Featuredফিচার

আমেরিকা নিয়ে একডজন

 

 

 

 

 

 

 

 

ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল:

আমার ছয়জন ছাত্রছাত্রী একসঙ্গে আমেরিকা চলে যাচ্ছে। একজন চাকরি করতে, অন্যেরা পিএইচ-ডি করতে। এরা সবাই এখন আমার সহকর্মী। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতাকে জীবন হিসেবে বেছে নিলে পিএইচ-ডি করতে হয়। যত তাড়াতাড়ি করা যায় ততই ভালো। আমি নিজেও আজ থেকে প্রায় চল্লিশ বছর আগে বছরের ঠিক এই সময়টাতে পিএইচ-ডি. করতে আমেরিকা গিয়েছিলাম।

আমার এই ছাত্রছাত্রীরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বেছে নেবার আগে কোথায় কী ধরনের প্রোগ্রাম, কোন প্রফেসর কী গবেষণা করেন, তাদের র‌্যাংকিং কী রকম এসব নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেছে। আমার মনে আছে আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয় ঠিক করেছিলাম তার প্যাডের কাগজটি দেখে! (না, আমি মোটেও বানিয়ে বলছি না।)

যাবার আগে আমার ছাত্রছাত্রীরা সবাইকে নিয়ে বিশাল একটা পার্টি দিয়েছে। আমি আমেরিকাতে আঠারো বছর ছিলাম। এর পরেও অনেকবার যেতে হয়েছে। তাই পার্টি শেষে সবাইকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘তোমরা কি যাবার আগে সেই দেশটি নিয়ে কোনো বাস্তব উপদেশ শুনতে চাও? যে উপদেশ বইপত্র, ইন্টারনেট কোথাও পাবে না?’’

তারা সবাই আগ্রহ নিয়ে শুনতে রাজি হল। আমি তাদেরকে তখন একডজন তথ্য এবং উপদেশ দিয়েছিলাম; সেগুলো ছিল এ রকম:

(১) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (বা সহজ কথায় আমেরিকা) পুরো পৃথিবীকে দেখে স্বার্থপরের মতো। কিন্তু তারা নিজের দেশের জন্যে সাংঘাতিকভাবে নিঃস্বার্থ। (একাত্তরে দেশটি আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরুদ্ধে ছিল, কিন্তু তাদের দেশের মানুষ ছিল আমাদের পক্ষে।) এই মুহূর্তে সারা পৃথিবীতে যে সব দেশে হানাহানি খুনোখুনি যুদ্ধ-বিগ্রহ হচ্ছে– খোঁজ নিলে দেখা যাবে সব জায়গায় সূক্ষ্মভাবে হলেও আমেরিকার একটা যোগাযোগ আছে।

তবে দেশটি যেহেতু নিজের দেশের মানুষকে ভালোভাবে দেখেশুনে রাখে, তাই থাকার জন্যে সেটি চমৎকার একটা জায়গা। সারা পৃথিবী থেকে সবদেশের মানুষ সেখানে গিয়ে এটাকে একটা ‘মিনি পৃথিবী’ বানিয়ে ফেলেছে। এই দেশে কেউই বিদেশি নয়। তাই থাকার জন্যে, লেখাপড়া বা গবেষণা করার জন্যে আমেরিকার কোনো তুলনা নেই।

(২) আমেরিকার সাধারণ মানুষেরা গোমড়ামুখী নয়, তারা খুব হাসিখুশি। পথেঘাটে সুন্দরী মেয়েরা খামোখা মিষ্টি হাসি দিলেই তারা প্রেমে পড়ে গেছে ভাবার কোনো কারণ নেই।

(৩) পশ্চিমা দেশের মানুষেরা নাম নিয়ে মোটেও সৃজনশীল নয়। তারা ধরেই নেয় সবার নামের দুটো অংশ থাকবে। প্রথম অংশটা হচ্ছে ঘনিষ্ঠদের ডাকার জন্যে এবং শেষ অংশটা আনুষ্ঠানিক পারিবারিক নাম। পারিবারিক নাম যে নামের প্রথমে থাকতে পারে (শেখ মুজিবর রহমান) সেটা তারা জানে না। খেয়ালী বাবা হলে যে পারিবারিক নাম নাও থাকতে পারে (বড় ভাই হুমায়ূন আহমেদ, মেজো ভাই মুহম্মদ জাফর ইকবাল, ছোট ভাই আহসান হাবীব) সেটাও তারা জানে না।

একটু ঘনিষ্ঠতা হলেই নামের প্রথম অংশ দিয়ে ডাকা শুরু করে বলে, আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষেরা আমেরিকা পৌঁছানোর কিছুদিনের ভেতরে আবিষ্কার করে সবাই তাদেরকে ‘মোহাম্মদ’ বলে ডাকছে! তাই ঘনিষ্ঠদের কাছে কে কী নামে পরিচিত হতে চায় সেটা একেবারে প্রথম দিনে পরিষ্কার করে খোলাখুলি বলে দেওয়া ভালো। আমেরিকায় নামের আগে মোহাম্মদের সংক্ষিপ্ত রূপ Md. লেখা খুবই বিপজ্জনক। তারা সেটাকে ‘ডাক্তারি’ ডিগ্রি মনে করে সবসময়েই নামের পিছনে নিয়ে যেতে চেষ্টা করে।

(৪) যখন প্রথম প্রথম কেউ আমেরিকা যায় তখন তাদের স্কলারশিপ বা বেতনের চেক পায় ডলারে। কিন্তু তারা যখন খরচ করতে যায় তারা সেটা ডলারে খরচ করতে পারে না, তারা খরচ করে টাকায়। নিজের অজান্তেই কোনো কিছুর দাম দেখা মাত্র মনে মনে ৮০ দিয়ে গুণ করে ভিমড়ি খেতে শুরু করে। এক কাপ কফির দাম একশ থেকে তিনশ টাকা, সিনেমায় টিকেট আটশ থেকে হাজার টাকা, আইসক্রিমের কোন দুইশ থেকে পাঁচশ টাকা, গানের সিডি প্রায় হাজার টাকা, একটা বই দুই থেকে তিন হাজার টাকা।

মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানের জন্যে সেখানে কেনাকাটা করা রীতিমতো কঠিন একটা ব্যাপার। (তবে বড়লোকের ছানাপোনারা যারা এই দেশে বনানী-গুলশানের হাইফাই দোকানপাট-রেস্টুরেন্টে ঘোরাফেরা কিংবা খানাপিনা করে অভ্যস্ত তাদের জন্যে ব্যাপারটা সহজ। এই দেশে তারা মোটামুটি আমেরিকান দামেই কেনাকাটা বা খানাপিনা করে।)

কাজেই, অন্য সবার প্রথম কাজ হচ্ছে কোনো কিছু কেনার আগে মনে মনে আশি দিয়ে গুণ করে ফেলার অভ্যাসটুকু ঝেড়ে ফেলা।

আমেরিকায় কেনাকাটার আরেকটা বিষয় হচ্ছে ‘টিপস’, এর বাংলা প্রতিশব্দ হচ্ছে ‘বখশিশ’। কিন্তু বখশিশ শব্দটার মাঝে তাচ্ছিল্য এবং অবমাননার ছাপ রয়েছে। টিপস শব্দটিতে তাচ্ছিল্য কিংবা অবমাননা নেই। আমেরিকার মূলধারার প্রায় সব তরুণ-তরুণী জীবনের কোনো না কোনো সময়ে রেস্টুরেন্টে ওয়েটারের কাজ করে বড় হয়েছে। তখন তাদের বেতন বলতে গেলে ছিলই না এবং খদ্দেরদের টিপসটাই ছিল তাদের বেতন।

সে দেশের রেস্টুরেন্টের ওয়েটার, নাপিত বা ক্যাব ড্রাইভারকে টিপস দিতে হয়। হতচ্ছাড়া কিপটে মানুষদের হাত গলে ১০ শতাংশ টিপসও বের হতে চায় না। দরাজদিল মানুষেরা দেয় ২০ শতাংশ। আর মাঝামাঝি পরিমাণ হচ্ছে ১৫ শতাংশ!

কাজেই বন্ধুবান্ধব সবাইকে নিয়ে কোথাও খেতে গেলে মেনুতে খাবারের দামটা দেখে আগেভাগেই তার সঙ্গে ১৫ থেকে ২০ ভাগ যোগ করে রাখাটা জরুরি।

(৫) আমরা হাত দিয়ে ডাল-ভাত-সবজি-মাছ-মাংস মাখিয়ে মাখিয়ে খাই। আমেরিকা গিয়েও বাসার ভেতরে নিজে রান্না করে সবকিছু হাত দিয়ে খাওয়া যাবে। বাইরে হ্যামবার্গার, স্যান্ডউইচ কিংবা পিৎজা (উচ্চারণটা পিজ্জা নয়, পিৎজা) হাত দিয়ে খেতে পারলেও বেশিরভাগ খাবার ছুরি-কাঁটা ব্যবহার করে খেতে হবে।

আমাদের এই অঞ্চলে খাবার জন্যে চামচ দেওয়া হয়। ইউরোপ-আমেরিকায় কিন্তু ডাইনিং টেবিলে চামচ নেই, শুধু ছুরি আর কাঁটা। কোন হাতে ছুরি, কোন হাতে কাঁটা ধরতে হয় সে রকম নানা ধরনের নিয়ম-কানুন রয়েছে। সেই নিয়ম আবার ইউরোপে এক রকম, আমেরিকায় অন্য রকম। কিন্তু মূল বিষয়টা খুব সহজ।

বেশিরভাগ মানুষ ডানহাতে কাজ করে এবং কাটাকাটি করতে একটু জোর লাগে, তাই ছুরিটা থাকবে ডানহাতে (এবং খাওয়ার প্রক্রিয়াতে সেটা কখনও মুখে ঢোকানো যাবে না, প্রয়োজনে আমি ডাইনিং টেবিলে একজনকে অন্যের ছুরি ব্যবহার করতে দেখেছি)– এটাই নিয়ম।

আমেরিকাতে কাঁটার জন্যে কোনো নিয়ম নেই। যারা ডানহাতে কাজ করে অভ্যস্ত তারা ছুরি দিয়ে কাটাকাটি শেষ করে প্লেটে ছুরিটা রেখে ডানহাতে কাঁটাটা তুলে নিয়ে খায়।

শুনেছি বিশুদ্ধ ‘অ্যারিস্টোক্রেট’ (বাংলা প্রতিশব্দ ‘সম্ভ্রান্ত’ শব্দটিতে অ্যারিস্টোক্রেসি পুরোটা ফুটে উঠে না, তাই আসল শব্দটাই ব্যবহার করতে হল) মানুষেরা মরে গেলেও ডানহাতে মুখে খাবার তুলে না। এই নিয়মগুলো কে করেছে এবং কেন এই নিয়মেই খেতে হবে, অন্য নিয়মে কেন খাওয়া যাবে না, আমি তার উত্তর জানি না।

তবে বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে অনেক আমেরিকান কিন্তু চপস্টিক (দুই টুকরো কাঠি) দিয়ে খেতে পারে। আমার ধারণা একবার চপস্টিক দিয়ে খেতে শিখে গেলে খাওয়ার জন্যে এটা খুব চমৎকার একটা পদ্ধতি।

আমার কিছু আমেরিকান বন্ধু আমাদের দেখাদেখি হাতে খেতে গিয়ে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। তারা আঙুল দিয়ে খাবার মাখিয়ে মুখ পর্যন্ত নিয়ে গেলেও মুখে সেই খাবার ঢোকাতে গিয়ে নাস্তানাবুদ হয়েছে। পাঁচটা আঙুল মুখের ভিতরে ঢুকিয়ে সেখানে খাবারটা ছেড়ে দিতে গিয়ে আবিষ্কার করেছে কাজটা মোটামুটি অসম্ভব। যারা আগে কখনও লক্ষ্য করেনি তাদেরকে বলে দেওয়া যায়, আমরা কিন্তু মুখের ভেতর আঙুল ঢুকাই না, বুড়ো আঙুল দিয়ে ঠেলে খাবারটা মুখে ঢুকিয়ে দিই, অত্যন্ত দক্ষ একটা পদ্ধতি।

খাবারের কথা বলতে হলেই পানীয়ের ব্যাপারটা তার সঙ্গে চলে আসে। আমেরিকায় ট্যাপের পানি বিশুদ্ধ। তাই পানি কিনে খাবার প্রয়োজন নেই। শুনেছি নিউ ইয়র্কের মানুষ মোটা হয়ে যাচ্ছে বলে বিশাল আকারের সফট ড্রিংক বেআইনি করে দেওয়া হয়েছে।

তবে অ্যালকোহল জাতীয় পানীয় (সোজা বাংলায় মদ) নিয়ে সবাইকে আশ্বস্ত করা যায়, যারা এটা খেতে চায় না আমেরিকানরা কখনওই তাদেরকে সেটা খেতে জোরাজুরি করবে না। তবে মদ-খাওয়া বাঙালিদের কথা আলাদা। তারা নিজেরা সেটা খায় বলে অন্যদের খাওয়ানোর জন্যে বাড়াবাড়িতে ব্যস্ত থাকে। বাঙালিদের আসরে তারা অন্য বাঙালিদের জোর করে, তাদের চাপ দেয় এবং না খেলে তাকে নিয়ে টিটকারি-ঠাট্টা-তামাশা করে। এর কারণটা কী আমি এখনও বের করতে পারিনি।

(৭) খাবার এবং পানীয়ের কথা বলা হলেই এর পরবর্তী ধাপ হিসেবে টয়লেটের কথা বলা উচিত। লোকচক্ষুর আড়ালে এর খুঁটিনাটি নিয়ে কথা বলা যেতে পারে। কিন্তু ছাপার অক্ষরে কিছু লিখে ফেলাটা শোভন হবে না। এই ভয়ংকর বিষয়টা জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে শিখতে হবে, আমরা যেভাবে শিখেছি।

(৮) ডাইনিং টেবিল আর টয়লেটের পরে নিশ্চয়ই বাথরুমের ব্যাপারটা আসার কথা। নিজের বাসায় নিরিবিলি বাথরুমের মাঝে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু আমেরিকার গণবাথরুমের মতো ভয়ংকর আর কিছু হতে পারে বলে আমার জানা নেই। আমাকে আগে থেকে কেউ সতর্ক করে দেয়নি। তাই প্রথমবার যখন আমার ডরমিটরির গণবাথরুমে একজন আমার সামনে জামা-কাপড় খুলে পুরোপুরি ন্যাংটো হয়ে গিয়েছিল, সেই আতংকের কথা আমি কোনোদিন ভুলব না!

এরপর অনেকদিন পার হয়েছে, আমি অনেক কিছুতে অভ্যস্ত হয়েছি। কিন্তু গণবাথরুমে উদাস মুখে শরীরে একটা সুতো ছাড়া সবাই ঘুরে বেড়াচ্ছে– সেই দৃশ্যে আমি কোনোদিন অভ্যস্ত হতে পারিনি। এই জন্মে সেটা সম্ভব হবে বলেও মনে হয় না। ছেলেরা ছেলেদের সামনে এবং মেয়েরা মেয়েদের সামনে জামা-কাপড় পুরোপুরি খুলে ফেলতে কোনো লজ্জা অনুভব করে না– এই ব্যাপারটা কীভাবে সম্ভব হতে পারে আমি কোনোদিন বুঝতে পারব না!

(৯) আমেরিকার দৈনন্দিন জীবনে পোশাকের ব্যাপারটা সবচেয়ে সহজ। সেটা নিয়ে কেউই মাথা খামায় না। যার যা খুশি পরতে পারে। তাই যে যেটা পরে আরাম পায় সেটাই পরে। টি শার্ট আর জিনস পরে পুরো জীবন কাটিয়ে দেওয়া যায়। (হাওয়াইয়ে আমার পরিচিত একজন বাংলাদেশের অধ্যাপক বিরক্ত হয়ে গ্রীষ্মকালে ক্লাস নেওয়া ছেড়ে দিয়েছিলেন, কারণ ছাত্রীরা বিকিনি পরে ক্লাসে চলে আসে! তবে হাওয়াইয়ের কথা আলাদা, মূল ভুখণ্ডে এত বাড়াবাড়ি নেই।)

একজন সহকর্মী হঠাৎ করে মারা যাবার পর তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াতে যাওয়ার সময় স্যুট পরে যাওয়া ছাড়া অন্য কখনও আমার স্যুট-টাই পরার সুযোগ হয়েছে বলে মনে করতে পারছি না! আনুষ্ঠানিক পোশাক পরতে হয় সে রকম জায়গা নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু আমার আঠারো বছরের প্রবাসজীবনে সে রকম জায়গায় খুব বেশি যেতে হয়নি। (কী আনন্দের কথা, দেশে ফেরার পর বাকি আঠারো বছরেও আমার সে রকম জায়গায় যেতে হচ্ছে না!)

(১০) আমাদের দেশে পান খাওয়ার একটি ব্যাপার আছে। তার সঙ্গে জড়িত আছে পানের পিক, পান চিবুতে চিবুতে এদিক সেদিক পিচিক করে পানের পিক ফেলাটা প্রায় কালচারের অংশ হয়ে গেছে। (কেউ কি আমাদের সদর হাসপাতালগুলোর দেওয়ালের কোনাগুলো দেখেছে? মনে হয় সেগুলো তৈরিই হয়েছে পানের পিক ফেলার জন্যে!) শুধু পানের পিক নয়, চিপসের প্যাকেট, ঠোঙ্গা, পানির খালি বোতল, চিউয়িং গামের কাগজ, সিগারেটের গোড়া যেখানে-সেখানে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়াটাকে এখানে কেউ অন্যায় কিছু মনে করে না।

বাংলাদেশের সবুজ পাসপোর্টটা হাতে নিয়ে পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশে যাবার জন্যে প্লেনে ওঠার আগে এই অভ্যাসগুলো বাক্সবন্দি করে দেশে রেখে যেতে হয়। আমেরিকার কোনো রাস্তায় অন্যমনস্কভাবে একটা ঠোঙা ছুঁড়ে ফেলার পর যদি কোনো খুরথুরে বুড়ি সেটা তুলে হাতে ধরিয়ে দিয়ে ঠিক জায়গায় ফেলতে বলে তাহলে অবাক হবার কিছু নেই। (দোহাই লাগে, এ রকম কোনো অভিজ্ঞতা হলে কেউ যেন নিজের দেশের পরিচয় দিয়ে দেশের বেইজ্জতি না করে!)

দেশের বাইরে গেলে শারীরিক কিছু ব্যাপার-স্যাপারেও একটু সতর্ক থাকা ভালো। ভালো-মন্দ কিছু খেলে খাবার শেষে একটা বড়সড় ঢেকুর তোলাটা আমাদের কাছে খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। (আমি শুনেছি কোনো কোনো কালচারে খাওয়া শেষে অতিথিরা ঢেকুর না তুললে সেটাকে অপমান হিসেবে ধরা হয়!)

তবে পশ্চিমা দেশে প্রকাশ্য জায়গায় ঢেকুর তোলাটা বন্ধ রাখতে হবে। হাঁচি-কাশি-ঢেকুর এ রকম গর্হিত ব্যাপার যদি ঘটেই যায় তাহলে ‘এক্সকিউজ মি’ বলে ক্ষমা চাইলে সবাই সেই অপরাধকে ক্ষমা করে দেয়। প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে এই বাক্যাংশটি ব্যবহার করার জন্যে প্রস্তুত থাকতে হবে।

এই সঙ্গে আরেকটা বাক্যাংশ শিখে নেওয়া ভালো– সেটা হচ্ছে ‘থ্যাংক ইউ’। কোনো একটা অজ্ঞাত কারণে আমরা যদি কারও প্রতি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ অনুভব করি তারপরও সেটা মুখ ফুটে বলি না। আমেরিকা গেলে এটা মুখ ফুটে বলা শিখে নিতে হবে। বাক্যাংশটি চমৎকার, যে বলে এবং যাকে বলে দুজনেই এটা থেকে আনন্দ পেতে পারে।

(১১) আমেরিকাতে তরুণ-তরুণীরা (এবং বুড়ো-বুড়িরাও) তাদের ভালোবাসা যথেষ্ট খোলামেলাভাবে প্রকাশ করে। দুজন তরুণ-তরুণী হাত ধরাধরি করে কিংবা জড়াজড়ি করে হাঁটছে এটা খুবই পরিচিত একটা দৃশ্য। কিন্তু দুজন তরুণ (কিংবা দুজন তরুণী) পরস্পরের হাত ধরে হাঁটছে এটা মোটেও পরিচিত দৃশ্য নয়।

দুজন তরুণ (কিংবা দুজন তরুণী) পরস্পরের খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু হতে পারে, কিন্তু কখনওই তারা একে অন্যের হাত ধরে হাঁটবে না। কারণ তাহলে অন্যেরা সেটাকে বিশেষ এক ধরনের সম্পর্ক হিসেবে ধরে নেবে (কোনো লেখায় আমার নাম থাকলে বাচ্চা-কাচ্চারা সেটা পড়ে ফেলে বলে খবর পেয়েছি– তাই এই বিষয়টাকে আর বিস্তৃত করা গেল না)!

(১২) আমার একডজন তথ্য এবং উপদেশের শেষটিতে চলে এসেছি– আসলে এখানে যে কথাটি বলতে চেয়েছি সেটা বলার জন্যে উপরের কথাগুলো একটি ভনিতা মাত্র! উপরের ভূমিকাটি শেষ করে এবারে আমি আসল কথাটিতে চলে আসতে পারি।

আমাদের দেশে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও সেগুলোতে সত্যিকার অর্থে গবেষণা শুরু হয়নি। (শিক্ষা এবং গবেষণার জন্যে সরকার যে পরিমাণ টাকা খরচ করে সেটা একটা কৌতুকের মতো!) তাই এই দেশের উৎসাহী ছেলেমেয়েরা প্রতি বছর বাইরে পিএইচ-ডি করতে যায়। এদের অনেকে এত উৎসাহী, এত সৃজনশীল, এত প্রতিভাবান যে তাদের একটা ছোট অংশও যদি দেশে ফিরে আসত তাহলে দেশে মোটামুটি একটা বিপ্লব ঘটে যেত।

কিন্তু তারা আসলে দেশে ফিরে আসে না। আমি আশায় আশায় থাকি যে কোনোদিন এই দেশের সরকার একটি-দুটি ছোট বিষয় নিয়মের মাঝে নিয়ে আসবে এবং আমাদের এই উদ্যমী সোনার টুকরো ছেলেমেয়েরা দেশে ফিরে আসতে শুরু করবে। যতদিন তারা দেশে ফিরে না আসছে আমার খুব ইচ্ছে তারা অন্তত এই দেশটির কথা তাদের বুকের ভিতরে লালন করুক, এর বেশি আমার কিছু চাইবার নেই।

আমাদের দেশ থেকে যারা লেখাপড়া করতে বিদেশে গিয়ে সেখানে থেকে যায় তাদেরকে আসলে মোটামুটি দুই ভাগে ভাগ করা যায়। এক ভাগ কখনও ভুলতে পারে না যে তারা এই দরিদ্র দেশটির মূল্যবান সম্পদ ব্যবহার করে লেখাপড়া করেছে, প্রতিদানে তারা দেশকে কিছু দেয়নি। দরিদ্র দেশে প্রায় বিনামূল্যে পাওয়া শিক্ষাটুকু ব্যবহার করে আমেরিকাকে (বা সে রকম কোনো একটা দেশকে) সেবা করে যাচ্ছে। সে জন্যে তাদের ভেতর একটা অপরাধবোধ কাজ করে। তারা সব সময়েই দেশের ঋণটুকু শোধ করার জন্যে নানাভাবে চেষ্টা করে।

আরেক ভাগ মানুষ এই অপরাধবোধ থেকে বের হবার জন্যে অত্যন্ত বিচিত্র একটা উপায় খুঁজে বের করেছে, সেটা হচ্ছে সবকিছুর জন্যে নিজের দেশটিকেই দায়ী করা। তারা প্রতিমূহূর্তে দেশকে গালাগাল দেয়। তারা বড় গলায় সবাইকে জানিয়ে দেয় এই পোড়া দেশে জ্ঞান-বিজ্ঞান-গবেষণার সুযোগ নেই, তাদের মেধা কিংবা প্রতিভা ব্যবহারের সুযোগ নেই, এই দেশে জন্ম হওয়াটাই অনেক বড় ভুল হয়েছিল। এখন আমেরিকাতে আসন গেড়ে সেই ভুল সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

নিজের দেশটি কীভাবে রসাতলে যাচ্ছে তার সমস্ত পরিসংখ্যান তাদের নখদর্পণে। দেশের অবিবেচক মানুষ কীভাবে রাজনীতি করে, হরতাল দিয়ে, সন্ত্রাস করে দুর্নীতি করে পুরো দেশটাকে ডুবিয়ে দিচ্ছে– সেটা তারা শুধু নিজেদের মাঝে নয় বাইরের সবার সঙ্গেও আলোচনা করে সময় কাটায়।

আমার যে ছাত্রছাত্রীরা আমেরিকাতে লেখাপড়া করতে যাচ্ছে তাদের এই স্বার্থপর অংশ থেকে সতর্ক থাকতে বলেছি, সম্ভব হলে একশ হাত দূরে থাকতে উপদেশ দিয়েছি। পৃথিবীতে যত রকম অনুভূতি আছে তার মাঝে সবচেয়ে সুন্দর অনুভূতি হচ্ছে ভালোবাসা। আর পৃথিবীতে যা কিছু ভালোবাসা সম্ভব তার মাঝে সবচেয়ে সেরা জিনিসটি হচ্ছে মাতৃভূমি। মাতৃভূমিটি যখন সবকিছুতে আদর্শ হয়ে উঠতে শুরু করে তখন তাকে ভালোবাসব– যখন সেটা দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণায় জর্জরিত হবে তখন তাকে ভালোবাসব না– সেটা তো হতে পারে না। যে সব হতভাগারা নিজের দেশকে ভালোবাসার সেই মধুর অনুভূতি কখনও অনুভব করেনি আমি আজকাল তাদের জন্যে করুণাও অনুভব করি না।

আজ থেকে প্রায় চল্লিশ বছর আগে আমি যখন আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচ-ডি করতে গিয়েছিলাম তখন আমি ছিলাম সেখানকার একমাত্র বাংলাদেশি। (দ্বিতীয় বাঙালি হিসেবে যে ছাত্রীটি এসেছিল ঝটপট তাকেই আমি বিয়ে করে ফেলেছিলাম!) এখন সেই অবস্থার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আমেরিকার যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন অনেক বাঙালি আছে, খাটি বাংলাদেশের বাঙালি। মাতৃভূমি ছেড়ে প্রবাসী হবার পর বাংলাদেশের সেই মানুষগুলোই হয়ে ওঠে পরিবারের মানুষ, হয়ে ওঠে আপনজন।

সুখে-দুঃখে সার্বক্ষণিকভাবে শুধু বাংলাদেশের মানুষকে নিয়েই সময় কাটাবে, নাকি পৃথিবীর ভিন্ন ভিন্ন দেশ থেকে আসা ভিন্ন ভিন্ন কালচারের মানুষগুলোর সঙ্গেও একটা আন্তরিক সম্পর্ক করে তুলবে?

যারা শুধুমাত্র বাংলাদেশের বাঙালিদের সঙ্গেই গল্পগুজব, আড্ডা, রাজনীতি কিংবা অনেক সময় দলাদলি করে সময় কাটায় তারা কিন্তু অনেক বিশাল একটা ক্যানভাসে নিজের জীবনটাকে বিস্তৃত করার একটা চমৎকার সুযোগ হারায়। একটা দেশের গণ্ডি থেকে বের হয়ে একটা পৃথিবীর গণ্ডির মাঝে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ কিন্তু অনেক বড় সুযোগ। কেউ যখন প্রথমবার আবিষ্কার করে গায়ের রঙ, মুখের ভাষা, ধর্ম, কালচার সম্পূর্ণ ভিন্ন হলেও সবাই যে হুবহু একই রকম মানুষ– সেটি অসাধারণ একটি অনুভূতি।

কাজেই আমি আমার ছাত্রছাত্রীদের বারবার করে বলেছি তারা যেন নিজের দেশের মানুষের পাশাপাশি আমেরিকার মানুষদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে, সম্পর্ক গড়ে তোলে। ভিন্ন কালচারের বৈচিত্র্যের সৌন্দর্যটা যেন উপভোগ করে। তারা যেন হাইকিং করে, জগিং করে, ক্যাম্পিং করে, হাজার হাজার মাইল ড্রাইভ করে ঘুরে বেড়ায়, গাড়ি নষ্ট হয়ে গেলে বনেট খুলে ঠিক করে ফেলতে শিখে, তারা যেন তুষারে ঢাকা পাহাড়ে উঠে, সমুদ্রের নিচে স্কুবা-ডাইভিং করে, ছবি আকঁতে শিখে, গান গাইতে শিখে, মিউজিয়ামে যায়, অপেরা দেখে, কনসার্টে যায়।

এক কথায় যে বৈচিত্র্যময় কাজগুলো কখনও করার সুযোগ পায়নি সেইগুলো করে জীবনটাকে উপভোগ করে। (কেউ কি বিশ্বাস করবে আমার মতো একজন মানুষ পর্বতারোহণের ট্রেনিং নিয়ে আইস এক্স আর ক্লাইম্বিং রোপ হাতে তুষারে ঢাকা পাহাড়ে উঠে বরফের ওপর ক্যাম্প করে স্লিপিং ব্যাগে ঘুমিয়েছি? পর্বতের চূড়ায় ওঠে উল্লসিত হয়েছি?)

কোনো কিছু থেকে কি সতর্ক থাকার প্রয়োজন আছে? আগে ছিল না, এখন আছে। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ছাত্র কাজী নাফিসের ঘটনাটি হচ্ছে তার উদাহরণ। এই দেশের যুদ্ধাপরাধীদের চেলা-চামুণ্ডারা সেই দেশে আজকাল খুবই সক্রিয়। আমেরিকার সকল সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করে তারা শুধু নিজেরা থাকে না, তাদের আরও পিছনের কয়েক প্রজন্মকে সেই দেশে নিয়ে চলে যায়– কিন্তু দেশটিকে তারা মনে করে ‘কাফিরদের দেশ’!

ভিন্ন ধর্মের জন্যে অবজ্ঞা দেখিয়ে যখন কেউ কাফিরদের দেশে থাকার কলাকৌশল শেখাতে এগিয়ে আসবে তাদের থেকে সাবধান। ভিন্ন ধর্ম আর ভিন্ন কালচার মানে ‘খারাপ ধর্ম’ আর ‘খারাপ কালচার’ নয়। ভিন্ন মানে বৈচিত্র্য আর বৈচিত্র্য হচ্ছে সৌন্দর্য– এটা যত তাড়াতাড়ি জানা যায় ততই ভালো। যারা জানে না তারা নতুন পৃথিবীর মানুষ নয়– তাদের থেকে সাবধান।

আর সেই দেশে দীর্ঘদিন থেকে লেখাপড়া শেষ করে জীবনকে উপভোগ করে কখনও যদি দেশের জন্যে বুক টনটন করে তখন কী করতে হবে?

তখন তারা আবার এই দেশটাতে ফিরে আসতে পারবে। মা যেমন করে তার সন্তানের জন্যে অপেক্ষা করে, দেশমাতৃকাও ঠিক সে রকম করে তার সন্তানের জন্যে গভীর ভালোবাসা নিয়ে অপেক্ষা করে থাকে, অপেক্ষা করে আছে।

আমি বাড়িয়ে বলছি না– আমি এটা জানি।

মুহম্মদ জাফর ইকবাল : লেখক ও অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close