স্বদেশ জুড়ে

বাংলাদেশে কপিরাইট আইন : সংজ্ঞা ও সমীক্ষা

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মুহম্মদ নূরুল হুদা: আজ ২৩ এপ্রিল ২০১৩ আন্তর্জাতিক গ্রন্থ ও কপিরাইট দিবস। এই উপলক্ষে বাংলাদেশ কপিরাইট আইন ও বিদ্যমান পরিস্থিতি নিয়ে এই রচনাটি প্রকাশ করা হলো।

সংজ্ঞা ও ব্যাখ্যা কপিরাইট কি? কপিরাইট মূলত দুটি শব্দের সম্মিলন। কপি এবং রাইট। কপি অর্থ নকল বা প্রতিলিপি বা অনুলিপি বা অনুকৃতি বা অনুকরণ বা অনুসৃতি ইত্যাদি। আর রাইট হচ্ছে অধিকার বা স্বত্ব বা সত্য বা ন্যায় ইত্যাদি। সহজ ভাষায় বলতে পারি, কপিরাইট হচ্ছে নকল করার অধিকার বা নকলাধিকার। যিনি নতুন কিছু সৃষ্টি করেন, তিনি তাঁর সেই সৃষ্টি অন্যকে জানাতে চান বা অন্যকে ব্যবহার করতে দিতে চান। তখন সেই সৃষ্টিকর্মের আরো অনুলিপি বা নকল বা কপি প্রয়োজন হয়। এই ধরনের কপি বা অনুলিপি বা নকল করার অধিকার রাখেন কেবল সেই সৃষ্টিকর্মের স্রষ্টা। আর রাখেন তিনি, যাকে সেই শিল্পস্রষ্টা বৈধ অনুমতি দিয়েছেন। আমাদের দেশে গ্রন্থের ক্ষেত্রেই এই ধারণাটি সমধিক প্রচলিত। বাংলায় কপিরাইটের বহুল প্রচলিত পারিভাষিক অর্থ করা হয়েছে ‘মেধাস্বত্ব’। বাংলা একাডেমী ইংলিশ-বেঙ্গলি ডিকশনারিতেও কপিরাইটের অর্থ ‘মেধাস্বত্ব’; ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে,  ‘কোনো লেখক বা শিল্পী কর্তৃক তাঁর সৃষ্টিকর্মের উপর একটি নির্দিষ্ট সময়ে স্থায়ী অধিকার।’

কপিরাইটের মৌলিক তাৎপর্যের সঙ্গে এই অর্থের কোনো বিরোধ না থাকলেও কপিরাইটের যে ক্রমসম্প্রসারমান ক্ষেত্র ও পরিধি, তা এই ব্যাখ্যায় পূর্ণ-প্রতিফলিত নয়। এটি বরং ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি-র বাংলা পারিভাষিক শব্দ হিসেবে অধিক সঙ্গতিপূর্ণ। কপিরাইট ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টির একটি অংশ, অন্য অংশ ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল রাইট, যার মধ্যে রয়েছে প্যাটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্ক। তাই কপিরাইটের তাৎপর্য আলাদাভাবে অনুধাবনযোগ্য।

কপিরাইট কেবল লেখক বা শিল্পীর বিষয় নয়, এটি যে কোনো সৃষ্টিশীল মানুষের সৃষ্টিস্বত্বের চর্চাক্ষেত্র। কেবল বৃহত্তর জনসাধারণ নয়, কপিরাইট সম্পর্কে আমাদের শিক্ষিত সমাজের ধারণাও যে খুব গোছালো ও সময়ানুগ নয়, এই পরিভাষা ও ব্যাখ্যা তার একটি সহজ উদাহরণ।

আমি প্রসঙ্গটি উত্থাপন করছি এ-কারণে যে, কপিরাইট-লঙ্ঘনসহ এ-সম্পর্কিত যাবতীয় ভুল-বোঝাবুঝি, অব্যবস্থাপনা ও প্রয়োগহীনতার মূল কারণ কপিরাইট সম্পর্কে আমাদের দেশে এর স্রষ্টা, স্বত্বাধিকারী, মধ্যস্বত্বভোগী, ব্যবহারকারী, ব্যক্তি ও সামষ্টিক পর্যায়ে ব্যবহারকারী, শাসক, প্রশাসক, আমলা, বুদ্ধিজীবীসহ বিভিন্ন মহলে ও পর্যায়ে প্রার্থিত ও আবশ্যকীয় সচেতনতার অভাব। বলাবাহুল্য, সেইসঙ্গে যুক্ত হয়েছে কালেকটিভ ম্যানেজমেন্ট বা যৌথ ব্যবস্থাপনার অভাব এবং সরকারী-বেসরকারী পর্যায়ে প্রশিক্ষিত জনবল, অবকাঠামো ও প্রযুক্তির অপ্রতুলতা।

সচেতনতা ও কাম্যতা ধারণাটি এদেশে নতুন না হলেও কপিরাইটের কাম্যতা, এ-সম্পর্কিত বোধ, সচেতনতা ও প্রয়োগ ইতোপূর্বে তেমন ব্যাপক ছিল না। ধারণাটি বৃটিশ আমল থেকেই শুরু, আর এ-সম্পর্কিত আইনও তখন থেকে প্রচলিত। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর প্যাটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্ক আইনের পাশাপাশি কপিরাইট আইন বলবৎ করা হয়েছে। এই আইনের কাঠামো ও ধারাগুলো অধিকাংশই পূর্বতন আইনের অনুরূপ। দেশের আভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ২০০০ সালে এই আইনটি যুগোপযোগী করে ঢেলে সাজানো হয়।

অতঃপর ২০০৫ সালে আইনটি আবার সংশোধিত হয়েছে। অর্থাৎ আইনটি যুগোপযোগী করার জন্য সরকার গত এক দশকে দু-দুবার উদ্যোগ নিয়েছে। এতদসত্বেও এই আইনে এখনো কিছু ফাঁকফোঁকর আছে। তবে আইনটির সদর্থক প্রয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগ ও বেসরকারি তৎপরতা কখনো উল্লেখযোগ্য ছিল না। এর মূল কারণ যারা কপিরাইটের স্বত্বাধিকারী তাদের মধ্যে সচেতনতার অভাব। উপরন্তু মেধাস্বত্বাধিকারীগণ তাদের প্রাপ্য আদায়ের জন্য ব্যক্তিক প্রচেষ্টার বাইরে কোনো সমন্বিত প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ গ্রহণ করেননি। তাই বাংলাদেশে কপিরাইট আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০০৫) বলবৎ থাকা সত্বেও নির্বিচারে এই আইনের লঙ্ঘন, অর্থাৎ পাইরেসি হয়েছে ও হচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে কপিরাইটের বৈধ স্বত্বাধিকারীর অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এটি কেবল সৃষ্টিশীলতার পরিপন্থীই নয়, বরং দেশে বিদ্যমান আইন ও মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এর ফলে দেশে ও বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বিশেষ অধিকার আমাদের বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন করতে হবে যে, কপিরাইট হচ্ছে লেখক, চিত্রকর, সঙ্গীতশিল্পী বা অনুরূপ অন্য কোনো শিল্প-স্রষ্টা ও পারফরমারের অধিকার। শিল্প-স্রষ্টা ও পারফরমার একক বা যৌথও হতে পারেন। অধিকার বলতে শিল্প-স্রষ্টা বা পারফরমার কর্তৃক নতুন কিছু সৃষ্টি করার অধিকার, সেই সৃষ্টি-কর্মের কপি বা অনুলিপি তৈরি করার অধিকার এবং সেই অনুলিপির ব্যবসায়িক বা অব্যবসায়িক সকল প্রকার ব্যবহার থেকে প্রাপ্ত সুফল ভোগ করার জন্মগত অধিকার বোঝায়। এই অধিকারের পরিপ্রেক্ষিত নানাবিধ ঃ নৈতিক, নান্দনিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, বিদ্যমান আইনে কপিারাইটের মেয়াদ স্রষ্টার জীবৎকাল ও তার মৃত্যুর পর ষাট বছর। এর পর তা মানবজাতির সাধারণ স¤পদে পরিণত হয়ে যায়। তার আগে এই অধিকার একান্তই ব্যক্তি বা যৌথ-স্রষ্টার।

মেয়াদকালে শিল্প-স্রষ্টা ও পারফরমারের বৈধ অনুমতি ছাড়া তাঁর বা তাঁদের কর্মের অনুলিপি ও ব্যবহার আইনত দ-নীয় অপরাধ। অবৈধ নকলকারী, ব্যবসায়ী, ব্যবহারকারী ও তাদের সহযোগীরা আইনের চোখে অপরাধী। বাংলাদেশে এ অপরাধের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে কতকটা আমাদের অনেকের জ্ঞাতসারেই।

কপিরাইটের আওতা বিদ্যমান আইনের আওতায় যে সব কর্মের ক্ষেত্রে কপিরাইট বা মেধাস্বত্বের সুরক্ষা (প্রটেকশন) প্রদান করা হয়েছে, সেগুলো নিম্নরূপ : সাহিত্যকর্ম, নাট্য ও সঙ্গীতকর্ম, শিল্পকর্ম, স্থাপত্য কর্ম, চিত্রকর্ম, আলোকচিত্র, চলচ্চিত্র বিষয়ক কর্ম, রেকর্ডকর্ম, অডিও-ভিডিও ক্যাসেট, বেতার ও টেলিভিশন তথা মিডিয়া সম্প্রচার, ক্যাবল নেট-ওয়ার্কস, কম্পিউটার সফটওয়ার ও ওয়েবসাইট সংক্রান্ত কর্ম। অধিকারের সুস্পষ্ট তিনটি দিক : অধিকারের স্বীকৃতি, সুরক্ষা ও আদায়। একটি কর্ম সৃষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা জন্মগত অধিকারের ভিত্তিতে স্বীকৃত হয়ে যায়। স্রষ্টা বা প্রণেতা তা যথাসময়ে কপিরাইট অফিসে বা সমিতিতে রেজিস্ট্রেশন বা নিবন্ধন করতে পারেন। স্বীকৃতির জন্য নিবন্ধন বাধ্যতামূলক নয়, তবে কোনো বিষয়ে প্রতিকার লাভের জন্য অত্যাবশ্যকীয়। বিদ্যমান আইনের (২০০০) দশম অধ্যায়ে এ বিষয়টি পদ্ধতিগতভাবে বর্ণিত হয়েছে। সুরক্ষা বা প্রটেকশনের জন্য প্রথম শর্ত ইউজার অ্যাগ্রিমেন্ট বা স্বত্ব-নিয়োগের জন্য বিধিমোতাবেক লিখিত চুক্তি সম্পাদন।

কপিরাইট আইনের (২০০০) ১৯ নং ধারায় বলা হয়েছে, ‘(১) কোন কর্মের কপিরাইটের স্বত্ব নিয়োগ বৈধ হইবে না, যদি  তাহার স্বত্ব প্রদানকারী বা তাহার নিকট যথাযথ ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধির দ্বারা স্বাক্ষরিত না হয়।’

অর্থাৎ চুক্তিটি লিখিত ও স্বাক্ষরিত হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। এই ধারার ৭টি উপধারায় চুক্তিসম্পাদনের নিয়ম ও শর্তাবলী উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তফসিলে চুক্তির কোনো নমুনা দেওয়া হয়নি। তাই শর্ত মোতাবেক চুক্তিসম্পাদনকারীরা নিজ নিজ কাঠামোতে চুক্তি প্রণয়ন, সম্পাদন ও স্বাক্ষর করতে পারেন। অবশ্য পালনীয় শর্তের মধ্যে রয়্যালটি পরিশোধের ধরন ও চুক্তির মেয়াদ উল্লেখ থাকতে হবে। যদি চুক্তিতে মেয়াদ উল্লেখ না থাকে, তাহলে স্বত্ব-নিয়োগের পাঁচ বছর পর মেয়াদ অবসিত হবে (ধারা ১৯-৫)। একইভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত স্বত্বাধিকারী যদি চুক্তির কোনো শর্ত এক বছর পর্যন্ত পালন না করেন, তাহলে চুক্তিটি বাতিল হয়ে যেতে পারে (ধারা ১৯-৩)। তাই প্রতিটি ক্ষেত্রে চুক্তি সম্পাদন ও পালনে উভয় পক্ষকে সর্বাধিক সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। অধিকার আদায়ের জন্য সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ে সমন্বিত ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

প্রতিটি ক্ষেত্রে বৈধ স্বত্বাধিকারীরা কপিরাইট সোসাইটি গঠন করে কপিরাইট অফিস থেকে নিবন্ধন গ্রহণ করতে পারেন। একই বিষয়ে দুটি কপিরাইট সোসাইটি নিবন্ধন করা যাবে না। তবে সব বিষয়ে গঠিত সোসাইটি নিয়ে বাংলাদেশ-ভিত্তিক একটি সমন্বয়কারী সোসাইটি গঠিত হতে পারে। উন্নত দেশগুলোতে এই উভয় ধরনের সোসাইটি আছে। এরাই লেখক, শিল্পী, পারফরমারসহ সকল স্বত্বাধিকারীর স্বত্ব  দেখাশোনা করে থাকে। বিদ্যমান আইনের (২০০০) অষ্টম অধ্যায়ে এবং ২০০৬ সালের কপিরাইট বিধির পঞ্চম অধ্যায়ে কপিরাইট সমিতি গঠন, নিবন্ধন ও পরিচালনার বিষয়াদি বর্ণিত হয়েছে।

পাইরেসি বা তাস্কর্য পাইরেসি অর্থ তাস্কর্য। সোজা কথায় তস্কর বৃত্তি, যা স্পষ্টত মেধাস্বত্ব লঙ্ঘন। এর উদাহরণ বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে দেওয়া যায়। যেমন, বৈধ চুক্তিবিহীন গ্রন্থপ্রকাশ থেকে শুরু করে পুরো গ্রন্থের অননুমোদিত ফটোকপিকরণ, নকল সিডি, নকল সফটওয়ার কিংবা মোবাইল ফোনের রিংটোনে সঙ্গীতের যথেচ্ছ ব্যবহার ইত্যাদি। অবৈধ নকল বলতে হুবহু, পুরোপরি বা আংশিক নকল বোঝায়। আংশিক নকল বলতে যে কর্মে কপিরাইট বিদ্যমান আছে তেমন কোনো কর্মের অনুমতিহীন ব্যবহার বোঝায়। উদাহরণ স্বরূপ, জেমস ওয়াটের ফর্মূলার সঙ্গে নিজস্ব ফর্মূলার সমন্বয় ঘটানো যেতে পারে, কেননা বর্তমানে ওয়াটের প্রদত্ত জ্ঞান কপিরাইটমুক্ত সর্বজনীন জ্ঞান। কিন্তু সেই ফর্মূলার সঙ্গে কোনো জীবিত বা কপিরাইটের অধিকারী উদ্ভাবকের ফর্মূলা তাঁর বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা যাবে না।

শেক্সপীয়রের রচনা প্রকাশে বাধা নেই,  কিন্তু তাঁর উপর রচিত কোনো রচনা প্রকাশ করতে হলে সংশ্লিষ্ট গবেষকের সঙ্গে চুক্তি করতে হবে। কম্পিউটারের জন্য নতুন কোনো সফটওয়্যার বা কী-বোর্ডে কপিরাইট বিদ্যমান আছে এমন কোনো সফটওয়্যার বা কী-বোর্ডের সনাক্তযোগ্য প্রতিফলন থাকলে তার জন্যে পূর্বতন স্বত্বাধিকারীর বৈধ অনুমতি নিতে হবে। সনাক্তযোগ্য প্রতিফলন সম্পর্কিত বিরোধ কপিরাইট বোর্ড ও আদালতে মীমাংসা করা যাবে। প্রতিকারের বিষয়টি চতুর্দশ অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে পাইরেসি বা লঙ্ঘন-জনিত অপরাধের জন্য বিভিন্ন মেয়াদের জেল, অর্থদ- ও যথোপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা আছে। বিদ্যমান আইনে এই ধরনের লঙ্ঘনজনিত অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি পাঁচ বছর কারাদ- ও পাঁচ লক্ষ টাকা জরিমানা। একজন সাব-ইন্সপেক্টর বা তদূর্ধ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তা পরোয়ানা ব্যতিরেকে লঙ্ঘনকারীকে গ্রেপ্তার এবং তার যাবতীয় যন্ত্রপাতি ও মালামাল জব্দ করতে পারেন। কপিরাইট আইনের ‘অপরাধ ও শাস্তি’ শীর্ষক পঞ্চদশ অধ্যায়ে এ-সম্পর্কে বিস্তৃত তথ্য আছে। এই আইন বাংলাদেশ ছাড়াও আন্তর্জাতিক চুক্তি ও বার্ণ কনভেনশনভুক্ত সকল দেশের কর্ম, স্বত্বাধিকারী ও অন্যান্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কপিরাইট অফিস থেকে প্রকাশিত ‘এশিয়ান কপিরাইট হ্যান্ডবুকে’ও এ-সম্পর্কে আলোচনা আছে। আরো সহজবোধ্য ভাষায় ও সংক্ষিপ্ত কলেবরে এই আইনের সারাংশ প্রণয়ন ও প্রকাশ করে সংশ্লিষ্ট সকলের মধ্যে প্রচার করা যেতে পারে। লেখক, শিল্পী ও সকল ক্ষেত্রের স্বত্বাধিকারীরা কপিরাইট সমিতি গঠনের পাশাপাশি সেমিনার, পাঠচক্র ইত্যাদির মাধ্যমে স্বপ্রশিক্ষণ ত্বরান্বিত করতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রশিক্ষণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের পাঠক্রমে কপিরাইট অন্তর্ভুক্ত করা জরুরী। সবচেয়ে বেশি জরুরি, স্টেকহোল্ডার বা অংশীজনদের উপলব্ধি ও প্রাপ্য আদায়ের জন্য কার্যকরী উদ্যোগ। তা না হলে কপিরাইট প্রয়োগের দিকটি কেবল বিলম্বিত হতে থাকবে।

কপিরাইট আইন : প্রয়োগ ও অনুশীলন আসলে কপিরাইট প্রয়োগের ক্ষেত্রটি যেমন জটিল, তেমনি এ সম্পর্কিত জ্ঞানার্জন অত্যাবশ্যকীয়। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যাচ্ছে যা কপিরাইটের স্বত্বাধিকারী, ব্যবহারকারী, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সকলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যেমন, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অন্তর্গত কপিরাইট অফিসের উদ্যোগে ১৩ই সেপ্টেম্বর ২০০৮ শনিবার বিয়াম ফাউণ্ডেশনে ‘কপিরাইট সুরক্ষা ও পাইরেসি রোধে টাস্কফোর্স’ শীর্ষক সেমিনারের আয়োজন; কিংবা, ১৫ই সেপ্টেম্বর ২০০৮ টাস্কফোর্সের পক্ষ থেকে একই বিষয়ে একটি ‘সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি’ প্রচার। সেমিনারে লেখক, প্রকাশক, শিল্পী, কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ, সরকারী কর্মকর্তা, আইনজ্ঞ, প্রযোজক, সাংবাদিক সহ বিভিন্ন পেশার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগণ উপস্থিত ছিলেন। প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত তৎকালীন মাননীয় উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী।

সংস্কৃতি সচিব জনাব শরফুল আলমের সভাপতিত্বে মূল আলোচক হিসেবে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপনা করেন বর্তমান লেখক, নির্ধারিত আলোচনায় অংশ নেন প্রবীণ প্রকাশক মহিউদ্দিন আহমদ, সফটওয়ার বিশেষজ্ঞ মোস্তফা জব্বার ও বিশিষ্ট শিল্পী কুমার বিশ্বজিৎ। স্বাগত ভাষণ দেন টাস্কফোর্সের সভাপতি মুনিরুল ইসলাম (উপসচিব), ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন খান এবং তাৎক্ষণিকভাবে প্রাণবন্ত আলোচনায় অংশ নেন বেশ কয়েকজন লেখক, শিল্পী, প্রকাশক ও প্রযোজক। সেমিনারে আরো উপস্থিত ছিলেন কপিরাইট বোর্ডের চেয়ারম্যান সরকারের অতিরিক্ত সচিব কাজী আখতার হোসেন ও কপিরাইট রেজিস্ট্রার এমএ শাহ মাহমুদুল হাসান। সরকারী ও বেসরকারী ব্যক্তিদের এই সচেতন ও সক্রিয় উপস্থিতিই প্রমাণ করে বিষয়টি নিয়ে সকলেই ভাবিত ও উদ্বিগ্ন।

জানা গেছে, মোবাইল ফোনের রিংটোনে ও ওয়েলকামটোনে সঙ্গীতের ব্যবহার ও তজ্জাত আয়ের উপকার-বণ্টন নিয়ে বিভিন্ন  পক্ষের মধ্যে সাময়িক মতানৈক্য দেখা দিয়েছে। সবাই জানতে চায়, কারা এর বৈধ মালিক বা স্বত্বাধিকারী।

সাধারণ উত্তর যিনি কোনো কর্মের স্রষ্টা তিনিই মালিক বা স্বত্বাধিকারী। বাংলাদেশে বর্তমানে বলবৎ কপিরাইট আইন (২০০০ ও সংশোধিত ২০০৫) অনুযায়ী ‘এই আইনের বিধানাবলী সাপেক্ষে, কোন কর্মের প্রণেতা ঐ কর্মের কপিরাইটের প্রথম স্বত্বাধিকারী হইবেন ঃ’ (অধ্যায়-৪, ধারা ১৭)। আবার প্রণেতা বলতে বোঝানো হয়েছে ‘(ক) সাহিত্য বা নাট্যকর্মের ক্ষেত্রে, কর্মটির গ্রন্থকার; (খ) সঙ্গীত বিষয়ক কর্মের ক্ষেত্রে, উহার সুরকার বা রচয়িতা; (গ) ফটোগ্রাফ ব্যতীত অন্য কোন শিল্পসুলভ কর্মের ক্ষেত্রে, উহার নির্মাতা; (ঘ) ফটোগ্রাফের ক্ষেত্রে, উহার চিত্রগাহক; (ঙ) চলচ্চিত্র অথবা শব্দ রেকর্ডিং এর ক্ষেত্রে, উহার প্রযোজক; (চ) কম্পিউটারের মাধ্যমে সৃষ্ট সাহিত্য, নাট্য, সঙ্গীত বা শিল্প সুলভ কর্মের ক্ষেত্রে কর্মটির সৃষ্টিকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান।’ (ধারা ২, দফা ২৪)। সংশ্লিষ্ট সকলের জন্যে এই বিধির আরো সহজ ও আইনানুগ ব্যাখ্যা প্রয়োজন। বর্তমানে মোবাইল ফোনের জন্য যে সব প্রতিষ্ঠান কনটেন্ট বা বিষয় সরবরাহ করছে, তারা কনটেন্ট প্রভাইডার হিসেবে পরিচিত।

আর প্রণেতা হচ্ছেন কনটেন্ট ক্রিয়েটর বা স্রষ্টা। এদের সম্পর্কে কোনো সরাসরি ব্যাখ্যা বর্তমান আইনে নেই। তবে বিদ্যমান আইনের বিধান অনুযায়ী (ধারা ১৯-১) প্রণেতার (যেমন কনটেন্ট ক্রিয়েটর) কাছ থেকে বৈধ ও লিখিত চুক্তিভিত্তিক স্বত্বগ্রহণ ছাড়া কেউ (যেমন কনটেন্ট প্রভাইডার) কোন সম্প্রচারকারী বা ব্যবহারকারীর কাছে কর্মটি প্রচারের অনুমতি প্রদান বা তা থেকে কোন আর্থিক বা অন্যরকম উপকার (বেনিফিট) গ্রহণ করতে পারবে না।

জানা গেছে, মোবাইল কোম্পানীগুলো জনপ্রিয় হওয়ার শুরু থেকেই বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি কনটেন্ট প্রভাইডার প্রতিষ্ঠান কাজ করে যাচ্ছে। কোন কোন প্রতিষ্ঠান শিল্পী ও সুরকারদের কাছ থেকে একচেটিয়া স্বত্ব কিংবা মেয়াদভিত্তিক স্বত্ব গ্রহণ করেছে। এখন এসব চুক্তি বা ব্যবস্থাসমূহ কতখানি বৈধ, প্রয়োগযোগ্য ও আইনসম্মত, তা যাচাই করা অপরিহার্য।

কোন কোন প্রণেতা মনে করছেন তাদের সারল্য ও অজ্ঞতার সুযোগে এমন কোন চুক্তিও হয়ে থাকতে পারে, যা তাদের স্বার্থের পরিপন্থী। গত ১৩ই সেপ্টেম্বরের সেমিনারে এসব বিষয় ও দ্বন্দ্ব সরাসরি প্রতিফলিত হয়েছে। গ্রন্থের ক্ষেত্রে পাইরেসি মোটামুটি বহুলপরিচিত বিষয়। তারই পাশাপাশি চলচ্চিত্র, সাউণ্ডরেকর্ডিং ও সফটওয়ার পাইরেসিও বিশদভাবে আলোচিত হয়েছে। তবে এসব ছাড়িয়ে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে অধিকার আদায়ের জন্য সামষ্টিক ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব। একজন ব্যক্তিপ্রণেতা তার কর্মের জন্য চুক্তি করতে পারেন, কিন্তু তজ্জাত উপকার আদায় সর্বক্ষেত্রে তার একার পক্ষে খুব সহজ কাজ নয়। আমাদের মতো দেশে তো নয়ই, বরং উন্নত বিশ্বেও এটি অসম্ভব প্রতিভাত হয়েছে। তাই কপিরাইট আইন প্রণয়নেরও আগে অধিকার আদায়ের জন্য সামষ্টিক ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। এই সামষ্টিক উদ্যোগের আইনসম্মত আধুনিক পরিভাষা কপিরাইট সোসাইটি বা ‘কপিরাইট সমিতি’ (অধ্যায়-৮, ধারা ৪১, ৪২, ৪৩, ৪৪, ৪৫, ৪৬, ৪৭ এবং কপিরাইট বিধিমালা, ২০০৬, অধ্যায়-৫)। বিভিন্ন ক্ষেত্রের প্রণেতা বা স্বত্বাধিকারীরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে এই সমিতি গঠন করতে পারেন। একটি ক্ষেত্রে একাধিক সমিতি সরকার কর্তৃক গ্রাহ্য ও নিবন্ধিত হবে না। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বর্তমানে প্রচলিত কপিরাইট আইনের আšতর্জাতিক উৎস যে বার্ণ কনভেনশন, তা প্রণীত হয়েছিলো ১৮৮৬ সালে। অথচ তারও পঁচানব্বই বছর আগে ১৭৯১ সালে গঠিত হয়েছিলো কালেক্টিভ সোসাইটি ফর ফ্রেন্চ কম্পোজারস।

তারও আগে ১৭০৯ সালে ব্রিটেনে ধারণাটি আইনানুগ ভিত্তি লাভ করে। সেই থেকে বার্ণ কনভেনশন জারি হওয়ার পূর্বের ইতিহাস ইউরোপ-অস্ট্রেলিয়া-আমেরিকায় মূলত প্রণেতাদের অধিকার আদায়ের সামষ্টিক সংগ্রাম ও উদ্যোগের ইতিহাস। দেরীতে হলেও আমরা এই উদ্যোগে শরীক হচ্ছি, এটি একটি শুভ সূচনা। তবে তার জন্যে প্রয়োজন সমিতি গঠনের পদ্ধতিগত জ্ঞান।

কপিরাইট সমিতি স্বীকার্য যে, কপিরাইট সমিতির ধারণাও এদেশে একবারে নতুন নয়। তবে বাস্তবায়নের ঘটনাটি একেবারেই নতুন। ১৯৬২ সনের কপিরাইট অধ্যাদেশে এই সমিতি পারফর্মিং রাইটস সোসাইটি নামে পরিচিত ছিল। বাংলাদেশে আজো এ-ধরনের কোনো সমিতি পূর্ণাঙ্গভাবে গঠিত ও নিবন্ধিত হয়নি। বর্তমানে মোবাইল ফোন, রেডিও-টিভি ও অন্যান্য মিডিয়ায় সঙ্গীত ও প্রচারযোগ্য বিভিন্ন বিমূর্ত শৈল্পিক সৃষ্টির ব্যবসায়িক মূল্য বেড়ে যাওয়ায় প্রণেতা ও স্বত্বাধিকারীরা এ-সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠেছেন। ফলে সামষ্টিক উদ্যোগ হিসেবে কপিরাইট সোসাইটি অপরিহার্য হয়ে পডেছে। আইনের বিধান অনুযায়ী বিভিন্ন ক্ষেত্রের কপিরাইট স্বত্বধিকারীরা অধিকার আদায়ের জন্য নিজ নিজ ক্ষেত্রে কপিরাইট সোসাইটি গঠন করতে পারেন। কপিরাইট আইন (২০০০) ও বিধিতে (২০০৬) এ-সম্পর্কিত দিকনির্দেশনা আছে। তবে কিভাবে এই সমিতি গঠন করা যায় সে সম্পর্কে অনেক বিশেষজ্ঞও সংশয়মুক্ত নন। যে কোনো ক্ষেত্রে একটি সমিতি গঠিত ও নিবন্ধিত হওয়ার পর বিষয়টি সকলের কাছে আরো খোলাসা হয়ে যাবে। মূল আইনের ধারাসমূহে (৪১-৪৭) কপিরাইট সমিতির নিবন্ধন (৪১), কপিরাইট সমিতি কর্তৃক মালিকদের অধিকার নির্বাহ (৪২), কপিরাইট সমিতি কর্তৃক পারিশ্রমিক প্রদান (৪৩), কপিরাইট সমিতির উপর কপিরাইট মালিকদের নিয়ন্ত্রণ (৪৪), রিটার্ণ ও প্রতিবেদন (৪৫), হিসাব এবং নিরীক্ষা (৪৬) ও অব্যাহতি (৪৭) ইত্যাদি বিষয়ে যা বলা হয়েছে, কপিরাইট বিধি ২০০৬-তে তা আরো বিস্তৃত ও সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। বিধিতে কপিরাইট সমিতি নিবন্ধনের জন্য একটি নির্ধারিত আবেদন ছক (ফরম-৮) ছাডাও মোট ১৩টি ধারায় (১৪-১৬) কপিরাইট সমিতির কার্যপ্রণালী বিশদভাবে অলোচিত । যেমন, অধিকারের ক্ষমতার্পণ (১৫), অধিকারের ক্ষমতা প্রত্যাহার (১৬), লাইসেন্স প্রদান, ফি সংগ্রহ ও এইরূপ ফি বণ্টনের শর্ত (১৭), সমিতি কর্র্তৃক রেকর্ড সংরক্ষণ (১৮), অডিট ও হিসাব সংরক্ষণ (১৯), বার্ষিক সাধারণ সভা (২০), রেজিস্ট্রারের নিকট সমিতির হিসাব (২১), ট্যারিফ ও বণ্টন ব্যবস্থা (২২), সমিতির সাধারণ সভা (২৩), তদন্ত প্রক্রিয়া (২৪), নিবন্ধন স্থগিত ও প্রশাসনিক নিয়োগ (২৫) ইত্যাদি। আইনে যে সব বিষয় উল্লেখিত ছিল, বিধিতে তা আরো স্পষ্ট করা হয়েছে। তবে এসব বিষয়ে আরো সহজ ব্যাখ্যা দরকার। আপাতত কপিরাইটের সৃষ্টি ও তার বৈধ উপকার-বণ্টন পর্যন্ত চারটি ধাপ সনাক্ত করা যায়। যেমন (ক) প্রণেতা বা তার বৈধ স্বত্বাধিকারী, (খ) প্রণেতা বা বৈধ স্বত্বাধিকারীদের সমন্বয়ে কপিরাইট সোসাইটি, (গ) নিবন্ধিত কপিরাইট সোসাইটির কাছ থেকে ব্যবহারের জন্য লাইসেন্স গ্রহীতা (কপিরাইট সোসাইটি না থাকলে সরাসরি প্রণেতা বা বৈধ স্বত্বাধিকারীর কাছ থেকে এই লাইসেন্স নিতে হবে) এবং (ঘ) ব্যবহারকারী। সহজেই অনুমেয়, (খ)-ধাপ অর্থাৎ কপিরাইট সমিতি না থাকলেও ব্যক্তি-স্বত্বাধিকারীর সাময়িক অসুবিধা নেই, কিন্তু বিকশিত বা ক্রম-বিকশিত কপিরাইট ব্যবস্থায় এটি অপরিহার্য বলে বিবেচিত হবে। সুবোধ্য ব্যাপার এই যে, একজন সৃষ্টিশীল ব্যক্তি যদি সর্বক্ষণ তার সৃষ্টির পণ্যমূল্য সংগ্রহে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে এক পর্যায়ে তাঁর সৃষ্টিপ্রেরণা বাধাগ্রস্ত, এমনকি রহিত হয়ে যেতে পারে। বিদ্যমান আইনে কপিরাইট সমিতি গঠনের মূল উদ্দেশ্য ‘কপিরাইটের দ্বারা সংরক্ষিত যে কোন ধরনের কর্মের ক্ষেত্রে লাইসেন্স ইস্যু বা মঞ্জুর’ করা এবং সমিতিভুক্ত স্বত্বাধিকারীদের কপিরাইট সম্পর্কিত তাবৎ স্বার্থ প্রত্যক্ষভাবে সুরক্ষা করা। যেহেতু একটি ক্ষেত্রে একাধিক সমিতি নিবন্ধনযোগ্য নয়, সেহেতু একই ক্ষেত্রের যে সব মালিক বা স্বত্বাধিকারী কপিরাইট সমিতির সদস্য নন, পরোক্ষভাবে বা অনুরুদ্ধ হয়ে তাদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিও নিবন্ধিত কপিরাইট সমিতির উপর বর্তায়। প্রাপ্ত আয় থেকে পরিচালনা পর্ষদের সম্মতিতে সকল স্বত্বাধিকারীর জন্য একটি সাধারণ কল্যাণ তহবিল গঠনও এই সমিতির একটি মুখ্য উদ্দেশ্য হতে পারে।

উল্লেখ্য, যেকোনো অসদস্য-স্বত্বাধিকারী নির্দিষ্ট ফরমে আবেদন করে সমিতির সদস্য পদ গ্রহণ বা সদস্য-স্বত্বাধিকারী তার সদস্যপদ প্রত্যাহার করতে পারেন। কপিরাইট সমিতি গঠন করতে হলে প্রাথমিক পর্যায়ে ‘তিন বা ততোধিক কপিরাইট স্বত্বাধিকারী’ প্রয়োজন হবে। প্রস্তাবিত কপিরাইট সমিতির একটি সঙ্ঘ-স্মারক ও সঙ্ঘবিধি থাকতে হবে। সঙ্ঘ-স্মারকে সমিতির নাম, নিবন্ধিত অফিসের ঠিকানা, উদ্দেশ্যাবলী (প্রধান অপ্রধান সকল বিষয়ের বর্ণনা থাকা বিধেয়), কর্মপরিধি ও ভৌগোলিক এলাকা (জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে), আগ্রহী স্বত্বাধিকারীদের নাম, ঠিকানা ও স্বাক্ষর থাকতে হবে। সঙ্ঘবিধিতে সমিতি পরিচালনার তাবৎ নিয়মকানুন যেমন প্রতিষ্ঠানের ধরন (যথা, সেবামূলক ও লাভালাভহীন), সদস্যদের মাসিক, বার্ষিক বা এককালীন চাঁদার হার, প্রশাসনিক ব্যয় নির্বাহের জন্য সংগৃহীত ফি থেকে অনধিক ২০% কর্তন, পরিচালনা পর্ষদ গঠন ও তাদের কর্মপদ্ধতি, নির্বাচন, সরকারি মনোনয়ন,  সমিতি কর্তৃক রেকর্ড সংরক্ষণকল্পে ‘স্বত্বাধিকারী রেজিস্টার’, ‘চুক্তি রেজিস্টার’, ‘ফি রেজিস্টার’ ও ‘অর্থ প্রদান রেজিস্টার’ যথাযথভাবে সংরক্ষণ, বার্ষিক সাধারণ সভা, মাসিক সভা, জরুরী সভা, ট্যারিফ বন্টনের রূপরেখা, হিসাব ও নিরীক্ষা, বিধি-লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে তদন্ত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা, পরিচালনা পরিষদের বিভিন্ন কর্মকর্তার ক্ষমতা ও দায়িত্ব, বাজেট প্রণয়ন, ব্যাংক হিসাব খোলা ও পরিচালনা, দায়বদ্ধতা, দায়মুক্তি ইত্যাকার যাবতীয় বিষয় সংশ্লিষ্ট বিধি মোতাবেক প্রণীত হতে হবে।

মোদ্দা কথা, স্বত্বাধিকারী-সদস্যদের দ্বারা গঠিত এই কপিরাইট সমিতির আসল উদ্দেশ্য তাদের বৈধ স্বত্ব থেকে প্রাপ্ত উপকার-বন্টন; আয়-ব্যয়ের উৎস তাদের চাঁদা ও ফি থেকে প্রাপ্ত আয়ের নির্ধারিত অংশ; এবং প্রতিষ্ঠানের প্রকৃতি সেবামূলক,  সহয়োগিতামূলক, তবে ব্যবসায়িক দিক থেকে অলাভজনক। কপিরাইট সমিতির নিবন্ধনের জন্য কপিরাইট রেজিস্ট্রারের বরাবরে আবেদন করতে হবে। রেজিস্ট্রারের কাছে আবেদনের পর নিবন্ধনের জন্য প্রযোজ্য শর্তাবলী বিবেচনা করে সরকার তিন মাসের মধ্যে আবেদন গ্রহণ বা বাতিল করতে পারেন।

পারফরমারস রাইটস বাংলাদেশ কপিরাইট আইনে (২০০০, সংশোধিত ২০০৫) বেশ-কিছু বিষয়ে অস্পষ্টতা, অসম্পূর্ণতা ও অসঙ্গতি আছে। যে ভাষায় সংজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে তা যেমন ঘোরালো-প্যাঁচালো, তেমনি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রদত্ত ব্যাখ্যাও পর্যাপ্ত বলে মনে হয় না। কিংবা এমনও হতে পারে কালের অগ্রগতির সাথে সাথে কিছু-কিছু বিষয়ের চাহিদা, কাম্যতা, পরিপ্রেক্ষিত বা প্রাসঙ্গিকতা পরিবর্তিত হয়েছে, যা আইনটি প্রণয়নের মুহূর্তে প্রণেতাদের অগোচরে ছিল। এরকম একটি বিষয় হচ্ছে সঙ্গীত। সঙ্গীতকর্ম কি? আইনের ২ নং ধারার ৩৭ উপধারায় বলা হয়েছে “সংগীতকর্ম অর্থ সুর সম্বলিত কর্ম এবং উক্ত কর্মের স্বরলিপির পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত হইবে কিন্তু কোন কথা বা কাজকে গানের মাধ্যমে প্রকাশ করা বা সম্পাদন করা অন্তর্ভুক্ত হইবে না;”। সংজ্ঞাটি যেমন অসম্পূর্ণ, তেমনি বিতর্কিত। সঙ্গীত কি শুধু সুর বা স্বরলিপি? সঙ্গীত কি কেবলি যন্ত্রসর্বস্ব? কথা বা কাজ তার সঙ্গে যুক্ত থাকবে না কেন? কথা বা কাজকে গানের মাধ্যমে প্রকাশ করা বা সম্পাদন করা কেন সঙ্গীতকর্মের অন্তর্ভুক্ত হবে না? গান কি তাহলে সঙ্গীত নয়? সুর ও স্বরলিপিকে বাজানো বা গাওয়া না হলে তা সঙ্গীতে পরিণত হবে কেমন করে? নিরব সুর ও মুদ্রিত স্বরলিপি কন্ঠে বা যন্ত্রে গীত বা পরিবেশিত বা অন্যরূপে সম্পাদিত না হলে তা কোনমতেই সঙ্গীত হয়ে ওঠে না।  কেননা সঙ্গীত বলতে একই সঙ্গে সুরসৃষ্টি ও তার পরিবেশনা বোঝায়। আমাদের দেশে একটি জনপ্রিয় সংজ্ঞা হচ্ছে গীত, নৃত্য ও বাদ্য সহযোগে যা সৃষ্ট হয়, তা-ই সঙ্গীত। সোজা কথা, সঙ্গীত শুধু স্বয়ম্ভূ সৃষ্টি নয়, তা একটি সক্রিয় পরিবেশনা, ইংরেজিতে যাকে আমরা বলি পারফরমেন্স।

বিদ্যমান আইনের প্রদত্ত সংজ্ঞায় সঙ্গীতের এই সৃষ্টিপ্রক্রিয়া ও পরিবেশনাকে আলাদা করা হয়েছে, অতঃপর এ দুয়ের সম্পর্কটিকে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে কিংবা ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছে । অপরপক্ষে সঙ্গীত যে পারফর্মিং আর্ট বা পরিবেশনা-নির্ভর শিল্প, তা অবশ্য আইনের বেশ কয়েকটি জায়গায় আভাসিত হয়েছে। যেমন, ২(৪১) ধারায় বলা হয়েছে: “ সম্পাদন অর্থ, সম্পাদনকারীর অধিকারের ক্ষেত্রে এক বা একাধিক সম্পাদনকারী কর্র্র্তৃক দর্শনসাধ্য বা শ্রবণযোগ্য জীবন্ত উপস্থাপন;” আবার ২(৪২) ধারামতে “সম্পাদনকারী অর্থ অভিনেতা, গায়ক, বাদযন্ত্রী, নৃত্যকারী, দড়াবাজকর, ভোজবাজিকর, জাদুকর, সাপুড়ে, লেকচারদাতা অথবা কিছু সম্পাদন করেন এমন যে কোন ব্যক্তি অন্তর্ভুক্ত হইবে;”।

বোঝা যাচ্ছে, এ আইনে পারফরমেন্স ও পারফরমারের বাংলা প্রতিশব্দ করা হয়েছে ‘সম্পাদন’ ও ‘সম্পাদনকারী’; অতঃপর ‘সম্পাদনকারী’র উদাহরণ কেবল শিল্পী বা গায়কগায়িকায় সীমাবদ্ধ না রেখে বিভিন্ন পরিবেশনা-স্তরে যথাসম্ভব ব্যাপক করা হয়েছে। কিন্তু সুরকার ও রচয়িতা তথা বাণীস্রষ্টার {ধারা ২(২৪)খ দ্রষ্টব্য} পাশাপাশি তার পারফরমার বা সম্পাদনকারী তথা পরিবেশনাকারীর অধিকার কী তা সুনির্দিষ্ট করে বলা হয়নি।

অন্যদিকে সঙ্গতকারণেই আইনপ্রণেতারা  আইনের তৃতীয় অধ্যায়ে ‘কপিরাইটের অর্থ’ নিরূপণ করতে গিয়ে বলেছেন, “১৪(গ) জনসমক্ষে কর্মটি সম্পাদন করা অথবা উহা জনগণের মধ্যে প্রচার করা” এবং “১৪(ঘ) কর্মটির কোন অনুবাদ উৎপাদন, পুনরুৎপাদন, সম্পাদন বা প্রকাশ করা;”। অর্থাৎ সম্পাদন বা পারফর্মিং একটি আধিকার এবং এটি কপিরাইটের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। তাই যদি হবে, তাহলে এই অধিকার কারা ভোগ করবেন, তার ধরন ও মেয়াদ কী হবে তা সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুর

আন্তর্জাতিক বলয়ে পারফরর্মাস রাইট্স কপিরাইটের নেইবারিং রাইটস হিসেবে নিকট-সম্পর্কযুক্ত ও অচ্ছেদ্য। বিশেষত সঙ্গীতের ক্ষেত্রে এর কোনো অন্যথা হওয়ার জো নেই। সুপ্রাচীন লোকসঙ্গীত থেকে শুরু করে সর্বাধুনিক কণ্ঠসঙ্গীত বা অন্য কোনো সাঙ্গীতিক উপস্থাপনা মাত্রেই পরিবেশনা, যা পারফরমেন্স-নির্ভর।  লোকসঙ্গীতের ক্ষেত্রে প্রায়শ যিনি গীতিকার, তিনিই সুরকার আর তিনিই শিল্পী বা পারফরমার হয়ে থাকেন। যেমন লালন। আবার আধুনিক যুগের একক সঙ্গীতস্রষ্টাদের কারো কারো ক্ষেত্রেও, যেমন রবীন্দ্রনাথ বা নজরুল, কখনো কখনো এমনটি হতে পারে। তেমন ক্ষেত্রে কপিরাইট ও পারফরমারস রাইটস এক হয়ে যায় এবং একই ব্যক্তিতে বর্তায়। কিন্তু পরবর্তী কালে যখন সেই সঙ্গীত অন্য কোনো শিল্পী বা পারফরমার পরিবেশন করেন, তখন সংশ্লিষ্ট বৈধ পারফরমার তার অধিকার লাভের যোগ্য হন। যেক্ষেত্রে বাণী, সুর ও গায়ন আলাদা ব্যক্তিরা সম্পাদন করেন, সেক্ষেত্রে অধিকার ও উপকারভোগের প্রশ্নও আলাদা ও সমানুপাতিক হয়ে যায়। সক্সগীতের সৃষ্টি ও পরিবেশনাগত এই বিবর্তনের পথ ধরেই কপিরাইটের সঙ্গে পারফরমারস রাইটসের ধারণা অচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত হয়েছে এবং তা আইনানুগ বৈধতা লাভ করেছে।

আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এই বিধানটি আমাদের প্রতিবেশী ভারতসহ বিভিন্ন দেশে প্রচলিত রয়েছে। ভারতীয় কপিরাইট আইনে পারফরমারস রাইটস কার্যকর হয়েছে ১৯৯৪ সাল থেকে। সেখানে এই রাইটসের মেয়াদ পঞ্চাশ বছর। আমেরিকায় বা অস্ট্রেলিয়ায় এর মেয়াদ সত্তুর বছর। কোন সঙ্গীত পরিবেশিত হওয়ার পরে পঞ্জিকাবর্ষ থেকে এই মেয়াদ গণনা করা হয়। নাইজেরিয়াসহ আফ্রিকার অধিকাংশ দেশে এই মেয়াদ ৭০ বছর।

নাইজেরিয়ায় ফোকলোর ও সঙ্গীতসহ সকল প্রকার পারফরমেন্স, পারফরমার ও তজ্জাত অধিকার স্বীকৃত। আইনে এ নিয়ে একটি আলাদা অধ্যায় আছে। বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনে অবিলম্বে পারফরমার্স রাইটসের বিধানাবলী সংশোধন ও হালতক করা অত্যাবশ্যক। ফোকলোরের কপিরাইট নিয়েও আলাদা একটি অধ্যায় সংযোজন করা জরুরী। ইতিমধ্যে তা প্রস্তাবিত হয়েছে এবং তা সরকারের বিবেচনাধীন আছে।

একবিংশ শতাব্দীর মুক্ত অর্থনীতির যুগে লোকস্রষ্টা থেকে শুরু করে আধুনিক কালের সৃজনশীল শিল্পীসমাজসহ সকল পারফরমার ও বৈধ স্বত্বাধিকারীর অধিকার সুসংহত করা ও তার সুরক্ষা প্রদানের কোনো বিকষ্প নেই।

বিভিন্ন ক্ষেত্রের মেয়াদ এই ধারণা প্রায় সর্বমহলে বদ্ধমূল হয়ে আছে যে, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী (২০০০, সংশোধিত ২০০৫) কপিরাইটের মেয়াদ প্রণেতার মৃত্যুর পর ষাট বছর পর্যন্ত বিস্তৃত।  এটি ‘প্রকাশিত সাহিত্য, নাট্য, সংগীত ও শিল্পকর্মের মেয়াদ’ সম্পর্কে কার্যকর, তবে অন্যান্য বিষয়ে গ্রাহ্য নয়। আইনের পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম অধ্যায়ে নান রকম সৃষ্টিকর্ম, সম্প্রচারকর্ম, সম্পাদনকর্ম ও প্রকাশনাকর্মের মেয়াদ সম্পর্কে ব্যাখ্যা আছে ( ধারা ২৪ থেকে ৪০)। কোনো কপিরাইটের প্রণেতার অধিকারের মেয়াদ তাঁর মৃত্যুর পরবর্তী পঞ্জিকাবর্ষের শুরু থেকে গণনা করতে হয়।

প্রণেতা বলতে ধারা ২(২৪) অনুযায়ী গ্রন্থকার (সাহিত্য ও নাট্যকর্মের ক্ষেত্রে), সুরকার বা রচয়িতা (সংগীত বিষয়ক কর্মের ক্ষেত্রে), নির্মাতা (ফটোগ্রাফ ব্যতীত অন্য কোনো শিল্প সুলভ কর্মের ক্ষেত্রে), চিত্রগ্রাহক (ফটোগ্রাফের ক্ষেত্রে), প্রযোজক (চলচ্চিত্র অথবা শব্দ রেকর্ডিংএর ক্ষেত্রে) এবং সৃষ্টিকারী ব্যক্তি (কম্পিউটার মাধ্যমে সৃষ্ট সাহিত্য, নাট্য, সংগীত বা শিল্পসুলভ কর্মের ক্ষেত্রে) ইত্যাদি বোঝায়। এর বাইরে রয়েছে  সম্পর্কিত অন্যান্য অধিকার, যা নেইবারিং রাইটস হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। প্রকৃতিভেদে এসব অধিকারের মেয়াদ বিভিন্ন রকম।

মৌলিক সৃষ্টিকর্মের ক্ষেত্রে প্রণেতা এক হোক বা যৌথ হোক, কপিরাইটের মেয়াদ তার বা তাদের জীবৎকাল ও তৎপরবর্তী ষাট বছর। যৌথ প্রণেতার ক্ষেত্রে যিনি সবশেষে মৃত্যুবরণ করেছেন, তার মৃত্যুর তারিখ ধরেই এই হিসাব করা হবে। চলচ্চিত্র ফিল্মের কপিরাইটের মেয়াদ কর্মটি প্রকাশিত হওয়ার পরবর্তী পঞ্জিকাবর্ষ থেকে ষাট বছর। শব্দ রেকর্ডিংএর ক্ষেত্রেও  কপিরাইটের মেয়াদ অনুরূপ। এই উভয় ক্ষেত্রে প্রযোজক সাধারণত কপিরাইটের অধিকারী। ক্ষেত্রবিশেষে প্রণেতার সঙ্গে এই অধিকার আনুপাতিক হয়ে যায়। প্রযোজক বলতে সেই ব্যক্তিকে বোঝায়, যিনি কর্মটির বিষয়ে উদ্যোগ, বিনিয়োগ ও দায়িত্ব পালন করেছেন। নামসর্বস্ব প্রযোজক এ ক্ষেত্রে আইনের চোখে গ্রাহ্য না-ও হতে পারেন। শব্দ রেকর্ডিংএর ক্ষেত্রেও এটি সমভাবে প্রযোজ্য। ষাট বছর পূরণ হলে বৈধ প্রযোজকের জীবদ্দশাতেই এই মেয়াদ অবসিত হবে। ফটোগ্রাফের মেয়াদ কর্মটি প্রকাশিত হওয়ার পর পঞ্চাশ বছর। ফটোগ্রাফ বলতে ফটো লিথোগ্রাফ বা ফটোগ্রাফ সদৃশ কোনো প্রক্রিয়ায় প্রস্তুত কর্ম, কিন্তু চলচ্চিত্রের কোনো অংশ বোঝায় না। বেনামী বা ছদ্মনামে প্রকাশিত কর্মের মেয়াদ কর্মটি প্রকাশিত হওয়ার পর ষাট বছর। তবে কোন প্রণেতার নাম জানা গেলে তা তার মৃত্যুর পর আরো ষাট বছর পর্যন্ত প্রসারিত হবে। সরকারী কর্মের ক্ষেত্রে সাধারণত সরকারই কপিরাইটের মালিক এবং এই মালিকানা কর্মটি প্রকাশিত হওয়ার পর ষাট বছর। অন্য কোন বাধ্যবাধকতা না থাকলের স্থানীয় কর্র্তৃপক্ষের কর্ম কিংবা আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মের মালিকানা আর মেয়াদও অনুরূপ। ষষ্ঠ  অধ্যায়ে সম্প্রচার ও সম্পাদনের কপিরাইট যৌথভাবে আলোচিত হয়েছে। সম্প্রচার বলতে রেডিও, টেলিভিশন ও অনুরূপ অন্যান্য মাধ্যমে (বর্তমানে মোবাইল ফোন ইত্যাদিও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে) কর্মটির প্রথম সম্প্রচার বোঝায়। এই অধিকারের নাম ‘সম্প্রচার পুনরুৎপাদন অধিকার।’ প্রথম সম্প্রচারিত হওয়ার পর এই অধিকারের মেয়াদ পঁচিশ বছর পর্যন্ত অক্ষুণ্ন থাকবে। বিষয়টি আরো বিশদ ব্যাখ্যার দাবি রাখে।

কোন কর্ম সম্পাদন বা পারফর্ম করার পর প্রথম বৈধ সম্পাদনকারী বা পারফর্মার বিশেষ অধিকার লাভ করেন। এই অধিকরারে মেয়াদ  পরবর্তী পঞ্জিকাবর্ষ থেকে পঞ্চাশ বছর। আগেই বলেছি, বিস্তৃত ব্যাখ্যাসহ আইনে এ নিয়ে একটি পৃথক অধ্যায় থাকা বাঞ্চনীয়।

বিদ্যমান আইনে  কপিরাইটের পার্শ্ববর্তী অধিকার হিসেবে ‘প্রকাশিত কর্মের সংস্করণের অধিকার’ স্বীকৃত। কোন সংস্করণের মুদ্রণশৈলীগত বিন্যাসের অধিকার সংশ্লিক্ষণ প্রকাশক সংরক্ষণ করেন। এই মেয়াদ যথারীতি পরবর্তী পঞ্জিকাবর্ষ থেকে পঁচিশ বছর অক্ষুণ্ন থাকে। আমাদের দেশে বিভিন্ন প্রকাশক নির্বিচারে অনুবাদ প্রকাশ করে থাকেন। অনুবাদের ক্ষেত্রেও কপিরাইট অবশ্য পালনীয়। এই মেয়াদ সৃষ্টিকর্মের অনুরূপ।

তর্ক, ব্যাখ্যা ও উপলব্ধি কপিরাইট নিয়ে বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি মহলে সচেতনতা ও উদ্যোগ ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। সেইসঙ্গে বাডছে তর্কও। এটিও সুস্থতা ও স্বাভাবিকতার লক্ষণ। একজন শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা জানালেন, বাংলাদেশে ইন্টেলেক্চুয়াল প্রপার্টির যৌথ ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য ওয়াইপো সম্প্রতি সুনির্দিষ্ট প্রকল্পভিত্তিক সাহায্য নিয়ে এগিয়ে এসেছে। ঢাকায় এ নিয়ে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সেমিনার হয়েছে ও হতে যাচ্ছে। অন্যদিকে লেখক, প্রকাশক, সঙ্গীতশিল্পী, সুরকার, গীতিকার, চিত্রশিল্পী, প্রযোজক, কনটেন্ট প্রভাইডার, আইনজীবী, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে নানা পেশার মানুষ নিজ নিজ ক্ষেত্রে কপিরাইট সোসাইটি গঠন করার কথা সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছেন। কপিরাইট অফিসে এ নিয়ে অনেকেই তথ্যানুসন্ধান করছেন।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন অনুসন্ধিৎসু কর্মকর্তা আমার কাছে জানতে চেয়েছেন, বিদ্যমান কপিরাইট আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় (অধ্যায় ৫, ধারা ২৪) কপিরাইটের মেয়াদ সম্পর্কে যা বলা হয়েছে তা সঠিক কিনা। তাঁর প্রশ্নের পর আমি ধারাটি পুনরায় পাঠ করে বুঝতে পরি, যে ভাষায় এটি লিখিত হয়েছে তাতে মূল প্রতিপাদ্য বা অর্থটি ভুল বোঝার যথেষ্ট অবকাশ আছে।

বার্ণ কনভেনশনের আওতায় আমাদের জাতীয় চাহিদা ও আইনী কাঠামোতে প্রণীত এই ধারার বক্তব্য হচ্ছে প্রণেতার কপিরাইটের মেয়াদ তার জীবনকালের পরও আরো ষাট বৎসর পর্যন্ত বিদ্যমান থাকবে। আর মৃত্যু-পরবর্তী ষাট বৎসর গণনা করতে হবে প্রণেতার মৃত্যুর পরবর্তী পঞ্জিকা-বৎসর থেকে। কিন্তু একটি যৌগিক বাক্যে প্রণীত বর্তমান ধারার ভাষিক বিন্যাস থেকে এ ধারণা দ্ব্যর্থহীনভাবে পাওয়া যায় না। ধারাটির পাঠ নিম্নরূপ : “অতঃপর ভিন্নরূপ বিধান করা না হইলে, প্রণেতার জীবনকালে প্রকাশিত কোন সাহিত্য, নাট্য, সঙ্গীত বা শিল্প কর্মের (ফটোগ্রাফ ব্যতীত) কপিরাইট তাহার মৃত্যুর পরবর্তী পঞ্জিকা-বৎসর হইতে গণনা করিয়া ষাট বৎসর পর্যন্ত বিদ্যমান থাকিবে।” এই বাক্যে প্রণেতার জীবনকালে তাঁর প্রকাশিত রচনার কপিরাইট থাকবে কিনা তা স্পষ্ট নয়। আসলে এই বাক্যের ১৯তম শব্দ কপিরাইট-এর পর অন্তত ‘প্রণেতার জীবনকাল এবং’ শব্দত্রয় যুক্ত থাকা আবশ্যক ছিল, যা বর্তমানে উহ্য আছে। এটি এই আইন প্রণেতাদের অনবধানতা ও বাক্যগঠনজাত সমস্যা হতে পারে, যা বিদ্যমান আইনের আরো কিছু কিছু ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায়।

আমরা এ বিষয়টি আগেই উলে¬খ করেছি এবং অনতিবিলম্বে এই সব অনভিপ্রেত অস্বচ্ছতা দূর করার জন্য পুরো আইনটি সংশোধন ও হালতক করার কথা বলেছি। সে যা-ই হোক, এ-মুহূর্তে এই বাক্যটি দিয়ে কিছুতেই এই অর্থ করা যাবে না যে, নিজের সৃষ্টিকর্মের জন্যে প্রণেতার জীবনকালে কোন কপিরাইট থাকবে না। এর প্রথম কারণ এই আইনের আইনের আন্তর্জাতিক উৎস বার্ণ কনভেনশন, যার আলোকে আমাদের জাতীয় আইনটি প্রণীত। দ্বিতীয় কারণ বিদ্যমান আইনের অন্যান্য ধারা, যেখানে প্রণেতার জীবনকালে কপিরাইট বিদ্যমান থাকার বিষয়টি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বর্ণিত হয়েছে।

চতুর্থ অধ্যায়ের কপিরাইটের ‘স্বত্ব ও মালিকদের অধিকার’ প্রসঙ্গে বর্ণিত ধারাসমূহ (১৭, ১৮, ১৯, ২০, ২১, ২২, ২৩) এ ক্ষেত্রে সর্বাগ্রগণ্য, যেখানে প্রণেতা বা স্বত্বাধিকারীর অধিকার আদায়ের জন্য প্রণেতার সঙ্গে প্রকাশক বা অন্যরূপ ব্যবহারকারীর দলিল স্বাক্ষরের বিধান আছে (ধারা ১৯)।  দলিল-বলে প্রণেতা তাঁর জীবনকালেই কপিরাইটের অধিকার ও উপকার ভোগ করবেন। অর্থাৎ এই ধারার মর্মার্থ হচ্ছে যে, জীবনকালেই প্রণেতার অধিকার বিদ্যমান। এমনকি যেক্ষেত্রে প্রণেতা সারা জীবনের জন্যে কারো সঙ্গে চুক্তিতে আবদ্ধ হন সেক্ষেত্রেও কতিপয় বিশেষ অধিকার তার আয়ত্তে থাকবে।

৭৮ ধারায় ‘প্রণেতার বিশেষ স্বত্ব’ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, “(১) কোন কর্মের প্রণেতা ঐ কর্মের কপিরাইট স্বত্ব নিয়োগী বা পরিত্যাগ করা স্বত্ত্বেও, কর্মটির রচনাস্বত্ব দাবী করিতে পারিবেন এবং উক্ত কর্মের কোন বিকৃতি, অঙ্গহানি বা অন্যান্য পরিবর্তন সম্পর্কে অথবা উক্ত কর্মটির বিষয়ে তাহার সম্মান ও সুখ্যাতি ক্ষু্ণ্ন হইতে পারে এমন অন্যান্য কার্যের জন্য ক্ষতিপূরণ বা কার্যের উপর নিবারণ দাবী করিতে পারিবেন”। প্রশ্ন হচ্ছে জীবনকালে কপিরাইট না থাকলে তিনি তার কর্মের বর্ণিত অপব্যবহারের জন্য ক্ষতিপূরণ বা নিবারণ দাবী করতে পারেন না।

২২ নং ধারায় বলা হয়েছে, প্রণেতা নির্ধারিত ফরমে রেজিস্ট্রারের নিকট নোটীশ দিয়ে তার কপিরাইট পরিত্যাগ করতে পারেন। জীবনকালে তাঁর কপিরাইট বিদ্যমান বলেই তিনি কপিরাইট পরিত্যাগেরও অধিকার রাখেন। কপিরাইট সমিতি, লাইসেন্স, অনুবাদ প্রণয়ন, অধিকার লঙ্ঘন, দেওয়ানী প্রতিকার, অপরাধ ও শাস্তি, আপীল প্রভৃতি অধ্যায় ও ধারাসমূহের মর্মার্থ হচ্ছে, এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রণেতা তার অধিকার সুরক্ষা ও উপকারভোগের জন্য উদ্যোগী হবেন। জীবনকালে কপিরাইটের অধিকারী না হলে প্রণেতা এই উদ্যোগ তার জীবদ্দশায় গ্রহণ করতে পারেন না। কাজেই বিদ্যমান আইনের আন্তর্জাতিক উৎস ও প্রণীত ধারাগুলোর সমন্বিত সাক্ষ্য ও মর্মার্থ এই যে, প্রণেতার জীবনকালে তাঁর সৃষ্টিকর্মের কপিরাইট বিদ্যমান এবং তা তাঁর মৃত্যুর পরও ষাট বৎসর পর্যন্ত কার্যকর।

আমরা মনে করি, এতদ্সত্বেও এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ বা মতানৈক্য বা বিরোধ দেখা দিলে তা নিরসনের জন্য সংশ্রিষ্ট ধারার প্রকৃত অর্থ সম্পর্কে কপিরাইট বোর্ডের ব্যাখ্যা গ্রহণ করা যেতে পারে। উল্লেখ্য, কপিরাইট সম্পর্কিত যাবতীয় বিরোধের নিষ্পত্তিকল্পে যে কোনো ধারার মর্মার্থের ব্যাখ্যা দেবার ক্ষমতা কপিরাইট বোর্ডের এখতিয়ারভুক্ত। বোর্ড ফৌজদারি কার্যবিধি (১৮৯৮ সনের ৫নং আইন) ও দ-বিধি (১৮৬০ সনের ৪৫ নং আইন) অনুযায়ী একটি আদালত রূপে গণ্য।

কপিরাইট বোর্ড বাংলাদেশে বর্তমানে কার্যকর কপিরাইট আইন (২০০০, সংশোধিত ২০০৫) অনুযায়ী কপিরাইট সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয় নিষ্পত্তির জন্য সরকার কর্তৃক একটি কপিরাইট বোর্ড গঠিত হয়েছে। আইনের দ্বিতীয় অধ্যায়ের ১১ নং ধারা এবং বিধিমালার অষ্টম অধ্যায়ের ২৯ নং বিধিতে এ বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে।

মূলত এই ধারা ও বিধিতে বোর্ডের গঠন, আওতা, কর্মপরিধি ও ক্ষমতা উল্লেখিত হয়েছে। অন্যান্য কার্যধারা, প্রণালী ও কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ধারা ও বিধিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এ নিয়ে পৃথক কোনো পুস্তিকা নেই। বোর্ডের এখতিয়ার, ক্ষমতা ও কর্মধারা বুঝতে হলে পুরো আইনটি অভিনিবেশ সহকারে পাঠ করা আবশ্যক। একজন চেয়ারম্যান ও অনধিক ছয়জন সদস্য নিয়ে সরকার বোর্ড গঠন করতে পারে। তবে বোর্ডের সদস্য সংখ্যা দুইজনের কম হতে পারবে না। বোর্ডের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের মেয়াদ আইনে স্পষ্ট না থাকলেও বিধিতে এই সময়সীমা অনধিক পাঁচ বৎসর বলা হয়েছে।

বর্তমানে নিয়োগকৃত কপিরাইট বোর্ডের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের কার্যকালের মেয়াদ তিন বৎসর। কার্য়কাল শেষে সরকার তাদের মেয়াদ বাড়াতে পারেন (বিধি ২৯-২)। আইনের ১১(৩) ধারায় বলা হয়েছে, ‘বোর্ডের চেয়ারম্যান ও অন্যান্য সদস্য বিধি দ্বারা নির্ধারিত মেয়াদ ও শর্তাধীনে স্বীয় পদে বহাল থাকবেন।’  বিধিতে তাদের দায়িত্ব পালন, অব্যাহতি গ্রহণ, সম্মানী ও অন্যান্য বৈষয়িক শর্তও উল্লেখিত আছে (বিধি ২৯-৫)। কপিরাইট বোর্ডের চেয়ারম্যানের নিয়ন্ত্রণে ও নির্দেশে রেজিস্ট্রার এই বোর্ডের সাচিবিক দায়িত্ব পালন করেন (বিধি ৩০)। কপিরাইট অফিসের মুখ্য কর্মকর্তা হিসেবে রেজিস্ট্রার বা নিবন্ধকই কপিরাইট অফিসের মুখ্য নির্বাহী। চেয়ারম্যান সিলেকশন গ্রেডপ্রাপ্ত জেলাজজ বা সরকারের অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা বা হাইকোর্টের বিচারপতি হওয়ার উপযুক্ত আইনজীবীদের মধ্য থেকে নিযুক্ত হয়ে থাকেন (ধারা ১১-৫)। সদস্যবৃন্দ সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ে কপিরাইটের বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে মনোনীত ব্যক্তি। বোর্ডের কার্যপরিধি ও ক্ষমতা সম্পর্কে ১২নং ধারায় বলা হয়েছে, যে কোনো সিদ্ধান্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের মতামতে গৃহীত হবে। সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলে চেয়ারম্যানের মতামত প্রাধান্য পাবে। বোর্ডের কোন সদস্যপদ শূন্য থাকা বা বোর্ড গঠনে কোনো ত্রুটির কারণে বোর্ডের কোন কাজ বা কার্যধারা অবৈধ হবে না বা এ নিয়ে কোনো বৈধতার প্রশ্ন তোলা যাবে না (ধারা ১২-৪)। বোর্ডের কোন সদস্য এমন কোন কার্যধারায় অংশ নিতে পারবেন না, যেখানে তার ব্যক্তিগত স্বার্থ আছে। তবে সামষ্টিক স্বার্থের ক্ষেত্রে এ কথা প্রযোজ্য নয়।

রেজিস্ট্রারের আদেশের বিরুদ্ধে কোন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বোর্ডের নিকট আবেদন করলে বোর্ড সে সম্পর্কে যে শুনানী গ্রহণ করবে তাতে রেজিস্ট্রার উপস্থিত থাকবেন না, অর্থাৎ প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করবেন না (ধারা ৯৫-২)। যেহেতু বোর্ড ফৌজদারি কার্যবিধি (১৮৯৮ সনের ৫নং আইন) ও দণ্ডবিধি (১৮৬০ সনের ৪৫ নং আইন) অনুযায়ী একটি আদালত রূপে গণ্য (ধারা ১২-৫), সেহেতু বোর্ডের সিদ্ধান্তও রায় হিসেবে বিবেচ্য।

বোর্ডের সিদ্ধান্ত বা আদেশের বিরুদ্ধে কোনো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি তিন মাসের মধ্যে সাধারণত হাইকোর্ট বিভাগে আপীল করতে পারবেন; তবে ৬নং ধারায় আওতায় প্রদত্ত বোর্ডের সিদ্ধান্ত বা আদেশের বিরুদ্ধে কোন আপীল করা যাবে না (ধারা ৯৬)। ৬নং ধারায় কোন  কর্মের প্রকাশনা তারিখ, মেয়াদকাল, অন্য কোন দেশে কর্মটি প্রকাশিত হওয়া ইত্যাদি বিষয় ও তৎসংক্রান্ত বিরোধের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন নয়, বরং বিরোধ মীমাংসাই বোর্ডের প্রধান কাজ। আদালত হিসেবে বোর্ডের অন্যান্য ক্ষমতার মধ্যে রয়েছে (ক) সমন প্রদান করা, কোনো ব্যক্তির  উপস্থিতি নিশ্চিত করা ও তাকে শপথপূর্বক পরীক্ষা করা; (খ)  কোন দলিল প্রদর্শন ও উপস্থাপন করানো; (গ) হলফনামাসহ সাক্ষ্যগ্রহণ; (ঘ) সাক্ষ্য বা দলিল পরীক্ষার জন্য কমিশন মঞ্জুর করা; (ঙ) কোন আদালত বা কার্যালয় থেকে সরকারী নথি বা তার অনুলিপি তলব করা এবং (চ) নির্ধারিতব্য অন্য কোন বিষয় (ধারা ৯৯)। বোর্ডের আরো বিশেষ কিছু ক্ষমতা আছে। যেমন, বোর্ড কর্তৃক প্রদত্ত অর্থ প্রদানের আদেশ ডিক্রীর ন্যায় কার্যকর হবে (ধারা ১০০)। এই আইনের উদ্দেশ্য সাধনে সরল বিশ্বাসে কৃত বা করার অভিপ্রায়ের জন্য বোর্ডের কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোন মামলা বা আইনগত কার্যক্রম চলবে না (ধারা ১০১)। বোর্ডের অপরাপর কার্যাবলীর মধ্যে রযেছে (ক) মূল অনুলিপির পুনঃবিক্রির শেয়ারের ক্ষেত্রে মূল প্রণেতার অংশ নির্ধারণ (ধারা ২৩-২), (খ) জনসাধারণের নিকট বারিত অর্থাৎ এ মুহূর্তে লভ্য নয় এমন কর্মের লাইসেন্স প্রদানের বিষয় পরীক্ষা ও আদেশ প্রদান (ধারা ৫০), (গ) অপ্রকাশিত বাংলাদেশী কর্মের বাধ্যতামূলক লাইসেন্স প্রদানের বিষয় পরীক্ষা ও আদেশ প্রদান (ধারা ৫১), (ঘ) অনুবাদ তৈরি ও প্রকাশের লাইসেন্স (ধারা ৫২, বিধি ৮), সম্প্রচার, শিক্ষাদান, গবেষণা, প্রযোজনা ও প্রকাশনার জন্য বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে লাইসেন্স প্রদান (ধারা ৫১-৭), সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য পূরণকল্পে কোন কর্ম পুনরুৎপাদন ও প্রকাশ করার লাইসেন্স, রয়্যালটি নির্ধারণ (ধারা ৫৩), নিবন্ধন বইতে সনাক্তকৃত ত্রুটি সংশোধনের আদেশ প্রদান (ধারা ৫৯) ইত্যাদি। আসলে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের বাইরে নীতিগত ও সিদ্ধান্তমূলক যাবতীয় দায়িত্বই বোর্ডের উপর বর্তায়। ৯৯(৬) ধারা অনুযায়ী কোন ধারায় বা বিধিতে অনুল্লেখিত যেকোনো বিষয় বোর্ড আলোচ্যসূচী হিসেবে নির্ধারণ করতে পারে এবং সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এ ছাড়া জনস্বার্থে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত অন্যান্য কর্মসূচী, পরিকল্পনা ও সুপারিশ প্রদানেও বোর্ড অঙ্গীকৃত। বোর্ডের গঠন ও কর্মপ্রণালী আলাদাভাবে ব্যাখ্যাত, সঙ্কলিত ও মুদ্রিত হওয়া আবশ্যক।

লাইসেন্স, স্বত্বনিয়োগ, অনুবাদ-বিষয়ক কপিরাইট আইনে লাইসেন্স একটি অত্যাবশ্যকীয় বিষয়। আইনে লাইসন্স শব্দটির কোনো বাংলা প্রতিশব্দ দেয়া হয়নি। শব্দটির প্রাথমিক অর্থ অনুমতিপত্র; অন্য অর্থ হতে পারে ক্ষমতাপ্রাপ্তিপত্র। বাংলা একাডেমী ইংরেজি বাংলা অভিধান অনুযায়ী ‘কোনো কাজ করার অনুমতিপত্র; (সাধারণত নিয়ন্ত্রিত পণ্যে) উৎপাদন বা বিক্রয় করার অনুমতি।’ অর্থাৎ এই অনুমতির সঙ্গে বাণিজ্যিক লাভালাভের প্রশ্ন যুক্ত। বিদ্যমান আইনের নবম অধ্যায়ের ৪৮ থেকে ৫৪ ধারায় বিভিন্ন বিষয়ে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে লাইসন্স প্রদান নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করা হয়েছে। ৪৮ ধারার বিষয় ‘কপিরাইটের স্বত্বাধিকারী প্রদত্ত লাইসেন্স’।

কোন কর্মের স্বত্বাধিকারী বা তাঁর বৈধ প্রতিনিধি লিখিত ও স্বাক্ষরিত লাইসেন্সের মাধ্যমে ঐ কর্মের উৎপাদন, বিক্রয় বা অনুরূপ অন্য কোন ব্যবহারের অনুমতি দিতে পারবেন। বর্তমানে সৃষ্ট হয়েছে এমন কর্ম ছাডাও ভবিষ্যতে সৃষ্ট হতে পারে এমন কর্মেরও লাইসেন্স প্রদান করা যায়।

তবে ভবিষ্যৎ কর্মের ক্ষেত্রে কর্মটি অস্তিত্বশীল হওয়ার পরেই লাইসেন্স কার্যকর হবে। লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যক্তি যদি কর্মটি সৃষ্ট হওয়ার আগেই মারা যান, তাহলে সাধারণভাবে তার বৈধ উত্তরাধিকারীই লাইসেন্সটির অধিকারী হবেন। তবে লাইসেন্সের কোন ধারায় অন্যরূপ বিধান থাকলে লাইসেন্সটি সেভাবেই ব্যবহৃত হবে।

৪৯ নং ধারায় আলোচিত হয়েছে স্বত্ব-নিয়োগ সংক্রান্ত বিরোধ ও উইলের মাধ্যমে কোন পাণ্ডুলিপির কপিরাইট হস্তান্তরের বিষয়। এত বলা হয়েছে, স্বত্ব প্রদান করার পর প্রদানকারী স্বত্বগ্রহণকারীর কোন কাজে সাংারণত বাধা দিতে পারেন না। অন্যদিকে স্বত্বগ্রহণকারীও অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত কর্মটির উৎপাদন ও বিক্রি বন্ধ রাখতে পারবেন না। এ নিয়ে কোন বিরোধ দেখা দিলে যে-কোন পক্ষের কাছ থেকে প্রাপ্ত লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে কপিরাইট বোর্ড বিরোধটি মীমাংসা করবে। বিশেষ পরিস্থিতির উদ্ভব না হলে স্বত্বনিয়োগ-রদের আদেশ পাঁচ বছরের মধ্যে প্রদান করা সঙ্গত নয়।

অন্য যে কোন মূর্ত সম্পত্তির মতো প্রণেতা তাঁর সাহিত্য, নাট্য, সঙ্গীত, শিল্প বা কপিরাইট আছে এমন যে কোন কর্ম তাঁর মৃত্যুর পূর্বে উইল করে স্বত্বাধিকারী নিয়োগ করতে পারেন। এক্ষেত্রে উইলকারীর লিখিত নির্দেশনা অনুযায়ী প্রণেতার জীবদ্দশায় বা তাঁর মৃত্যুর পরেও কর্মটির স্বত্ব ব্যবস্থিত হবে। এ সম্পর্কিত কোন ব্যাখ্যা বা বিরোধ নিষ্পত্তির প্রয়োজন হলে তা কপিরাইট বোর্ড সম্পন্ন করবে। ধারা ৫০এ রয়েছে ‘জনসাধারণের নিকট বারিত কর্মের বাধ্যতামূলক লাইসেন্স’ প্রদানের নির্দেশনা।

বারিত কর্ম বলতে এমন কর্ম বোঝায় যা এখন বাজারে নেই এবং যা জনসাধারণের কাছে সহজলভ্য নয়। এ ধরনের কোন বারিত কর্ম জনস্বার্থে পুনঃপ্রকাশ বা পুনঃউৎপাদন বা পুনঃসম্প্রচার অত্যাবশ্যকীয় হওয়া সত্বেও কর্মটির প্রণেতা বা বৈধ স্বত্বাধিকারী যদি তার পুনঃপ্রকাশ বা পুনঃউৎপাদন বা পুনঃসম্প্রচার ইত্যাদির অনুমতি না দেন, তাহলে কপিরাইট বোর্ড আগ্রহী প্রকাশক, উৎপাদক, সম্প্রচারক বা অনুরূপ অন্য কোন ব্যবহারকারীর কাছ থেকে আবেদন প্রাপ্তির পরিপ্রেক্ষিতে কর্মটির পুনঃপ্রকাশ বা পুনঃউৎপাদন বা পুনঃসম্প্রচার ইত্যাদির অনুমতি বা লাইসেন্স দিতে পারবেন।

এক্ষেত্রে কর্মটির বাণিজ্যিক ও অন্যান্য ব্যবহারের জন্য তার বৈধ স্বত্বাধিকারীকে বোর্ড কর্র্তৃক নির্ধারিত হারে ক্ষতিপূরণ বা রয়্যালটি প্রদান করতে হবে।  কর্মটি ব্যবহারের জন্য একাধিক আবেদনকারী থাকলে বোর্ডের বিবেচনায়  ‘যে ব্যক্তি জনসাধারণের স্বার্থে সবচেয়ে ভালো কাজ’ করবে, তাকেই লাইসেন্স প্রদান করা হবে।

৫১ নং ধারার বিষয় ‘অপ্রকাশিত বাংলাদেশী কর্মের বাধ্যতামূলক লাইসেন্স’। যদি এ ধরনের অপ্রকাশিত কর্মের প্রণেতা মৃত বা অজ্ঞাত বা নিরুদ্দিষ্ট থাকে, তাহলে ঐ কর্মটির আগ্রহী প্রকাশক, অনুবাদক, সম্প্রচারক বা অন্য কোনরূপ ব্যবহারকারীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বোর্ড তৎনির্ধারিত শর্তসাপেক্ষে লাইসেন্স প্রদান করতে পারবে।

বোর্ডের কাছে আবেদন করার আগে আবেদনকারী অন্তত দুটি সংবাদপত্রে (একটি বাংলা, একটি ইংরেজি) তার  প্রস্তাব প্রকাশ করবেন, যাতে কোন সম্ভাব্য স্বত্বাধিকারী থাকলে বিষয়টি তার নজরে আসে। প্রাপ্ত আবেদনের পর এ বিষয়ে বোর্ডও নির্ধারিত পদ্ধতিতে তদন্ত সম্পন্ন করবে।

এ ধরনের কর্মের জন্য প্রাপ্য নির্ধারিত রয়্যালটি কপিরাইট অফিসের রেজিস্ট্রারের বরাবরে জমা দিতে হবে। কর্মটির স্বত্বাধিকারী সনাক্ত করা গেলে এই অর্থ যথাবিধি তাকে প্রদান করা হবে। তা না হলে বোর্ডের সিদ্ধান্ত মোতাবেক তা জাতীয় স্বার্থে ও কল্যাণে ব্যবহৃত হতে পারে।

প্রণেতা বা তার বৈধ প্রতিনিধি পাওয়া গেলে কর্মটি তাঁর বা তাঁদের উদ্যোগে প্রকাশ বা অস্তিত্বশীল করার জন্য বোর্ড তাদের অনুরোধ করতে পারে। ৫২ নং ধারার বিষয় ‘অনুবাদ তৈরি ও প্রকাশের লাইনেসন্স’।

বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে যে কোন কর্মের অনুবাদ প্রকাশ করতে হলে অবশ্যই প্রণেতা বা বৈধ স্বত্বাধিকারীর লিখিত অনুমতি নিতে হবে। তার অনুমতি পাওয়া না গেলে আগ্রহী প্রকাশক বা উৎপাদক এই অনুমতি চেয়ে বোর্ডের নিকট আবেদন করতে পারেন। সাধারণত কোন সাহিত্য বা নাট্যকর্ম প্রকাশের পাঁচ বছর পর বাংলাদেশে তার অনুবাদ প্রকাশের জন্য বোর্ডের নিকট আবেদন করা যাবে।

শিক্ষাদান, গবেষণা ও অন্যান্য একাডেমিক প্রয়োজনে বাংলাদেশের বাইরের কোন কর্ম  প্রথম প্রকাশিত হওয়ার তিন বছর পর বোর্ডের অনুমতির ভিত্তিতে বাংলাদেশে  মুদ্রণ, পুনরুৎপাদন ইত্যাদি করা যাবে। এই ধরনের কর্মের প্রচার, বিক্রি ইত্যাদি কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সীমাবদ্ধ থাকবে; বিদেশে রপ্তানি করা যাবে না; তবে বাংলাদেশের বাইরে বসবাসরত বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য পাঠানো যাবে। কর্মটির উপরে ‘কেবল বাংলাদেশে ব্যবহারের জন্য’ কথাটি লেখা থাকবে। এই  কর্মের প্রণেতা বা স্বত্বাধিকারীকে বোর্ড কর্তৃক নির্ধারিত হারে ও পদ্ধতিতে রয়্যালটি দিতে হবে।

নিবন্ধন, লঙ্ঘন, প্রতিকার-বিষয়ক একজন স্রষ্টা কোন নতুন সৃষ্টি বা উদ্ভাবনী সম্পন্ন করার সঙ্গে সঙ্গে তা তার নামে স্বত:নিবন্ধিত হয়ে যায়। এ তাঁর মৌলিক ও নৈতিক অধিকার। এ নিয়ে কোন বিরোধ দেখা দিলে তিনি আইনের আশ্রয়ও নিতে পারেন। তবে কার্যকর প্রতিকার পাওয়া এবং তার কর্মের বাণিজ্যিক অপব্যবহার ও তাস্কর্য প্রতিরোধ করার জন্য কপিরাইট আইনের আওতায় কপিরাইট অফিসে বা বৈধ কোন কপিরাইট সোসাইটিতে তা নিবন্ধন করা অপরিহার্য। বিদ্যমান আইনের দশম অধ্যায়ে ৫৫ থেকে ৬১ ধারায় এ বিষয়ে বিস্তৃত ব্যাখ্যা আছে। নির্ধারিত ফরমে নির্ধারিত ফি দিয়ে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করতে হবে। একই বিষয় কপিরামইট আইন এবং প্যাটেণ্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্ক আইনের অধীনে নিবন্ধন করা যাবে না। সাধারণ বিমূর্ত সৃষ্টি কপিরাইটে ও মূর্ত আবিষ্কার প্যাটেণ্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্ক আইনে নিবন্ধন করা যাবে। নিবন্ধনের পাশাপাশি পুস্তক ও সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে প্রিন্টিং প্রেসেস এণ্ড পাবলিকেসন্স (ডিকলারেশন এণ্ড রেজিস্ট্রেশন) অ্যাক্ট ১৯৭৩ অনুয়ায়ী বাংলাদেশ গণ গ্রন্থাগারে প্রকাশিত প্রতিটি পুস্তকের ছয়টি করে জমা দিতে হবে। আইনের একাদশ অধ্যায়ে এ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা আছে (ধারা ৬২ থেকে ৬৭)। গণগ্রন্থাগারে প্রকাশক কর্তৃক যথাবিধি পুস্তক জমা দেয়া না হলে তার জন্য প্রতিটি ক্ষেত্রে এক হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা যেতে পারে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে কপিরাইট লঙ্ঘনজনিত বিভিন্ন অপরাধের জন্য বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড কিংবা উভয়ের ব্যবস্থা আছে।

অপরাধ ও শাস্তি ১৮ই জুলাই ২০০০/৩রা শ্রাবণ ১৪০৭ তারিখে কপিরাইট আইন ২০০০ জাতীয় সংসদে অনুমোদিত হওয়ার পর মহামান্য রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভ করে এবং সর্বসাধারণের জন্য আইন ( ২০০০ সনের ২৮ নং আইন)  হিসেবে জারি হয়। এর পরে ১৮ই মে ২০০৫/৪ঠা জ্যেষ্ঠ ২০০৫ তারিখে জাতীয় সংসদের অনুমোদন ও রাষ্ট্রপতির স্বীকৃতিক্রমে এই আইনের কিছু সংশোধন করা হয় (২০০৫ সনের ১৪ নং আইন)। মূল আইন ও তার পরবর্তী সংশোধন অনুসারে কপিরাইট লঙ্ঘন, তজ্জনিত অপরাধ ও শাস্তির বিষয়টি এখানে আলোচনা করা যেতে পারে।

মূল আইনের ত্রয়োদশ অধ্যায়ে ৭১, ৭২, ৭৩ ও ৭৪ নং ধারায় কোন কোন ক্ষেত্রে ও পরিস্থিতিতে কপিরাইট লঙ্ঘিত হয় তার বিশদ বর্ণনা ও ব্যাখ্যা দেয়া আছে। আমরা শুধু সংক্ষেপে এটুকু বলবো যে, এই আইন অনুযায়ী কোন সৃষ্টিকর্মের বৈধ মালিক বা কপিরাইট রেজিস্ট্রার (যেক্ষেত্রে মালিক অসনাক্ত) কর্তৃক ‘প্রদত্ত লাইসেন্স ব্যতীত বা অনুরূপভাবে প্রদত্ত লাইসেন্সের শর্ত বা এই আইনের অধীন কোন উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কর্তৃক আরোপিত কোন শর্ত লঙ্ঘনপূর্বক’ কোন ব্যবসায়ী, প্রকাশক, বিক্রেতা, আমদানীকারক, প্রযোজক, রেকর্ড প্রস্তুতকারক, ফটোকপিকারক, সম্প্রচারক, কনটেন্ট প্রোভাইডার, মোবাইল ফোন কোম্পানী, চলচ্চিত্রকার, অনুবাদক, রূপান্তরকারী, উদ্ভাবক, কম্প্যুটার বিশেষজ্ঞ, নির্মাতা, সর্ব পর্যায়ের ব্যবহারকারী ও অন্য যে কেউ বাণিজ্যিক স্বার্খসিদ্ধির উদ্দেশ্যে যা-কিছু  করবে তা-ই কপিরাইটলঙ্ঘন বলে বিবেচিত হবে।

তবে বাণজ্যিক লাভালাভের উদ্দেশ্য ব্যতীত কেবল অধ্যয়ন, গবেষণা, চর্চা, উদ্ভাবন, জনস্বার্থে সংবাদপত্র বা অন্য মিডিয়ায় প্রচার, বিচারকার্য, জাতীয় সংসদের কার্যসম্পাদন, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সার্টিফায়েড কপি প্রদান, জনসমক্ষে কোন কর্মের যুক্তিসঙ্গত উদ্ধৃতি, শিক্ষামূলক কাজের জন্য আংশিক উদ্ধৃতি বা সংক্ষেপায়ন, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ইত্যাকার অব্যবসায়িক ও অলাভজনক কাজ সাধারণত কপিরাইট লঙ্ঘনের পর্যায়ে পড়ে না। এ-ধরনের ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রণেতার বিশেষ-স্বত্ব স্বীকারপূর্বক তার নাম উদ্ধৃত করা বিধেয়।

আইনের এই ধারা সম্পর্কে অবহিত না থেকে কেঊ যদি কপিরাইট লঙ্ঘন করে থাকেন, তাহলেও তা অপরাধ বলে বিবেচিত হবে। যা-হোক, এবারে আমরা অপরাধের শাস্তি সম্পর্কে আলোচনা করবো। লঙ্ঘন সনাক্ত করে প্রণেতা বা কপিরাইটের বৈধ স্বত্বাধিকারী দেওয়ানী প্রতিকার চেয়ে বিধিমোতাবেক আদালতে মামলা রুজু করতে পারেন। তারও আগে তিনি এ ধরনের প্রতিকারের জন্য কপিরাইট বোর্ডের কাছে আবেদন করতে পারেন। মালিকের এ ধরনের আবেদন বা মামলার পরিপ্রেক্ষিতে অপরাধ সনাক্তকরণ ও আইনানুগ শাস্তি প্রদান করা যেতে পারে।

আবার গোপন ও বিশ্বস্ত সংবাদের সূত্র ধরে আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ লঙ্ঘনকার্য সনাক্ত করার পর লঙ্ঘিত মালামাল জব্দ করে আইনানুগ কর্তৃপক্ষের কাছে সোপর্দ করতে পারেন। সরকার কর্তৃক সম্প্রতি গঠিত টাস্কফোর্সও এ কাজটি করতে পারেন।

পঞ্চদশ অধ্যায়ে ৮২ থেকে ৯৩ পর্যন্ত ধারায় অপরাধ ও শাস্তি সম্পর্কে বিস্তৃত তথ্য আছে। ২০০৫ সনের সংশোধনও এ-ক্ষেত্রে যুক্ত করা অত্যাবশ্যক। ৮২ নং ধারার মূল বক্তব্য, যদি কেউ চলচ্চিত্র ব্যতিরেকে অন্য কোন ক্ষেত্রের কপিরাইট ইচ্ছাকৃতভাবে লঙ্ঘন করেন বা লঙ্ঘন করতে সাহায্য করেন, ‘তিনি অনূর্ধ চার বৎসর কিন্তু অন্যূন ছয় মাস মেয়াদের কারাদণ্ড এবং অনূর্ধ দুই লক্ষ টাকা কিন্তু অন্যূন পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয়’ হবেন। তবে আদালতে যদি প্রমাণ করা যায় যে, লঙ্ঘনটি বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে  হয়নি, তাহলে আদালত শাস্তির পরিমাণ কমিয়ে দিতে পারেন।

চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে জেল ও অর্থদণ্ড অপেক্ষাকৃত বেশি। এক্ষেত্রে এক বছর থেকে পাঁচ বছর জেল ও এক লক্ষ থেকে পাঁচ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড প্রদেয়, তদুপরি শাস্তি শিথিল করার কোনো অবকাশ নেই।

৮২ নং ধারায় ‘দ্বিতীয় বা পরবর্তী অপরাধের বর্ধিত শাস্তি’ বর্ণিত। প্রথমবার অপরাধ করে শাস্তিভোগের পর কেউ যদি আবার অপরাধ করে তাহলে সেই ব্যক্তি ছয় মাস থেকে তিন বছর কারাদণ্ড ও এক লক্ষ থেকে তিন লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। ৮৪ নং ধারায় কম্পিউটার প্রোগ্রামের লঙ্ঘিত কপি জ্ঞাতসারে ব্যবহারের অপরাধ বর্ণিত হয়েছে। ধারাটির অংশবিশেষ ২০০৫ সালে সংশোধিত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অনূর্ধ চার বছরের কারাদণ্ড ও চার লক্ষ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান আছে। যদি প্রমাণিত হয় যে, লঙ্ঘনটি অব্যবসায়িক কারণে ঘটেছে তাহলে দণ্ড শিথিল করা যেতে পারে।

৮৫ ও ৮৬ নং ধারায় অধিকার লঙ্ঘনকারী প্লেট তৈরি, দখলে ও বিলিবন্টনের শাস্তি পঞ্চাশ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড ও দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড। ৮৭ নং ধারায় রেজিস্টারে মিথ্যা অন্তর্ভুক্তি, মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান ইত্যাদির শাস্তি বর্ণিত হয়েছে অনূর্ধ দুই বছর কারাবাস ও দশ হাজার টাকা জরিমানা। ৮৮ নং ধারায় ‘প্রতারিত বা প্রভাবিত করিবার উদ্দেশ্যে মিথ্যা বিবৃতি প্রদান’ সম্পর্কিত শাস্তি অনূর্ধ দুই বছর কারাবাস ও পঁচিশ হাজার টাকা জরিমানা। ৮৯ নং ধারায় ‘প্রণেতার মিথ্যা কর্তৃত্ব আরোপ’-এর শাস্তি অনূর্ধ দুই বছর কারবাস ও পঁচিশ হাজার টাকা জরিমানা। এ ধারাটি লেখক, প্রণেতা, সুরকার, গীতিকার, পারফরমার, চিত্রকর, কম্পিউটর নির্মাতা, চলচ্চিত্রকার প্রমুখের জন্য বিশেষভাবে প্রযোজ্য। ৯০ ধারায় আইনের ৭১ ধারা লঙ্ঘনপূর্বক রেকর্ড বা ভিডিও চিত্র তৈরির শাস্তি অনূর্ধ তিন বছর কারাদণ্ড ও তিন লক্ষটাকা জরিমানা। ৯১ ধারায় বলা হয়েছে কোনো কোম্পানীর অপরাধের ক্ষেত্রে  কোম্পানীর দায়িত্বে নিয়োজিত ও কোম্পানীর নিকট দায়ী ব্যক্তিসকল দোষী বিবেচিত হবেন। তবে তদন্ত শেষে নির্দোষ ব্যক্তি অব্যাহতি পেতে পারেন। ‘কোম্পানী’ বলতে কোন বিধিবদ্ধ সংস্থা বা অন্য কোন সমিতি বোঝাবে। ৯২ ধারা অনুযায়ী দায়রা জজ আদালত অপেক্ষা নিম্নতর কোন আদালত বর্ণিত অপরাধ বিচারার্থ গ্রহণ করবে না। ৯৩ ধারামতে সাব ইন্সপেক্টরের নিম্নে নয় এমন যে কোন পুলিশ কর্মকর্তা গ্রেফতারি পরোয়ানা ছাড়াই লঙ্ঘিত অনুলিপি জব্দ করে যত দ্রুত সম্ভব একজন ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে উপস্থাপন করবেন।

আমরা শুরুতেই বলেছি, বর্তমান পরিস্থিতিতে কপিরাইট আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও পাইরেসি রোধকল্পে বিশেষ সরকারি নির্দেশবলে র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটেলিয়নের (র‌্যাব) সম্পৃক্ততায় যে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টাস্ক ফোর্স গঠন করা হয়েছে, তা বর্তমান সরকারের যুগোপযোগী পদক্ষেপ। এই টাস্কফোর্সকে সকল প্রকার হস্তক্ষেপ ছাড়া স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়াই যুক্তিযুক্ত। আমাদের অনেক শুভ উদ্যোগই অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপের কারণে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। আমরা তার পুনরাবৃত্তি চাই না।

আমরা চাই, সংশ্লিষ্ট সকল ক্ষেত্রের প্রতিনিধি নিয়ে এই টাস্ক ফোর্স বাংলাদেশের সর্বত্র অভিযান পরিচালনা করবে। তারা সনাক্তকৃত অপরাধীর বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

এই টাস্কফোর্সের কার্যকারিতার উপরেই বাংলাদেশে কপিরাইট প্রয়োগের সফলতা বহুলাংশে নির্ভরশীল। টাস্কফোর্সের কার্যক্রম ন্যুনতম তিনটি ধাপে পরিচালিত হতে পারে : (ক) সচেতনতা সৃষ্টির জন্য সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও গণযোগাযোগ; (খ) অভিযান পরিচালনার আগে সংশ্লিষ্ট সকলের জন্য সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি জারি এবং (গ) সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে ঝটিকা অভিযান পরিচালনা ও অপরাধীদের তাৎক্ষণিকভাবে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান। নিয়মিত এই কার্যক্রম পরিচালিত হলে পরিস্থিতি অবশ্যই উন্নততর হবে। বাংলা একাডেমী আয়োজিত আমর একুশে গ্রন্থমেলা  ও মেধাস্বত্ব বাংলা একাডেমীর এই বইমেলার ভ্রুণাবস্থার আগের কথাও স্মরণ না করে উপায় নেই। সেটি শুরু হয়েছিল একুশে ফেব্র“য়ারি উপলক্ষে স্মরণিকা প্রকাশ ও বিক্রয়ের মাধ্যমে। আর তার উৎসলগ্ন কমপক্ষে ১৯৫৩ সাল, যখন প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক কর্মী ও প্রকাশক মরহুম মোহাম্মদ সুলতান তার ‘একুশে ফেব্র“য়ারি’ শীর্ষক ঐতিহাসিক স্কংলনটি প্রকাশ করেন।

একুশকন্দ্রিক সৃষ্টিশীলতাই বলি, প্রাতিষ্ঠানিকতাবিরোধী লিটল ম্যাগাজিনই বলি কিংবা একুশে ফেব্রুয়ারি বিষয়ক প্রথম প্রামাণ্য প্রকাশনা, যা-ই বলি না কেন, এই সঙ্কলনটিই বাংলাদেশে সৃষ্টিসৃষ্টিশীলতার নবায়নের ক্ষেত্রে উৎসদলিল। আর এখানেই উপ্ত আছে আমাদের বইমেলারও আদিবীজ। সেই বীজ কালক্রমে আরো বীজের জন্ম দিয়েছে, বিশেষত ষাটের দশকে। এই দশকে যেমন শুরু হয়েছে লিটল ম্যাগ আন্দোলন, তেমনি একুশকেন্দ্রিক সঙ্কলন প্রকাশনার অভূতপূর্ব জোয়ার। প্রথমে প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠন, তারপর সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান,আর সবশেষে বাংলাদেশের প্রতিটি জেলাশহরে ছোট-বড় প্রায় সব সংগঠন একুশ উপলক্ষে বের করেছে অন্তত একটি সংকলন। এটিকে বলা যেতে পারে দেশজোড়া  একুশবাহিত সৃষ্টিবিপ্লব।

বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে শহীদ মিনার স্থাপিত হওয়ার বদৌলতে এই বিপ্লব বিবর্তিত ও পরিবর্তিত পর্যায়ে দেশের তৃণমলীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। ‘সৃষ্টি করো, প্রকাশ করো, বিনিময় করো, বিক্রি করো, পৌছে দাও’ … তারুণ্যের এই সৃষ্টদ্রোহেরই পরিকল্পিত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ বাংলা একাডেমী আয়োজিত বইমেলা, যার প্রাতিষ্ঠানিক নামকরণ ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’। পুরো সত্তুরের দশক এই মেলার আয়োজন হয়েছে অনানুষ্ঠানিকভাবে। একদিকে শহীদ মিনার, দোয়েল চত্বর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল, কলাভবন, আজিমপুর গোরস্থানকে ঘিরে চলেছে প্রভাতফেরি ও সংকলনফেরি, অন্যদিকে একুশের প্রত্যক্ষ ফসল জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রতীক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমীর ভিতরপ্রাঙ্গনে এসে উপচে পড়েছে সেই জনস্রোত ও সৃষ্টিস্রোত। সকল সংশয়ের  ঊর্ধে উঠে বাংলা একাডেমী মায়ের আদরে বুকে টেনে নিয়েছে সেই সন্ততিপ্রবাহ। এভাবে বাংলা একাডেমী যথার্থ অর্থেই হয়ে উঠেছে আমাদের জাতিসত্তার, তার সৃষ্টিবৈচিত্রের মিলনমোহনা। আদিতে যা ছিল প্রাণোচ্ছ্বাস, ক্রমে ক্রমে তাই হয়ে উঠলো বুদ্ধিশাসিত ও পরিকল্পিত বাস্তবতা।

বাংলা একাডেমী, প্রকাশক সম্প্রদায় আর জাতীয় গ্রন্থের ত্রিপাক্ষিক সহযোগিতায় বাংলা একাডেমীর ভেতর প্রাঙ্গনেই শুরু হলো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ভিত্তিক বইমেলা, যেখানে কেবল বাংলাদেশে রচিত ও প্রকাশিত বই বিক্রি করা হবে। এই বইমেলার অনন্যতা এখানেই যে, এটি কোনো আন্তর্জাতিক বইমেলা নয়, বরং আমাদের জাতীয় বইমেলা। আশির দশকের পুরোটা সময় জুড়ে দেশের প্রতিষ্ঠিত প্রকাশকদের পাশাপাশি নবাগত সৌখিন প্রকাশকরা এই মেলাকে ক্রমেই একটি ভিন্নমাত্রায় উন্নীত করতে সাহায্য করেছে।

সত্তর-দশকের শেষদিকে যেখানে সাত-আটজন প্রকাশক বই বিক্রি করেছেন, সেখানে আশির দশকের শেষাশেষি অংশগ্রহণকারী স্টলের সংখ্যা দুশ ছাড়িয়ে যেতে থাকে। তারপর স্বৈরতন্ত্রবিরোধী গণআন্দোলন আমাদের সৃষ্টিশীলতার পাশাপাশি আমাদের প্রকাশনা শিল্পকেও বহুগুণ উচ্চকিত করে তোলে। এসময় নবপ্রজন্মের সৌখিন প্রকাশকরা বর্ধিত হারে এগিয়ে আসে, কম্পিউটার প্রযুক্তির সম্প্রসারণের ফলে বইমুদ্রণ ও প্রকাশ আরো সহজ হয়ে ওঠে, বাংলাবাজারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভার্সিটি সংলগ্ন আজিজসুপারমার্কেট বইব্যবসার নতুন কেন্দ্র গড়ে ওঠে, আর তার চাপ পড়ে অমর একুশে গ্রন্থমেলার উপর। স্বৈরাচারের পতনের পর এই অবস্থা সামাল দেয়াই কষ্টকর হয়ে ওঠে। নব্বুই-দশকের শুরুতেই বাংলা একাডেমীর ভেতরপ্রাঙ্গণে মেলার স্থান সঙ্কুলান প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তবু ২০১৩ সাল পর্যন্ত ভেতর-প্রাঙ্গণেই আছে।

এই মেলায় বর্তমানে গড়ে প্রায় তিন হাজারের  মতো বই প্রকাশ হয়ে আসছে। এর অধিকাংশ মেধাস্বত্ব অনুসারে যথার্থ অর্থে বই কিনা তা প্রশ্নসাপেক্ষ। টাকা থাকলেই একজন ব্যক্তি গদ্যে বা পদ্যে তিন ফর্মার একটি বই ছেপে গ্রন্থকার হয়ে যাচ্ছেন। কেউ অন্যের রচনা সঙ্কলন করে নিজের নাম সম্পাদক না লিখে গ্রন্থকার হিসেবে ছেপে দিচ্ছেন। তারপর গ্রন্থমেলায় একজন প্রসিদ্ধ সাহিত্যিকের দ্বারস্থ হয়ে মোড়ক উন্মোচন করে সাহিত্যিক অভিধা গ্রহণ করছেন। এই প্রবণতাকেও ন্যুনতম নিয়মের মধ্যে আনা জরুরি। মোড়ক উন্মোচনের সম্মতি ও ঘোষণা দেয়ার আগে কর্তৃপক্ষ একটি বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে বইটির গুণাগুণ প্রাথমিকভাবে বিচার করে দেখতে পারে। আর এজন্যে বইটি কমপক্ষে তিনদিন আগে জমা দেয়ার বিধান রাখা যেতে পারে। যতই অপ্রিয় হোক, এর মাধ্যমে মেলায় প্রকাশিত প্রমিত গ্রন্থসমূহের একটি তালিকা প্রণয়ন করা সম্ভব হবে। আসলে মেলায় প্রকাশিত ও বিক্রয়যোগ্য প্রতিটি নতুন গ্রন্থ একাডেমী কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেয়ার বিধান মেলার নীতিমালায় রাখা ও কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা যুক্তিযুক্ত। মেধাস্বত্ব সংরক্ষণ ও বইটির মৌলিকতা নির্ণয়েও এটি জরুরি।  এটি করা সম্ভব হলে মেলায় অবৈধ ও বিদেশী বইয়ের অননুমোদিত বিক্রয় বন্ধ হয়ে যাবে। তারপরের কথা লেখক-প্রকাশক সম্পর্ক। বাংলাদেশের জনপ্রিয় ও কাটতি-ভালো অধিকাংশ লেখকের সঙ্গে প্রকাশকদের সম্পর্ক ভালো। কেননা সেক্ষেত্রে প্রকাশকরাই অগ্রণী হয়ে লেখকদের বাড়িতে ধর্ণা দিয়ে থাকেন এবং তাদের সঙ্গে মৌখিক বা লিখিত চুক্তির মাধ্যমে প্রাপ্য মিটিয়ে বই প্রকাশ ও বিপণন করে থাকেন। পদাসীন, ক্ষমতাবান ও আমলা লেখকদের সঙ্গেও প্রকাশকরা মেয়াদী সম্পর্ক ভালোভাবে বজায় রাখেন। একাধিক প্রকাশককে তাদেঁর পেছনে লেগে থাকতেও দেখেছি। তাঁরা রয়্যালটিও পেয়ে যান প্রায়-তাৎক্ষণিক। ক্ষমতাবদল ও অবসরগ্রহণের পর ব্যাপারটা পুরোপুরি উল্টে যেতে দেখেছি। যাঁরা নিজের পয়সা খাটিয়ে প্রকাশকদের দিয়ে বই প্রকাশ করেন তাদের সঙ্গে প্রকাশকদের সম্পর্ক মিশ্র। অধিকাংশ প্রকাশক বই ছেপে কথামত লেখককেই বই সরবরাহ করেন। বাকি সামান্য সংখ্যক বই নিজ প্রকাশনার তালিকা দীর্ঘ করার ক্ষেত্রে কাজে লাগান। কেউ কেউ লেখককে যৎসামান্য বই সরবরাহ করে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। বিদেশবাসী লেখকদের ক্ষেত্রে এমনটি বেশি হয়ে থাকে বলে শুনেছি। আবার যে সব বিদেশবাসী লেখক প্রভাব প্রতিপত্তিতে এগিয়ে আছেন এবং য়ুরোপ-আমেরিকায় মেলাটেলার আয়োজন করে থাকেন, তাদের সঙ্গেও সঙ্গতিসম্পন্ন প্রকাশকরা সুসম্পর্ক বজায় রাখেন। এরা চুক্তিফুক্তির পরোয়া করে না। তবে সবচেয়ে অবমাননাকর অবস্থার সম্মুখীন বৃহৎ সংখ্যক নিরীক্ষাপ্রিয় ও মৌলিক লেখক, যারা পাঠকপ্রিয়তা বা জনপ্রিয়তার ধার ধারেন না। প্রকাশকরা অনুগ্রহ করে তাদের পুস্তক প্রকাশ করে নিজেদের ইমেজ বাড়ালেও তাদের সঙ্গে সম্মানজনক চুক্তি সম্পাদন ও  রয়্যালটি প্রদানে অনীহ। এরাই চরম দুর্ভোগের শিকার। আমাদের সমাজে এখনো ষাটোর্ধ অনেক মৌলিক কবিসাহিত্যিক আছেন যাদের রচনাসংগ্রহ বা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গ্রন্থ প্রকাশকদের আনুকূল্যে প্রকাশিত হয়নি। অথচ দেখা যায়, মৃত্যুর পর হঠাৎ করেই তাদের বই প্রকাশে কিছু কিছু প্রকাশক উৎসাহী হয়ে ওঠেন। আমার ষ্পষ্ট মনে পড়ে অকালপ্রয়াত কবি হুমায়ুন কবিরের কথা। আমি তার ‘কুসুমিত ইস্পাত’ প্রকাশের প্রস্তাব নিয়ে খানব্রাদার্সের কাছে যাই। খান  সাহেব এই অপরিচিত নতুন কবির বই প্রকাশ করতে অনীহা প্রকাশ করেন। কিন্তু তার মৃত্যুর পর ব্যাপক প্রচারণার পরিপ্রেক্ষিতে খান ব্রাদার্স থেকেই বইটি প্রকাশিত হয়। আমাদের অনেক প্রতিভাবান  ষাটোর্ধ কবির কাব্যসমগ্র এখনো কোনো প্রকাশক প্রকাশ করার আগ্রহ দেখাননি বলে জেনেছি। স্বীকার্য, প্রকাশক নিশ্চিত ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে কোনো বই প্রকাশ করবেন না। আমাদের অধিকাংশ প্রকাশকরা তাৎক্ষকি কাউন্টার বিক্রি ছাড়া উন্নততর পরিবেশনা প্রক্রিয়ায় প্রশিক্ষিত নন। ফলে নতুন বা অর্জনপ্রিয় মৌলিক লেখকের পৃষ্ঠপোষকতায় তারা অনাগ্রহী। যারা আগ্রহী হয়ে ওঠেন তাদের অনেকেই আবার এটাকে অনুগ্রহ করছেন ভেবে আত্মতৃপ্তিতে ভোগেন। তবে ব্যতিক্রম আছেন ঐতিহ্যবাহী প্রকাশকরা। তাদের ভেতর আদর্শস্থানীয় ব্যক্তির নাম স্বর্গত চিত্তরঞ্জন সাহা  বা প্রবীণ মহিউদ্দিন আহমদ, যারা তাদের প্রতিটি প্রকাশনার জন্য সংশ্লিষ্ট লেখকের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন করেন এবং চুক্তিমোতাবেক এককালীন বা সময়ে সময়ে লেখক সম্মানী প্রদান করেন। এক্ষেত্রে নতুন প্রজন্মেন আরো অনেকের নাম করা যেতে পারে যারা মেধাস্বত্ব আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। যে  বই  মেধাস্বত্ব মেনে লেখা হয়নি সেটি যেমন পাইরেটে বই, তেমনি যে বই মেধাস্বত্বের সংশ্লিষ্ট বিধান মেনে প্রকাশিত হয়নি সেটিও পাইরেটে বই। প্রথম ক্ষেত্রে দায়ী স্বয়ং লেখক, দ্বিতীয় ক্ষেত্রে প্রধানত প্রকাশক। বাংলা একাডেমী আয়োজিত আমাদের সৃষ্টিশীলতার এই মহান মিলনমেলাকে পাইরেসি বা মেধাস্বত্ব লঙ্ঘনের দায় থেকে মুক্ত করতে হলে লেখককে লিখতে হবে তার মৌলিক বই আর প্রকাশককে প্রকাশক করতে হবে লিখিতভাবে সম্পাদিত  চুক্তিভিত্তিক বই। সেই চুক্তির ভারসাম্যময় শর্ত কী হবে তা নির্ধারণ করবেন সংশ্লিষ্ট লেখক-প্রকাশক। ভারসাম্যহীন একপাক্ষিক চুক্তিও আইনের চোখে নিপীড়নমূল বিধায় অগ্রহণীয়। চুক্তির নমুনাও বাংলা একাডেমী থেকে সংগ্রহ করা যেতে পারে, কেননা একাডেমী প্রকাশিত প্রতিটি বইয়ের ক্ষেত্রে একটি প্রমিত নমুনার  ভিত্তিতে এই চুক্তি সম্পাদন করা হয়। লেখক নিজের বইয়ের প্রকাশক হলে চুক্তির প্রশ্ন ওঠে না। তবে আমাদের প্রকাশনা শিল্পের কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পদার্পণের এই সন্ধিক্ষণে প্রকাশনাকে আনুষ্ঠানিক শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে হলে লেখক প্রকাশক সুষম চুক্তিসম্পাদনের কোনো বিকল্প আছে বলে মনে করি না। আশার কথা, আমাদের জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সম্প্রদায়ও আমাদের সঙ্গে একমত। চুক্তি যে লেখকদের চেয়ে প্রকাশকদেরই অধিক প্রয়োজন তা নবীন-প্রবীণ, সৌখিন-পেশাদার সকল প্রকাশককেই বুঝতে হবে। তাই কোনো গৃহীত পা-ুলিপি বই হিসেবে প্রকাশ করার আগে প্রকাশককে নিজের স্বার্থেই চুক্তি সম্পাদন করতে হবে। মনে রাখা প্রয়োজন, মেধাস্বত্ব আইন অনুযায়ী চুক্তি বা নিবন্ধন ছাড়াও রচয়িতা তাঁর রচনার মালিক, কিন্তু রচয়িতার সঙ্গে বৈধ লিখিত চুক্তি ছাড়া প্রকাশক তাঁর প্রকাশনা-স্বত্বের অধিকারী হতে পারেন না। তাই লেখক ও প্রকাশকদের মধ্যে সুসম্পর্ক ও সৌহার্দ্য বজায় রাখার পাশাপাশি  প্রকাশকের অধিকার ও ব্যবসায়িক নিরাপত্তার জন্যেই এই চুক্তি সর্বাধিক জরুরী।  আসুন, আমরা অনানুষ্ঠানিকতা থেকে আনুষ্ঠানিকতায় প্রবেশ করি, সৌখিনতা থেকে পেশাদারিত্বে পা বাড়াই। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি হস্তক্ষেপের আগেই আমরা আমাদের স্বেচ্ছাশৃঙ্খলায় শ্রদ্ধাবান হই। গ্রন্থের ক্ষেত্রে মেধাস্বত্ব সুরক্ষার জন্য এর কোনো বিকল্প নেই। এত লেখকদের চেয়ে প্রকাশকরই অধিক সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবেন। তাই আমাদের সকলের সুষম প্রচেষ্টায় সব বইমেলাই শতভাগ মেধাস্বত্ববান বইমেলায় রূপান্তরিত হোক। এটি হলে দেশে পাইরেসির প্রতাপ অনেক কমে যাবে।

সুরক্ষা সুরক্ষার জন্যে কিছু অন্ত-সম্পর্কযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ অনস্বীকার্য। যেমন, (১) মেধাস্বত্ব সম্পর্কে সকল পক্ষের মধ্যে স্পষ্ট ধারণার বিস্তার ও বিভ্রান্তি-মুক্তির উদ্যোগ; (২) যথাযথ আইন প্রণয়ন ও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এই আইনের দ্রুত পরিবর্তন; (৩) আইন সম্পর্কে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট সকল মহলের উপলব্ধি ও বাস্তবায়নের সদিচ্ছা; (৪) বাস্কবায়নের জন্যে যথাযথ সরকারি পদক্ষেপ ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগগ্রহণ;  (৫) পাইরেসির বিরুদ্ধে অভিযান;  (৬) পৃথক আইপি আদালত গঠন ও দ্রুততম সময়ে সুবিচার প্রদান; (৭) মেধাস্বত্ব সুরক্ষার ফসল যথাসময়ে ও প্রক্রিয়াগতভানে সকল উপকারভোগীর মধ্যে বিতরণ করার জন্যে প্রতিটি ক্ষেত্রে কপিরাইট সোসাইটি গঠন। এই পদক্ষেপসমূহের মধ্যে আরো সম্পর্কযুক্ত অণুপর্যায় থাকতে পারে। যা-হোক, এই পর্যায়গুলো গৃহীত হলে সুরক্ষা ত্বরান্বিত হবে নিঃসন্দেহে।

সুফল প্রাপ্ত সুফল সাধারণত অর্থিক, একোেেডমিক ও  ভাবমূর্তিগত।  কেবল মেধা-সম্পদের সুরক্ষা দিয়েই যে একটি জাতি পৃথিবীতে আর্থিক ও অন্যান্য দিক দিয়ে শীর্ষে আরোহণ করতে পারে, তার উদাহরণ জাপান। সৃষ্টিশীলতা ও প্রতিনিয়ত উদ্ভাবনশীলতা এবং অনবিলম্বে তার সুরক্ষা দিয়ে দেশের ভিতরে ও বাইরে থেকে সম্পদ ও সুনাম আহরণ করছে এই দেশটি। তাই মেধা-সম্পদের সুরক্ষাকেই তারাই জাতীয় আয়ের প্রধান নিয়ামক মনে করে এবং প্রতি বছর এই আইন নবায়ন করে। আমাদের ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটতে পারে। আমারা আমাদের ট্র্যাডিশনাল সম্পদকে সহজেই সুরক্ষা দিতে পারি; আর তাকে নবায়িত করে, কিংবা নতুন সৃষ্টি ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে তজ্জাত নতুন পণ্য (মূর্ত বা বিমূর্ত) বাজারজাত করে দেশবিদেশ থেকে সম্পদ আহরণ করতে পারি। বলা বাহুল্য, প্রাকৃতিক সম্পদ, যেমন তৈল, গ্যাস, কয়লা, খনিজ পদার্থ ইত্যাদি সীমাবদ্ধ; কিন্তু মানুষের সৃষ্টি-ক্ষমতা অসীম ও যুগে যুগে তা নবায়নপ্রবণ। এর সাহায্যেই আমরা আমাদের দেশে প্রাকৃতিক সম্পদ, যেমন ধানের ফলন, বাড়িয়েছি। বিজ্ঞান ও কারিগরী উদ্ভবনীর ক্ষেত্রে আমাদের অর্জন এখনো  অতি সীমিত। প্রকারান্তরে শিল্পে-সাহিত্যে-সক্সগীতে আমাদের অর্জন উল্লেখযোগ্য। এ-সব সৃষ্টি ও উদ্ভাবনাকে সুরক্ষা দিলে তার সুফল হতে পারে অভাবনীয়। প্রতিটি ক্ষেত্রে একটি মূল্যানয়ন-জরিপ করা গেলেই সুফলের পরিমাণটাও অনুধাবন করা যাবে। সবচেয়ে বড় কথা, একবিংশ শতাব্দীর এই মেধাস্বত্ব প্রতিযোগিতার যুগে কেবল অনুকারক ও অনুকম্পাকামী জাতি হয়ে টিকে থাকা যেমন অসম্ভব, তেমনি অনাকাক্সিক্ষত। আমাদের সৃষ্টিশীলতা বাড়িয়ে আমরা ক্রমে অন্যদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমে আমাদের নিজেদের চাহিদা নিজেরাই মেটাতে পারি। তারপর আমাদের অর্জন সম্প্রসারিত হতে পারে অন্যান্য দেশেও। চীন-কোরিয়ার উদাহরণ তো আমাদের সামনেই আছে। আর আছে আমাদের ধান গবেষণা ও তার সুযোগ্য বিজ্ঞানীরা। এই মুহূর্তে অন্তত আমাদের কপিারাইটের ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে প্রকাশনা, কম্পিউটার প্রোগ্রাম, সঙ্গীত, চিত্রকলা, লোকসৃষ্টি ইত্যাদি ক্ষেত্রে সৃষ্টি ও উদ্ভাবনার  সুরক্ষা প্রদান করা হলে আগামী এক দশকেই আমরা যে আর্থিক সফলতা লাভ করবো, তাতে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে মধ্য-আয়ের দেশে পরিণত হতে পারে। আমরা ইতিমধ্যেই অনেক এগিয়েছি। আমাদের মেধাস্বত্ব চর্চা আমাদেরকে  ঈপ্সিত গন্তব্যে পৌঁছতে সাহায্য করবে।

কপিরাইট সম্পর্কে সর্বস্তরের অংশীজন বা স্টেকহোল্ডারের সমন্বিত উদ্যোগ সফল হোক, জাতি সৃষ্টিশীলতার প্রতি ক্রমেই শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠুক। অন্যের অবৈধ অনুকৃতি নয়, স্বোদ্ভাবিত সৃষ্টিকর্ম, তার সামষ্টিক স্বীকৃতি ও সুষম উপকার-বণ্টনই হোক আমাদের টেকসই প্রবৃদ্ধির স্থায়ী সূচক। আমরা মনে করি ব্যাপকহারে সচেতনা বৃদ্ধি, প্রাথমিক পর্যায় থেকে এ বিষয়ে পরিকল্পিত জ্ঞানানুশীলন, শিক্ষাদান, প্রশিক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে বাংলাদেশকে মেধাস্বত্ববান জাতি হিসেবে গড়ে তোলার কোন সহজ বিকল্প নেই। আসলে একবিংশ শতাব্দীর বিজয় মানে ব্যক্তিমানুষ, জাতিমানুষ ও বিশ্বমানুষের সৃষ্টিশীলতার সুরক্ষা ও মেধাস্বত্বের বিজয়।

লেখক : মূলত কবি । তাছাড়া প্রাবন্ধিক, ফোকলোরিস্ট, মেধাস্বত্ববিদ, অনুবাদক, কথাসাহিত্যিক, সাহিত্য সংগঠক ইত্যাদি।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close