প্রচ্ছদ রচনা

আহলান সাহলান ইয়া রামাদ্বান

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

তামীম রায়হান: শুরু হলো পবিত্র রমজান। সবার জন্য রইলো অসংখ্য আহলান ওয়া সাহলান। এ মহিমান্বিত অতিথিকে আজ থেকে প্রাণভরে বলতে পারি, মারহাবা ইয়া শাহরান মুবারাকান।

চারিদিকে আজ খুশির ফোয়ারা ছুটছে। শুধু আমাদের দেশ কিংবা বিশ্বজুড়েই নয়, আকাশের ওই ঊর্ধ্বজগতেও আজ আনন্দধ্বনি শোনা যাচ্ছে। কুল মাখলুকাত জুড়ে তাই উৎসবের আমেজ। পার্থিব কোনো লালসা কিংবা লোভের অর্জনে নয়, গোটা ভূমণ্ডল জুড়ে বিরাজমান এক পরম স্বর্গীয় পরিবেশ। মুমিনের হৃদয় থেকে জান্নাতুল ফেরদাউসের সুসজ্জিত প্রাঙ্গণেও আজ স্বস্তি ও সুখের সুবাতাস। এর একমাত্র উপলক্ষ পবিত্র রমজান এর শুভাগমন। আমাদের মতো অধমদের কপালে আবার জুটলো মহিমান্বিত রমজান, পরম দয়াময়ের দরবারে তাই কোটি কোটি বার কৃতজ্ঞতা ও শুকরিয়া অফুরান।

শত পাপ পঙ্কিলতায় ঘেরা আর হিংসা হানাহানি ভরা এ মাটির বুকে আজ থেকে সব বদলে যাবে। সব অনিষ্ট ও ধ্বংসের কুমন্ত্রনার দুষ্ট কারিগর শয়তান আজ থেকে শিকলে বাঁধা থাকবে গোটা একটি মাস। আল্লাহপ্রেমিক বান্দারা একটু স্বস্তি ও তৃপ্তির সঙ্গে এবার আল্লাহকে ডাকবেন প্রাণভরে, তার দরবারে নিজেকে সপে দেবেন আকুল হয়ে।

প্রিয় পাঠক, আর মাত্র কিছুক্ষণ পর থেকে আপনার সামনে ৭২০ ঘণ্টার যে সময় শুরু হবে, এর মূল্য স্বয়ং আল্লাহ পাকের কাছেও অনেক অনেক বেশি। এ সময়ে আপনার প্রতিটি আমলের সওয়াব কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। এ ৭২০ ঘণ্টার ৪৩,২০০ মিনিট অবিরাম আপনাকে ঘিরে থাকবে আল্লাহ পাকের বিশেষ রহমত ও বরকত। এমন সৌভাগ্যের মৌসুমে আজ থেকে বদলে ফেলুন নিজের দৈনন্দিন রুটিন। এই একটি মাসে যারা সত্যিই সমর্পিত হতে পারবেন, তারাই তো পরম ভাগ্যবান।
খুব সংক্ষেপে আসুন জেনে নেওয়া যাক কেন এ মাসকে ঘিরে এতো তোড়জোড়, কিসের ছোঁয়ায় রমজানুল মুবারক এতো বরকত ও কল্যাণময়।

এ মাসের সবচেয়ে বড় সম্মান হচ্ছে পবিত্র কুরআন। কারণ এ মাসেই আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ করেছেন। সূরা বাকারার ১৮৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ পাক বলেছেন, ‘‘রমজান মাস, যে মাসে অবতীর্ণ করা হয়েছে কুরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়াত..।’’ ইমাম আহমদের বর্ণনায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, রমজানের প্রথম রাতে অবতীর্ণ করা হয়েছিল হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের সহিফা, রমজানের ষষ্ঠ দিনে অবতীর্ণ করা হয়েছিল তাওরাত, আর ইঞ্জিল অবতীর্ণ করা হয়েছিল চৌদ্দ রমজানে। আর ফুরকান অবতীর্ণ করা হয়েছে চব্বিশে রমজান।

আল্লাহ পাক এ মাসের রোজা ফরজ করেছেন। সূরা বাকারার ১৮৩ নং আয়াতে আল্লাহ পাক বলেছেন, ‘‘হে ঈমানদারগণ, তোমাদের জন্য রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেভাবে তা ফরজ ছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের জন্য, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’’

এ মাস তওবা এবং মাগফেরাতের। আল্লাহ পাক এ মাসে অগণিত বান্দার অসংখ্য গুণাহ মাফ করে দেন। সহিহ হাদিসে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে মুসলমান ঈমান ও বিশ্বাসের সঙ্গে রমজানে রোজা রাখলো এবং নামাজ পড়লো, তার আগের সব গুণাহ আল্লাহ পাক মাফ করে দেবেন।

আল্লাহ পাক এ মাসে জাহান্নাম থেকে অগণিত পাপী বান্দাকে মুক্তি দান করে থাকেন। তিরমিজি শরিফের হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, এ মাসের প্রতি রাতে আল্লাহ পাক অগণিত বান্দাকে মুক্ত করে দেন জাহান্নাম থেকে।

বুখারি ও মুসলিম শরিফের বর্ণনায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিস থেকে জানা যায়, এ রমজান মাস জুড়ে আল্লাহ পাকের নির্দেশে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে রাখা হয়, আর জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এ মাসের সম্মানার্থে, শয়তানকে শিকলে বেঁধে রাখা হয় পুরো মাস।

পাশাপাশি এ মাস দয়া ও ধৈর্যের মাস। রোজা রেখে আল্লাহ পাকের ইবাদত পালনে যেসব কষ্ট হবে, সেগুলো সন্তুষ্টচিত্তে সহ্য করার নাম সবর। আল্লাহ পাক এ সবরের বিনিময়ে বান্দার জন্য জান্নাত রেখেছেন। সূরা জুমার এর ১০ নং আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন, ‘‘নিশ্চয়ই সবরকারীদের পূর্ণ প্রতিদান দেওয়া হবে, যা হবে অসীম ও অগণিত।’’
আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআনে রোজা ফরজ করা সম্পর্কিত আয়াতের পরপরই দুআর কথা বলেছেন। কারণ এ মাস হচ্ছে আল্লাহকে ডাকার সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। আর তাই আল্লাহ পাক তার নবীর মাধ্যমে আমাদের সুসংবাদ জানাচ্ছেন সূরা বাকারার ১৮৬ নং আয়াতে, (হে নবী!) আমার বান্দারা যখন আপনার কাছে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, (আপনি তাদের বলে দিন) আমি তো তাদের খুব কাছেই রয়েছি। আমাকে যে ডাকে আমি তার ডাকে সাড়া দিয়ে থাকি।’’ ইমাম আহমদের বর্ণনায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, রোজাদার ব্যক্তির দুআ কখনো ফেরত দেওয়া হয় না।
অন্যের প্রতি দয়া ও অনুগ্রহের জন্য রমজান মাসের চেয়ে এমন সৌভাগ্যজনক সময় আর নেই। এজন্যই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজান মাস এলে অনেক বেশি দানশীল ও দয়ালু হয়ে যেতেন।
পবিত্র রমজান এমন মহিমান্বিত এবং মূল্যবান হওয়ার অন্যতম কারণগুলোর একটি হচ্ছে লায়লাতুল কদর বা শবে কদর। স্বয়ং আল্লাহ পাক এ মাসকে হাজার মাসের চেয়ে উত্তম ও শ্রেষ্ঠ বলেছেন।
ইবনে মাজাহ শরিফের সূত্রে হযরত আনাস (রা.) এর বর্ণনায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ রাত সম্পর্কে বলেছেন, এ রাতের কল্যাণ থেকে যে বঞ্চিত রইল, সে সমগ্র কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত হলো, কপাল পোড়া দুর্ভাগা ছাড়া আর কে এ রাতের কল্যাণ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করে?
প্রিয় পাঠক, আগামী রমজান পর্যন্ত আমরা বেঁচে থাকবো কিনা, এর কোনোই নিশ্চয়তা নেই। তাই এই একটি রমজান যদি আমাদের আমলনামায় সফলভাবে লিখিত হয়ে যায়, মহান আল্লাহ পাকের দরবারে যদি এই একটি মাসের ইবাদত কবুল হয়ে যায়, তবেই তো ধন্য আমাদের জীবন ও মরণ।

আমাদের হৃদয় ও মনোজগতে রমজানের আবহ বিরাজমান থাকুক, প্রাত্যহিক কাজকর্মে রমজানের আহ্বান ফুটে উঠুক। তুমি আমাদের তওফিক দিও হে পরম দয়াময়।(আমীন)
লেখক-শিক্ষার্থী, কাতার ইউনিভার্সিটি, দোহা।

 

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

আরও দেখুন...

Close
ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close