স্বদেশ জুড়ে

বাংলাদেশে বিপজ্জনক পেশা সাংবাদিকতা

সিরাজুর রহমান: নরসিংদীর সাংবাদিক কাবিদের এবার ঈদুল আজহা উদযাপন করা হলো না। ঈদের আগেই ঘাতকের গুলিতে তিনি মারা যান। বর্তমান বাংলাদেশে সাংবাদিকতা রাজনীতির চেয়েও বিপজ্জনক পেশা। যদ্দূর হিসাব করতে পারছি এ সরকারের আমলে কাবিদ হলেন ১৭ নম্বর নিহত সাংবাদিক। কতজন সাংবাদিক আহত, নির্যাতিত ও নিপীড়িত হয়েছেন তার হিসাব হয়তো কোনো দিন পাওয়া যাবে না। খুন-জখমের ঘটনা হামেশা ঘটছে আজকের বাংলাদেশে, প্রাণের দাম কোনো কোনো পণ্যের দামেরও কম। তার হিসাব রাখার সময় কার আছে? সবচেয়ে নাটকীয় সাংবাদিক হত্যা হয়েছে ফেব্রুয়ারি মাসে। রাতের বেলা নিজেদের শোবার ঘরে এবং শিশুপুত্র মেঘের চোখের সামনে খুন হন দু’জন টেলিভিশন সাংবাদিকÑ এটিএন বাংলার চিফ রিপোর্টার মেহেরুন রুনি আর তার স্বামী মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার। এই হত্যার কারণ সম্বন্ধে কারোরই আর সন্দেহ নেই। স্বামী-স্ত্রী জ্বালানি খাতে হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির বিবরণ সংগ্রহ করেছিলেন। শেখ হাসিনার বর্তমান সরকারের আমলে দুর্নীতিই হচ্ছে স্বাভাবিক নিয়ম, এ নিয়মের বিরোধিতা করতে গিয়ে প্রতিশ্রুতিশীল এই সাংবাদিক দম্পতিকে প্রাণ দিতে হলো। তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বেশ কয়েকজন সাংবাদিকের সামনে বলেছিলেন ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই খুনিদের গ্রেফতার করা হবে। তার পর অনেক নাটক হয়েছে। পাওনাদার ঋণীর কাছে টাকা চাইতে গেলে সে নাকি বলে, আগামী পরশুর পরদিন আসবেন, সে দিন বলে দেবো কবে টাকা দেবো। সাগর আর রুনি হত্যার তদন্তে সে রকম ব্যাপারই লক্ষ করা গেছে। বাংলাদেশের কোনো গণ্ডগ্রামে কোনো লোক সরকার কিংবা প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করেছে সে খবরও পুলিশ জানে। গত পৌনে চার বছরে এ রকম হাজার হাজার মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু এই দু’জন সাংবাদিকের খুনিদের খুঁজে বের করতে পারল না আওয়ামী লীগ সরকারের পুলিশ। শেষে হাইকোর্ট হুকুম দিলো খুনিদের ধরার দায়িত্ব নিতে হবে র‌্যাবকে। বাংলাদেশের র‌্যাবের নাম আছে দুনিয়াজোড়া। তবে সেটা সুনাম নয়, বিচারবহির্ভূত হত্যা, রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের গুম করার জন্য দুর্নাম। তারাও রুনি-সাগর হত্যার কোনো কূলকিনারা করতে পারেনি। সাধারণ মানুষ বুঝেই গিয়েছিল আসল খুনি ধরা পড়বে না। জ্বালানি খাতে বিনা টেন্ডারে কুইক রেন্টাল বিজলি কেন্দ্র স্থাপন এবং অন্যান্য বাবদ যারা হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করেছে তারা খুবই শক্তিধর। তাদের গায়ে হাত দিয়ে অঘোরে মারা যেতে কোনো পুলিশ কর্মকর্তা চাইবেন বলুন? তা ছাড়া তখনই জোর গুজব রটেছিল যে হত্যার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই খুনিদের বিদেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। হত্যার কয়েক মাস পর নতুন একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিযুক্ত হয়েছেন। নতুন নাটক সৃষ্টি করেছেন তিনিও। আট মাস পরে যেন হঠাৎ করেই কয়েকজন ‘খুনিকে‘ পাকড়াও করা হলো। ঝানু আমলা ছিলেন এই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপিয়ে হলেও ওপরওয়ালাদের মুশকিল আসান করার টেকনিক কোনো কোনো আমলা ভালো করেই আয়ত্ত করেন। মনে হচ্ছে সাধারণ মানুষ মোটেই বিশ্বাস করতে পারছে না যে, আসল খুনিরাই ধরা পড়েছে। আর যেসব সাংবাদিক খুন হয়েছেন তাদের হত্যার পেছনেও কারণগুলো মোটামুটি একই প্রকৃতির মনে হয়। তাদের কেউ কেউ দুর্নীতি, চোরাচালানি, ভূমিগ্রাস প্রভৃতি অপরাধের কাহিনী ফাঁস করতে গিয়ে শাসক দলের নেতাকর্মী কিংবা পেশি শক্তির বিরাগভাজন হয়েছিলেন। অন্যরা ঊর্ধ্বতন কোনো ব্যক্তির অন্যায়কাজের সমালোচনা করে সরাসরি সরকারের কোপে পড়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের এক সদস্যের বিরুদ্ধে একটা দুর্নীতির খবর তখন ইন্টারনেটেও ঘোরাফেরা করছিল। সে খবরটা ছেপে আমার দেশ পত্রিকা ও সে পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান মহা বিপদে পড়েছেন, বহু নির্যাতন সয়েছেন। তার বিরুদ্ধে হয়রানি-নিপীড়ন চলছে তো চলছেই। সে পত্রিকার একজন সংবাদদাতাকে হত্যার লক্ষ্যে তার গাড়ির ওপর আক্রমণ চালানো হয়েছিল। কোনো মতে তিনি পালিয়ে যান। পুলিশ এসেছিল সম্পাদক ও প্রকাশককে গ্রেফতার করতে। উপস্থিত সাংবাদিকেরা স্বভাবতই প্রতিবাদ করেছিলেন। কয়েকজন সাংবাদিকসহ পাইকারিভাবে ৪০০ জন (যাদের পরিচয় পুলিশ জানে না এবং যাদের অনেকে সেখানে উপস্থিতও ছিলেন না) অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে পুলিশ অভিযোগ লিপিবদ্ধ করে। মাহমুদুর রহমানের দুর্ভোগ মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে যাওয়া হয় এবং জানা গেছে সেখানে তার ওপর নির্যাতন ও তাকে অপদস্থও করা হয়। মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা হয় মানহানি, হাইকোর্টে তাকে কারাদণ্ড দেয়া হয় ছয় মাসের কিন্তু মোট নয় মাস তাকে জেলে আটক রাখা হয়। উল্লেখ্য, যে পদ্মা সেতু সম্পর্কিত বিশ্বব্যাংকে দুর্নীতির অভিযোগকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের ওই সদস্যের ব্যবসায় ও সম্পত্তির উৎস সম্বন্ধে কানাডীয় পুলিশ যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে তদন্ত চালাচ্ছিল। পুলিশ নাকি এখন আমার দেশ পত্রিকার ওই ৪০০ সাংবাদিককে গ্রেফতার করতে চায়। কারণ? কারণ নাকি এই যে পুলিশ তাদের রিমান্ডে নিয়ে তাদের ঠিকানা প্রভৃতি সংগ্রহ করতে চায়। দেশের আনাচে-কানাচের খবর এবং সরকারের বিরোধী ও সমালোচকদের হাঁড়ির খবর যে পুলিশের নখদর্পণে কয়েকজন সাংবাদিকের ঠিকানা সংগ্রহের জন্য সে পুলিশকে কেন এই পেশাজীবীদের রিমান্ডে নিতে হবে কোনো শিশুও সেটা ভেবে পাবে না। রিমান্ডের নামে বর্তমান বাংলাদেশে কী হয় কারো অজানা নয়। বিচিত্র নয় যে, আমার দেশ পত্রিকার সাংবাদিকেরা রিমান্ডে যেতে চাইছেন না, বাংলাদেশের সাংবাদিকেরা একযোগে প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠেছেন। কেউ কেউ সন্দেহ করছেন আসল কারণটা ভিন্ন রকম। কেউ একজন প্রধানমন্ত্রী সম্বন্ধে একটা বই লিখেছেন। সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই সে বই বিক্রির দায়িত্ব নিয়েছে বলে মনে হয়। তারা সে বই কেনার তাগিদ দিয়ে বিভিন্ন মহলকে চিঠি লিখেছে। আরেকটা মজার ব্যাপার ঘটেছে এখানে। সবাই জানেন বিক্রি বাড়ানোর জন্য প্রকাশকেরা ক্রেতাদের বিক্রয় মূল্যের সিকি ভাগ পর্যন্ত ছাড় (ডিসকাউন্ট) দিয়ে থাকেন। এ ক্ষেত্রে ঘটেছে উল্টো ব্যাপার। আলোচ্য বইটির দাম প্রকাশক নির্ধারণ করেছেন ৪০০ টাকা। কিন্তু ডিজিএফআই ৫০০ টাকা দামে ৪০০ টাকার বই কিনতে বলেছে সংশ্লিষ্ট সবাইকে। কয়েক দিন আগে দৈনিক আমার দেশ সে চিঠির আলোকচিত্র প্রথম পৃষ্ঠায় ছেপে দেয়। সরকার ও ডিজিএফআই দেশবাসী এবং সারা দুনিয়ার চোখে হাস্যস্পদ হয়েছে। এর সাথে কি সে পত্রিকার সাংবাদিকদের হয়রানির কোনো সম্পর্ক থেকে থাকতে পারে? একসাথে নাম-পরিচয়বিহীন শত শত এবং হাজার হাজার লোকের বিরুদ্ধে পাইকারি মামলা বোধ হয় আজব দেশ বাংলাদেশ ছাড়া আর কোথাও দেখা যাবে না। সিরাজগঞ্জে ট্রেন পোড়ানোর ঘটনা, আড়িয়াল বিলে বিমানবন্দর নির্মাণের বিরুদ্ধে আন্দোলনে এবং আরো বহু ঘটনায় এ যাবৎ বোধ করি কয়েক লাখ লোকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে পুলিশ যাদের দেখেনি, ঘটনাস্থলে তারা উপস্থিত ছিল বলে কোনো প্রমাণ নেই। সন্দেহ হতে পারে সরকার রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রয়োজন বোধ করলে যেকোনো নিরীহ ব্যক্তিকেও গ্রেফতার করে নির্যাতন করার কিংবা জেলে পোরার সুযোগ সৃষ্টি করাই এই আজগুবি কাণ্ডকারখানার উদ্দেশ্য। গত অন্তত তিন শতাব্দী ধরে সংবাদপত্র (বর্তমানে মিডিয়া) রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ (ফোর্থ স্টেট) বলে স্বীকৃত। সংসদ, নির্বাহী বিভাগ এবং বিচার বিভাগের মতো সংবাদপত্রও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের একটি প্রধান অঙ্গ বলে বিবেচিত। প্রথমোক্ত তিনটি স্তম্ভের কোনোটিতে অন্যায় কিংবা ত্রুটি দেখা দিলে সংবাদপত্র সেটির সমালোচনা করবে, সে অন্যায় কিংবা ত্রুটিকে জনসাধারণের সামনে তুলে ধরবে এবং প্রতিকার হওয়া পর্যন্ত সে বিষয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাবে। এই হচ্ছে গণতন্ত্রে সংবাদপত্রের স্বীকৃত ভূমিকা। সংবাদের স্বাধীনতা বনাম ফ্যাসিবাদ ব্যতিক্রমও দেখা গেছে। হিটলার ও মুসোলিনি সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার মূলোৎপাটন করেই ফ্যাসিবাদ চালু করতে পেরেছিলেন। তার পরিণতি কারো জন্যই ভালো হয়নি। কোটি কোটি মানুষ মারা গেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে। মানবসভ্যতা ধ্বংস হতে বসেছিল। এই দুই ফ্যাসিবাদী ইতিহাসে ধিকৃত হয়ে থাকবেন। যুদ্ধের পরে কমিউনিস্ট সাম্রাজ্যের প্রধান জোসেফ স্ট্যালিনও সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধ করেছিলেন। সরকার পরিচালিত মিডিয়া তোতাপাখির মতো সরকারি বয়ানগুলো আউড়ে যাচ্ছিল। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের মানুষ সেসব অসত্যকে চিনে ফেলতে এবং ঘৃণা করতে শিখেছিল। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় এবং আশির দশকের শেষার্ধে স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের আন্দোলনে বাংলাদেশেও এ রকম পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু সেন্সরশিপে স্বৈরতন্ত্রীদের লাভ হয়নি। মানুষ লুকিয়ে তখনকার ব্যয়বহুল শর্টওয়েভ রেডিও কিনেছে, বিবিসির খবর শুনেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নেও ঠিক তাই ঘটেছিল। আশির দশকের শেষাশেষি মিখাইল গরবাচেভ গদিতে বসে টের পেলেন যে কমিউনিস্ট সাম্রাজ্য নড়বড়ে আর ঝরঝরে হয়ে গেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের ধসে পড়ার পথ তিনি সুগম করে দিয়েছিলেন। সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার ওপর বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কখনোই শ্রদ্ধা ছিল না। সাংবাদিকদের ‘সাঙ্ঘাতিক‘ বলা তার অত্যন্ত প্রিয় ‘কৌতুক‘ ছিল। ক্ষমতা পেয়ে তিনি নানাভাবে সে বিদ্বেষকে ব্যবহার করেছেন। ১৯৯৬-২০০১ সময়ে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন ফেনীর জয়নাল হাজারী, লক্ষ্মীপুরের আবু তাহের, ঢাকার মায়া চৌধুরী, নারায়ণগঞ্জের শামীম ওসমান প্রমুখ ব্যক্তিদের ‘গডফাদার’ বলায় এবং তাদের শাস্তি দাবি করায় সংবাদ সম্মেলনে তিনি সাংবাদিকদের তিরস্কার করেছিলেন। প্রায় চার বছর আগে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার ওপর শেখ হাসিনার আক্রোশ আরো নানাভাবে প্রকাশ পেয়েছে। এ কথা সবাই জানে বাংলাদেশের  বেশির ভাগ সংবাদপত্রেরই মালিক এমন সব ব্যবসায়ী গোষ্ঠী যারা আগেও আওয়ামী লীগ সরকারের কাছ থেকে অন্যায় অনুগ্রহ পেয়েছে এবং বর্তমানেও পেয়ে যাচ্ছে। শেখ হাসিনার উভয় সরকারের আওতায় টেলিভিশন চ্যানেল খোলার লাইসেন্স দেয়া হয়েছে দলীয় মন্ত্রী, সংসদ সদস্য কিংবা তাদের আত্মীয়দের। এই চ্যানেলগুলোকে ভারতীয় চ্যানেলের অপসংস্কৃতি প্রচার করার অবাধ সুযোগ দেয়া হয়েছে। অন্য কোনো স্বাধীনতা তাদের নেই। এ কথা সত্যি যে, সরকার এখনো আনুষ্ঠানিক সেন্সরশিপ আরোপ করেনি। কিন্তু সাংবাদিকদের ওপর সেলফ-সেন্সরশিপের অসহনীয় বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। সরকারের অনুগ্রহভাজনদের ছাড়া অন্য কাউকে অনুষ্ঠানে, বিশেষ করে টকশোগুলোতে, আমন্ত্রণ করা সরকারের পছন্দ নয়। টকশোতে কিংবা পত্রিকার প্রবন্ধ ও কলামে সামান্যতম সমালোচনাও সরকার সহ্য করতে রাজি নয়। সেটা সম্পূর্ণরূপে সাংবাদিকতার মূলনীতি ও দায়িত্বের বিরোধী। সরকারের কুশাসন, দুর্নীতি কিংবা অনিয়মেরও যদি সমালোচনা করা না যায় তাহলে ফোর্থ স্টেট হিসেবে সংবাদপত্র (বর্তমানে মিডিয়া) তাদের দায়িত্ব পালন করবে কিভাবে? পৃথিবীর যেকোনো প্রকৃত সাংবাদিক আপনাকে বলে দেবেন সেলফ-সেন্সরশিপ প্রকৃত সেন্সরশিপের চেয়েও অনেক বেশি জঘন্য, অনেক বেশি দুর্বিষহ। সেন্সরশিপে সাংবাদিকেরা জানেন কী বলা যাবে আর কী লেখা যাবে না। কিন্তু সেলফ-সেন্সরশিপে বলার কিংবা লেখার গণ্ডি সাংবাদিকদেরই নির্ধারণ করতে হবে। সাংবাদিকেরা প্রতি মুহূর্ত ভয়ভীতি আর আশঙ্কার মধ্যে কাটাতে বাধ্য হন। গণ্ডিগুলো তাদের মুক্ত বুদ্ধি ও বিবেকের সাথে সঙ্ঘাতপূর্ণ বলে কাজ করা খুবই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। টকশো বন্ধ করার চক্রান্ত? প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক একটি উক্তিতে টেলি-সাংবাদিকেরা উদ্বিগ্ন, ভীত এবং আতঙ্কিত। তিনি টকশোতে অংশগ্রহণকারীদের মাঝ রাতের গলাকাটা সিঁধেল চোর বলে বর্ণনা করেছেন। এর মধ্যে সাংবাদিক ও উপস্থাপকেরা টকশো বন্ধ করে দেয়ার কিছু আশঙ্কা দেখতে পাচ্ছেন। গত ২৩ অক্টোবর আর টিভির এক টকশোতে সরকারের নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান অন্য একজন আমন্ত্রিত অতিথি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়াকে তুইতোকারি করেছেন, ‘হারামজাদা‘ বলে গালি দিয়েছেন, তাকে প্রহার করতে ঘুসি বাগিয়ে ছুটে গিয়েছেন এবং তার চোখ উপড়ে ফেলার ‘প্রতিশ্রুতি‘ দিয়েছেন। বহু সাংবাদিক এটাকে একটা প্ররোচনা হিসেবে দেখছেন। তারা ভয় করছেন এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাগি¦তণ্ডা ব্যাপক হলে সে অজুহাত দেখিয়ে সরকার টকশো সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দিতে পারে। শেখ হাসিনা নিজেকে গণতন্ত্রী বলে দাবি করেন। কিন্তু তিনি নিজেও জানেন যে, তার কাজকর্ম, এমনকি চিন্তাধারাও গণতন্ত্রের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। প্রধানমন্ত্রী অবগত আছেন যে, বহির্বিশ্ব বাংলাদেশে মানবাধিকারের মতো সংবাদের স্বাধীনতার অভাবে উদ্বিগ্ন। সে জন্যই বাংলাদেশে সংবাদপত্রের পূর্ণ স্বাধীনতা আছে দাবি করে এক লাখ পাউন্ড খরচ করে লন্ডন টাইমস পত্রিকায় তাকে বিজ্ঞাপন দিতে হয়েছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী যদি মনে করেন, বিশ্বসমাজের একজন মানুষও সে বিজ্ঞাপনে প্রভাবিত হয়েছে তাহলে তিনি আত্মপ্রতারণা করছেন বলতেই হবে। বর্তমান যুগটা সামাজিক সাংবাদিকতার (স্যাটেলাইট টেলিফোন, টুইটার, ফেসবুক, ইউটিউব প্রভৃতি) যুগ। স্ট্যালিনের যুগ, এমনকি এরশাদের যুগ থেকেও আমরা এখন অনেক এগিয়ে এসেছি। এ যুগে সত্যকে ধামাচাপা দিয়ে রাখা সম্ভব নয়।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close