Featuredস্বদেশ জুড়ে

সোনা মসজিদে যাবেন? হোটেল শেরাটন-সোনারগাঁয়ে খাবেন?

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ, রাজশাহী থেকে:

সোনামসজিদ যাবেন? হোটেল শেরাটন অথবা সোনারগাঁয়ে খাবেন। সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জে গিয়ে স্থানীয় একজনের মুখে এ কথা শুনে ধন্দে পড়ে যাই। এখানে কোত্থেকে সোনারগাঁ-শেরাটন আসবে!

একসময় শেরাটন ঢাকায় ছিল। এখন তার নাম রূপসী বাংলা। আর সোনারগাঁ তো রাজধানী শহরেই আছে। অবশ্য এখানেও একসময় বাংলার রাজধানী ছিল। নাম ছিল গৌড়। বর্তমান দুই বাংলা ছাড়াও তখন বিহার ও উড়িষ্যা রাজ্যের অর্ধেকেরও বেশি অঞ্চল এই বাংলার ভেতরে ছিল। বাংলার স্বাধীন সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ (১৪৯২-১৫১৯) এই সোনামসজিদ নির্মাণ করেন। মসজিদের চূড়ায় সোনার প্রলেপ থাকার কারণে এর নাম হয়ে যায় সোনামসজিদ। এই মসজিদের নামানুসারে এলাকার নামই হয়ে গেছে সোনামসজিদ। একটি ছোট সোনামসজিদ। বড়টি এখন ভারতের মালদহের মধ্যে পড়েছে। দেশ বিভাগের সময় গৌড়ের ৮০ শতাংশ এলাকা চলে যায় ভারতের মধ্যে আর ২০ শতাংশ এপারে। সেই হিসাবে গৌড়ের স্থাপত্য কীর্তির বেশির ভাগই ভারতের অংশে থেকে যায়।

১৫৭৬ সালে গৌড়ে প্লেগ রোগ ছড়িয়ে পড়লে মোগল সেনাপতি খানখানান মুনিমসহ লক্ষাধিক লোক মারা যান। তারপর রাজধানী গৌড় স্থায়ীভাবে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। মোগল সেনাপতি মানসিংহ তখন বাংলার রাজধানী বিহারের পুর্নিয়া জেলার রাজমহলে স্থানান্তর করেন। পরে মানসিংহ রাজমহলের নাম পাল্টে রেখেছিলেন আকবরনগর। মুর্শিদ কুলি খাঁ পরিত্যক্ত গৌড়ের ইট নিয়ে গিয়ে মুর্শিদাবাদ নগরের নির্মাণ শুরু করেন। তবে গৌড়ের রাজধানীর সেই ‘কোতওয়ালী দরওয়াজা এখনো রয়েছে। এসব মনে করেই যাওয়া। কিন্তু শেরাটন-সোনারগাঁ? যা হোক, অত ভাববার সময় হাতে নেই। আগে তো যাওয়া যাক, তারপর দেখা যাবে।চাঁপাইনবাবগঞ্জের স্থলবন্দর সোনামসজিদে ভাতের হোটেল সোনারগাঁ। ছবি: প্রথম আলো।চাঁপাইনবাবগঞ্জের স্থলবন্দর সোনামসজিদে ভাতের হোটেল সোনারগাঁ। ছবি: প্রথম আলো। রাজশাহী থেকে সোনামসজিদের উদ্দেশে সকালে গৌড়ে স্পেশাল গাড়ি যায়। সেটা ধরতে না পেরে ভেঙে ভেঙে যেতে হচ্ছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকেও সোনামসজিদের সরাসরি গাড়িটা কিছুক্ষণ আগেই ছেড়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত প্রথম আলোর চাঁপাইনবাবগঞ্জের নিজস্ব প্রতিবেদক আনোয়ার হোসেনের মোটরসাইকেলই ভরসা হলো। সেই ভালো হলো, কারণ ঢাকা থেকে এসেছেন প্রথম আলোর ডেপুটি নিউজ এডিটর হাফিজুর রশীদ হীরণ। তাঁরই আগ্রহে যাওয়া। আমের দেশ চাঁপাইনবাবগঞ্জের সব রাস্তারই দুই পাশে ছড়ানো আমবাগান। সে এক অপূর্ব নৈসর্গিক সৌন্দর্য! মোটরসাইকেলে যাওয়ার কারণে এসব দৃশ্য ভালোভাবেই উপভোগ করা গেল।…সেই কানসাট। বিদ্যুতের জন্য প্রাণ দেওয়া মানুষের দেশ। তারপর সোনামসজিদ। আহা এমন সুন্দর জায়গায় পাথর আর সিমেন্টের ট্রাকের ধুলায় নিঃশ্বাস নেওয়া দায়। স্থলবন্দর বলে কথা। প্রথমে সোনামসজিদ। তারপর খানিকটা গেলে গৌড়ের সেই ‘কোতওয়ালী দরওয়াজা’। দেখা যাচ্ছে ভালোই কিন্তু তার কাছে যাওয়ার উপায় নেই। তার খানিকটা আগেই বাংলাদেশের সীমানা শেষ। রাস্তার ওপরে একটা সাইনবোর্ড দেওয়া রয়েছে। ‘বাংলাদেশের শেষ সীমানা। অতিক্রম নিষেধ’। পাসপোর্টধারী মানুষ শুধু ওপার-ওপার হচ্ছেন। ওপার থেকে একটি শিশুকে নিয়ে আসছেন একজন মা। সাইনবোর্ডের এপারে দাঁড়িয়েছিলেন বাবা। সীমানা পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাবা শিশুটিকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। মানুষের এদেশ-ওদেশ করার দৃশ্য অনবরতই চলছে। চোখ ফেরানো যাচ্ছে না। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরা কোতওয়ালী দরওয়াজা পর্যন্ত যেতে পারেন। পরিচয় দিয়ে তাঁদের অনুরোধ করা হলো ওই পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার জন্য। তাঁরা রাজি হলেন কিন্তু একটু অপেক্ষা করতে হবে। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) প্রধান আসবেন। তাঁর জন্য শূন্য রেখায় চেয়ার-টেবিল পাতা হয়েছে। কিন্তু হাতে অত সময় নেই। রাজশাহীতে ফিরতে হবে। সেখান থেকে এসে সোনামসজিদ চত্বর ঘুরে দেখা হলো। এখানেই বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের কবর। দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র দুই দিন আগে তিনি শহীদ হয়েছেন। কবরের নামফলকে তার বর্ণনা দেওয়া রয়েছে। পড়তে পড়তে চোখে পানি এসে যায়। কিছুক্ষণ চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। তার পাশেই ৭ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর নাজমুল হকের কবর। যুদ্ধের সময় তিনি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান।

মসজিদ চত্বর থেকে বের হতে হতে মনে হলো, এবার পেটে কিছু দিতে হবে। মনে পড়ল শেরাটন ও সোনারগাঁ হোটেলের কথা। সেখানেই খাওয়া যাক। কিন্তু যেরকম নাম, সেরকম কোনো ভবনই আশপাশে চোখে পড়ছে না। একজনকে জিজ্ঞেস করা হলে বললেন, ওই দিকে। তাঁর ইশারায় গিয়ে যেখানে দাঁড়ালাম, সেখানে দুটি টিনের ছোট ঘর। বারান্দায় ঠাসাঠাসি করে মোটরসাইকেল রাখা। হীরণ ভাই বললেন, এই তো শেরাটন। তাকিয়ে দেখি বারান্দার পাশেই একটা সাইনবোর্ডে লেখা ‘হোটেল শেরাটন’। বারান্দার অপর পাশে আরেকটি সাইনবোর্ড। লেখা রয়েছে ‘হোটেল সোনারগাঁ’। দুজন মালিক পুকুরের ওপরে পিলার দিয়ে হোটেল দুটি করেছেন। বারান্দায় মোটরসাইকেল রেখে মানুষ ভেতরে খেতে ঢুকেছেন। আমরা শেরাটনে ঢুকলাম। শেরাটনের মালিক আবদুল মালেক বলেন, এটা একবেলার ভাতের হোটেল। বন্দরের লোকজন ও বাইরের দর্শনার্থীরা মূলত এই হোটেলের খদ্দের। শুধু দুপুরে বেচাকেনা হয়। তিনি বলেন, হাঁসের মাংসের জন্য সবাই খেতে আসে। শেরাটন নাম কেন হলো—জানতে চাইলে হাসেন আবদুল মালেক। একপর্যায়ে বলেন, পাশের হোটেলের মালিক সোনারগাঁ নাম দিয়ে ভালো ব্যবসা করছিলেন। তাই দেখে এক বছর পরে তিনিও হোটেল করেন। ওদের হোটেলের নাম সোনারগাঁ। তার পাশে হোটেল। কী নাম রাখা যায়। ভেবেচিন্তে তিনি তাঁর হোটেলের নাম রাখেন ‘হোটেল শেরাটন’। এখন ভালোই ব্যবসা হচ্ছে। নামের রহস্য জানার জন্য এবার যেতে হলো হোটেল সোনারগাঁয়ে। মালিক আশরাফুল আলমও হাসেন। হাসতে হাসতে বলেন, নামের একটা কাহিনি আছে। প্রায় ১৫ বছর আগে চাটাইয়ের বেড়া আর বাঁশের খুঁটি দিয়ে তিনি হোটেল চালু করেছিলেন। একদিন ঢাকা থেকে গাড়ি নিয়ে কিছু লোকজন সোনামসজিদ দেখতে যান। তাঁরা হোটেলে খেয়ে খাবারের খুব প্রশংসা করলেন। কিন্তু হোটেলের নাম নেই দেখে তাঁরা সিগারেটের প্যাকেটের ওপরে লিখে দিয়ে গেলেন ‘হোটেল সোনারগাঁ’। তাঁদের সম্মানে তিনি সেই নামটিই রেখে দেন।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close