ফিচার

রাজনীতি নিয়ে রাজনীতিবিদরাই ভাবুন না

শওগাত আলী সাগর: ‘রাজনীতি নিয়ে রাজনীতিকদেরই ভাবতে দেওয়া ভালো’। জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষণে নির্বাচনকালীন সময়ে ‘সর্বদলীয় সরকার গঠনের’ প্রস্তাবের ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে সামাজিক যোগাযোগের জনপ্রিয় মাধ্যম ফেসবুকে এ মন্তব্য করেছিলাম। অগ্রজ সাংবাদিক, ঢাকার এবিসি রেডিও-র চিফ অপারেটিং অফিসার সানাউল্লাহ, আমাদের প্রিয় লাবলু ভাই তাতে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। তিনি মন্তব্য করেছেন, ”ঠিক আছে সাগর। দেশটা তাহলে ওদের কাছে বর্গা দিয়ে দিই! আমরা কেউ কিছু ভাবব না, বলব না। ওরা শুধু আমাদের জিম্মি না করলেই হয়!!!”

তার আগে আমাদের আরেক বন্ধু রঞ্জন নন্দী প্রশ্ন করেছেন, “আমরা সাধারণরাই যে রাজনীতি নিয়ে ফেসবুকে, অফিস-আদালতে, চায়ের দোকানে প্রতিনিয়ত ঝড়-তুফান তুলি– তারা কি এখন এসব বন্ধ করে দেব? বন্ধ করে চাল-ডাল-শাড়ি-গয়না-ফুটবল-ক্রিকেট-সিগারেট-অ্যারোপ্লেন নিয়ে স্ট্যাটাস দেব? আর আমাদের উদ্ধার করার জন্য এরশাদ-ফখরুল-নাসিমরাই ভেবে যাবেন?”

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষণটি প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নানা মহল থেকে প্রতিক্রিয়া এসেছে। স্বাধীনতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতে ইসলামী তাৎক্ষণিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করলেও, প্রধান বিরোধী দল বিএনপি প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেনি। তারা বরং পরদিন শনিবার দলের নীতিনির্ধারকদের সভা ডেকেছে। সভায় আলোচনা করেই তারা তাদের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছেন।

যদিও অনেকেই ধারণা করেছিলেন যে, বিএনপি আসলে জামাতের পথই অনুসরণ করবে, কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব নাকচ না করে দেওয়াকেই অনেকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেছেন। আমি নিজেও বিএনপির এ আচরণকে তাদের ‘রাজনৈতিক ম্যাচুরিটি’ হিসেবেই দেখছি।

প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব নিয়ে শুরু থেকেই ইতিবাচক একটা প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে সাধারণের মাঝে। এমনকি ‘সুশীল সমাজের প্রতিনিধি’ হিসেবে পরিচিত ব্যরিস্টার রফিকুল হক, ড. আকবর আলী খানের মতো ব্যক্তি যারা বরাবরই রাজনৈতিক অস্থিরতায় উদ্বিগ্ন ছিলেন এবং সমঝোতার তাগিদ দিয়ে আসছিলেন– তারাও প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবের মধ্যে ইতিবাচক সমাধানের সম্ভাবনা খুঁজে পেয়েছেন।

বিএনপি যেহেতু রাজনৈতিক দল, সেহেতু তারা তাদের রাজনীতির স্বার্থ বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেবে– এটা স্বাভাবিক। কিন্তু এরই মাঝে আমাদের অনেক বন্ধুই ‘ভিন্নরকম’ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতে শুরু করলেন। তারা প্রধানমন্ত্রীর সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাবের মধ্যেও সহিংসতার উসকানি খুঁজে পেলেন এবং তা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে প্রচার করতে শুরু করলেন।

প্রধানমন্ত্রীর সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাবের মধ্যে ‘সহিংসতার উসকানি’ যারা খুঁজেছেন তারা যে সবাই জামাত-বিএনপির লোক তা কিন্তু নয়। হ্যাঁ, জামাত-বিএনপিপন্থী কিছু কিছু টকশোর আলোচক এদের মধ্যে আছেন। এর বাইরে প্রগতিশীল বাম রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার দাবিদার অনেকেও আছেন। বলাবাহুল্য, এ অংশের প্রতিক্রিয়াই আমাকে মন্তব্য করতে উদ্বুদ্ধ করেছে।

এটা ঠিক, প্রধানমন্ত্রীর সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব নিয়েও আলোচনার, প্রশ্ন তুলবার সুযোগ আছে। সে সুযোগ না থাকলে বিরোধী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সরকারের আলোচনার যোগসূত্র হবে কীভাবে? আইনজ্ঞ শাহদীন মালিক যখন প্রশ্ন তুলেন, ‘’প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে বিরোধী দলকে কোন কোন মন্ত্রণালয় দেওয়া হবে তার উল্লেখ নেই’’– তখন তার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয় বৈকি। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি যদি প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবে সম্মত হয়, তাহলে মন্ত্রণালয় নিয়ে দর-কষাকষির সুযোগটা তাদের থাকা উচিত। প্রধানমন্ত্রী নিজেই যদি সেটি নির্ধারণ করে দেন, তাহলে তো আর আলোচনার কোনো জায়গা থাকে না।

প্রগতিশীল অনেক বন্ধুই প্রশ্ন তুলছেন, সর্বদলীয় সরকারের প্রধান হিসেবে যদি শেখ হাসিনাই থাকেন, তাহলে সংকটের সমাধান হল কীভাবে? মজার ব্যাপার হচ্ছে, বেগম খালেদা জিয়া একাধিকবার ‘হাসিনাকে রেখে কোনো নির্বাচন নয়’ বলে ঘোষণা দিলেও বিএনপি তাৎক্ষণিকভাবে সর্বদলীয় সরকারের প্রধান কে হবেন তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলেনি। অথচ আমরা আগেভাগে উসকে দিচ্ছি এবং আতংক ছড়ানোর মতো করেই বলে দিচ্ছি– ‘সহিংসতা অত্যাসন্ন’।

গত কয়েক দিনে ২৫ অক্টোবর ঘিরে দেশে বিদেশে বেশ বড় ধরনের আতংক তৈরি হয়েছিল। সর্বত্রই একটা উৎকণ্ঠাজনিত প্রশ্ন উচ্চারিত হয়েছে, কী হতে যাচ্ছে দেশে? মজার ব্যাপার হচ্ছে, এ উৎকণ্ঠা যতটা না রাজনীতিকরা ছড়িয়েছেন, তার চেয়ে বেশি কিন্তু মিডিয়া, টকশোর আলোচক আর রাজনীতি নিয়ে অতিউৎসাহী আমরা করেছি।

গত কয়েক বছর ধরেই জামাত একটা অপপ্রচার চালিয়েছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হলে দেশে ‘গৃহযুদ্ধ’ লেগে যাবে। জামাত কাজটা করেছে পরিকল্পিতভাবে এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে। জামাতের উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে জনমনে একটা আতংক তৈরি করা। একেকটা রায়ের পর পরিকল্পিত সন্ত্রাস সৃষ্টি করে তারা তাদের দীর্ঘদিনের অপপ্রচার প্রতিষ্ঠিত করারও চেষ্টা করেছে।

একই কায়দায় ২৫ অক্টোবর নিয়েও আতংক ছড়ানো হয়েছে। হালে সাদেক হোসেন খোকার ‘দা-কুড়ালের ঘোষণা’ ছাড়া রাজনীতিকরা গত কয়েক সপ্তাহে এমন কী ঘোষণা দিয়েছেন যাতে জনমনে আতংক তৈরি হতে পারে? কিন্ত মিডিয়া, টকশো আর আমরা মিলে কিন্তু ‘কেয়ামতের’ প্রস্তুতির জন্য সর্বসাধারণকে উৎসাহ দিয়েছি লাগাতার।

এটা সত্য, দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক অস্থিরতার পেছনের প্রধান ইস্যু হচ্ছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, পরিবর্তিত আর্থসামজিক বাস্তবতায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে নতুন করে ভাববার মতো জায়গায় আমরা দাঁড়িয়ে আছি। একটা দেশে রাজনীতিকরা জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা করতে পারবেন না, ওটা করে দেওয়ার জন্য বাইর থেকে লোক নিয়ে আসতে হবে, এই নিয়মটা অনন্তকাল চলতে পারে না।

তাহলে কখন আমরা এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসব? বিএনপি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায়? বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে যদি দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন জায়েজ হয়, আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রেখে এটা শুরু করা যাবে না কেন?  বিএনপি জমানায় ‘মাগুরা নির্বাচন’ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিকে জোরালো করেছিল। আওয়ামী লীগ অন্তত সে রকম কোনো দৃষ্টান্ত স্থাপন করেনি। তাহলে?

আর যারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে সারা বছর উচ্চকণ্ঠ থেকেছেন, তারা কিন্তু সমান্তরালভাবে নির্বাচনী ব্যবস্থা, দলীয় সংস্কার নিয়ে কথা বলেননি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের চেযেও নির্বাচনী ব্যবস্থা শক্তিশালী করার জন্য চাপ দেওয়া গেলে আজকের পরিস্থিতি হয়তো আরও সহজতর হয়ে যেত।

কিন্তু রাজনীতির বাইরে আমরা যারা নিজেদের দেশের ‘বিবেক’ হিসেবে দাবি করে অতিরিক্ত কথাবার্তা বলি, তারা কিন্তু রাজনৈতিক দলের এজেন্ডার বাইরে যাই না। রাজনৈতিক দলগুলো যেহেতু নির্বাচনী ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে চায় না, সে কারণে আমরাও সেটি নিয়ে উচ্চকণ্ঠ হই না। রাজনৈতিক দলগুলো যেহেতু দলের সংস্কারে আগ্রহী নয়, সে কারণে আমরা সেটি নিয়ে কোনো কথা বলতেই চাই না।

ক্ষমতায় যেতে না পারলে কোনো দলই সংসদে যাবেন না, তারা কেবল ক্ষমতার স্বাদই ভোগ করবেন– রাজনৈতিক দলের এই মানসিকতার বিরুদ্ধে কি গত কয়েক বছরে কোনো আন্দোলন হয়েছে? হয়নি। দেশের মানুষ, সাধারণ নাগরিকরা কিন্তু এগুলো ভেবেছেন।

সরকারের মেয়াদের শেষ প্রান্তে এসে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানের জন্য সারা দেশ যখন উন্মুখ, বিএনপিও যখন দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দলের মতোই প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেছে– তখন যারা দুটি দলের মধ্যে বিরোধ উসকে দিতে চান, তাদের আসলেই রাজনীতি নিয়ে ভাবা উচিত নয়, তাদের ভাবতে দেওয়াই উচিত নয়।

অগ্রজ সাংবাদিক সানাউল্লাহর মন্তব্যের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েও বলব, দেশটা আমরা অবশ্যই রাজনীতিকদের কাছে বর্গা দেব না। কিন্তু প্রগতিশীলতার বুলি আওড়ানো যে মানুষগুলো বিভেদ উসকে দিতে সক্রিয় হয়ে পড়েছেন, তাদের অবশ্যই রাজনৈতিক ভাবনা থেকে নির্বাসনে পাঠানোর চেষ্টা করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবনার পর নতুন করে আলোচনার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তাকে এগিয়ে  যেতে সহায়তার জন্যই সেটি করা দরকার।

 

লেখক: কানাডা থেকে প্রকাশিত ‘নতুনদেশ ডটকম’-এর প্রধান সম্পাদক।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close