Featuredদুনিয়া জুড়ে

দুষ্টগ্রহে ইতালির রাজনীতি

শীর্ষবিন্দু আন্তর্জাতিক নিউজ: বহুমাত্রিক শিল্পী দ্য ভিঞ্চি ছবিটি এঁকেছিলেন ইতালির মিলান শহরের সান্তা মারিয়া দেল্লা গার্সিয়া গির্জার দেয়ালে। শিল্পী লেওনার্দো দ্য ভিঞ্চি তাঁর বিখ্যাত শিল্পকর্ম দ্য লাস্ট সাপার এঁকেছিলেন দীর্ঘ চার বছর সময় নিয়ে।

কাজটি শেষ হচ্ছিল না যিশুর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতাকারী শিষ্য জুডাসের মুখাবয়বের জন্য। এই ঐতিহাসিক শিল্পকর্মটিতে তিনি ফুটিয়ে তুলেছিলেন গ্রেপ্তার ও ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করার আগে ১২ অনুগামীকে নিয়ে যিশুখ্রিষ্টের আহার করার দৃশ্য। ওই আহারপর্বেই যিশু বলেছিলেন, তাঁর এই অনুগামীদের মধ্য থেকে একজনের বিশ্বাসঘাতকতার জন্যই তিনি গ্রেপ্তার হতে পারেন।

এই মুখটির জন্য দ্য ভিঞ্চি মিলান শহরের গুন্ডা অধ্যুষিত এলাকায় হন্যে হয়ে ঘুরেছেন। কিন্তু আজকের দিনের ইতালিতে হয়তো এত কষ্ট করতে হতো না শিল্পীকে। মিলান শহরে খুব সহজেই একটি মুখ খুঁজে পেতেন তিনি। কোন সেই মুখ? মুখটি এখন সবার চেনা। নানা অপকর্ম করেও শুধু ক্ষমতা আর অর্থের দাপটে বহাল তবিয়তে দীর্ঘদিন রাজনীতি করে যাওয়া মিলানের ‘কৃতী সন্তান’ সিলভিও বেরলুসকোনি।

কিন্তু সবকিছুরই শেষ আছে। শেষ পর্যন্ত পার্লামেন্ট থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন চার-চারবারের নির্বাচিত এই প্রধানমন্ত্রী। শুধু ইতালিতে নয়, গোটা ইউরোপের রাজনীতিতে তিনি একটি দুষ্টগ্রহ বলে পরিচিত। ১৯৯৪ সালে প্রথম প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। এর পর থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত চার দফায় নয় বছর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তার আগে পররাষ্ট্র, স্বাস্থ্য ও অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বেও ছিলেন। গত ফেব্রুয়ারি মাসে ইতালির সর্বশেষ নির্বাচনে সিনেট সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৩৬ সালে মিলানে একজন সাধারণ ব্যাংক কর্মচারীর ঘরে জন্ম নেওয়া বেরলুসকোনি স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৯৪ সালে রাজনীতিতে নবাগত হিসেবেই প্রধানমন্ত্রী হন। যদিও সেই দফায় মাত্র নয় মাস ক্ষমতায় ছিলেন। পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ক্ষমতাকে ব্যবহার করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলেন এই বেরলুসকোনি। বিশ্বের ১৭৮ জন শীর্ষ ধনীর অন্যতম তিনি। রাজনৈতিক জীবনে একের পর এক কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত হয়েও নানা মতলব এঁটে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। কিন্তু এবার খুব সম্ভবত শেষ রক্ষা হচ্ছে না।

গত আগস্ট মাসে কর জালিয়াতির মামলায় ইতালির সর্বোচ্চ আদালত সাজা দিয়েছেন তাঁকে। বেরলুসকোনিকে এক বছর বাড়িতে অন্তরীণ থাকতে হবে। অথবা কোনো সামাজিক কাজে সময় দিতে হবে। আর তিনি ভবিষ্যতে রাজনীতি করতে পারবেন কি না সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্বটি ছেড়ে দেওয়া হয় পার্লামেন্টের ওপর।

এর আগে অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়ে মরক্কোর বংশোদ্ভূত কারিমা এল মাগরুহ ওরফে রুবীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করায় তাঁর সাত বছর কারাদণ্ড হয়। তবে বিষয়টি এখন উচ্চ আদালতে। মিলান শহরে বেরলুসকোনির ভিলায় ‘বুঙ্গা বুঙ্গা’ পার্টি হতো। সেখানে অনেক অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে যোগ দিত। ২০১১ সালে বিষয়টি জানাজানি হলে ইতালি জুড়ে প্রায় ১০ লাখ নারী বেরলুসকোনির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেন। ৭৭ বছর বয়স্ক বেরলুসকোনি তিনবার বিয়ে করেছেন। তবু মেয়েঘটিত ঘটনায় তিনি প্রায়ই খবরের শিরোনাম হয়েছেন।

বেরলুসকোনির দুর্গতির অন্যতম কারণ কারিমা এল মাগরুহ ওরফে রুবীর সঙ্গ

বেরলুসকোনির দুর্গতির অন্যতম কারণ কারিমা এল মাগরুহ ওরফে রুবীর সঙ্গ২০১১ সালে ইতালিতে চরম অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের মুখে দেশটির অর্থনৈতিক স্থবিরতা কাটাতে অর্থনীতিবিদ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। কিন্তু তাঁদের কথায় কান না দিয়ে বরং ২০১১ সালের ১৬ নভেম্বর পদত্যাগ করেন বেরলুসকোনি। গত ফেব্রুয়ারি মাসে সাধারণ নির্বাচনে আবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার চেষ্টা চালালেও তা ব্যর্থ হয়। তবে ২৯ শতাংশ ভোট পেয়ে বেরলুসকোনির দল পিপল অব ফ্রিডম পাঁচটি মন্ত্রী পদ নিয়ে সরকারে যোগ দেয়। সরকারের অংশীদার হলেও একাধিক মামলা ক্রমেই তাঁকে কোণঠাসা করছিল।

কারাদণ্ড এড়ানো ও রাজনীতিতে টিকে থাকার জন্য বেরলুসকোনি নতুন ফন্দি আঁটেন। নিজের পাঁচ মন্ত্রীকে সরিয়ে প্রধানমন্ত্রী এনরিকো লেত্তার সরকারের বিরুদ্ধে পার্লামেন্টে আস্থা ভোটের প্রস্তাব আনেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাথা হেঁট করে ২ অক্টোবরের আস্থা ভোটে লেত্তার জয় দেখতে হয়েছে তাঁকে। বেরলুসকোনির নিজের দলেরই অনেকে লেত্তার পক্ষে ভোট দেন। কর ফাঁকির অপরাধে তাঁকে সিনেট থেকে বহিষ্কার করা হলে জোট সরকারকে লণ্ডভণ্ড করার হুমকি দিয়েছিলেন বেরলুসকোনি। এই নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রধানমন্ত্রী এনরিকো লেত্তার মধ্য-বাম ও বেরলুসকোনির মধ্য-ডান দলের মধ্যে টানাপোড়েন চলে।

আস্থা ভোটে প্রধানমন্ত্রী এনরিকো লেত্তার জয়লাভের ঠিক দুই দিন পর ৪ অক্টোবর পার্লামেন্টে বেরলুসকোনির সিনেট পদ থাকা না-থাকার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন সিনেটররা। সেখানে কর নিয়ে জালিয়াতি ও অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের সঙ্গে সংসর্গের মতো অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত একজন ব্যক্তিকে সিনেটর পদ থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। খুব সম্ভবত এর মধ্য দিয়েই ২০ বছর ধরে ক্ষমতার অপব্যবহারকারী বেরলুসকোনির রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের ইতি ঘটতে চলেছে।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close