বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ০২:১৬

দুই পাজেরোর রহস্যের জট এখনও খোলেনি

দুই পাজেরোর রহস্যের জট এখনও খোলেনি

/ ১১৮
প্রকাশ কাল: মঙ্গলবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০১৪

চৌধুরী মুমতাজ আহমদ, সিলেট থেকে |

জেলা ও মহানগর দুই পুলিশের খাতাতেই মামলা। দেশের সার্বভৌমত্ব ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার গুরুতর অভিযোগ। তবুও দমেননি তারা। উল্টো পুলিশকেই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন, তাদের কিছুই করতে পারবে না পুলিশ। সিলেট জেলা পুলিশ সে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেও মেট্রো পুলিশ পুরোপুরি নির্বিকার। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও সীমানা আইন লঙ্ঘন করে গাড়ি নিয়ে দেশে প্রবেশ করা তিন যুক্তরাজ্য প্রবাসী নিজেদের নিরাপদ করে এখন চেষ্টায় আছেন পুলিশের কাছ থেকে আটক গাড়ি দু’টো ফিরিয়ে নিতে।

গত ৩১শে অক্টোবর সিলেটের বিয়ানীবাজারের শেওলা ইমিগ্রেশন চেক পোস্টের তল্লাশি চৌকিতে দায়িত্বরতদের ফাঁকি দিয়ে দু’টো পাজেরো নিয়ে প্রবেশ করেন তিন আরোহী। পরিচয় নিশ্চিত হয়ে ওই দিনই কাস্টমসের রাজস্ব কর্মকর্তা আবদুল হান্নান বাদী হয়ে শুল্ক আইনে বিয়ানীবাজার থানায় মামলা (নং ১৮) দায়ের করেন। মামলায় আসামি করা হয় তিন যুক্তরাজ্য প্রবাসী কাবুল মিয়া, আসকার উদ্দিন ও আমতর আলীকে।

পরদিন অনুপ্রবেশের দায়ে বিয়ানীবাজার থানার এএসআই ওয়াসিম বিল্লাহর দায়ের করা মামলায়ও আসামি করা হয় এ তিনজনকেই। রুপালি ও কালো রঙের গাড়ি দু’টোর নম্বরও সংগ্রহ করে পুলিশ। লন্ডন থেকে ভারত হয়ে আসা মিতসুবিশি শোগান ব্র্যান্ডের এক্স৮৭৫ ওএভি (রুপালি) এবং এলভি৫২ জেডআরও (কালো) নম্বরের গাড়ি দু’টো সিলেট নগরী থেকে উদ্ধার হয় ওই রাতেই। রুপালি গাড়িটি উদ্ধার হয় কুমারপাড়ার একটি গ্যারেজ থেকে, কালো গাড়িটি উপশহর থেকে। পুলিশের সাফল্য বলতে এতটুকুই আর রহস্যের শুরুও তখনই।

বিয়ানীবাজারে করা দু’টো মামলাতেই গাড়ির আরোহীদের চিহ্নিত করা হলেও সিলেট মেট্রো পুলিশ বিষয়টি চেপে যায়। বিশেষ ক্ষমতা আইনে কোতোয়ালি থানায় দায়ের হওয়া মামলায় তারা আসামিদের অজ্ঞাত হিসেবেই চিহ্নিত করে। অথচ রুপালি রঙের গাড়িটি যে গ্যারেজ থেকে উদ্ধার করা হয় সেখানকার রশিদ বইয়ে গাড়ির মালিক হিসেবে কাবুল মিয়ারই নাম উল্লেখ ছিল।

পুলিশ নাকি হন্যে হয়ে খুঁজছিল তাদের! রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও সীমানা আইন লঙ্ঘন করে দেশে প্রবেশ করা তিন যুক্তরাজ্য প্রবাসীর নাম-পরিচয় সব জানা থাকলেও নিজেরা ধরা দেয়ার আগ পর্যন্ত পুলিশ তাদের টিকিটিরও নাগাল পায়নি। অথচ তারা দেশেই ছিলেন এবং পুলিশকে ঘুমে রেখেই দুটো মামলাতেই হাইকোর্ট থেকে জামিনও নেন। পরে মামলার জামিনের মেয়াদ বাড়াতে গেলে নিম্ন আদালতে নিজেদের মামলায় সে আবেদন চ্যালেঞ্জ করে জেলা পুলিশ। আর মেট্রো পুলিশ চুপই রয়ে যায়।

অপরাধ যে গুরুতর তা বুঝতে পেরেই নিজে থেকেই হাইকোর্টে হাজির হয়েছিলেন তিন প্রবাসী। বিয়ানীবাজারে দায়ের হওয়া মামলায় দুই প্রবাসী কাবুল মিয়া ও আসকার উদ্দিন ১৯শে নভেম্বর সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি এম এনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মোহাম্মদ উল্লাহর বেঞ্চে হাজির হন। ১৮ই ডিসেম্বর পর্যন্ত অন্তর্বর্তী জামিন লাভ করেন। একই দিন অপর প্রবাসী আমতর আলী হাজির হন বিচারপতি রেজাউল হক ও বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুরের বেঞ্চে। জামিন মেলে ৪ সপ্তাহের। কোতোয়ালি থানার মামলায় কাবুল মিয়া ও আসকার উদ্দিন ২৫শে নভেম্বর আবার হাজির হন বিচারপতি এম এনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মোহাম্মদ উল্লাহর বেঞ্চে। এ মামলায় অন্তর্বর্তী জামিন মেলে ৩০শে ডিসেম্বর পর্যন্ত।

কোতোয়ালি থানার মামলায় অন্তর্বর্তীকালীন জামিনের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই কাবুল মিয়া ও আসকার উদ্দিন ১০ই ডিসেম্বর সিলেটের চিফ মেট্রো পলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির হন। আদালত তাদের জামিন মঞ্জুর করেন এবং দ্রুত জামিননামা দাখিলের নির্দেশ দেন। ১২শে ডিসেম্বর জামিননামা দাখিল করেন কাবুল মিয়া ও আসকার উদ্দিন।

কোতোয়ালি থানার মামলায় কোন চ্যালেঞ্জের মুখে না পড়লেও বিয়ানীবাজারে দায়ের হওয়া মামলায় আটকে যান কাবুল মিয়া ও আসকার উদ্দিন। ১৮ই ডিসেম্বর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ৪-এ হাজির হয়ে জামিন চেয়েছিলেন তারা। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষের তুমুল বিরোধিতার মুখে আদালত তাদের জামিন নামঞ্জুর করে জেলহাজতে পাঠান। আগের দিন একই কোর্টে হাজির হয়ে জামিন পাননি আমতর আলীও।

এরই মাঝে বিয়ানীবাজার থানার মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা শাখার এসআই গাজী মিজানুর রহমান ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করেন। ২২শে ডিসেম্বর দীর্ঘ শুনানি শেষে আদালত ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। ২৮শে ডিসেম্বর তদন্ত কর্মকর্তা তিন প্রবাসীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তার জিম্মায় নেন। ৩০শে ডিসেম্বর রিমান্ড শেষে আসামিদের আদালতে পাঠান। প্রায় ১ মাস জেল খাটার পর জেলা জজ আদালত থেকে জামিন লাভ করেন তারা।

তদন্তে জেলা পুলিশ অনেক দূর এগিয়ে গেলেও মেট্রো পুলিশের ঘুম এখনও ভাঙেনি। এমনকি গাড়ির মালিক সম্পর্কেও কোন ধারণা নেই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিলেট কোতোয়ালি থানার ওসি (তদন্ত) শ্যামল কুমার বণিকের!

১০ই ফেব্রুয়ারি মানবজমিনের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, গাড়ির মালিক পাচ্ছিন না। তখন তিন প্রবাসীর নাম বললে তদন্ত কর্মকর্তার জবাব, ‘এরা যে মালিক তা তো জানি না।’ মেট্রো পুলিশের যে আরও অনেক কিছুই ‘অজানা’ তা জানা গেল উপ-কমিশনার এজাজ আহমদের বক্তব্য থেকে। তিনি মানবজমিনকে তথ্য দেন, কোতোয়ালি থানার মামলায় কেউই জামিন নেননি। তিনি বলেন, গাড়ির মালিকদের পরিচয় সম্পর্কে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রকৃত মালিকের পরিচয় জানতে পুলিশ হেড কোয়ার্টারের মাধ্যমে বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগ চলছে। ইতিমধ্যে মামলার তদন্ত কর্মকর্তাও বদলি হয়েছেন। নতুন করে এ মামলার দায়িত্ব পাওয়া এসআই আশরাফুল ইসলাম মামলা সম্পর্কে এখনও বুঝে উঠতে পারেননি।

শুরু থেকেই যেন গাড়ির মালিকদের বাঁচানোর সংকল্প করেছিল সিলেট মেট্রো পুলিশ। নাম-পরিচয় জানা থাকার পরও তারা গাড়ি উদ্ধারের পর আসামিদের অজ্ঞাত হিসেবে চিহ্নিত করায় এ সন্দেহ আরও জোরালো হয়। বিয়ানীবাজার থানা গাড়ি দু’টো নিজেদের মামলায় জব্দ দেখাতে চাইলে মেট্রো পুলিশ তাদেরকে সে সুযোগও দেয়নি এমন অভিযোগ তদন্ত কমকর্তা গাজী মিজানের। উল্টো নিজেরাই একটি মামলা করে এ ঘটনায়।

যদিও একই এজাহারে একাধিক মামলা আইনত বৈধ নয়। আর পুলিশের এ ভুলের কারণেই আইনের ফাঁক গলে বেঁচে যেতে পারেন অভিযুক্তরা। বিয়ানীবাজারের মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গাজী মিজান গাড়ি দু’টো নিলামের জন্য আদালতে আবেদন করলেও মেট্রো পুলিশ গাড়ি দু’টো আসামিদের জিম্মায় বুঝিয়ে দেয়ার প্রক্রিয়া চালাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিয়ানীবাজার থানার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা শাখার এসআই গাজী মিজানুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, আসামিরা প্রভাবশালী। শুরু থেকেই আমরা চাপের মধ্যে রয়েছি। তবে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অটল আছেন।




Comments are closed.



পুরানো সংবাদ সংগ্রহ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯  
All rights reserved © shirshobindu.com 2024