স্বদেশ জুড়ে

৯০ বছর কারাদন্ডে দন্ডিত গোলাম আযম (ভিডিও)

 

 

 

 

 

 

 

 

 

শীর্ষবিন্দু নিউজ: সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসির পরিবর্তে বয়স বিবেচনায় নিয়ে জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ৯০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। গোলাম আযমের বিরুদ্ধে আনা ৫ ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধের ৬১টির অভিযোগের সবক’টিই প্রমাণিত হয়েছে উল্লেখ করে সোমবার এ রায় দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।

সোমবার বেলা ১১টা ৫ মিনিট থেকে দুপুর ১টা ৫৫ মিনিট পর্যন্ত রায় পাঠ করেন ট্রাইব্যুনাল। এর মধ্যে মামলার চূড়ান্ত অর্থাৎ মূল রায়ের অংশ পড়েন ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর। দুপুর দেড়টা থেকে রায়ের তৃতীয় ও শেষ অংশ পড়তে শুরু করেন তিনি। বেলা সাড়ে ১২টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত রায়ের দ্বিতীয় অংশ পড়েন বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন। আর শুরুতে বেলা ১১টা ৫ মিনিট থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত রায়ের প্রথম অংশ পাঠ করেন বিচারক প্যানেলের সদস্য বিচারপতি আনোয়ারুল হক। আর সকাল ১০টা ৫৫ মিনিট থেকে ১০ মিনিটের সূচনা বক্তব্য দেন চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর।

একই সঙ্গে জামায়াতকে ক্রিমিনাল অর্গানাইজেশন উল্লেখ করে ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেন, এরা দলবদ্ধভাবে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে। এ দলটি ১৯৪৭ সালে যেমন পাকিস্তান সৃষ্টির আন্দোলনের বিরোধিতা করেছে, তেমনিভাবে বাংলাদেশ সৃষ্টির সংগ্রামেরও বিরোধিতা করেছে। পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র সংক্রান্ত ছয়টি, সহযোগিতা সংক্রান্ত তিনটি, উস্কানির ২৮টি, সম্পৃক্ততার ২৩টি এবং ব্যক্তিগতভাবে হত্যা-নির্যাতনের ১টিসহ মোট ৬১টি অভিযোগ আনা হয়েছিল গোলাম আযমের বিরুদ্ধে।

ট্রাইব্যুনাল তার রায়ে সরকারি-বেসরকারি পদে যেন স্বাধীনতাবিরোধীদের চাকরি না দেওয়া হয়, সেজন্য সরকারকে আদেশ দিয়েছেন। মামলার রায়ে এ ৬১টি অভিযোগই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন ট্রাইব্যুনাল। ট্রাইব্যুনাল এ পাঁচ ধরনের অভিযোগের মধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় অভিযোগে ১০ বছর করে, তৃতীয় ও চতুর্থ অভিযোগে ২০ বছর করে ও পঞ্চম অভিযোগে ৩০ বছর কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছেন গোলাম আযমকে। এ সাজা তিনি একাধারে ভোগ করবেন বলেও রায়ে উল্লেখ করেন ট্রাইব্যুনাল।

৭ এপ্রিল গোলাম আযম এক যুক্ত বিবৃতিতে স্বাধীনতাকামী মানুষকে ‘ভারতীয় অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, তাদের যেখানেই দেখা যাবে, সেখানেই ধ্বংস করা হবে। ২২ এপ্রিল শান্তি কমিটির সভা শেষে এক বিবৃতিতে গোলাম আযম অধীনস্থ সংগঠনগুলোর সদস্যদের দেশপ্রেমিক নাগরিক উল্লেখ করে দেশের সাধারণ নাগরিকদের ধ্বংস করার আহ্বান জানান। ১৭ মে গোলাম আযম ঢাকায় এক সভায় স্বাধীনতা আন্দোলনকে রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ ও মুক্তিযোদ্ধাদের বিশ্বাসঘাতক উল্লেখ করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অপারেশন সার্চলাইট নমের সেনা অভিযানের প্রশংসা করেন। একাত্তরের ১৬ জুলাই রাজশাহী, ১৮ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ৪ আগস্ট খুলনা, ৭ আগস্ট কুষ্টিয়া প্রভৃতি এলাকায় আয়োজিত বিভিন্ন সভায় মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক ও উত্তেজনাকর বক্তব্য দেন।

১৪ আগস্ট পাকিস্তানের ২৫তম আজাদী দিবস উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে, ১৭ ও ২৩ আগস্ট দলীয় সভায় এবং ২৬ আগস্ট পেশোয়ারে অনুষ্ঠিত দলীয় অনুষ্ঠানে গোলাম আযম বিভিন্ন উস্কানিমূলক বক্তব্য দেন। ১৭ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুরের ফিজিক্যাল এডুকেশন সেন্টারে শিক্ষা গ্রহণরত রাজাকারদের শিবির পরিদর্শন করে তাদের সশস্ত্র হওয়ার আহ্বান জানান। ৩ অক্টোবর ঢাকায় মজলিসে শুরার সভায় একই ধরনের উস্কানিমূলক বক্তব্য দেন গোলাম আযম।

প্রমাণিত চতুর্থ অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধে সহযোগিতা বা সম্পৃক্ততার ২৩টি ঘটনা উল্লেখ করা হয়। ৪ ও ৬ এপ্রিল টিক্কা খানের সঙ্গে দেখা করে গোলাম আযমসহ অন্যরা সহযোগিতার আশ্বাস দেন। ৯ এপ্রিল গোলাম আযমের সহযোগিতায় নাগরিক শান্তি কমিটি গঠিত হলে ১৫ এপ্রিল এর নাম পরিবর্তন করে কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটি করা হয়। শান্তি কমিটির ২১ সদস্যের কার্যকরী কমিটির একজন সদস্য ছিলেন গোলাম আযম। ১৮ জুন লাহোর বিমানবন্দরে গোলাম আযম বলেন, জনগণ সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করতে চায়। ১৯ জুন রাওয়ালপিন্ডিতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে দেখা করে সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা ও মুক্তিযোদ্ধাদের মোকাবিলার জন্য রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনীকে অস্ত্র সরবরাহের আহ্বান জানান। পরদিন লাহোরে জামায়াতের পশ্চিম পাকিস্তান কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, পূর্ব পাকিস্তানে দুষ্কৃতকারীরা সক্রিয় রয়েছে এবং তাদের প্রতিরোধে ও শান্তিপ্রিয় নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্য অস্ত্রসজ্জিত হওয়া উচিত।

প্রমাণিত পঞ্চম অভিযোগে হত্যা ও নির্যাতনের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, কুমিল্লার হোমনা থানার রামকৃষ্ণপুর গ্রামের সিরু মিয়া একাত্তরে ঢাকার মোহাম্মদপুর থানায় দারোগা (সাব-ইন্সপেক্টর) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ২৮ মার্চ তিনি স্ত্রী আনোয়ারা বেগম ও ১৪ বছরের ছেলে আনোয়ার কামালকে নিয়ে কুমিল্লার নিজ বাড়িতে যান। সেখানে সিরু মিয়া শরণার্থীদের ভারতে যাতায়াতে সাহায্য করতেন। ২৭ অক্টোবর সকাল ১০টার দিকে কসবা থানার তন্তর চেকপোস্টের কাছে সিরু মিয়া ও তার ছেলেসহ ছয়জন ভারতে যাওয়ার সময় রাজাকারদের হাতে ধরা পড়েন। তাদের রাজাকার ক্যাম্পে নিয়ে কয়েক দিন নির্যাতনের পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

স্বামী-সন্তানের ধরা পড়ার খবর পেয়ে সিরু মিয়ার স্ত্রী গোলাম আযমের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সিরু মিয়ার ভগ্নিপতি ছিলেন গোলাম আযমের দুই ছেলে আজমী ও আমীনের শিক্ষক। তিনি গোলাম আযমের কাছে সিরু মিয়া ও তার ছেলেকে মুক্তি দিতে অনুরোধ জানান। গোলাম আযম ব্রাহ্মণবাড়িয়া শান্তি কমিটির নেতা পেয়ারা মিয়ার কাছে একটি চিঠি পাঠান, যাতে সিরু মিয়া ও তার ছেলেকে হত্যার নির্দেশ ছিল। চিঠি পাওয়ার পর ঈদের দিন রাতে সিরু মিয়াসহ ৩৯ জনকে পাকিস্তানি সেনারা রাজাকার ও আলবদরদের সহযোগিতায় কারাগার থেকে বের করে নিয়ে পৈরতলা রেলব্রিজের কাছে নিয়ে যায়। সেখানে পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে ৩৮ জন মারা গেলেও একজন প্রাণে বেঁচে যান।

৫ম ধরনের অভিযোগ সিরু মিয়াসহ ৫ জনকে হত্যার যে অভিযোগ আনা হয়েছিল সে সম্পর্কে ট্রাইব্যুনাল তার রায়ে বলেছেন, জামায়াতের আমির হিসেবে গোলাম আযম তাদেরকে রক্ষা করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা না করে নেগেটিভ সিগন্যাল দিয়েছেন।

গোলাম আযমের শাস্তি  মৃত্যুদণ্ড হলে আওয়ামীলীগের ভোট হয়তো বাড়তো না, কিন্তু তার ভোটব্যাংকের একটি ভোটও কমতো না। কিন্তু গোলাম আযমের বিরুদ্ধে এই রায়ে আওয়ামীলীগের অনেক ভোট কমে যেতে পারে। আওয়ামীলীগের ভোটব্যাংক দলটির কাছ থেকে চিরতরে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে। বিভিন্ন মহলের মতে, সালমান এফ রহমান পুঁজি বাজারকে ফতুর করে দিয়ে অনেক আগেই মহাজোট সরকারকে দেউলিয়া বানিয়েছেন, এবার তিনি আওয়ামীলীগ নামের দলটিকেই দেউলিয়া বানিয়ে দিলেন। শেখ হাসিনার নৌকাডুবি হলে না হয় একদিন না একদিন উদ্ধার করা যেতই। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সোনারতরী যদি গোলাম আযমের দাড়িপাল্লায় ওজন করে কেজি দরে বিক্রি হয়ে যায়? তাহলে অবশ্যই বিষয়টি ভেবে দেখার দাবি রাখে।

এই মুহুর্তে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর কথাবার্তা সরকার পতনের আন্দোলনের দিকেই মোড় নিচ্ছে। ফেইসবুকে অনেকেই লিখছে ‘নো মোর শেখ হাসিনা-সরকার’, এই সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় প্রকৃতভাবে বিশ্বাসী নয়’, এই সরকারের পতন ঘটাতে হবে বিএনপি এবং আওয়ামীলীগের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। শেখ হাসিনাকে এই ভুলের মাশুল দিতে হবে ফেইসবুকে এতো এতো মন্তব্যের মধ্যে আমিও একটি স্টাটাস লিখলামঃ মানবতা বিরোধী অপরাধের দায়ে গোলাম আযমের কারাদন্ড ৯০ বছর, আওয়ামীলীগের মৃত্যুদণ্ড।

[youtube id=”vP9Nh2NO3A8″ width=”600″ height=”350″]

 

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close