স্বদেশ জুড়ে

কবর থেকে ফিরে এলাম

সিরাজুল ইসলাম, নূরুজ্জামান, হাফিজ উদ্দিন সাভার থেকে:  চারদিকে অন্ধকার। পাশে পড়ে আছে লাশ। নাকে আসছে দুর্গন্ধ। পানি নেই। তৃষ্ণায় বুক ফেটে যায়। শ্বাস নেয়ার মতো বাতাসও নেই। নিজের শার্ট খুলে নাকের সামনে ঘুরিয়েছি একটু অক্সিজেনের জন্য। এভাবে কেটেছে ৬০ ঘণ্টা। সারাক্ষণ সৃষ্টিকর্তাকে ডেকেছি। কবর থেকে বেরিয়ে ফের সূর্যের আলো দেখবো কখনও ভাবিনি। শেষ পর্যন্ত সৃষ্টিকর্তা আমার ডাক শুনেছেন। উদ্ধারকারীরা আমাকে তুলে এনেছেন মৃত্যুর দুয়ার থেকে। সাভারে ধসে পড়া ভবনে আটকা পড়ার ৬০ ঘণ্টা পর উদ্ধার হওয়া শ্রমিক পিন্টু কুমার সাহা এভাবেই তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তার মতো এমন অসংখ্য মানুষকে ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে গতকাল। উদ্ধার হওয়া তাদের কাউকে ভর্তি করা হয়েছে হাসপাতালে। আবার কেউ প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে ফিরে গেছেন। দুই দিনেরও বেশি সময় খাবার পানি ছাড়া অন্ধকার হাতড়ে বেঁচে থাকা এসব মানুষকে উদ্ধারের ঘটনায় প্রাণ বাঁচানোর আনন্দ ক্ষণিকের জন্য হলেও উদ্ধারকারীদের ভুলিয়ে দেয় সব কষ্ট ক্লান্তিকে। উপস্থিত জনতা একেকটি জীবিত প্রাণ ফিরে পেয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেনি। জীবিত মানুষের সঙ্গে ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে আনা হয়েছে অনেকের নিথর দেহ। লাশ বের করে আনার সময় বিমর্ষতায় কালো হয়ে আসে মানুষের মুখ। উদ্ধারকারীদের চোখে-মুখেও দেখা যায় যন্ত্রণার কালো ছাপ।

নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে এসে এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন পিন্টু জানান, আমি কোন অভাবী লোক না। শখের বশে গত ডিসেম্বর মাসে চাকরিতে যোগ দিয়েছিলাম। ৭ম তলায় নিউওয়েব স্টাইল কারখানায় কাজ করতাম। গতকাল বেলা সোয়া ২টার দিকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের বেডে শুয়ে পিন্টু কথা বলছিলেন। এ সময় হঠাৎ তার স্বজনরা এসে হাজির জরুরি বিভাগে। স্বজনদের দেখেই কান্নায় ভেঙে পড়েন পিন্টু। স্বজনদেরও একই দশা। আবেগে জড়িয়ে ধরেন একে অপরকে। এ যেন এক অভূতপূর্ব আবেগঘন পরিবেশ। তিনি বলেন, আজ থেকে আমি দ্বিতীয় জীবন ফিরে পেলাম। পিন্টু কুমারের বোনজামাই প্রভাত কুমার জানান, ৩ দিন ধরে তাকে খুঁজছিলাম। একবার যাই রানা প্লাজার সামনে। আবার এ হাসপাতাল থেকে ও হাসপাতালে। কোথাও খুঁজে পাচ্ছিলাম না। অধরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে রাখা লাশের সারিতেও খুঁজেছি পিন্টুকে। সে মারা গেছে নাকি জীবিত আছে কিছুই জানতে পারছিলাম না। আধা ঘণ্টা আগেও এনাম মেডিকেল থেকে খুঁজে গেছি। আমার মোবাইল নম্বর পিন্টুর মুখস্থ ছিল। হঠাৎ একজন ডাক্তার এনাম মেডিকেল থেকে ফোন করে বলেন, পিন্টু নামের আপনার স্বজন জরুরি বিভাগে আছে। সে সুস্থ। দ্রুত এখানে এসে আবেগ সামলে রাখতে পারছি না। কি যে ভাল লাগছে বলতে পারব না।

এদিকে ভবন ধসের তৃতীয় দিনেও চলে উদ্ধারের জোর তৎপরতা। তবে উপস্থিত স্বজনরা অভিযোগ করেছেন উদ্ধারের ধীর গতির কারণে অনেককে আর শেষ পর্যন্ত জীবিত উদ্ধার করা যাবে না। তবে উদ্ধারকারীরা জানিয়েছেন, সতর্কতার সঙ্গে তৎপরতা চালানোর উদ্দেশ্য হলো জীবিতদের উদ্ধার। ভেতরে একজন জীবিত থাকা অবস্থায়ও এ তৎপরতা বন্ধ হবে না। গতকাল রাত নয়টা পর্যন্ত ৩১৪ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এ পর্যন্ত জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ২৩৭০ জনকে। গতকাল ৮১ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।

স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে ২৮৬টি লাশ। অজ্ঞাত লাশগুলো সাভারের অধরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে রাখা আছে। এদিকে গতকাল পর্যন্ত ভবন মালিক সোহেল রানা ও গার্মেন্ট মালিকদের গ্রেপ্তার করা যায়নি। তাদের গ্রেপ্তারের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দিয়েছেন। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ জানিয়েছে রানা প্লাজায় যেসব শ্রমিক কাজ করতেন তাদের বেতন আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে পরিশোধ করা হবে। রানা প্লাজার মালিক ও ওই ভবনের গার্মেন্ট মালিকদের শাস্তির দাবিতে গতকাল বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করেছেন গার্মেন্ট শ্রমিকরা। সাভার ট্রাজেডিতে নিহতদের স্মরণে জুম্মার নামাজের পর সারা দেশের সব মসজিদে বিশেষ মোনাজাত করা হয়েছে। অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে হয়েছে প্রার্থনা।

পানি নেই, বাতাস নেই, তবু বাঁচার চেষ্টা: হাসপাতালে চিকিৎসাধীন উদ্ধার হওয়া শ্রমিকরা জানান, একটু পানির জন্য হাহাকার করছেন আটকে পড়া শ্রমিকরা। একজনের পানি কেড়ে নিচ্ছেন অন্যজন। এক ফোটা পানির জন্য হাহাকার করছেন। এমনই বর্ণনা দিলেন গতকাল মৃত্যুকূপ থেকে বের হয়ে আসা সিলেট জেলার কবিতা। এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীস কবিতা কান্নাজড়িত কণ্ঠে সেই রোমহর্ষক দৃশ্যের বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, আমি মাথায় আঘাত পেয়ে অচেতন ছিলাম। কয়েক ঘণ্টা পর চেতনা ফিরে পেয়ে বুঝতে পারি মাথা রক্তাক্ত। নড়াচড়া করতে পারছি না। তখন আমার ডান পাশে এক পুরুষের ওপর ভারি মেশিন পড়ে চ্যাপ্টা হয়ে মারা যান। রক্ত গড়িয়ে আমার পিঠ ভিজে ওঠে। পানি মনে করে মুখে দিতেই রক্তের গন্ধ পাই। পরে হাতড়িয়ে আমার ব্যাগের পানির বোতল বের করি। ছিল অর্ধেক পানি। ওই পানি মুখে দিতে গেলেই ডান পাশে থাকা আরেক চাপা পড়া পুরুষ হাত বাড়িয়ে কেড়ে নিতে চান। না দিলে খামচে শরীরের জামা-কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন। এভাবে কয়েক ঘণ্টা পার হওয়ার পর ওই ব্যক্তি নিস্তেজ হয়ে পড়েন। কবিতা বলেন, আমি উদ্ধার হলেও ওই ব্যক্তিকে উদ্ধার করতে পারেনি কেউ। এখনও তিনি চাপা পড়ে আছেন।

বুধবার রাত আড়াইটার দিকে জীবিত উদ্ধার করা হয় গার্মেন্ট কর্মী তাসলিমা (২০) ও সখিনা (২৫)কে। মাথায় দেয়ালের আঘাত পেয়ে তারা এখন আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সখিনার স্বামী মালেক বলেন, উদ্ধার হওয়ার পর থেকেই আমার স্ত্রী কথা বলতে পারছেন না। বাকশক্তি হারিয়েছেন। ইশারার মাধ্যমে যন্ত্রণা বোঝানোর চেষ্টা করছেন। সুইং অপারেটর হারুন বলেন, আল্লাহ আমার জীবন ফেরত দিয়েছেন। দুদিন নরককূপে বন্দি ছিলাম। নড়াচাড়া করতে পারিনি। দানা-পানি পড়েনি পেটে। যারা উদ্ধার করেছে তাদের কাছে আমি ঋণী।

গতকাল বেলা ১টা ২৫ মিনিটে উদ্ধার করা হয় সবিতাকে। তিনি কাজ করতেন ৭ম তলায় ফিনিসিং বিভাগে। তিনি বলেন, কিভাবে বেঁচে আছি বলতে পারব না। মনে হয় আল্লাহ নিজের হাতে আমাকে বাঁচিয়েছে। আমার আশপাশে কেউ জীবিত ছিল না। সবাই মারা গেছে। আমি একটি মেশিনের নিচে পড়েছিলাম ৫২ ঘণ্টা। চারদিকে লাশের গন্ধ। অক্সিজেন পাচ্ছিলাম না। ভেতর থেকে আমি বাঁচার জন্য আকুতি করছিলাম। বাইরে মানুষের কোলাহল শুনছিলাম। আমার আকুতি বোধ হয় বাইরে আসছিল না। অন্ধকারের কারণে কিছু দেখতে পারছিলাম না। নিঃশ্বাসও নিতে পারছিলাম না। আমার ওপরে ছাদ, নিচে ফ্লোর। সামান্য ফাঁকা জায়গায় উপুড় হয়ে ছিলাম। ওপর থেকে ছাদ আরেকটু ধসে পড়লেই আমাকে আর খুঁজে পাওয়া যেতো না। যে কোন সময় ছাদ আমার ওপর ধসে পড়ার আশঙ্কা ছিল। সবিতা বলেন, আমার গ্রামের বাড়ি রাজশাহীর মতিহার থানার বাদুরতলা গ্রামে। রাজমিস্ত্রি স্বামী শাহেদুল এখনও জানে না যে আমি বেঁচে আছি।

রানা প্লাজার চতুর্থ তলায় কর্মরত বাবলুকে উদ্ধার করা হয় গতকাল বেলা দেড়টার দিকে। বাবলু বলেন, দীর্ঘ ৫০ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে কোন নড়াচড়া করতে পারিনি। প্রচণ্ড গরম। মারাত্মক দুর্গন্ধ। কোন কিছুই সহ্য করতে পারছিলাম না। সামান্য একটু ফাঁকা জায়গায় ২০-২৫ জন পুরুষ-মহিলা একসঙ্গে ছিলাম। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে মৃত্যুর প্রহর গুনছিলাম। চোখের সামনে মারা গেছে অনেকে। মৃত্যু কত ভয়ানক তা নিজ চোখে উপলব্ধি করেছি। মরার আগে মানুষ বাঁচার জন্য কত আকুতি, কত চেষ্টা চালায় তা নিজ চোখে দেখিছি। আমার চারপাশে ছিল লাশ। ভেবেছিলাম কিছুক্ষণের মধ্যে আমিও লাশ হয়ে যাব। এর চেয়ে ভয়াবহ দৃশ্য আর কি হতে পারে? বাবলু বলেন, কখনও ভাবিনি আমি বাঁচতে পারবো। আল্লাহ নিজ হাতে আমাকে বাঁচিয়েছে। বুধবার রাত ১২টার পর থেকে বুঝতে পারছিলাম বাইরে থেকে আমাকে উদ্ধারের চেষ্টা হচ্ছে। তখন মনের মধ্যে বাঁচার আশা জেগে উছে। এর পরও ১২-১৩ ঘণ্টা কেটে যাওয়ায় মনে হচ্ছিল- বাইরে থেকে আমাদের সঙ্গে তামাশা করা হচ্ছে। তিনি জানান, আমার গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জের মধ্যনগর থানার রূপনগর গ্রামে।

সবুরা আক্তার নূপুর (২৫) বলেন, ভবন ধসে পড়ার শব্দ শুনেই বাঁচার জন্য দৌড়াই। দেয়াল থেকে একটি ইট কানে এসে পড়ে। এরপর আর কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না। চারদিকে অন্ধকার। একপর্যায়ে শুয়ে পড়ি। একটি শেলাই মেশিন এসে বুকের ওপর পড়ে। আমি মেশিনের নিচেই পড়ে থাকি। পানির ট্যাঙ্কি ফেটে ফ্লোর ভিজে গিয়েছিল। শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে রক্ত বের হচ্ছিল। প্রচণ্ড পানি পিপাসা লাগছিল। ভেজা ফ্লোরে ওড়না ভিজিয়ে চুষে চুষে পানি খাচ্ছিলাম। একদিন পর্যন্ত বাঁচাও বাঁচাও করে চিৎকার করছিলাম। এরপর বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়ে নিথর হয়ে পড়ে থাকি। ভবন থেকে যখন টেনে-হিঁচড়ে বের করা হয় তখন মনে হচ্ছিল জীবনটা চলে যাচ্ছে। তিনি জানান, আমরা এক সঙ্গে ১০-১২ জন ছিলাম। একজনের কাছে মোবাইল ফোন ছিল। ১৫-২০ মিনিট মোবাইলের নেটওয়ার্ক ছিল। ওই সময়ে তিনি বাঁচার জন্য বাইরে যোগাযোগ করছিলেন। এরপর মোবাইলের নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে যায়। তিনি জানান, আমি ৪র্থ তলায় সহকারী হিসেবে কাজ করতাম। ৪ মাস আগে কাজে যোগ দিয়েছি। ২ মাসের বেতনই বকেয়া। বাড়ি বগুড়ার নন্দীগ্রামের বেউলা গ্রামে। আমার ১ বছর বয়সী একটি ছেলে এবং ৭ বছর বয়সী একটি মেয়ে রয়েছে।

সুড়ঙ্গ পথে উদ্ধার: ধসে পড়া ভবনের ভেতর থেকে জীবিত অথবা মৃতদেহ উদ্ধারের জন্য উপর থেকে মেশিনের মাধ্যমে ছাদ ফুটো করে নিচের দিকে নামছেন উদ্ধারকর্মীরা। ছোট ছোট এ রকম ৮টি সুড়ঙ্গ পথে বের করে আনা দেহগুলোর মধ্যে কোনটিতে আছে প্রাণের স্পন্দন, কোন কোনটি পচে ফুলে উঠেছে। বাতাসে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। উদ্ধারকর্মীরা জানান, আরও ধসের ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে তারা ভারী যন্ত্র ব্যবহার করতে পারছেন না। ফলে ড্রিল মেশিন আর রড কাটার যন্ত্র দিয়ে উপর থেকে ধসে পড়া প্রতিটি তলা ফুটো করেই জীবিত অথবা মৃতদের সন্ধান করা হচ্ছে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, ভবনটি পুরোপুরি ধূলায় মিশিয়ে যাওয়া রোধে ছাদ ফুটো করা ছাড়া কোন উদ্ধার অভিযান চালানো যাচ্ছে না। এজন্য ধসে পড়া ভবনের উপর দিকে ফুটো করে সুড়ঙ্গপথে সেনাসদস্য ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের সঙ্গে উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়েছেন সাধারণ মানুষও। ভবন ধসের পর থেকেই উদ্ধার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। ধ্বংসস্তূপ থেকে যেসব লাশ বেরুচ্ছে সেগুলোর বেশিরভাগই পচে-ফুলে গেছে। দুর্গন্ধের মধ্যে সুড়ঙ্গগুলোতে কাজ করতে এয়ার ফ্রেশনার ছিটাতে হচ্ছে। কোন লাশ বের করে অ্যাম্বুলেন্সে অথবা ট্রাকে নেয়ার সময়ও এয়ার ফ্রেশার ছিটাতে হচ্ছে। জীবিতদের উদ্ধারে আজও পর্যন্ত ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি চলবে বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক জাহিদুল ইসলাম।

আর এস টাওয়ারে কম্পন, আহত ৩৫:  সাভারে ধসে পড়া রানা প্লাজার পাশের ভবন ‘কেঁপে ওঠার’ খবরে হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে সাংবাদিক আবদুল হালিমসহ আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৩৫ জন উদ্ধারকর্মী। গতকাল সকালে রানা প্লাজার পেছনে ষষ্ঠ তলা আর এস টাওয়ার থেকে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছিলেন সেনাবাহিনীসহ উদ্ধারকর্মীরা। এ সময় ভবনটি হঠাৎ কেঁপে উঠেছে বলে মনে হওয়ায় উদ্ধারকর্মীরা দৌড়ে বের হতে শুরু করেন। তখন হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে পদদলিত হয়ে কমপক্ষে ৩৫ জন আহত হয়েছেন। আহতদের সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন ক্লিনিকে নেয়া হয়েছে।

ওরা অকুতোভয়: ওরা অকুতোভয়। নেই প্রতিদানের আশা। নেই কোন প্রশিক্ষণ। নেই জীবনের মায়া। তবুও ওরা মৃত্যু ঝুকি নিয়ে কাজ করছেন। প্রকৃত ত্রাণকর্তার ভূমিকায় আবির্ভূত হয়েছেন।  অসহায়  ও বিপন্ন জীবনের মুক্তির নেশায় নিজের জীবনকে ফেলেছেন ঝুঁকির মধ্যে। অবিশ্বাস্য সাহসিকতায় ধ্বংসস্তূপের সুড়ঙ্গ কেটে  একে একে বের করে আনছেন জীবন্ত প্রাণ। এমন অকুতোভয় অন্তত বিশটি স্বেচ্ছাসেবক দলের তরুণ রাত-দিন অবিশ্রান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। উদ্ধারকর্মী আবু বকর সিদ্দিক বলেন, জীবিত একটি প্রাণ উদ্ধারের পরপরই সাহস ও শক্তি সঞ্চারিত হচ্ছে তাদের মনে। মিরপুর আজমত গ্রুপের একটি গার্মেন্টের সুপারভাইজার মাসুদ রানা। বয়স বাইশের কোঠায়। ভবন ধসের খবর শুনেই ছেড়েছেন চাকরি। যোগ দিয়েছেন ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রাণ বাঁচানোর কাজে। তিনি বলেন, গতকাল সকাল থেকে দুপুর একটা পর্যন্ত দুই মহিলা ও একজন পুরুষ কে উদ্ধার করেছি। ভবনের নিচতলায় কেচি গেটের কাছে আরও তিন জন মানুষের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। তাদের উদ্ধার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। ৫২ ঘণ্টা পর ধ্বংসস্তূপের তৃতীয় তলা থেকে উদ্ধার হয়েছেন প্যাকিং ম্যান পিন্টু সাহা (৩৩) ও সবিতা (৪৫)। দুপুর একটার দিকে সুরঙ্গ কেটে চতুর্থ তলা থেকে তাদের জীবিত উদ্ধার করে এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। উদ্ধারকর্মী আবু বকর সিদ্দিক বলেন, বৃহস্পতিবার রাত ৮টা থেকে গতকাল দুপুর একটা পর্যন্ত টানা ১৭ ঘণ্টার পর তাদের উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি।

পড়ে আছে অজ্ঞাত লাশ: অধর চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে পড়ে আছে অজ্ঞাত লাশ। লাশের পাশে দেয়া আছে মোবাইল ফোন নম্বর। লেখা আছে- এই লাশটির পরিচয়-০১৭৭৫২৫৬৭৬০। অর্থাৎ লাল রঙের সেলোয়ার পরিহিত ওই নারীর লাশের পাশে ওই নম্বরের মোবাইল পাওয়া গেছে। এছাড়া ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হানপাতালে আরও ২৮টি মৃতদেহের নাম পরিচয় জানা যায়নি। অজ্ঞাত হিসেবে পড়ে আছে।

যারা জীবিত উদ্ধার: ভবন ধসের পর গতকাল পর্যন্ত দু’হাজারের বেশি জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানান পুলিশের এডিশনাল আইজিপি শহীদুল হক। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, যতক্ষণ উদ্ধার হবে ততক্ষণ পর্যন্ত উদ্ধার তৎপরতা অব্যাহত থাকবে। এদিকে উদ্ধারকর্মীরা জানান, গতকাল প্রায় ৭৫ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের সবাইকে সাভারের বিভিন্ন হাসপাতাল, ক্লিনিক, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদের মধ্যে এনাম ক্লিনিকে চিকিৎসাধীনরা হলেন- শ্রাবণী, ইয়াসিন আরাফাত, আকলিমা, এমদাদ, পারভীন, ফরিদা, র‌্যাব সদস্য ফরিদ, নূরশাদ, গীতা, কবির, শামসুল, আঁখি, আকলিমা খাতুন ও পারুল

সন্ধান চাই: নিখোঁজ নারী-পুরুষের ছবি সম্বলিত পোস্টারে ছেয়ে গেছে অধর চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের সীমানা প্রাচীর ও গেটের দেয়াল। শত শত মানুষের সন্ধান দেয়ার আকুতি জানিয়েছেন স্বজনরা। ছবি ও মোবাইল ফোন নম্বর দিয়ে অন্তত লাশটি ফেরত পাওয়ার আকুলতার কথা জানিয়েছেন। এভাবে আবুল কালাম আজাদের সন্ধান প্রার্থনা করেছেন সাতক্ষীরা জেলার শেখ আবদুল করিম। তিনি নিজের দুটি মোবাইল ফোন নম্বর (০১৯১১৪৯৭০১৪, ০১৯৩০৭৭১৪৯) দিয়েছেন।

রানার ভাবী ও ফুফা গ্রেপ্তার:  ধসে পড়া রানা প্লাজার মালিক যুবলীগ নেতা সোহেল রানার ভাবী ও ফুফাকে গ্রেপ্তার করেছে সাভার মডেল থানা পুলিশ। গতকাল সকালে পুলিশ মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুর থানার পোদ্দারপাড় এলাকার বাড়ি থেকে তাদের গ্রেপ্তার করেছে। তারা হচ্ছেন- রানার চাচাতো ভাই জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী মুন্নী বেগম ও ফুফা আনোয়ার হোসেন। ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শ্যামল কুমার মুখার্জী বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদের আনা হয়েছে।

প্রকৃত আসামিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে: পুলিশের দায়ের করা মামলার ৬ আসামির কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। তবে প্রধান আসামি সোহেল রানার চাচাতো ভাই জাহাঙ্গীরের স্ত্রী মুন্নি ও মুন্নির ফুফা আনোয়ার হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কায়সার মাতুব্বর বলেন, এখনও তাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি। রানা প্লাজা ধসে পড়ার রাতেই সাভার মডেল থানার এসআই ওয়ালী আশরাফ বাদী হয়ে ৩৩৭, ৩৩৮, ৩০৪(ক), ৪২৭, ৩৪ পেনাল কোড ধারায় মামলা (নং-৫৫) করেন। এতে রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানাকে প্রধান ও তার পিতা আবদুল খালেকসহ ৬ জনকে আসামি করা হয়েছে। অন্য আসামিরা হচ্ছে- আদাবর থানাধীন খিলজি রোডের বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম, রানা প্লাজায় অবস্থিত একটি পোশাক কারখানার মালিক। ফ্যান্টম টেক্সটাইল লি. এর স্পেন দেশীয় ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডেভিড মেয়র রেকো, আনিসুজ্জামান ও ফজলুস সামাদ আদনান। সাভার মডেল থানার ওসি আসাদুজ্জামান বলেন, তারা সবাই পলাতক। কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

উদ্ধারকর্মী-জনতার সংঘর্ষ, আহত ৩৫: সাভারে ধসে পড়া ভবনের ধংসস্তূপে উদ্ধার অভিযান ত্বরান্বিত করার দাবিতে উদ্ধারকর্মীদের ওপর হামলা চালিয়েছে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী। এ সময় সেনাসদস্য, বিজিবি, পুলিশ ও র‌্যাবের সঙ্গে নিহতদের স্বজন ও স্থানীয়দের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট ছুঁড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ সময় কমপক্ষে ৩৫ জন আহত হন। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, উদ্ধারকর্মীরা যথেষ্ট উদ্যোগী হয়ে কাজ করছেন না এমন অভিযোগে সকাল আনুমানিক সাড়ে ১০টার দিকে ধসে পড়া ভবনের পেছন দিকে তাদের দিকে তেড়ে যায় বিক্ষুব্ধরা। এ সময় বিক্ষুব্ধ জনতা উদ্ধার কাজে নিয়োজিত বুলডোজার ভাঙচুরের চেষ্টা করে।

ভবনের পেছন দিকে অনেকগুলো মৃতদেহের বিভিন্ন অংশ ধ্বংসস্তূপ থেকে বেরিয়ে রয়েছে। নিহতদের স্বজন ও স্থানীয়রা সেগুলো বের করার জন্য উদ্ধারকর্মীদের অনুরোধ করে। এক পর্যায়ে জনতা উদ্ধারকর্মীদের ওপর ইট-পাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে। তখন পুলিশ লাঠিপেটা করে বিক্ষুব্ধ জনতাকে সরিয়ে দিতে চেষ্টা করে। পরে পুলিশ বেশ কয়েক রাউন্ড রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশের এসআই আবদুল আজিজ বলেন, হঠাৎ করেই জনতা আমাদের ওপর হামলা করে। পরে আমরা তাদের ছত্রভঙ্গ করে দিই।

 

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close