়ির ধ্বংসাবশেষের ভিতর থেকে তার দেহাবশেষ কুড়িয়ে বেড়াচ্ছিলাম। এক পর্যায়ে বলা হয়, আমার ভাই, আঙ্কেল এবং পুরে পরিবারের সদস্যরা নিহত হয়েছে।

এ খবর শুনে আমার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। আবেদের চোখের চারপাশে কালো দাগ। রাতের বেলায় ঘুমিয়ে থাকলে ইসরাইলি গোলার শব্দে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। ঘুম ভেঙে যায় তার। তখন খুব একা একা মনে হয় নিজেকে। আবেদ হোসেন বলে, মা-বাবা বেঁচে থাকতে আমি ঘুমাতে পারতাম। তাদেরকে হত্যা করা হয়েছে। তাই এখন আর ঘুমাতে পারি না। আমি সব সময় বাবার পাশেই ঘুমাতাম।

আবেদ হোসেন ও তার অন্য দুই ভাইবোনকে দেখাশোনা করেন তাদের দাদী। কিন্তু তাদের সবার জন্যই প্রতিটি দিন হয়ে উঠেছে কঠিন। আবেদ হোসেন বলে, আমাদের খাদ্য নেই। পানি নেই। সমুদ্রের পানি পান করার কারণে পেটে পীড়া হয়। রুটি বানানোর জন্য আটা মাখার সময় হত্যা করা হয়েছে কিনজা হোসেনের পিতাকে।

এখন পিতার সেই মৃতদেহের ছবি তাকে তাড়িয়ে ফেরে। ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে তিনি মারা যাওয়ার পর বাড়ি নেয়া হয়েছিল দাফন করার জন্য। কিনজা হোসেন বলেন, বাবার চোখ সঙ্গে ছিল না। তার গলা কেটে গিয়েছিল। আমরা চাই যুদ্ধ শেষ হয়ে যাক। কারণ, সবকিছুই খুব খারাপ হয়ে পড়েছে।

গাজায় বসবাসকারী প্রায় প্রতিজনই এখন জীবন রক্ষাকারী জিনিসপত্রের জন্য নির্ভর করে সাহায্যদাতাদের ওপর। জাতিসংঘের হিসাবে, কমপক্ষে ১৭ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।  জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক এজেন্সি ইউনিসেফ বলেছে, গাজার ১৯ হাজার শিশুকে নিয়ে তাদের উদ্বেগ বেশি। এসব শিশু এতিম। তাদেরকে দেখভাল করার কেউ নেই।

উল্লেখ্য, গাজায় মোট জনসংখ্যা ২৩ লাখ। তার প্রায় অর্ধেকই শিশু। নিষ্ঠুর এই যুদ্ধে এসব শিশুর জীবন তছনছ হয়ে গেছে। ইসরাইল যতই বলছে তারা বেসামরিক জনগণের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে ব্যবস্থা নিয়েছে।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
All rights reserved © shirshobindu.com 2012-2024