Featuredপ্রচ্ছদ রচনা

ইসি কি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন করতে প্রস্তুত?

 

 

 

 

 

 

 

 

 

বদিউল আলম মজুমদার:

সম্প্রতি জাতিসংঘ ও আমাদের উন্নয়ন-সহযোগীদের একদল প্রতিনিধি নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন সম্পর্কে কমিশনের প্রস্তুতির বিষয়ে জানতে চেয়েছেন। জানতে চেয়েছেন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, বিশ্বাসযোগ্য ও ‘ইনক্লুসিভ’ বা সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে কমিশনের প্রস্তুতি সম্পর্কে। নাগরিক হিসেবে আমরাও কমিশনের প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে আগ্রহী।বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে কমিশনের দুই ধরনের প্রস্তুতি আবশ্যক: টেকনিক্যাল প্রস্তুতি ও লজিস্টিক্যাল প্রস্তুতি। টেকনিক্যাল প্রস্তুতি নির্বাচনের অনেক আগেই সম্পন্ন করতে হয়। পক্ষান্তরে লজিস্টিক্যাল প্রস্তুতি, যেমন বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জাম কেনাকাটা; ভোটার তালিকা, ব্যালট পেপার ইত্যাদি ছাপানো; ভোটকেন্দ্র চিহ্নিত ও মেরামত করানো; নির্বাচনী কর্মকর্তা নিয়োগ প্রভৃতি কার্যক্রম—অনেক আগে এবং নির্বাচনের সময়ও গ্রহণের প্রয়োজন পড়ে। টেকনিক্যাল প্রস্তুতির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত: (১) একটি যথাযথ আইনি কাঠামো প্রণয়ন, (২) একটি সঠিক ভোটার তালিকা প্রস্তুতকরণ, (৩) যথাযথভাবে সংসদীয় এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ এবং (৪) তথ্য প্রদানের জন্য যথাযথ ছক তৈরীকরণ। এসব প্রস্তুতির সঠিকতার ওপরই নির্বাচনী ফলাফলের গ্রহণযোগ্যতা মূলত নির্ভরশীল। এসব ক্ষেত্রে আমাদের কমিশন কি প্রস্তুত? আইনি কাঠামো কমিশনের পূর্বের ঘোষণা অনুযায়ী, গত মার্চের মধ্যে এ কাজটি সম্পন্ন হওয়ার কথা, যা আজও হয়নি। কমিশনকে সত্যিকারার্থে শক্তিশালী এবং আইনি কাঠামোকে আরও সময়োপযোগী করতে হলে, প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো ছাড়াও আরপিওতে আরও কিছু বিধান সংযোজন আবশ্যক। যেমন হলফনামা ও নির্বাচনী খরচের বিবরণীতে মিথ্যা তথ্য প্রদান এবং নির্বাচনের সময় গুরুতর আইন ভঙ্গ ও অসদাচরণের জন্য নির্বাচনী ফলাফল বাতিলের ক্ষমতা কমিশনকে প্রদান, দলের তৃণমূলের সদস্যদের তৈরি সর্বোচ্চ তিনজনের প্যানেল থেকে মনোনয়ন প্রদানের বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি এবং ‘না’ ভোটের পুনঃপ্রবর্তন করা ইত্যাদি। তাই কেউই এখনো নিশ্চিত নয়, কবে আইনি কাঠামো চূড়ান্ত হবে। অদৃশ্য কারণে কমিশনের অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টির প্রবণতা, একগুঁয়েমি, স্বার্থসংশ্লিষ্টদের মতামত নিতে অনীহা এবং নিজেদের মধ্যে কথিত বিভক্তি এ ধরনের অনিশ্চয়তার বড় কারণ। প্রসঙ্গত, গত কমিশন তাদের বিদায়ের প্রাক্কালে আরপিওর কতগুলো সংশোধনী ও আইনের খসড়া তৈরি করে রেখে গিয়েছিল, যা বর্তমান কমিশনের কাজকে সহজ করার কথা।

ভোটার তালিকা: গত জানুয়ারি মাসে হালনাগাদ করা ভোটার তালিকা অনুযায়ী, বর্তমান ভোটার সংখ্যা নয় কোটি ২২ লাখ, ২০০৮ সালে যা ছিল আট কোটি ১১ লাখ। অর্থাৎ গত পাঁচ বছরে ভোটার সংখ্যা বেড়েছে বার্ষিক ২ দশমিক ৭৪ শতাংশ হারে। কিন্তু এর থেকে ১৮ বছর আগে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ১ দশমিক ৮০ শতাংশের মতো। এ ছাড়া এবার নারী ভোটারের সংখ্যা পুরুষ ভোটারের থেকে চার লাখ কম, যদিও ২০০৮ সালে ছিল ১৪ লাখ বেশি। এসব কারণে ভোটার তালিকার সঠিকতা নিয়ে অনেকের মনে গুরুতর সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে।

ভোটার তালিকার সঠিকতা নিয়ে সন্দেহের আরও কারণ হলো, গত জানুয়ারি মাসে নতুন ভোটার তালিকার ওপর পরিচালিত ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপের এক অডিট থেকে দেখা যায় যে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ১৫ শতাংশ ভোটার আইডি নম্বর ভুল। আইডি নম্বরে ভুল থাকলে ভোটার তালিকা সঠিক, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।

অনেকেরই স্মরণ আছে, ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজে দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। তালিকায় গরমিলের এটি কি একটি কারণ? অন্য কারণ কি একই ব্যক্তির একাধিক জায়গায় ভোটার হওয়া, যা ২০০৮ সালে ছিল প্রায় অনুপস্থিত?

ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা তৈরির পর এর সঠিকতা যাচাইয়ের জন্য গত কমিশন একটি নিরপেক্ষ অডিটের আয়োজন করেছিল। বর্তমান হালনাগাদ করা তালিকার সঠিকতা নিরূপণের লক্ষ্যেও এমন একটি অডিট আবশ্যক বলে আমরা মনে করি। প্রসঙ্গত, ভোটার তালিকা ছাপার কাজ এখনো শুরু হয়নি, যা জুলাইয়ে শেষ হওয়ার কথা ছিল—ফলে ভোটার তালিকা পাওয়া যাচ্ছে না এবং আমরাও এর ওপর কোনো নিরীক্ষা চালাতে পারছি না।

সীমানা পুনর্নির্ধারণ: কমিশনের নির্ধারিত সময়সীমা অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর মাসের মধ্যে নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণের কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা, যা করা সম্ভবপর হয়নি। তবে গত ফেব্রুয়ারিতে ৮৭টি নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাবসংবলিত একটি প্রাথমিক তালিকা কমিশন প্রকাশ করে। এ তালিকা থেকে দেখা যায়, কমিশনের প্রস্তাবের ফলে বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকার মধ্যে ভোটার সংখ্যার অসমতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশীয় আইন ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের পরিপন্থী। যেমন ২০০৮ সালে যেখানে গড় ভোটার সংখ্যার ২১ শতাংশসংবলিত আসনের সংখ্যা ছিল ৮৩টি, সেখানে বর্তমানে তা এসে দাঁড়িয়েছে ১০২টিতে। প্রসঙ্গত, ভোটার তালিকা অধ্যাদেশ, ১৯৭৬ অনুযায়ী, প্রতিটি আদমশুমারির পর ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা বাধ্যতামূলক, যার উদ্দেশ্য হলো বিভিন্ন নির্বাচনী আসনের ভোটার সংখ্যার মধ্যে যথাসম্ভব সমতা সৃষ্টি।

প্রাথমিক তালিকাটি প্রকাশের পর এটি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা, এমনকি কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের ঝড় ওঠে। উদাহরণস্বরূপ, অভিযোগ ওঠে যে একজন প্রতিমন্ত্রীর মৌখিক অনুরোধে তাঁর নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ করতে গিয়ে কমিশনকে ঢাকার অন্য ১৫টি আসনের সীমানা বদলাতে হয়, যার বিরুদ্ধে আটজন সরকারদলীয় সাংসদ কমিশনে অভিযোগ দাখিল করেন। এ প্রসঙ্গে ঢাকা-৭ আসনের সাংসদ ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন অভিযোগ করেন: ‘নির্বাচন কমিশন আমাদের সরকারের প্রভাবশালী একজন প্রতিমন্ত্রীর স্বার্থরক্ষা করে ঢাকার আসনের সীমানা বিন্যাসের প্রস্তাব করেছে। একজনের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে ১৫ জনের স্বার্থহানি করাটা অন্যায়।’ (প্রথম আলো, ৩১ মার্চ ২০১৩)

কুড়িগ্রাম জেলার দুটি আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের ব্যাপারে কমিশনের একজন সদস্যের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ ওঠে। এ প্রসঙ্গে সরকারদলীয় সাংসদ জাকির হোসেন অভিযোগ করেন: ‘কমিশন সচিবালয়ের নিচতলায় বসে কুড়িগ্রামের আসন তছনছ করার ষড়যন্ত্র হচ্ছে। একজন নির্বাচন কমিশনারের ছেলে ও জামাতা কুড়িগ্রাম থেকে নির্বাচন করতে চাইছেন। তাঁদের জন্য পছন্দসই সীমানা সাজাতে কুড়িগ্রামের আসনগুলোকে হাত দিয়েছেন এই নির্বাচন কমিশনার।’ (কালের কণ্ঠ, ২৪ এপ্রিল ২০১৩)

নির্ধারিত সময়ের প্রায় সাত মাস পর কমিশন জুলাই মাসে চূড়ান্ত সীমানা পুনর্নির্ধারণের তালিকা প্রকাশ করেছে। কিন্তু ভোটার তালিকার তথ্য এখনো পাওয়া যাচ্ছে না বলে আমরা এটি নিরীক্ষা করে দেখতে পারছি না। আশা করি, কমিশন শিগগিরই ভোটার তালিকার তথ্য প্রকাশ করবে।

হলফনামার ছক: অনেকেই অবগত আছেন যে ‘সুজন—সুশাসনের জন্য নাগরিক’-এর নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার ফলে জাতীয় ও স্থানীয় সর্বস্তরের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রায় সব প্রার্থীরই এখন তাঁদের নিজেদের ব্যক্তিগত, অপরাধসম্পর্কিত এবং নিজেদের এবং নির্ভরশীলদের আর্থিক তথ্য হলফনামা আকারে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দিতে হয়। বাধ্যতামূলক তথ্য প্রকাশের সুফল এরই মধ্যে আমরা পেতে শুরু করেছি। এর মাধ্যমে গত নির্বাচনগুলোতে অনেক অবাঞ্ছিত প্রার্থীকে নির্বাচনী অঙ্গন থেকে দূরে রাখা সম্ভব হয়েছে। ক্ষমতার সঙ্গে যে সম্পদের মালিকানার জাদুরকাঠি জড়িত, তা প্রমাণ করা গেছে। কিন্তু অভিজ্ঞতার আলোকে দেখা যায়, হলফনামার ছকে গুরুতর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যেমন, এটি ব্যবহার করে আয়ের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় না। আরও পাওয়া যায় না প্রার্থীদের এবং নির্ভরশীলদের ব্যবসায়ে মালিকানার তথ্য, যার ভিত্তিতে তাঁদের স্বার্থের দ্বন্দ্ব নিরূপণ করা সম্ভব হতো। তাই হলফনামার ছকটিতে পরিবর্তন আনা জরুরি।

পরিশেষে, এটি সুস্পষ্ট যে নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় টেকনিক্যাল প্রস্তুতির ক্ষেত্রে কমিশন অনেক পিছিয়ে আছে। কমিশনের ইতিমধ্যে সম্পাদিত কাজগুলোর মান ও নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কেও নানা প্রশ্ন উঠেছে। অর্থাৎ কমিশন সঠিক সময়ে সঠিকভাবে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় কাজগুলো সম্পাদন করতে ব্যর্থ হয়েছে। এসব, বিশেষত কাজের গুণগত মান সম্পর্কে সন্দেহের কারণে কমিশন পরিচালিত নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে বাধ্য।

সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেও কমিশন কতটুকু সফল হবে, সে নিয়েও অনেকের মনে প্রশ্ন রয়েছে। কমিশনের নানা কার্যক্রমের, বিশেষত ৯১-ই বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশব্যাপী বিতর্কের কারণে কমিশনের বিবেচনাশক্তি ও যোগ্যতা নিয়ে অনেকেই আজ সন্দিহান। আমাদের বড় চারটি দলের মধ্যে তিনটিই—বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী (যদিও জামায়াতের নিজ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করতে পারা অনিশ্চিত) ইতিমধ্যেই কমিশনের প্রতি অনাস্থা প্রদর্শন করেছে। নাগরিক হিসেবে আমরা জানতে চাই, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথের পর্বতপ্রমাণ এসব বাধা কমিশন কীভাবে কাটিয়ে উঠবে।

ড. বদিউল আলম মজুমদার, সম্পাদক, সুজন—সুশাসনের জন্য নাগরিক।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

আরও দেখুন...

Close
ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close