Featuredস্বদেশ জুড়ে

নিজেদের রাজনীতি ঠিকঠাক করতে হবে বাংলাদেশকেই

বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ। পাকিস্তানের কাছ থেকে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় যুদ্ধাপরাধের  অভিযোগে শীর্ষ স্থানীয় ইসলামী রাজনীতিবিদ আবদুল কাদের মোল্লাকে সুপ্রিম কোর্ট ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের শাস্তি দিয়েছে গত ১৭ই সেপ্টেম্বর। ফেব্রুয়ারিতে তাকে বাংলাদেশী একটি যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক আদালত যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় তখন হাজার হাজার মানুষ তার ফাঁসির দাবিতে রাজপথে নেমে আসে। তখন থেকে প্রতিবাদ বিক্ষোভ ও পাল্টা প্রতিবাদ বিক্ষোভে শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ এসব কথা লিখেছেন গ্যারি জে. বাস। ‘নিক্সন অ্যান্ড কিসিঞ্জারস ফরগোটেন শেম’ শীর্ষক নিবন্ধ প্রকাশিত হয় গতকাল।

তিনি প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির রাজনৈতিক এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ক প্রফেসর। লিখেছেন ‘দ্য ব্লাড টেলিগ্রাম : নিক্সন, কিসিঞ্জার, অ্যান্ড এ ফরগোটেন জেনোসাইড’ বই। নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর ওই নিবন্ধে তিনি আরও লিখেছেন, একথা মার্কিনিদের কাছে দূরবর্তী ও অপ্রাসঙ্গিক শোনাতে পারে। কিন্তু এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অনেকটা সম্পর্ক রয়েছে। ১৯৭১ সালে গভীর যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যখন বাংলাদেশের জন্ম হয় বর্তমান সমস্যার মূল নিহিত রয়েছে তার মধ্যে। তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন রিচার্ড এম. নিক্সন। তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন হেনরি এ. কিসিঞ্জার। তারা ঘাতকদের ব্যাপকভাবে সমর্থন করেছিলেন। এটা বাংলাদেশী প্রজন্মের কাছে এক যন্ত্রণা।

১৯৪৭ সালে ভারত উপমহাদেশ ভাগ হয়। তখন থেকেই অদভুত বিভক্তি ভূ-প্রকৃতির মুসলিম দেশ হিসেবে একীভূত পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছিল। এতে কর্তৃত্ব ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের (যা বর্তমানে শুধুই পাকিস্তান)। এটি নিপীড়িত পূর্ব পাকিস্তান (যা বর্তমানে বাংলাদেশ) থেকে ছিল আলাদা। এ দু’অংশের মধ্যে ছিল হাজার মাইলের দূরত্ব। মাঝখানে ছিল বৈরী ভারত।

পাকিস্তানিরা কৌতুক করে বলতেন, তাদের বিভক্ত এই দু’ অংশ নিয়ে সৃষ্ট দেশটি ইসলাম ও পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্স দ্বারা একীভূত। ১৯৭০ পর্যন্ত এই উদ্ভট যুক্তি তারা দেখিয়েছে। এরপর জাতীয় নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা বিজয় অর্জন করে। তখন ক্ষমতায় ছিল সেনা সরকার। এর ঘাঁটি ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। পূর্ব পাকিস্তান তাদের হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে বলে তাদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়।

ফলে ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ পাকিস্তানি সেনারা পূর্ব পাকিস্তানের বিদ্রোহী বাঙালিদের বিরুদ্ধে ভয়াবহ দমন-পীড়ন শুরু করে। রক্তপাতের মাঝামাঝি সময়ে সিআইএ এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হিসাব দেখায় যে, প্রায় ২ লাখ মানুষ মারা গেছে। তবে এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের হিসাব অনেক বেশি। তাদের হিসাবে এ সংখ্যা ৩০ লাখ। প্রায় এক কোটি বাঙালি শরণার্থী দেশ থেকে পালিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে যায়। সেখানে দুর্দশাপীড়িত শরণার্থীদের শিবিরে তারা মারা যায়।

সম্প্রতি ফাঁস হওয়া ডকুমেন্ট ও হোয়াইট হাউসের টেপ বলে যে, পাকিস্তানি জেনারেলদের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন নিক্সন ও কিসিঞ্জার। অনেক সঙ্কটময় সময়ে তারা ঘাতক ওই শাসকগোষ্ঠীকে সমর্থন করেছেন। পুরো শীতল যুদ্ধের সময়ে ভয়াবহ এ ঘটনাকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। অবশ্যই কোন দেশই নয়, এমনকি যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের প্রতিটি স্থানের গণহত্যা প্রতিরোধ করতে পারে না।

কিন্তু এক্ষেত্রে ঘটনাটি ঘটিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র। তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছে এবং নিজেদের লোকজনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম। পাকিস্তানি সামরিক সরকারের ওপর খুব একটা চাপ সৃষ্টি করেননি নিক্সন ও কিসিঞ্জার। ২৫শে মার্চ পাকিস্তান দমন-পীড়ন শুরু করে। এর আগের দিনগুলো ছিল অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানি জেনারেলরা তাদের নিজেদের বিরুদ্ধে গোলাগুলি শুরু করে।

এ বিষয়ে নিক্সন ও কিসিঞ্জার সচেতনভাবে পাকিস্তানি জেনারেলদের সতর্ক না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তারা নির্বাচনের ফলের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর জন্য চাপ দেননি। বাঙালি নেতৃত্বের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগি করতেও তারা সামরিক বাহিনীকে কিছু বলেননি। তারা এমন কোন সতর্কতা বা শর্ত চাপিয়ে দেন নি যাতে স্বৈরতন্ত্র থেকে পাকিস্তানি জান্তাকে বিরত রাখে। হত্যাযজ্ঞ শুরুর পর তারা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অথবা অর্থনৈতিক সমর্থন হারানোর হুমকিও দেননি।

চীনের সঙ্গে গোপনে সম্পর্ক তৈরি করা ও সোভিয়েতপন্থি ভারতকে শাস্তি দেয়ার জন্য তারা পাকিস্তানের সহায়তা চাইছিলেন। এতে তারা বাস্তবসম্মত রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে পারেন নি। হোয়াইট হাউসের টেপে পাওয়া যায় তাদের আবেগ। নিক্সন অশ্লীল গালিগালাজও করেন। ওভাল অফিসে কিসিঞ্জারকে নিক্সন বলেন যে, ভারতের দরকার একটি দুর্ভিক্ষ। তখন কিসিঞ্জার এ কথার মধ্যে নাক গলিয়ে বলেন, মরণমুখী বাঙালিদের জন্য কে রক্ত দিতে যায়! পূর্ব পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের কনসাল জেনারেল ছিলেন আরচার কে ব্লাড।

তিনি সাহসের সঙ্গে হত্যাযজ্ঞ নিয়ে বিস্তারিত জানিয়েছিলেন। তা সত্ত্বেও বাঙালিদের দুর্ভোগের বিষয়ে অবস্থান পরিবর্তন করেন নি নিক্সন ও কিসিঞ্জার। গণহত্যার বিষয়টি নিয়ে ওভাল অফিসে তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে তর্ক-বিতর্কে অংশ নেন নিউ ইয়র্কের রিপাবলিকান দলের সাবেক সিনেটর কেনেথ বি. কিটিং। তিনি বলেন, গণহত্যায় টার্গেট করা হচ্ছিল বাঙালি হিন্দুদের। কিন্তু নিক্সন ও কিসিঞ্জার তাতেও অবস্থান থেকে টলেন নি। কেনেথ বি. কিটিং তখন ভারতে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। আরচার কে. ব্লাডের কনস্যুলেট থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি ব্যতিক্রমী তারবার্তা পাঠানো হয়। বার্তাটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নীতির বিরোধী। তাতে তিনি গণহত্যার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।

এর ফলে তাকে পূর্ব পাকিস্তানে তার পদ থেকে উৎখাত করেন নিক্সন ও কিসিঞ্জার। ব্লাডকে ব্যক্তিগতভাবে ‘ম্যানিয়াক’ বলে তাচ্ছিল্য করেন। কিটিংকে বিশ্বাসঘাতক বলে অভিহিত করেন নিক্সন। ভারত গোপনে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি বিদ্রোহীদের সহযোগিতা করেছিল। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি যুদ্ধ শুরুর পরই সহিংসতার ইতি ঘটে। এ যুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনী বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে দ্রুততার সঙ্গে নিশ্চিত করে। এখানে সব সময়ই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও রাজনৈতিক অগ্রগতি চলছিল কঠিন অবস্থার মধ্য দিয়ে।

প্রাণহানি, অবকাঠামোর ধ্বংসস্তূপ ও মৌলবাদী রাজনীতি- এসব বিপর্যয়কর অবস্থা বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে আরও সঙ্গিন করে তুলেছিল। সামপ্রতিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও বাংলাদেশ একটি তাড়িত দেশ। আবদুল কাদের মোল্লার মতো বিবাদীদের পরিণতি কি হবে তা-ই এখন উত্তেজনার কেন্দ্রে।

১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তানিদের সঙ্গে স্থানীয় সহযোগীদের নিয়ে যে নৃশংসতা তারা ঘটিয়েছিলেন তার জন্য জাতীয় পর্যায়ে যুদ্ধাপরাধের বিচার হচ্ছে। এই বিচার ব্যাপক জনপ্রিয়। কিন্তু সুষ্ঠু বিচারের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে মাঝে মধ্যেই ব্যর্থ হয়েছে আদালত। এই প্রক্রিয়ায় ফাঁদে পড়েছেন সবচেয়ে বড় ইসলামী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর সদস্যরা। এ দলটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে যুক্ত। দেশের তিক্ততাপূর্ণ রাজনীতি ঠিকঠাক করতে হবে বাংলাদেশীদেরই।

কিন্তু নিক্সন ও কিসিঞ্জার যে উদাসীনতা দেখিয়েছেন তা তাদের কাজকে অনেক কঠিন করে তুলেছে। এখনও ১৯৭১ সালের ঘটনায় ভারতে যুক্তরাষ্ট্রের সুনাম অনেকটাই বিবর্ণ। কিসিঞ্জারের পক্ষ থেকে যদি একটি ক্ষমা প্রার্থনা খুব বেশি প্রত্যাশিত হয় তাহলে মার্কিনিরা অন্ততপক্ষে স্মরণ করতে পারবে তিনি ও নিক্সন ওইসব ভয়াবহ দিনগুলোতে কি করেছেন।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close