কিচিরমিচির

এখন তুমি খুব ভালো

মাহবুব সাদিক:

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

এই তো চমৎকার দেখাচ্ছে তোকে। তোর আলসেমি চলে গেছে– চলে গেছে সব নোংরা অভ্যাস। এখন তুমি খুব ভালো ছেলে।

ভোরবেলা ঘুম থেকে জেগেই দেখি বিছানা থেকে পালিয়ে গেল কম্বল।

চাদরটাও উঠে  পড়ল বিছানা ছেড়ে। বালিশটাকে জড়িয়ে ধরে ঢেউয়ের তোড়ে যেন কোথায় ভেসে গেল  চাদর।
গেলাম আলো জ্বালতে– সে উড়ে গেল পাখা মেলে। রঙিন ছবির বইটা খুলতে গেছি। চোখের পলকে সে হাওয়া– লুকোল গিয়ে বিছানার তলায়।

ভাবছি একটু চা খাব। দৌড়ে পালাল কাপ-পিরিচ। টি-পট, চামচ, ক্রিম আর ডিমও দিল দৌড়– যেন তাদের পা গজিয়েছে।

কী হল রে কী? কাণ্ডখানা কী? পৃথিবী কি উল্টে গেল আজ? সবাই কেবল ছুটছে ফেলে কাজ।

 

ঘরজোড়া গোলমাল। ইস্ত্রিটা তাড়া করছে মায়ের বড় একটা চামচকে। পাখির খাঁচা  তেড়ে গেল জুতোকে, জুতো তেড়ে যাচ্ছে চিমটাকে। আগুন খোঁচানো লোহার ডাণ্ডা  তাড়া করছে খেলনাকে। চারপাশে ভয়ানক হট্টগোল।

মামণির বেডরুম থেকে বেরিয়ে এল এক কুঁজো বুড় ওয়াস-স্ট্যান্ড– পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করাই তার কাজ। তড়পে এল সে আমার দিকে।

ওমা! সে বকছে দেখি আমাকেই: “ওরে নোংরা অলস ছোঁড়া। ওরে দুষ্টু পাজি নোংরা  নাকু– শূয়োরছানাও তোর মতো নোংরা ঘাটে না। আয়নায় তাকিয়ে দেখ না একবার। তোর  নাকে কালির দাগ, ঘাড়ে ময়লা। নোংরা হাত-নখ জীবনে ধুয়েছিস বলে মনেই হয় না।  অবাক হব না, যদি দেখি তোর মোজাজোড়া ময়লা দুর্গন্ধ।

তুই কি জানিস  ইঁদুরছানাটাও ভোররেলা হাতমুখ ধুয়ে ফিটফাট! পিঁপড়া-বেড়াল-হাঁসেরছানারাও  নিজেকে সাফসুতরো করেছে। দেখ না গিয়ে, তুই ছাড়া অন্য সবাই কেমন দাঁত মেজেছে, মুখ ধুয়েছে– আঁচড়ে নিয়েছে চুল। তুই-ই খালি নোংরা। তুই আর পরার কাপড় পাবি  না।

জানিস, আমি ধোয়া-মোছার বিখ্যাত নেতা? বিশাল বাহিনী আছে আমার। আমি ডাকলে এসে যাবে সব্বাই। এক্ষুনি– এখানেই। অবিরাম বাজবে ঘণ্টা। তারা চেঁচাবে আর রাগে ফোঁসফোঁস করবে। আর শক্ত মোটা ব্রাশ দিয়ে ঘঁষবে তোকে– যতক্ষণ না তুই ঝকমক  করে উঠিস। পানির স্রোতে ধুয়ে তুলবে তোকে।

এই না বলে পেতলের থালায় সে চালিয়ে দিল হাতুড়ি। শব্দ উঠল ঢংঢং।

চেঁচিয়ে বলল, কারা বারাস।

সঙ্গে সঙ্গে একদল ব্রাশ কিচমিচ করে ঘঁষতে থাকে আমাকে। যেন তারা চামড়া তুলে ফেলবে আমার। বলল তারা, নোংরা ছোঁড়াটাকে এবার ধুয়ে সাফ করা যাক। ধুয়ে তাকে করব  এবার সাদা– সাদার চেয়েও সাদা।

তখন লাফিয়ে উঠল সাবান আমার মাথায়–  ঘঁষল সারা শরীর। ফেনায় ভরে গেল চোখমুখ। মনে হল মরেই যাব এবার। ব্রাশের ঘঁষা থেকে বাঁচতে আমি সাগরে ডুবতে রাজি। কিন্তু ছাড়া পেলাম না।

দৌড়ে পালিয়ে এলাম খোলা মাঠে– ডিঙিয়ে এলাম বেড়া। কিন্তু শিকারি কুকুরের মতো তারা পিছু ছাড়ল না।

পথের বাঁকে এসে দেখি বুড় কামালকাকা তার যমজ ছেলেদের নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। ব্রাশ তাড়া করছে আমাকে– দেখলেন তিনি।

রেগে গেলেন কাকা। লাল চোখ তার কপালে উঠল। ফিরলেন তিনি আমার দিকে– চেঁচিয়ে  বললেন, কী দুঃখের কথা। এক্ষুনি ধুয়ে আয় হাতমুখ। নয়তো মারব তোকে। গিলেও  ফেলতে পারি।

এবার বুঝতে পারলাম সব। দৌড়ে বাড়ি ফিরে এলাম। এলাম সেই  ওয়াস-বেসিনের সামনে। মুখে-হাতে সাবান মাখলাম– ধুয়ে ফেললাম ঠাণ্ডা পানিতে।  সব ময়লা ধুয়ে সাফ। নাকের ডগার কালি উঠে গেল। ঝকঝকে হয়ে উঠল মুখ।

আর সঙ্গে সঙ্গে ফিরে এল আমার সব পোশাক– সোজা আমার হাতে। মজার একটা পিঠা মুখের সামনে এসে বলল, এবার খেতে পার আমাকে। বাগান থেকে উড়ে এল একটা আপেল। নামল এসে আমার মুখে।

আরে, ওই তো ফিরে আসছে আমার ছবির বই। ফিরে আসছে সব পুতুলও। ফিরে এল আমার সব বই।

এবার সেই বিখ্যাত ওয়াস-বেসিন নাচতে নাচতে এল আমার কাছে। খেল আমায় চুমু এবং হাসল মধুর হাসি। বলল, এই তো চমৎকার দেখাচ্ছে তোকে। তোর আলসেমি চলে গেছে– চলে গেছে সব নোংরা অভ্যাস। এখন তুমি খুব ভালো ছেলে– পরিষ্কার আর পরিচ্ছন্ন।

*  বিদেশি কাহিনি অবলম্বনে

 

 

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

আরও দেখুন...

Close
ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close