দুনিয়া জুড়ে

যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে দায়ী নাইরোবির শপিং মলে হামলার জন্য

চলতি সপ্তাহে কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবির ওয়েস্টগেট শপিং মলে সন্ত্রাসীদের হামলায় কমপক্ষে ৬২ জন মারা গেল। হামলার জন্য দায়ী করা হয়েছে সোমালিয়ার জঙ্গি সংগঠন আল শাবাবকে। সেই দায় স্বীকারও করে নিয়েছে আল শাবাব। কিন্তু কী কারণে আল শাবাব ভিন্ন একটি দেশে ঢুকে এই হামলা চালাল? তাদের ক্ষোভটা কী? লাভটাই বা কী?—এমন সব প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। অনেক বিশ্লেষক এ ঘটনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছেন।

তাঁরা মনে করছেন, সোমালিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নাক গলানোই এই ঘটনার মূল কারণ। প্রতিষ্ঠানবিরোধী রাজনৈতিক ভাবধারার ওয়েবসাইট কাউন্টারপাঞ্চে গত মঙ্গলবার ‘হাউ দ্য ইউএসএস সোমালি পলিসি স্পার্কড দ্য কেনিয়ান ম্যাসাকারস’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ ছাপা হয়। এটি লিখেছেন, প্রথাবিরোধী মাসিক ম্যাগাজিন ‘ফিউচার অব ফ্রিডম’-এর সম্পাদক শেল্ডন রিচম্যান। এই নিবন্ধে নাইরোবিতে হামলার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের হাত থাকার বিষয়টি খোলাসা করেছেন তিনি।

নিবন্ধে বলা হয়েছে, ১৯৯০ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র সোমালিয়ায় খবরদারি করে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের উসকানি না থাকলে আল শাবাবের মতো ক্ষুদ্র একটি সংগঠন হয়তো আজ এতটা প্রভাবশালী ও হিংস্র হয়ে উঠত না। যুক্তরাষ্ট্রের একটি রেডিওর পররাষ্ট্রনীতি-বিষয়ক অনুষ্ঠানের উপস্থাপক স্কট হর্টন ‘ফিউচার অব ফ্রিডম’-এর সেপ্টেম্বর সংখ্যায় একটি কলাম লিখেছেন।

কলামটির উদ্ধৃতি দিয়ে শেল্ডন রিচম্যান বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বহু দিন ধরেই সোমালিয়ায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করে আসছে। কেনিয়াসহ প্রতিবেশী আফ্রিকার অন্য দেশগুলো সোমালিয়ায় একের পর এক সামরিক অভিযান চালিয়েছে। তাদের সরাসরি মদদ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন মদদপুষ্ট এসব অভিযানের মাধ্যমে ১৯৯১ সালে সোমালিয়ার অপেক্ষাকৃত উদারপন্থী (একই সঙ্গে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নপন্থী) সরকারকে উত্খাত করে মার্কিন মদদপুষ্ট ট্রানজিশনাল ফেডারেল সরকারকে ক্ষমতায় বসানো হয়। বিদেশি সেনাবাহিনীর অভিযান ও ওই মার্কিনপন্থী ট্রানজিশনাল সরকারকে যারা প্রতিহত করেছে, তাদের ঠান্ডা মাথায় মৌলবাদী বানিয়ে দেওয়া হয়। সোমালিয়াজুড়ে বিশৃঙ্খলার সুযোগে আল-কায়েদার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গ্রুপ আল শাবাব সোমালিয়ার একটি অংশে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। বিদেশি হস্তক্ষেপ না হলে আল শাবাবের পক্ষে কস্মিনকালেও তা সম্ভব হতো না।

মার্কিন সাংবাদিক জার্মে শেহিলের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে স্কট হর্টন বলেছেন, টুইন টাওয়ারে হামলার পর তত্কালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের প্রশাসন বিশ্বের কয়েকটি দেশে সরকার পরিবর্তন আনা হবে বিবেচনা করে একটি তালিকা বানায়। নাইন-এগারোর হামলায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ—কোনোভাবেই যে দেশটির কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই, সেই সোমালিয়ার নামও ওই তালিকায় ছিল।

পেন্টাগন ও সিআইএর জন্য সৌভাগ্যের বিষয় হলো, তারা সোমালিয়ায় ইসলামপন্থী হওয়া বা অন্য কোনো বিবেচনায় টার্গেট করে হত্যাকাণ্ড ঘটানো বা অপহরণের জন্য সহজেই ভাড়াটে যুদ্ধবাজদের হাতে পেয়ে যায়। ১৯৯১-পরবর্তী সময়ে সিআইএর পয়সা খেয়ে সেখানকার যুদ্ধবাজ নেতারা ইসলামপন্থী নেতাদের টার্গেট করে হত্যা করতে শুরু করে।

এতে শুরু হয় চরম অস্থিরতা। সোমালিয়ার প্রায় এক ডজন ইসলামপন্থী গ্রুপ এক হয়ে ইসলামিক কোর্টস ইউনিয়ন (আইসিইউনামের একটি জোট গড়ে তোলে। এই জোট যুদ্ধবাজ নেতাদের এবং ট্রানজিশনাল ফেডারেল সরকারকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে সোমালিয়াকে ‘ইসলামি ভূখণ্ড’ ঘোষণা করে। বুশ প্রশাসন এটা মেনে নিতে পারেনি। আইসিইউকে উত্খাতে ২০০৬ সালে প্রতিবেশী খ্রিষ্টান-প্রধান দেশ ইথিওপিয়াকে দিয়ে সোমালিয়ায় সামরিক অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র।

স্কট হর্টনের দাবি, ওই অভিযানের নেতৃত্বে ছিল সিআইএ। মার্কিন মদদ সত্ত্বেও ইথিওপিয়ানরা টিকতে পারেনি। ২০০৮ সালে আইসিইউ ইথিওপিয়ানদের সোমালিয়া থেকে বিতাড়িত করে। ওই সময় আইসিইউয়ের একটি ছোট্ট উপদল হওয়া সত্ত্বেও আল শাবাব (শাবাব অর্থ তরুণ) লড়াইয়ে ব্যাপক সাহসিকতা প্রদর্শন করে।

ইথিওপিয়ান বাহিনীর পরাজয়ের পর ‘লজ্জা ঢাকতে’ যুক্তরাষ্ট্র আইসিইউর প্রবীণ নেতাদের আলোচনায় বসায়। তাদের ‘বুঝিয়ে-সুঝিয়ে’ ট্রানজিশনাল ফেডারেল সরকার পদ্ধতির পক্ষে স্বীকৃতি আদায় করে। এটি আল শাবাব মেনে নিতে পারেনি। তারা আইসিইউর ওই সব প্রবীণ নেতাকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ ও ‘আমেরিকার এজেন্ট’ ঘোষণা করে। একই সঙ্গে নিজেদের আল-কায়েদার অনুসারী গোষ্ঠী বলে ঘোষণা করে আল শাবাব।

যুক্তরাষ্ট্র সোমালিয়ায় তাদের মনোনীত সরকারকে টিকিয়ে রাখতে কোটি কোটি ডলার এবং আধুনিক সমরাস্ত্র সরবরাহ করে। এসব অর্থ ও অস্ত্রের একটি বড় অংশ পেয়েছে কেনিয়া ও ইথিওপিয়া সরকার। শেল্ডন রিচম্যান তাঁর কলামে লিখেছেন, কেনিয়ার ওপর প্রতিশোধ নিতে নাইরোবিতে হামলা চালিয়েছে আল শাবাব। তিনি মনে করেন, এর মাধ্যমে পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপরই হামলা চালানো হয়েছে। তাঁর কথায়, আল শাবাব এবং তাদের এই হুমকি ওয়াশিংটন ডিসিরই সৃষ্টি।

হর্টন বলেছেন, তখন থেকেই আল শাবাব আল-কায়েদার মতো আচরণ শুরু করে। চুরি করলে হাত কেটে দেওয়ার মতো শরিয়া আইন প্রয়োগ করতে থাকে। বারাক ওবামা ক্ষমতায় আসার পর আল শাবাবকে নিশ্চিহ্ন করতে যুক্তরাষ্ট্র আফ্রিকান ইউনিয়নের ব্যানারে উগান্ডা ও বুরুন্ডির সেনা পাঠায়। এদের সঙ্গে যুক্ত হয় কেনিয়ার সেনাবাহিনী। ২০১১ সালে ইথিওপিয়া আবার সোমালিয়ায় জঙ্গি দমনে অভিযান চালায়। ২০১২ সালে কেনিয়ার বাহিনী সোমালিয়ার বন্দর শহর ও আল শাবাবের প্রধান ঘাঁটি কিসমায়ো থেকে তাদের বিতাড়িত করে।

 

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close