স্বদেশ জুড়ে

ব্লগ, শাহাবাগ এবং ধর্মীয় চেতনা

রশিদ জামিল:

১.  ‘গ’তে গোলাম আযম/তুই রাজাকার। ‘ন’তে নিজামী/ তুই রাজাকার। ‘ক’তে কাদের মোল্লা/ তুই রাজাকার। আর কোনো দাবি নাই/ রাজাকারের ফাঁসি চাই। দড়ি লাগলে দড়ি নে/ রাজাকারের ফাঁসি দে…এগুলো শাহাবাগের স্লোগান। গগণবিদারী চিৎকারে উত্তাল শাহাবাগ। প্রজন্ম চত্বরে জড়ো হয়েছে একাত্তর পরবর্তী প্রজন্ম। নেতৃত্বে আছে অনলাইন জার্নালে লেখালেখি করা তারুণ্যের একটি অংশ। এরা বিভিন্ন বাংলা ব্লগ সাইটে ব্লগিং করে। ব্লগিং করে বলে এদের নাম ব্লগার। সম্প্রতি একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক জামাত নেতা কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ঘোষিত হবার পর ব্লগার্স এন্ড অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম শাহাবাগ আন্দোলনের ডাক দেয়। একাত্তর আমাদের গর্ব। আমাদের অহংকার। যারা সেদিন আমার দেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলো, আমার মায়ের ইজ্জতের উপর হাত দিয়েছিলো, আমার বোনের ওড়না ধরে টান মেরেছিলো, বেয়নেট দিয়ে ঝাঝরা করেছিলো আমার ভাইয়ের বুকটা, যারা পাকিস্তানি নরপশুদের পা চেটেছিলো সেদিন, এদের কোনো ক্ষমা নেই। ক্ষমা করার অধিকাই কারো নেই। বিচারের মাধ্যমে মৃত্যুই তাদের একমাত্র পাওনা। সঙ্গত কারণে তারুণ্যের এই জাগরণকে স্বাগত না জানানোর কোনোই যুক্তি থাকতে পারে না।

২.  বাংলাদেশে অযুত-কোটি মুসলমান এমন আছে যারা নামাজ রোযার ধার ধারে না। যেমন খুশি চলে। কিন্তু আল্লাহ, নবী বা  কুরআনকে নিয়ে কেউ  বাঁকা কথা বললে আর সহ্য করতে পারে না। বেরিয়ে আসে রাস্তায়। সেই কুলাংগারের জিব টেনে ছিড়ে ফেলার  হুংকার দিয়ে গর্জে উঠে। ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল সাক্ষী, এদেশে কোনো কুলাংগার আল্লাহ-রাসূল-কুরআনকে গালি দিয়ে কখনো পার পায়নি।  ভবিষ্যতেও পাবে না  কারণ, বাংলাদেশের মুসলমানরা ধর্মপ্রাণ। ঈমানের সাথে আপোষ করতে শেখেনি। প্রয়োজনে একবেলা খাবে একবেলা না খেয়ে থাকবে কিন্তু নবীর ইজ্জতের জন্য পেটে পাথর বেধে রাস্তায় বেরিয়ে আসবে।

৩.  যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে যারা বন্দী/পলাতক আছেন, তাদের অধিকাংশই জামায়াতে ইসলামীর নেতা। কিছু আছেন বিএনপির। আওয়ামীলীগে থাকা অভিযুক্ত কাউকে এখনো গ্রেফতার হতে হয়নি। অর্থাৎ, এদেশে নিবন্ধিত/অনিবন্ধিত আর কোনো ইসলামী দলের কোনো নেতাকে এই অভিযোগে গ্রেফতার হতে হয়নি। আবার জামাতে ইসলামীর সাথে অন্যান্য ইসলামী সংগঠনগুলোর  আদর্শিক দ্বন্দ্ব সর্বজনবিধিত। যে কারণে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে কোনো ইসলামী সংগঠনেরই এক্সট্রা অডিনারি মাথাব্যথা নেই। সরাসরি মাঠে না থাকলেও বিচারের প্রশ্নে তাদের মৌন সমর্থন জাতির সামনে পরিষ্কার। কোনো কোনো সংগঠন থেকে তো পরিষ্কার ভাষাতেই বিচারের পক্ষে বিবৃতি এসেছে। বিচারের বিপক্ষে কাউকে কথা বলতে শোনা যায়নি।

৪. এদেশের আলেম-উলামা এবং ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা আবারো মাঠে নেমেছেন বা নামছেন বিশ্বনবী সা.’র বিরুদ্ধে বিষেদাগারের প্রতিবাদে। দিনে দিনে দানা বেধে উঠছে ক্ষোভ। ঘোষণা এসেছে নাস্তিক কিছু ব্লগার কর্তৃক নবীজীর বিরুদ্ধে কটুক্তির সুষ্ঠু বিচার না হলে সারা দেশে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। ইতোমধ্যে সেটা শুরুও হয়ে গেছে। এ পর্যন্ত মারা গেছেন বেশ কয়েকজন। আলেম-উলামাদের ঘোষণা, “৯০% মুসলমানদের এই দেশে আল্লাহ রাসূলের অবমাননা বরদাশত করা হবে না। প্রয়োজনে লক্ষ লক্ষ মুসলমান নবীর ইজ্জতের জন্য জীবন দেবে।” আর দুঃখজনক হলেও শাহবাগ আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা ব্লগারদের মধ্যেই মিশে আছে ইসলামকে নিয়ে অবমাননাকর লেখালেখি করা সেই প্রতিক্রিয়াশীলরা।

৫.  সাইবার ক্রাইম এবং ফেক নিকের কথা মাথায় রেখেই বলছি। যাদের নামের আইডি থেকে নোংরামী করা হয়েছে, একমাত্র রাজিব ছাড়া সকলেই তো জীবিত। রাজিবের না হয় আত্মপক্ষ সমর্থন করে কথা বলার সুযোগ নেই। কিন্তু বাকিরা? তারা কেউ তো কখনো বলেনি আমরা নবীকে নিয়ে খারাপ মন্তব্য করিনি।  আমাদের নামে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে। যেহেতু তারা একেকজন অভিজ্ঞ ব্লগার এবং ফেসবুক ইউজার, তাই তাদের নাম থেকে যে এগুলো হচ্ছে, সেটা তো তাদের না জানার কোনো কারণ নেই। তারা যদি এর সাথে জড়িত না হয়েই থাকতো, তাহলে তো প্রতিবাদ জানাতো। তেমন কিছু তো চোখে পড়লো না। তাহলে মানুষ তো ভাবতেই পারে এরা স্বেচ্ছাচারি দুবৃত্ত আর শান্তি-শৃঙ্খলা বিনষ্টের চক্রান্তে লিপ্ত প্রতিক্রিয়াশীল। খুঁজলে হয়তো দেখা যাবে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব বিরোধী কোনো অপশক্তির হয়ে এরা কাজ করছে। এরা যে যুদ্ধাপরাধীদের পয়সা খেয়ে তাদেরকে বাঁচানোর জন্য আন্দোলনকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করবার লক্ষ্যে জেনেবুঝেই নবীকে অপমান করে সাধারণ মুসলমানকে ক্ষেপিয়ে তুলছে না, সেটারই বা নিশ্চয়তা কোথায়?  নবীকে অপমান করা হাতেগুনা এই ক’জন ধর্মদ্রোহী; বাংলাদেশকে কখনো  স্থিতিশীল দেখতে চায় না-বাইরের এমন কারো ইন্দনে দেশকে অরাজকতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে – সেই সম্ভাবনাও কিন্তু উড়িয়ে দেয়া ঠিক হবে না।

তাহলে উপরে বর্ণিত  ১.২.৩.৪.৫ এর সারাংশ কী দাড়ালো? এদেশে ইসলামকে আক্রমণ করে কেউ কোনোদিন পার পায়নি। আগামীতেও পাবে না। শাহাবাগে দ্রোহের দাবানল জ্বলছে যুদ্দাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে। যে দাবির সাথে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের কোনো বিরোধ নেই। জামাত ছাড়া এদেশের আর কোনো ইসলামী দলের মধ্যে যুদ্ধাপরাধী নেই। আর তারা কেউ এই বিচারের বিরুদ্ধাচারণও করছেন না। কিন্তু মাঠে নামছেন তারা। যে নামাটার সাথে জড়িয়ে যাচ্ছে শাহবাগ। অর্থাৎ, আলেম-উলামা  ধর্মপ্রাণ মুসলমান আর শাহাবাগ আন্দোলনের মূল ইস্যুর মধ্যে মৌলিক বিরোধ না থাকলেও সংঘাত অনিবর্য হয়ে পড়ছে। পরিস্থিতি বিচারে অত্যন্ত পরিষ্কার, সরকার থেকে কার্যকর এবং যথাযত উদ্যোগ নেয়া না হলে সংঘাত অত্যাসন্ন, যা শান্তিপ্রিয় কারোই কাম্য হতে পারে না।

দুই.

১৪ ফেব্র“য়ারি গিয়েছিলাম শাহাবাগে। যেহেতু  শাহবাগের কাছেই একুশে বইমেলায় ছিলাম পাঁচ দিন,  তাই ১৪ তারিখ ঢু মারলাম সেখানে।  আমার সাথে আরো দশ বারোজন ব্লগার। সকলেই প্রথম আলো ব্লগে লেখালেখি করি। রাত ন’টা পর্যন্ত বইমেলায় কাটিয়ে সাড়ে ন’টায় গেলাম আমরা শাহাবাগে। রাত ১২ টা পর্যন্ত থাকলাম সেখানে। এক্টিভিস্ট ফোরামের এক্টিভিটিজ ঘুরে ঘুরে দেখলাম। প্লেকাড আর ফেস্টনে ছেয়ে আছে শাহবাগ। রাজাকারের প্রতীকি ডামি বানিয়ে ঘৃণা প্রকাশ চলছে। উল্কি এঁকে তরুণ-তরুণিরা উদ্বেলিত। নেচে-গেয়ে, ঢাক-ঢোল-বাধ্য বাজিয়ে মুখরিত করে রাখা হয়েছে পুরো এলাকা। মূল মঞ্চ ছাড়াও আরো অনেকগুলো ভাম্যমান মঞ্চ থেকে বক্তৃতা করা হচ্ছে। গান গাওয়া হচ্ছে। তাদের চোখেমুখে ভেসে বেড়াচ্ছে  লাল-সবুজের বাংলাদেশ। মনে মনে ভাবলাম… এখানে যদি নাচ-গান না হতো, তাহলে আমাদের মতো আরো অনেকেই সেখানে জড়ো হতে পারতো। কারণ, যুদ্ধারপাধের বিচারের দাবি তো আমাদেরও। এদেশের ধর্মপ্রাণ লক্ষ লক্ষ মানুষ এমন আছেন যারা যুদ্ধাপরাধের বিচার চান কিন্তু নাচগানের সাথে নাই। তারা বিশ্বাস করেন একাত্তরের চেতনা মিশে থাকবে মননে, মানসিকতায়, কথনে, আচরণে। চেতনার জানান দিতে বাদ্য-বাজনা জরুরি না। নাচ-গান-বাদ্য-বাজনা ছাড়াও এই চেতনাকে লালন করা যায়।

তিন.

সব মিলিয়ে দুইটি ধারা আছে এই পৃথিবীতে । আস্তিক ও নাস্তিক। তৃতীয় কোনো ধারা নেই। পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ কোনো না কোনো ধর্ম বিশ্বাস লালন করেন। ছয়শ’ কোটি মানুষ আছে পৃথিবীতে। এর মধ্যে  দেড়শ’ কোটি মুসলমান যা মোট জনসংখ্যার ওয়ান  ফোর্থ।  নাস্তিকের সংখ্যা কয়েক লাখ হতে পারে। এই কয়েক লাখের মধ্যে মাত্র কয়েক হাজার হতে পারে এমন, যারা ধর্মের সমালোচনা করে। আর তার মধ্যে ধর্মকে (পড়–ন ইসলামকে) গালাগালি করা নাস্তিকের সংখ্যা কয়েকশ’র বেশি হবে বলে মনে হয় না। কিন্তু বার বার মুষ্ঠিমেয় এই অংশটিই পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে। শান্ত জনপদকে অশান্ত করে তুলে। কেউ যদি নাস্তিকতায় আরাম পায়, সে যদি নাস্তিক্যবাদে বিশ্বাস করে, করতেই পারে। এটা তার  মানবিক অধিকার। কিন্তু নাস্তিকতার নামে ধর্মকে(আবার পড়ুন ইসলামকে, কারণ, নাস্তিকরা একমাত্র ইসলামকে নিয়েই সমালোচনা করে।) নিয়ে সমালোচনার বা বাজে মন্তব্য করার কোনো অধিকারই তাদের থাকতে পারে না। কিন্তু তাই হচ্ছে। আজকাল নাস্তিকতা মানেই হয়ে দাঁড়িয়েছে ইসলামের বিরুদ্ধাচরণ এবং নোংরা ভাষায় আল্লাহ কুরআন ও মুহাম্মাদ সা. কে নিয়ে অশালীন কথা বলা। এটা তো হতে পারে না।

চার.

আগেই বলেছি শাহাবাগের মূল চেতনার সাথে ইসলাম, মুসলমান ও আলেম-উলামার কোনো বিরোধ নেই। কিন্তু যখন নবীজির ইজ্জত নিয়ে কথা উঠে, যখন আল্লাহকে নিয়ে ঔদ্ধত্বপূর্ণ কথা বলার দুঃসাহস দেখানো হয়, তখন স্বাভাবিক কারণেই সংঘাত অনিবার্য হয়ে পড়ে। একমন ঘি‘য়ে এক ফুটা কেরোসিন পড়লে ঘি কি আর ঘি থাকে ?  শাহাবাগের এই উদ্বিপ্ত তারুণ্যকে, তাদের এই উদ্দমকে কেনো গুটি কতেক নাস্তিকদের পাপের বোঝা টানতে হচ্ছে? কেনো সেই বখাটেদেরকে শাহাবাগে অবাঞ্চিত ঘোষণা করা হচ্ছে না? কেনো বলা হচ্ছে না যে বা যারাই ধর্ম নিয়ে আজেবাজে কথা বলে আসছে, শাহাবাগে তাদের কোনো স্থান নেই। শাহাবাগ আন্দোলন শুধুই তাদের, যারা  ধর্মের বিরুদ্ধে নয়, যুদ্ধাপরাধীর বিরুদ্ধে। তাহলেই তো ঝামেলা চুকে যায়। বছর তিনেক থেকে ব্লগে লেখালেখি করি বিধায় বিভিন্ন ব্লগের হালচাল সম্বন্ধে আমার মোটামুটি একটা ধারণা আছে । বিভিন্ন মৌলিক পয়েন্টে মাথামোটা অনেক নাস্তিকের সাথে অনলাইনে সরাসরি বিতর্ক হয়েছে আমার। কিন্তু কথা হয়েছে পারষ্পরিক শ্রদ্ধাবোধ আর সম্মান রেখে। গালাগালির পর্যায়ে যেতে হয়নি। আমি জানি ব্লগার মানেই নাস্তিক নয়। ব্লগারদের মধ্যে হাতে গুনা কিছু আছে নাস্তিক। কিন্তু অতি উৎসাহি কাউকে কাউকে যখন দেখি ব্লগারদের প্রতিহত করার কথা বলতে, যখন শুনি বলছেন, ব্লগাররা নাস্তিক, তখন তাদের নাবালেগ বিবেক দেখে করুণা হয় আমার।

আমি জানি শাহবাগের আন্দোলন ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে নয়। এ আন্দোলন যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে। কিন্তু দিনের পর দিন যারা ইসলামকে কটাক্য করে, নবীজির ইজ্জতে হামলা চালায়, অশালীন অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে, তাদেরকে যখন দেখা যায় শাহবাগের নেতৃত্বের আশেপাশে, তখন স্বাভাবিক কারণেই মুসলিম সেন্টিমেন্ট অন্যরকম হয়ে যায়। ফলে আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্যের সাফল্যের প্রশ্নে সন্দেহের বীজ দানা বাধতে আরম্ভ করে। আর সেই সুযোগে পানি আরেকটু ঘোলা করে শিকারের নেশায় ছুটে চলে সেই তারা, একাত্তরে যারা পাগলা কুকুরের মতো হামলে পড়েছিলো সাত কোটি বাঙালির উপর। সতর্ক হওয়া উচিৎ না?  এতোটা উদাসিন হলে কি চলে?

পাঁচ.

ইতোমধ্যেই জল অনেকখানি ঘোলা হয়ে গেছে। ব্লগার, সরকার এবং আলেম-উলামা, কাউকেই আমার কাছে লাইনে মনে হচ্ছে না। ব্লগারদের উচিৎ ছিলো নাস্তিক্যবাদ সম্বন্ধে অবস্থান আরো ক্লিয়ার করা। উচিৎ ছিলো যারা যারাই ইসলাম ও মহানবী সা. কে নিয়ে কটুক্তি করে এসেছে বিভিন্ন ঠিকানায়, সেই চিহ্ণিত প্রতিক্রিয়াশীলদের বিরুদ্ধে সচেতন থাকা। তাদেরকে আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত হতে না দেয়া। ফ্রন্ট লাইনে নিয়ে আসার তো প্রশ্নই আসে না।

সরকারের উচিৎ ছিলো পুরো ব্যাপারটি আরো বিচক্ষণতার সাথে হ্যান্ডেল করা। ভাবা উচিত ছিলো এদেশের মুসলমানের ঈমানী সেন্টিমেন্টের কথা। যারা যারাই ইসলাম ও বিশ্বনবীকে নিয়ে বাজে কথা বলেছে, বিভিন্ন পত্রিকায় যেগুলো স্কিনশর্টসহ ছাপা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে তড়িৎ ব্যবস্থা নেয়া। প্রমাণ করা এদেশে আল্লাহ, রাসুল ও মুহাম্মাদ সা. কে নিয়ে যারা আজেবাজে কথা বলবে, তাদের প্রতি সরকারের কোনো দুর্বলতা নেই। কিন্তু সরকারকে আমরা সেটা করতে দেখলাম না। আলেম-উলামার উচিত ছিলো আরো পরিষ্কার করে জানান দেয়া যে, শাহবাগের আন্দোলনের সাথে আলেমদের কোনো বিরোধ নেই। আলেমদের আন্দোলন নবীকে গালি দেয়া সেই কয়েকটি অপদার্থের বিরুদ্ধে। জামাতে ইসলামীর সাথে আলেমদের এই আন্দোলনের কোনোই সম্পর্ক নেই। কিন্তু বিভক্ত নেতৃত্বের কাছ থেকে সেভাবে সুষ্পষ্ট বক্তব্য আসছে না।

ছয়. এই ফাঁকে আলেম উলামাদেরকে একটু ওয়াজ করে ফেলি। অন্যায় যেখানে হবে, জবাব তো সেখানেই দেয়া দরকার। নাকি? আপনারা অনলাইনে আসবেন না, ছেলেরা নেট ব্রাউজিং করলে তাদের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট বসাবেন, তাহলে জানবেন কেমন করে কোথায় কী হচ্ছে? ইসলাম নিয়ে কথা উঠবে ব্লগে বা ফেসবুকে, আর আপনারা মিছিল নিয়ে গিয়ে জড়ো হবেন পল্টন ময়দানে! এটা কেনো? স্বরণ করিয়ে দিই তৎকালীন সময়ে মক্কার মুশরিকরা নবীর কুৎসা রটনা করে কবিতা লিখেছিলো। বিশ্বনবী সা. হযরত যায়েদ বিন সাবিতকে নির্দেশ করেছিলেন কবিতার মাধ্যমে কটুক্তির জবাব দিতে। হযরত আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহাকেও বলতেন কবিতার মাধ্যমে কবিতার জবাব দিতে। তাহলে মানেটা কী দাঁড়ালো? আঘাত যেখান থেকে যেভাবে আসবে, জবাব সেখানে সেভাবেই দিতে হবে। আর এটা তো যুক্তিরও দাবি। পায়ের আঙুলে আঘাত লাগলো আর মলম পট্টি লাগালাম মাথায়, তাহলে তো হবে না। এই সহজ কথাটি আপনাদের কাছে পরিষ্কার হতে আর কত বছর লাগবে? সুতরাং ব্লগে বা ফেসবুকে কেউ উল্টাপাল্টা কিছু করলে জবাব দিতে হবে সেখানেই। যেটা আমরা করে আসছি।

যদিও এ পর্যন্ত আপনারা যখনই মাঠে নেমেছেন, ব্যর্থ হয়ে ঘরে ফেরেননি। এটা যতটা না আপনাদের নেতৃত্বের কোয়ালিটির কারণে, তারচে’ বেশি সাধারণ মুসলমানদের সাপোর্টিং কোয়ান্টিটির কারণে হয়েছে। স্বীকার করুন আর নাই করুন, এটাই সত্য। প্রায়ই দেখা যায় আন্দোলনে নেমে মূল ছেড়ে ডালপালা ধরে ঝুলে আছেন। বর্তমানের কথাই বলি।

শাহবাগে চলছে যুদ্ধাপরাদীর ফাঁসির দাবিতে আন্দোলন। সেখানে আছে হাজার হাজার তরুন/তরুণী। বলবেন এরা  সেখানে নেচে গেয়ে নাফরমানি করছে। এতে বিশেষভাবে অবাক হবার কী আছে? সারা দেশেই তো এরা অপেন এয়ার কনসার্টের নামে নাচগান করে। সবসময়ই করে। শাহবাগে যারা আছে, এদের মধ্যে হয়তো গুটি কতেক আছে কুলাংগার টাইপ নাস্তিক। যারা আমার নবীকে নিয়ে আজেবাজে কথা বলেছে। আপনারা এই গুটি কতেকের বিরুদ্ধে সর্বস্ব নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ছেন। কোনো মানে হয়? নিজেদের ক্ষমতাকে আর কত খাটো করে দেখবেন? আবার নাম ধরে ধরে ব্যানারে রীতিমতো ছবি লাগিয়ে মিছিল করছেন। লাভটা কী হচ্ছে! যারা নবীজীকে নিয়ে নোংরামী করেছে, তাদেরকে হিট করিয়ে দিচ্ছেন, এই তো। যাদের কুড়ি ছিলো ৪২০ টাকা, দেখা যাবে তাদের নাম ধরে ধরে স্লোগান আর বক্তব্য দিতে দিতে তাদেরকে এমন অবস্থানে নিয়ে গেছেন যে, তাদের তোলা বিকতে শুরু করবে হাজার ডলার। আর এরা তো এটাই চায়। ভেবে পাই না আলেমরা এতো বুঝেন কিন্তু এই সহজ ব্যাপারটা কেনো বুঝেন না! কেনো তারা বার বার এভাবে নষ্ট মাথাগুলোর উপরে উঠার সিঁড়ি হন?

সাত.  না, আমি বলছি না হাত পা গুটিয়ে বসে থাকতে। কাজ করতে হবে কাজের গতিতে। আন্দোলন হবে মূল ধরে। ডালপালা ধরে ঝুলাঝুলির মাঝে কোনো ফায়দা নেই। এভাবে কিছুদিন পরপর একেকজনের খাহেশ হবে আলোচনায় আসতে, সে নবীকে গালি দিয়ে বসবে। ব্যস। বেরিয়ে গেলেন মিছিল নিয়ে। ‘অমুকের ফাঁসি চাই’ স্লোগান দিয়ে দিয়ে বিশ্বব্যাপী তাকে পরিচিত করিয়ে দিলেন? কেনো বুঝেন না এরা সেটাই চায়।  আন্দোলন যদি করতেই হয়, বাংলার জমীনে যদি নবীর ইজ্জতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়, তাহলে খণ্ড খণ্ড ইস্যু ভিত্তিক নয়, সময় সময় একেকজনের বিরুদ্ধে নয়, মৌলিক ইস্যুতে মাঠে নামুন। আওয়াজ তুলুন ব্লাসফেমি আইনের জন্য। বরাবরের মতো মিঁউ মিঁউ স্টাইলে নয়। এই দাবি এর আগেও উঠানো হয়েছে। আবার সরে আসা হয়েছে। এভাবে হলে হয় না। হবেও না। ঐক্যবদ্ধভাবে রাস্তায় নামুন। দাবি থাকবে একটাই, ব্লাসফেমি আইন তৈরি করতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত জাতীয় সংসদে এ আইন পাশ করা না হবে, যতক্ষণ পর্যন্ত মহামান্য রাষ্ট্রপতি সে আইনে স্বাক্ষর না করবেন, যতক্ষণ না আইনটি সরকারি গেজেট আকারে প্রকাশিত হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত রণে ভঙ্গ দেয়া যাবে না। মাঠে থাকতে হবে। পারবেন সেটা?  পারলে সেটা করুন। আর না পারলে দরকার নেই। যেমন আছেন তেমনই থাকুন। খামাখা কয়েক দিন চিল্লাচিল্লি করে লাভ নাই।

সরকারকে বলি। দেশটা যে অনাকাঙ্খিত সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, এটা কি বুঝতে পারছেন? যদি পারেন, তাহলে অবিলম্বে ব্লাসফেমি আইন পাশ করুন। এটা করতে সমস্যা তো কিছু নেই। কেউ নাস্তিক থাকলে তো সমস্যা নেই। আস্তিক থাকলো আস্তিকের মতো। নাস্তিক নাস্তিকের মতো। কিন্তু আইনটি করা থাকলে কেউ আর কিছু দিন পরপর ধর্মকে গালিগালাজ করে পরিবেশ নষ্ট করতে সাহস পাবে না। সরকার যদি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে আন্তরিক হন, তাহলে দেরি না করে আইনটি করে ফেলা দরকার। তাহলে আলেম-উলামারা শান্ত হয়ে ঘরে ফিরে যাবেন। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা বিব্রতকর অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসবে। শাহাবাগ থাকবে স্বমহিমায়। বিচার চলবে নিজস্ব গতিতে। বল এখন সরকারের কোর্টে। সরকার কী করেন, সেটাই এখন দেখবার বিষয়।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close