স্বদেশ জুড়ে

সরকার বিরোধী আন্দোলেনের ডাক খালেদা জিয়ার

 

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি কয়েকটি ইসলামী দলের ডাকা হরতালের সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহতদের পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে সিঙ্গাইরের গোবিন্দল গ্রামে যান খালেদা জিয়া। নিহতদের পরিবারকে অর্থ সহায়তা দেয়ার পর সিঙ্গাইরের চারিগ্রামে শাহাদাত আলী খান সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জনসভায় বক্তব্য দেন তিনি।

সংলাপের জন্য সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ প্রত্যাশা করে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের প্রেস ব্রিফিংয়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরে জনসভায় খালেদা জিয়া ডাক দেন ১৮ ও ১৯ মার্চ হরতাল পালনের। তিনি বলেন সরকার পতনে আরো হরতাল-ঘেরাও কর্মসূচির দেয়া হবে। সরকারকে  ‘খুনি’ আখ্যা দিয়ে বলেন, “তাদের সঙ্গে আর কোনো কথা বলে লাভ নেই। হয় তাদের বিদায় নিতে হবে, নইলে আরো হরতাল-অবরোধ-ঘেরাও কর্মসূচি, সব কিছু দেয়া হবে। দুর্বার আন্দোলনের মাধ্যমে এই সরকারের বিদায় ঘটাতে হবে। বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, এদের (সরকার) বিদায়ের জন্য হয়ত আরো কিছু প্রাণহানি হবে। তারপরও সরকার পতনের জন্য আমাদের রাস্তায় নামতে হবে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে রাজনৈতিক সঙ্কট অবসানে বিভিন্ন মহল থেকে দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যে সংলাপের কথা বলা হচ্ছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শনিবার সকালে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, সরকার প্রধানকে সংলাপের আনুষ্ঠানিক বা লিখিতভাবে প্রস্তাব জানাতে হবে। এরপর দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামে আলোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। এরপর বিকালে এক সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেন, সংলাপের জন্য সরকার তৈরি, বিরোধী দলকে শর্ত বাদ দিয়ে আসতে হবে। যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে জামায়াতি তাণ্ডবের মধ্যে দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে রাজনৈতিক সংঘাত চরম আকার ধারণ করবে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে।

এর আগে পশ্চিম গোবিন্দল প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে একটি শোক সমাবেশও বক্তব্য রাখেন বিরোধীদলীয় নেতা। যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে জামায়াতি তাণ্ডবের ফলে সৃষ্ট সহিংসতায় প্রাণহানির ঘটনাকে ‘গণহত্যা’ বলে আখ্যায়িত করেন তিনি। এজন্য সরকারকে দায়ী করে খালেদা জিয়া বলেন, আগামীতে এই গণহত্যার জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনালে হবে। এক নম্বর ব্যক্তিকে (প্রধানমন্ত্রী) ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। তারা পুলিশ দিয়ে নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়েছে। এই পর্যন্ত ১৭০ জন মানুষ হত্যা হয়েছে। সরকারি হিসেবে, ওই সহিংসতায় নিহত হয় ৬৭ জন। এর মধ্যে সাত পুলিশ সদস্যও রয়েছেন। ওই তাণ্ডবে বিভিন্ন স্থানে মন্দির ও উপাসনালয়েও হামলা হয়। লোহাগড়ায় এক হিন্দুও নিহত হন।

সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার জন্য সরকারকে দায়ী করে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, “তারা হিন্দু মন্দিরে হামলা চালিয়ে প্রতিমা ভাংচুর করে বিরোধী দলের ওপর দোষ চাপাচ্ছে। এই সরকার একটি বিধর্মী সরকার। এই সরকারের আমলে কোনো ধর্মের মানুষ নিরাপদ নয়। সরকার ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলে, আসলে তারা ধর্মহীন সরকার। তারা মুসলমান কি না, সন্দেহ আছে। তারা কোনো ধর্মে বিশ্বাস করে না। গণজাগরণ আন্দোলনের সমালোচনা করে খালেদা জিয়া আবারো বলেন, শাহবাগীরা ধর্মদ্রোহী। সরকারের অপকর্ম ঢাকতে শাহবাগে এই আন্দোলন চলছে। সত্যিকার যুবক ও তরুণরা তাদের সঙ্গে নেই।

সরকারের অবস্থানের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “একদিকে বায়তুল মোকাররম মসজিদে শুক্রবার গেইট তালা দিয়ে রাখা হয়। অন্যদিকে পুলিশ শাহবাগে পাহারা বসিয়ে গণজমায়েত করতে দিচ্ছে। এছাড়াও বর্তমান বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে তিনি কঠোর সমালোচনা করেন তিনি।

ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল নিয়ে আতংক:

ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, “পুলিশের গুলিতে গণহত্যার পর এখন শিশু হত্যা করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব-উল আলম হানিফের কোম্পানি বিদেশ থেকে নিম্ন মানের ভিটামিন এ ক্যাপসুল নিয়ে এসেছে। এসব ক্যাপসুলের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন নেই। এই ক্যাপসুল খেয়ে অনেক শিশু অসুস্থ হয়ে গেছে। অনেকে মারা গেছে। তারা ট্যাবলেট খাইয়ে শিশু হত্যা করছে। সম্প্রতি ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ার পর শিশুমৃত্যুর গুজবে আতঙ্ক তৈরি হলে হাসপাতালে উৎকণ্ঠিত অভিভাবকদের ভিড় জমে। ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খেয়ে কোনো শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। তবে সরকারের এই গুজবের উৎস খুঁজতে কমিটি করেছে। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির থেকে এই গুজব ছড়ানো হয় বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।

মালয়েশিয়ার প্রস্তাব ভাঁওতাবাজি:

পদ্মা সেতুর নির্মাণে মালয়েশিয়ার প্রস্তাবকে ‘ভাওতাবাজি’ আখ্যায়িত করে বিরোধী নেতা বলেন, “সরকারের দুর্নীতির কারণে বিশ্ব ব্যাংক পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন বাতিল করেছে। এখন মালয়েশিয়ার প্রস্তাবের কথা বলা হচ্ছে। এটাও ভাঁওতাবাজি। এরকম নানা কথা বলে তারা সময় পার করবে। কিন্তু পদ্মা সেতু এই সরকার করতে পারবে না। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে একটি নয়, দুটি পদ্মা সেতু করবে। একটি মাওয়া দিয়ে অন্যটি আরিচা-দৌলতদিয়া দিয়ে।

ত্বকী হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার দাবি

নারায়ণগঞ্জের গণজাগরণ মঞ্চের উদ্যোক্তা ও নাগরিক আন্দোলনের সংগঠক রফিউর রাব্বির ছেলে তানভীর মোহাম্মদ ত্বকী হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান খালেদা জিয়া। খবরের কাগজে এসেছে, সিটি নির্বাচনের সময়ে সেলিনা হায়াৎ আইভীর পক্ষে ত্বকীর বাবা কাজ করেছে বলে ত্বকীকে নারায়ণগঞ্জের গডফাদার শামীম ওসমান হত্যা করেছে। অথচ তাকে পুলিশ এখনো গ্রেপ্তার করেনি। আমি অবিলম্বে ত্বকী হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার দাবি করছি। দেশে কোনো সরকার নেই। সরকারি দলের জন্য এক আইন। বিরোধী দলের জন্য ভিন্ন আইন চলছে। বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করছে না।

বিএনপি অফিসে পুলিশী হানা:

গত ১১ মার্চ নয়া পল্টনে পুলিশি অভিযানে দলীয় কার্যালয় ভাংচুর ও মূল্যবান কাগজপত্র-নগদ অর্থ লুটপাটের অভিযোগ তুলে এনিয়ে আদালতে মামলা না নেওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেন খালেদা। জনসভায় বক্তব্যে মানিকগঞ্জকে বিএনপির ‘ঘাঁটি’ আখ্যায়িত করে আগামী নির্বাচনে এই জেলার চারটি আসনই বিএনপি পাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

শামসুল ইসলাম খানের ছেলে মইনুল ইসলাম শান্ত, হারুনার রশীদ খান মুন্নুর মেয়ে আফরোজা খান রীতা এবং খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের ছেলেদের দিকে ‘খেয়াল’ রাখতে মানিকগঞ্জবাসীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি। এসময় প্রয়াত মহাসচিব দেলোয়ার হোসেনের ছেলে খোন্দকার আকবর হোসেন বাবলু, খোন্দকার আবদুল হামিদ ডাবলুও জনসভায় ছিলেন। সিঙ্গাইরের সাবেক সংসদ সদস্য মইনুল ইসলাম খান শান্তর সভাপতিত্বে জনসভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বরকত উল্লাহ বুলু, আফরোজা খান রীতা প্র্রমুখ।

এর আগে গোবিন্দলে বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান মোজাহারুল হক মহরের সভাপতিত্বে শোক সমাবেশে বক্তব্য রাখেন খেলাফত মজলিশের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ ইসহাক, ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ নেজামী, হারুনার রশীদ খান মুন্নু প্রমুখ। মানিকগঞ্জ সফরে খালেদার সঙ্গে ছিলেন মির্জা আব্বাস, সাদেক হোসেন খোকা, আবদুল্লাহ আল নোমান, সেলিমা রহমান, মাহবুব উদ্দিন খোকন, ফজলুল হক মিলন, নিতাই রায় চৌধুরী, সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, নুরে আরা সাফা, শিরিন সুলতানা প্রমুখ।

 

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close