Featuredঅন্যকিছু

আত্মহত্যার সংখ্যা ৯১২

কাজী সুমন: ১৯৭৮ সালের ১৮ই অক্টোবর। পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কলঙ্কজনক ঘটনা ঘটে এ তারিখে। একসঙ্গে ৯১২ জন বিষাক্ত সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করে আমেরিকার জোন্সটাউনে। জোন্সটাউনের ধর্মযাজক জিম জোন্সের প্ররোচনায় তার অনুসারীরা এ হত্যাযজ্ঞটি ঘটায় বলে ধারণা করা হয়। তবে জোন্সটাউনের অনেকেই আত্মহত্যা করতে চাননি।

ধারণা করা হচ্ছে, যারা আত্মহত্যা না করে জোন্সটাউনের ওই বন্দিশালা থেকে পালাতে চেয়েছিলেন তাদের গুলি করে হত্যা করা হয়। ১৯৫৬ সালে জিম জোন্স নামে এক ধর্মযাজক একটি চার্চ প্রতিষ্ঠা করেন। তার উদ্দেশ্য ছিল ওই চার্চ থেকে আর্ত-পীড়িত মানুষদের সাহায্য-সহযোগিতা করা। জোন্সটাউন এলাকাটি মাইলের পর মাইল জঙ্গল দিয়ে ঘেরা।  ১৯৭৭ সালের দিকে জোন্সটাউনে বসবাসকারী লোকজনের ওপর উল্টো অমানবিক নির্যাতন শুরু হলো। বসবাসের জন্য পর্যাপ্ত ঘর ছিল না। যে ক’টি ঘর ছিল তার মধ্যে গাদাগাদি করে বসবাস করতে হতো লোকজনকে। নারী-পুরুষকে রাখা হতো আলাদা ঘরে। বিবাহিত দম্পতিকেও আলাদা ঘরে ঘুমাতে হতো।

এছাড়া প্রচণ্ড গরমে এবং ঘিঞ্জি পরিবেশে কাজ করার কারণে জোন্সটাউনের কয়েকজন লোক অসুস্থ হয়ে পড়েন। তারপরও লোকজনকে প্রচণ্ড রোদে দীর্ঘ ১১ ঘণ্টা কাজ করতে হতো। তার ওপর মড়ার ওপর খাঁড়া হয়ে সারাক্ষণ উচ্চস্বরে বাজানো হতো জোন্সের ভাষণ। সারাদিন কাজ করার পর যখন লোকজনের বিশ্রাম দরকার তখনও উচ্চস্বরে চলতো জোন্সের ভাষণ। এসব নির্যাতনের পরও কিছু লোক জন্সটাউনে থেকে যায় আর কিছু লোক পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

কিন্তু কেউ জোন্সটাউনের বাইরে যেতে চাইলে জোন্সের অনুমতি নিতে হতো। সারাক্ষণই অস্ত্রধারীরা পুরো এলাকা পাহারা দিতো। জোন্স চাইতো না কেউ জোন্সটাউন ছেড়ে চলে যাক। এ ঘটনা জানতে পেরে ক্যালিফোর্নিয়ার কংগ্রেসম্যান লিও রায়ান জোন্সটাউন সরজমিন পরিদর্শন করার সিদ্ধান্ত নেন প্রকৃত ঘটনা নিজ চোখে দেখার জন্য। তিনি সঙ্গে করে চলচ্চিত্র নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান এনবিসির কয়েকজন সদস্যকে নিয়ে যান।

প্রথমে দেখায় জোন্সটাউনের সবকিছু স্বাভাবিকই পান তিনি। কিন্তু ওইদিন সন্ধ্যায় একটি বিশাল ডিনারের আয়োজন করা হয় চার্চের কম্পাউন্ডে। ওই সময় কয়েকজন লোক ‘জোন্সটাউনের বন্দিজীবন থেকে মুক্ত জীবনে ফিরে যেতে চান’- এমন একটি চিরকুট লিখে গোপনে রায়ানের হাতে দেন। তখনই তার কাছে সবকিছু দিনে আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে যায়। পরের দিন অর্থাৎ ১৮ই নভেম্বর ১৯৭৮ সালে রায়ান ঘোষণা দেন- কে কে আমেরিকার ফিরে যেতে ইচ্ছুক। জোন্সের প্রতিশোধ নেয়ার ভয়ে অল্প কয়েকজন রায়ানের সঙ্গে যেতে রাজি হয়। রায়ান সফরসঙ্গীদের নিয়ে জোন্সটাউন এলাকা ছেড়ে যাওয়ার সময় কড়াকড়ি আরোপ করা হয়।

কিন্তু রায়ান ট্রাক নিয়ে কিছু দূর যাওয়ার পর জোন্সটাউনে ফিরে আসেন এই বন্দিশালা থেকে বের হতে ইচ্ছুক এমন কেউ রয়ে গেছে কিনা তা নিশ্চিত করতে। ঠিক এ সময় তার ওপর আক্রমণ করে বসেন জোন্সের অনুসারীরা। কিন্তু তাদের আক্রমণ থেকে বেঁচে গিয়েও রেহাই পাননি রায়ান। রায়ানসহ তার সফরসঙ্গী পাঁচজনকে বিমানবন্দরের টারমাকে গুলি চালিয়ে হত্যা করে জোন্সের অস্ত্রধারী বাহিনী। এ সময় আহত হন আরও কয়েকজন।

এ হত্যাকাণ্ড ঘটার পর একেবারে ভেঙে পড়েন জোন্স। তিনি জোন্সটাউনের আঙ্গিনায় তার অনুসারীদের জড়ো করেন। তাদের উদ্দেশে জোন্স বলেন, আমেরিকা সরকার কংগ্রেসম্যান রায়ানসহ পাঁচজন হত্যার বদলা অত্যন্ত কঠোরভাবে নিতে পারে। আক্রমণ করতে পারে আমাদের জোন্সটাউনে। তারা যদি বিমান থেকে জোন্সটাউনে গুলিবর্ষণ শুরু করে তাহলে আমাদের নিষ্পাপ শিশুগুলো মারা যাবে। তারা আমাদের লোকজনকে ধরে নিয়ে নির্যাতন শুরু করবে।

সুতরাং আমাদের জোন্সটাউন নিরাপদ নয়। উপস্থিত অনুসারীদের উদ্দেশে জোন্স বলেন, এখন একটাই রাস্তা আছে আমাদের একসঙ্গে সুইসাইড করতে হবে। এ সময় একজন নারী জোন্সের প্রস্তাবের প্রতিবাদ করেন। কিন্তু জোন্সের যুক্তির কাছে ওই নারীর প্রতিবাদ পাত্তা পায়নি। তখন জোন্সের প্রস্তাবই শিরোধার্য হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে মেনে নিতে হয় আত্মহত্যার পথ।

ইতিমধ্যে জোন্সটাউনের প্যাভিলিয়নের পাশে একটি বড় পাত্রে মেশানো হয় বিষাক্ত সায়ানাইড এবং ভ্যালিয়াম এসিড। প্রথমে সিরিঞ্জের মাধ্যমে বিষাক্ত সায়ানাইড শিশুদের মুখে পুশ করা হয়। এরপর মায়েরা এই বিষাক্ত দ্রবণ পান করেন। এ সময় পুরো জন্সটাউন জঙ্গলের সশস্ত্র পাহারাদাররা লোকজনকে আত্মহত্যায় উৎসাহিত করেন। ধীরে ধীরে তারা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। বিষাক্ত পয়জন পান করার ৫ মিনিটের মধ্যেই বেশিরভাগ লোক মারা যান।

এ সময় যারা আত্মহত্যা না করে পালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন তাদেরকে গুলি করে হত্যা করা হয়। অনেকের মৃতদেহ জঙ্গলের বিভিন্ন জায়গায় ছড়ানো-ছিটানো অবস্থায় পাওয়া যায়। তবে ধারণা করা হয়, ধর্মযাজক জিম জোন্স সায়ানাইড খাননি। তিনি পিস্তল দিয়ে মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করেছিলেন। এ ঘটনায় সর্বমোট ৯১৮ জন লোক মারা যান। এর মধ্যে ২৭৬টি শিশুর মৃতদেহ ছিল।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close