Featuredফিচার

লন্ডনে ডিম, মসজিদে চমক

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মাকসুদুল আলম, টোকিও থেকে: প্রথমে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের সামনের রাস্তাটির নামকরণ ফেলানী রোডের যে প্রস্তাব রয়েছে তার প্রতি বিন্দুমাত্র সংশয় না রেখে পূর্ণ সমর্থন জ্ঞাপন করছি। সেইসাথে যদি কেউ পুরান ঢাকার ঋষিকেশ দাস লেনের রাস্তাটির নামকরণ দর্জি বিশ্বজিত দাস রোড করার প্রস্তাব করেন,তার প্রতিও আমার পূর্ণ সমর্থন থাকবে। আমার এই লেখা পাঠকের হাতে পৌঁছার আগেই শেষ হয়ে যেতে পারে প্রযুক্তিবিদ তথ্য উপদেষ্টার আলটিমেটাম।

সম্প্রতি তিনি ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে আমাদের গণমাধ্যম কর্মীদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন এই বলে যে,‘তিনদিন পরেই চমক আসছে’। দৃঢ় কন্ঠে তিনি বলেছেন,‘আগামী তিনদিন খেয়াল রাখুন। চমক দেখতে পাবেন’। কি আছে তার চমকে? ঢাকঢোল পিটিয়ে সময়সীমা বেঁধে দিয়ে ভিনদেশী জনগণকে তিনি কি চমক দেখাতে চান? নাকি বক্তৃতা বিবৃতি দিয়ে নিজেই চমক হয়ে আসতে চাইছেন?

তিনি বলেছেন,আওয়ামী লীগ দলীয় নেতাকর্মীদেরকে প্রতি শুক্রবার মসজিদে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মসজিদে যেতে এখন দলীয় নির্দেশের প্রয়োজন হয়, এমন তথ্য জানা ছিল না। তথ্য উপদেষ্টার দেয়া তথ্যে জানলাম। এর আগেও তিনি গণমাধ্যমে আচমকা মন্তব্য করে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন।

ইফতার পার্টিতে কথার বোমা ফাটিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। বেসরকারি টেলিভিশন ‘চ্যানেল আই’ তে প্রচারিত ‘লেটস টক’ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে স্কুল পড়ুয়া একজন শিক্ষার্থী দর্শকের ‘আপনার কাছে তথ্য আছে আওয়ামী লীগ আগামীতে ক্ষমতায় যাবে’ এমন প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন,‘সব দেশেই নির্বাচনের আগে পোলিং হয়। আমি এই মুহূর্তে পোলিং করে বলে দিতে পারবো,কোন দল কয়টা আসন পাবে’। হাজার কোটি টাকা খরচ করে নির্বাচন করার কোনো প্রয়োজন নেই। ফলাফল তো তার হাতে।

তিনি এখন ‘অসমাপ্ত বিপ্লব’,‘রাইজিং স্টার’,‘ফেইলর স্টেট’,‘নেক্সট ইলেভেন’,‘মারাত্মক উন্নতি’ কিংবা ‘রূপকল্প ২০২১’ যতসব অদ্ভুত নামে গণমাধ্যমে গেইম খেলছেন। বিলবোর্ড সিনেমার পর এবার ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিরোধী প্রচারণার নতুন কৌশল হিসাবে ইসলামী ফাউন্ডেশনকে দিয়ে ভূঁইফোড় সংগঠনের নামে জনগনের আয়করের কষ্টার্জিত টাকায় লাখ লাখ বুকলেট তৈরি করে মসজিদে বিলি করানোর ফন্দি এঁটেছেন। কথায় আছে,শূন্য কলসি বাজে বেশি। আবার কেউ বলেন,যত গর্জে তত বর্ষে না। আমি বলি,মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত। উপদেষ্টার দৌড় বড়জোর ফেইসবুক ও ট্যুইটার পর্যন্ত। ৩০০ প্রার্থীর ৯০০ ফেইসবুক পেজ পর্যন্ত।

সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর অর্থায়নে পরিচালিত জরিপে দেখা যায় বর্তমান সরকারি দলের জনসমর্থন একেবারেই তলানিতে গিয়ে পৌঁছেছে। জরিপে দেখা যায়,দেশের ৮১ শতাংশ ভোটারই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করার বিরুদ্ধে। তারপরও সরকারি দলের নেতাদের হুঙ্কার ও গলার জোর কমছে না। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিমের মতে,সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন গুলোতে আওয়ামী লীগের পরাজয় হয়নি। পরাজয় হয়েছে জনগণের। কিছুদিন পরেই জনগণ বুঝতে পারবে তারা কী ভুল করেছে।

তার মতে,বাংলাদেশে আর কোনোদিন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরে আসবে না। জনার নাসিমের খুঁটির জোর কোথায়? কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম মনে করেন,আওয়ামী লীগ যদি একতরফাভাবে কোনরকমে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করেই, আর সেই নির্বাচনে বিরোধীদল বিএনপি যদি না যায়,তাহলে স্বতন্ত্র প্রার্থী তো আর ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। সেই স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কাছেও হারবে আওয়ামী লীগ।

প্রধান বিরোধীদল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের মতে,স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সঙ্গে নির্বাচন করেও জামানত হারাবে তারা। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মতে,আওয়ামী লীগ টের পেয়ে গেছে যে,নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে,তাদের সব প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হবে। তাই উচ্চ আদালতের আংশিক রায়ের দোহাই দিয়ে আগেভাগেই সংবিধান কাটাছেঁড়া করে রেখেছে। ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করতে সংবিধানে ছুরি চালিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দিয়েছে। হাইকোর্টের রায়কে ব্যবহার করে,এখন সাজানো নির্বাচন করে ক্ষমতাকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চাইছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও জাতীয় অধ্যাপক ড. তালুকদার মনিরুজ্জামান (নামটি আগে থেকে জানা ছিলনা, প্রথম জানলাম) মনে করেন, ভৌগলিক কারণে বাংলাদেশকে নেপাল বানাতে চায় আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত। সবসময় আধিপত্য বিস্তার করতে চায় তারা। বাংলাদেশে সংঘাত-সংঘর্ষ লেগে থাকলে বা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিরাজ করলে ভারতের লাভ। খুবই হক কথা। দুই দুইয়ে চার মেলাচ্ছি,ব্যাপারটি ঠিক তা নয়। চোখের সামনে যথেষ্ট আলামতও দেখতে পাচ্ছি।

বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতীয় ড্রোন মোতায়ন করা হচ্ছে। এর কারণ সম্পর্কে সরকারিভাবে কোন সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি। সীমান্তে বসবাসকারী বাংলাদেশীরা আতঙ্কে দিনযাপন করছেন। কখন আবার ফেলানির মত ঝুলে থাকতে হয়। গুলিতে পাখির মত শিকার হতে হয়। নির্বাচন নিয়ে চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানে জাতিসংঘের উদ্যোগও শেষ পর্যন্ত ভেস্তে যেতে চলেছে। সরকারের অনীহায় জাতিসংঘের অধিবেশন চলাকালে আপাতত আলোচনার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করে, নির্বাচন কমিশনকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, সব দলের অংশগ্রহণে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হলে তারা কোন পর্যবেক্ষক দল পাঠাবে না। বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত বৃটিশ এমপিও গণতন্ত্রের বৃহত্তর স্বার্থে বাংলাদেশে একটি অবাধ স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পক্ষে মত দিয়েছেন। নির্বাচন নিয়ে দেশ বিদেশের সবাই উদ্বিগ্ন হলেও ‘হু কেয়ারস’ মনোভাব নিয়ে রাজার হালে বহাল তবিয়তে দিন কাটাচ্ছে সরকার। বেশ কিছুদিন আগে যুক্তরাজ্যের ইকোনমিস্ট জানিয়েছিল,সরকারের মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা গণধোলাইয়ের ভয়ে নিজের নির্বাচনী এলাকায় যেতে সাহস করেন না। এখন আবার পত্রিকায় শুনছি বিদেশ ভ্রমনের ব্যাপারেও আতঙ্কে রয়েছেন মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা।

সম্প্রতি যুক্তরাজ্য সফররত সময় লন্ডনে তথ্যমন্ত্রীর ওপর আক্রমণ হয়েছিল। পত্রিকায় প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায় অজ্ঞাত পরিচয়ের দুই যুবক তথ্যমন্ত্রীকে কিল-ঘুষি মেরে লাঞ্ছিত করার চেষ্টা করছে। তবে তা নাকি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। তারা মন্ত্রীকে ডিম ছুড়ে মারে ও পরে বাইরে অপেক্ষমাণ গাড়িতে করে পালিয়ে যায়। মানবদেহের ওপর যে কোনো ধরনের আক্রমণ নিন্দার যোগ্য। বলার আর অপেক্ষা রাখে না। কোনভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।

তবে সরকারের মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদেরকেও জনগণের ভাষা বোঝার চেষ্টা করতে হবে। জনমতকে শ্রদ্ধা করতে হবে। ভিন্নমতকে সহ্য করতে হবে। শুধু নিজেদের আখের গোছানোর কাজে আর চাটুকারিতায় ব্যস্ত থাকলে চলবে না। দেশের স্বার্থে জনস্বার্থে কাজ করতে হবে। বিদেশ বিভুইয়ে আমরা নিজ দেশের মন্ত্রীদের মুখে পঁচা ডিম, টমেটো,আলু নিক্ষেপের মত দৃশ্য দেখতে চাই না। বাংলাদেশ থেকে প্রবাসে এসে লাঞ্ছিত হওয়াটা,মোটেই কারো প্রত্যাশিত নয়। জনমতকে শ্রদ্ধা না করলে,জনগনের ভাষা বোঝার চেষ্টা না করলে যে সুদুর প্রবাসেও সবাইকে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়,তা অনুধাবন করতে হবে।

লেখক: জাপান প্রবাসী কলাম লেখক ১৪ই সেপ্টেম্বর ২০১৩, টোকিও

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

আরও দেখুন...

Close
ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close