প্রচ্ছদ রচনাস্বদেশ জুড়ে

খালেদা কঠিন সিদ্ধান্ত নিলেন যে কারণে

 

পীর হাবিবুর রহমান: সরকারের মনোভাব পরিবর্তন না হওয়ার কারণেই বিরোধী দলের নেত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে শেষ পর্যন্ত হার-জিতের লড়াইয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হলো। দলীয় সূত্র এ তথ্য জানায়। চিকিৎসা শেষে সিঙ্গাপুর থেকে দেশে ফিরেই বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে হরতাল কর্মসূচি ঘোষণা, শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ নিয়ে বক্তব্য প্রদান ও হরতালের দোহাই দিয়ে বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারতের মহান রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সঙ্গে সাক্ষাৎ সূচি বাতিল ও সর্বশেষ সরকার পতনের একদফার আন্দোলনে পা বাড়ানোর নেপথ্যে সরকারের নীলনকশার নির্বাচনে পথ হাঁটার কারণই প্রধান বলে জানা যায়।

সূত্র জানায়, ভারত সফরের পর বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়াকে দলের থিংক ট্যাংকের কেউ কেউ নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন। সেদিন খালেদা জিয়া তাদের সাফ বলে দিয়েছিলেন, ভারত আমাকে যে সম্মান দিয়েছে, তার মর্যাদা আমাকে রাখতেই হবে। ভারত যেমন বাংলাদেশের বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে সম্মান-সমাদর দিতে কার্পণ্য করেনি, তেমনি তিনিও অকপটে বলেছিলেন, তাদের আতিথেয়তায় আমি মুগ্ধ ও অভিভূত। এমনকি শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের তারুণ্যের উচ্ছ্বাসকে সমর্থন জানিয়ে তার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত স্থায়ী কমিটি ঘোষণা দিয়েছিল, বিএনপি ক্ষমতায় এলেও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার অব্যাহত রাখবে। কিন্তু পরবর্তীতে দ্রুত দৃশ্যপট বদলে যেতে থাকে। বিএনপি নেত্রীর সিঙ্গাপুর সফর নিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম দেশে নাশকতা সৃষ্টি ও একটি বিদেশি শক্তির সঙ্গে বৈঠকের অভিযোগ আনেন। একদিকে সরকারের এই বক্তব্য, অন্যদিকে পুলিশ-জামায়াতের মুখোমুখি সহিংসতা ও সরকারের বিরোধী দল দমনের কঠোর নীতি বিএনপি নেতৃত্বকে প্রবল ঝাঁকুনি দেয়।

সূত্র আরো জানায়, সিঙ্গাপুর থেকে ফিরেই বিরোধী দলের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া দলের চাকাকে যেভাবে ঘুরিয়ে নিয়ে নিজের কঠোর অবস্থান পরিষ্কার করেছেন, তা ক্ষমতার রাজনীতির সর্বশেষ পাওয়া হিসাব-নিকাশ থেকেই করেছেন। নির্বাসিত ছেলেদের নামে মামলা, রায়, তাকে আদালতের বারান্দায় টেনে নেওয়া ও তার চলি্লশ বছরের বাড়ি থেকে উচ্ছেদের পরেও গণরায় নিয়ে পরবর্তী নির্বাচনে ফিরে আসার আশায় সব যন্ত্রণা সয়ে রাজনীতিতে হামাগুড়ি দিয়ে পথ চলছিলেন খালেদা জিয়া। এমনকি সংঘাতের রাজনীতিতে তৃতীয় পক্ষের আগমনের আশঙ্কাকেও আমলে নিয়েছিলেন রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণে। কিন্তু সিঙ্গাপুর সফরের আগে-পরেই বিরোধী দলের নেত্রী খালেদা জিয়া নিশ্চিত হয়ে যান যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব যতই সব দলের অংশগ্রহণে আগামী জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলুক না কেন, সরকারের তাতে কোনো সাড়া নেই। খালেদা জিয়ার ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, সিঙ্গাপুরে কারও সঙ্গে তাদের নেত্রীর কোনো আলাপ-আলোচনা হয়েছে কিনা তা জানা নেই। তবে খালেদা জিয়া নিশ্চিত হয়েছেন সরকার তাকে ও তার সন্তানদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করে বিএনপির একাংশকে নিয়ে নির্বাচন করার পথেই হাঁটছে।

বিএনপির নেতা-কর্মীদের জেল-মামলায় নাস্তানাবুদ করে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আমলে না নিয়ে তাদের অধীনেই নির্বাচন করে ১৪ দল আবার ক্ষমতায় ফিরে তাদের ভিশন-২১ পূরণের পথে হাঁটছে। অন্যদিকে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চকে তাদের ছায়া দিয়ে ভোটের রাজনীতির ফায়দা নিতে চায়। এমনি পরিস্থিতিতে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার নিজের এবং সন্তানদের ছাড়াও দলের ঐক্য আর অস্তিত্ব রক্ষা করে সরকারের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ ছাড়া সামনে কোনো পথ খোলা ছিল না। সূত্র জানায়, বর্তমান অবস্থান খালেদা জিয়াকে এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করালেও তিনি মনে করেন, সার্বিক পরিস্থিতিতে ভোটারদের পাল্লা যেমন তার দিকে, তেমনি তার দলও সুসংহত হয়েছে। রাজনীতির ময়দানে সরকার বনাম জামায়াতের লড়াইয়ে বিএনপি পর্দার আড়ালেই নয়, তিন নম্বর সারিতে চলে গিয়েছিল। খালেদা জিয়ার বর্তমান অবস্থান বিএনপিকেই সরকারের বিকল্প শক্তি হিসেবে রাজনীতিতে দৃশ্যমান করেছে। এ ছাড়া সরকার বিএনপিতে ভাঙন ধরানোর যে খেলাটি খেলেছিল বিএনপি নেত্রীর এ অবস্থান সেই পথও রুদ্ধ করে দিয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

ব্যবসায়ীদের তরফ থেকে চলমান রাজনৈতিক সহিংসতার মুখে দুই নেত্রীকে বা সরকার ও বিরোধী দলকে সংলাপে বসানো যায় কিনা এ নিয়ে গত শুক্রবার গুলশানের হোটেল ওয়েস্টইনের লবিতে এফবিসিসিআই’র বর্তমান সভাপতি ও সাবেক সভাপতিরা অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় বসেছিলেন। সেখানে ছিলেন বর্তমান সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ, সাবেক সভাপতি সালমান এফ রহমান, মীর নাসির হোসেন, আবদুল আউয়াল মিন্টু, ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুন ও একে আজাদ। তারাও সংলাপে বসানোর মতো কোনো পথ পাননি খোলামেলা আলোচনায়। সেখানে সরকার ও বিরোধী দলের মনোভাবের প্রকাশ ঘটেছে তাদের কথাবার্তায়। খালেদা জিয়ার ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, সাম্প্রতিককালের সহিংসতায় যে রক্তপাত ঘটেছে তাতে সংলাপের সম্ভাবনাও ক্ষীণ হয়ে এসেছে। তাই খালেদা জিয়া এখন একদফা অর্থাৎ সরকার পতনের মাধ্যমে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি আদায়ের পথ নিয়েছেন। খালেদা জিয়া মনে করেন, রাজপথই এখন সংকটের সমাধান।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close