Featuredদুনিয়া জুড়ে

কূটনীতির অন্ধকার অধ্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র

শীর্ষবিন্দু আন্তর্জাতিক নিউজ ডেস্ক: সিরিয়ায় সরকারি বাহিনী সাধারণ জনগণকে হত্যা করছে, এমন অজুহাত তুলে দেশটিতে সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ফেলেছে যুক্তরাষ্ট্র। অথচ ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি দখলদার সেনারা যখন বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করেছিল, তখন এই যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ বন্ধ দূরে থাক, পাকিস্তানকে অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে সহায়তা করেছিল।

১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন রিচার্ড নিক্সন। তাঁর নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন হেনরি কিসিঞ্জার। সে সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক মহলকে আহ্বান জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশে গণহত্যা বন্ধে উদ্যোগ নেওয়ার জন্য। অথচ কিসিঞ্জারের পরামর্শে নিক্সন তা বাতিল করে দেন।

কেবল তা-ই নয়, সে সময় বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বজ্যেষ্ঠ কূটনীতিক ছিলেন আর্চার ব্লাড। তিনিও মত দিয়েছিলেন যে, ওই হত্যাযজ্ঞ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু নিক্সন প্রশাসন এ ধরনের প্রস্তাবে কান দেয়নি, বরং পাকিস্তানের জন্য সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগ সফল হয়নি। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। বাংলাদেশের অস্তিত্ব মার্কিন কূটনীতির পরাজয়ের নজির হিসেবে থেকে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এ পরাজয়ের কারণ ও ঘটনাক্রম ওঠে এসেছে ‘দ্য ইকোনমিস্ট’-এর কলাম লেখক গ্যারি ব্রাসের বই ‘দ্য ব্লাড টেলিগ্রাম’-এ। ৪৯৯ পৃষ্ঠার বইটিকে নিয়ে একটি সমালোচনা ছাপা হয়েছে ‘দ্য ইকোনমিস্ট’-এ।

বইটিতে গ্যারি ব্রাস লিখেছেন, কিসিঞ্জারের পরামর্শে নিক্সন পাকিস্তানকে যুদ্ধবিমান ও অস্ত্র সরবরাহ করেছিলেন। যদিও তিনি জানতেন, তাতে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘিত হয়। ওই সময় তিনি ভারতকে ঠেকানোর অভিপ্রায়ে বঙ্গোপসাগরে একটি নৌবহর মোতায়েন করেন। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, তিনি অত্যন্ত গোপনে চীনকে অনুরোধ করেছিলেন, ভারত সীমান্তে সেনা মোতায়েন করতে। বিশ্লেষকদের কাছে আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো, সোভিয়েত ইউনিয়নকে অগ্রাহ্য করে নিক্সন কেন এত বড় ঝুঁকি নিয়েছিলেন। সে সময় একটু এদিক-ওদিক হলেই তো সোভিয়েত ইউনিয়ন পারমাণবিক বোমা নিয়ে এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারত।

বাংলাদেশে গণহত্যার কথা নিক্সন ও কিসিঞ্জার বেশ ভালোভাবেই জানতেন। তাঁদের কূটনীতিকেরাই সে কথা বারবার তাঁদের জানিয়েছিলেন। ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের কনসল জেনারেল আর্চার ব্লাড টেলিগ্রামে সে সব তথ্য নিক্সন প্রশাসনকে জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এখানে ভেবেচিন্তে গণহত্যা চালানো হচ্ছে।

আর্চার ব্লাড ও তাঁর সহকর্মীরা মার্কিন সরকারকে আরও বলেছিলেন, পাকিস্তানকে সহায়তা না করতে। সে সময় প্রায় ২০ জন মার্কিন কূটনীতিক মার্কিন নীতির সমালোচনা করে একটি টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন। কূটনীতিকেরা আদর্শিক কারণে এত বড় ঝুঁকি নিয়েছিলেন যে, তা পরে তাঁদের পেশাজীবনকে খর্বিত করে দিয়েছিল।

বইটিতে গ্যারি ব্রাস লিখেছেন, ওই টেলিগ্রামে মার্কিন নীতি বদলায়নি, তবে তা ঐতিহাসিক নথি হিসেবে রয়ে গেছে। এ ধরনের খোলামেলা বিরোধিতা আর দেখা যায়নি। গ্যারি ব্রাস আরও বলছেন, পাকিস্তানের প্রতি নিক্সনের এ মনোভাবের পেছনে কেবল রাজনীতি নয়, বরং ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ প্রভাব রেখেছিল।

সে সময় পাকিস্তানের শাসক ইয়াহিয়া খানকে বেশ পছন্দ করতেন নিক্সন। তিনি ভাবতেন ইয়াহিয়া পাকিস্তানের ‘আব্রাহাম লিংকন’। অথচ ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরাকে তিনি ভীষণ অপছন্দ করতেন। আড়ালে তিনি ইন্দিরাকে ‘কুত্তি’ ও ‘ডাইনি’ হিসেবে অভিহিত করতেন।

সবচেয়ে বড় কথা, পাকিস্তান ছিল যুক্তরাষ্ট্রের পরীক্ষিত মিত্র। সে সময় ভারত ছিল অনেক বেশি সোভিয়েত ঘেঁষা। এ সময় চীনের নেতা মাও জে দংয়ের সঙ্গে দেখা করতে চীনে যেতে চেয়েছিলেন নিক্সন। আর এ কারণে কিসিঞ্জার স্বয়ং চীন সফর করেছিলেন।

কিসিঞ্জার সে সময় বলেছিলেন, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের খুব বেশি কিছু করার নেই। ইন্দিরা বলেছিলেন, বাংলাদেশ থেকে বিপুল শরণার্থীর ভারতে যাওয়ার বিষয়টি এক মানবিক বিপর্যয় এবং তা আঞ্চলিক শান্তি নষ্ট করতে পারে। অথচ কিসিঞ্জার বলেছিলেন, ‘শরণার্থী ইস্যুকে কেন্দ্র করে যুদ্ধে জড়ানো যায় না।’ তিনি বলেছিলেন, ভারত বিশ্বশান্তির জন্য বড় ধরনের হুমকি। নিক্সনের মতো কিসিঞ্জারও মনে করতেন ভারতের ‘জারজদের’ সংখ্যা কমানোর জন্য দেশটিতে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ শুরু হওয়া দরকার।

ব্রাস বলছেন, পাকিস্তানের ভাঙন যত দ্রুত হতে থাকে, কিসিঞ্জার ততই উগ্র হয়ে ওঠেন। কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে বলতেন, ‘আমাদের রাইনল্যান্ড।’ (এখান থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছিল।) তিনি আরও বলতেন, ভারত সুযোগ পেলে পাকিস্তানকে ‘ধর্ষণ’ করবে।

গ্যারি ব্রাস জানিয়েছেন, কিসিঞ্জারের তাঁর সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি। কিসিঞ্জার কেন সে সময় ওই রকম ভূমিকা নিয়েছিলেন, তা-ও তিনি কখনো ব্যাখ্যা করেননি। তবুও কিসিঞ্জারের মতো একজন মেধাবী ব্যক্তির এত বড় ভুল মার্কিন কূটনীতির ইতিহাসের অন্ধকার অধ্যায় বলেই বিবেচিত হবে।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close