Featuredবিনোদন

বাংলার দামাল ছেলে মান্না দে আর নেই

শীর্ষবিন্দু নিউজ: ‘কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই।‘ তার মায়াবী কণ্ঠের সেই সুর কলেজে সহপাঠীদের আসর মাতিয়ে যাবে, নিরন্তর বাঙালিকে নিয়ে যাবে স্মৃতির আয়নায়; শুধু ‘কফি হাউজের’ সেই গানটি আর গাইবেন না প্রবোধ চন্দ্র দে, ভারতীয় উপমহাদেশ যাকে চেনে মান্না দে নামে। কফি হাউজের সেই আড্ডাটার মতো মান্না দে চিরদিনের মতো হারিয়ে গেছেন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা তার সকল ভক্তদের কাছ থেকে। তবে তার রেখে যাওয়া সৃষ্টি সংস্কৃতি চিরদিন বেচে থাকবে সবার মনে।

পঞ্চাশের দশকে কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী মোহাম্মদ রফি, কিশোর কুমার,মুকেশদের সঙ্গে সঙ্গীতজগতে আবির্ভাব ঘটে মান্না দের। এরপর কেবল নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পালা। সাত যুগেরও বেশি সময় ধরে এপার বাংলা ওপার বাংলায় তিনি ছিলেন সমান জনপ্রিয়। সুর ছড়িয়ে তিনি জনপ্রিয়তা পেয়েছেন হিন্দি, মারাঠি, গুজরাটি, পাঞ্জাবি,অহমিয়া ভাষাগোষ্ঠীর মধ্যেও। বাংলাসহ বিভিন্ন ভাষায়  সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি গান রয়েছে তার। আধুনিক বাংলা গানের পাশাপাশি গেয়েছেন রবীন্দ্রসঙ্গীতও।

সঙ্গীতে অবদানের জন্য পুরস্কৃতও হয়েছেন তিনি। এ সুরস্রষ্টাকে ১৯৭১ সালে পদ্মশ্রী, ২০০৫ সালে পদ্মবিভূষণ এবং ২০০৯ সালে দাদাসাহেব ফালকে সম্মাননায় ভূষিত করে ভারত সরকার। রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে পেয়েছেন ডিলিট সম্মান। বাংলাদেশেও সম্মানিত হয়েছেন এই গুনী শিল্পী। ১৯৮৮ সালে তাকে ‘মাইকেল সাহিত্য পুরস্কার’ দেয় রেঁনেসা সাংস্কৃতিক পরিষদ। ১৯১৯ সালের পহেলা মে কলকাতার একটি হিন্দু পরিবারে জন্ম হয় মান্না দের। বাবা পূর্ণ চন্দ্র ও মা মহামায়া দের ঘরে তার নাম হয় প্রবোধ চন্দ্র দে।

সঙ্গীতের সুর ছিল তার রক্তে মেশা। ছোট চাচা সঙ্গীতাচার্য কৃষ্ণ চন্দ্র দের প্রতি ছিল  প্রবল আকর্ষণ। তার অনুপ্রেরণা ও উৎসাহেই গানের ভুবনে নিজেকে সমর্পণ করা সহজ হয় এ শিল্লীর। কলকাতায় ইন্দু বাবুর পাঠশালায় প্রাথমিক শিক্ষা শেষে স্কটিশ গির্জা কলেজিয়েট এবং স্কটিশ গির্জা কলেজে লেখাপড়া করেন মান্না দে। এখানেই সহপাঠীদের গান শুনিয়ে আসর মাতিয়ে রাখতেন তিনি। এ সময় চাচা কৃষ্ণ চন্দ্র ও উস্তাদ দাবির খানের কাছে তালিম নেন তিনি। আন্তঃকলেজ গানের প্রতিযোগিতায় পরপর তিন বছর তিনটি আলাদা বিভাগে প্রথম হন মান্না দে।

১৯৪২ সালে চাচা কৃষ্ণ চন্দ্রের সঙ্গে মুম্বাই দেখতে যাওয়া। শুরুতে সেখানে চাচারর  সহকারী হিসেবে এবং তারপর শচীন দেব বর্মণের সঙ্গে কাজ করেন। পরে আরো অনেক খ্যাতিমান গীতিকারের সাহচর্যে আসেন তিনি। এরপর শুরু হয় নিজের পথচলা। এ সময় বিভিন্ন হিন্দি চলচ্চিত্রের জন্য সঙ্গীত পরিচালনায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। পাশাপাশি উস্তাদ আমান আলি খান ও উস্তাদ আব্দুল রহমান খানের কাছে তালিম নেন হিন্দুস্তানি শাস্ত্র সঙ্গীতে।

১৯৪৩ সালে ‘তামান্না’ চলচ্চিত্রে গানের মধ্য দিয়ে সামনে আসেন মান্না দে। সুরাইয়ার সঙ্গে দ্বৈত সঙ্গীতে কণ্ঠ দেন। ওই সময় গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। এরপর ১৯৫০ সালে মুক্তি পাওয়া ‘মশাল’ চলচ্চিত্রে ‘ওপার গগন বিশাল’ নামে একক গানে কণ্ঠ দেন তিনি। ১৯৫২ সালে  বাংলা ও মারাঠী ছবিতে একই নামে ও গল্পে ‘আমার ভূপালী’ গানটি গান। এর মধ্য দিয়েই সঙ্গীতজগতে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন মান্না দে।

ভীমসেন জোসির সঙ্গে জনপ্রিয় দ্বৈত গান ‘কেতকী গুলাব জুহি’, কিশোর কুমারের সঙ্গে ‘ইয়ে দোস্তী হাম নেহী তোরেঙ্গে (শোলে)’ ও ‘এক চতুর নার (পদোসান)’ গেয়েছেন মান্না দে। শিল্পী ও গীতিকার হেমন্ত মুখোপাধ্যায়সহ অনেক গীতিকারের সঙ্গে বাংলা ছবিতে গান গেয়েছেন তিনি। লতা মুঙ্গেশকারের সঙ্গেও দ্বৈত কণ্ঠে গান রয়েছে তারা। এই দুই শিল্পীর ‘কে প্রথম কাছে এসেছি’ গানটির এখনো সমান আবেদন রোমান্টিক হৃদয়ে।

বেশ কিছু গান মান্না দেকে নিয়ে গেছে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। তার গাওয়া ‘কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই/ কোথায় হারিয়ে গেল সোনালি বিকেলগুলো সেই/’ আজো সমান জনপ্রিয়। এ ধরনের অসংখ্য গান বাঙালির কণ্ঠে ও হৃদয়ে সব সময় জাগিয়ে রেখেছে এই সুর সম্রাটকে। ১৯৫৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর কেরালার মেয়ে সুলোচনা কুমারনের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধেন মান্না দে। শুরোমা (১৯৫৬) ও সুমিতা (১৯৫৮) নামে দুটি মেয়ে রয়েছে তাদের।

শিল্লীর বিদায়ের আগের বছরই ক্যান্সারে ভুগে মারা যান সুলোচনা। স্ত্রীকে সম্মান জানাতে একটি নতুন অ্যালবামেরও কাজ শুরু করেছিলন। ইচ্ছে ছিল হাসপাতাল থেকে বেরিয়েই কাজটি শেষ করা। কিন্তু তার আগেই বৃহস্পতিবার সুরের এ পৃথিবী ছেড়ে তিনি চলে গেলেন নিঃশব্দের জগতে। ৫০ বছরেরও বেশি সময় মুম্বাইয়ে কাটানোর পর কয়েক বছর ধরে ব্যাঙ্গালোরের কালিয়ানগর শহরে বাস করছিলেন তিনি।

২০০৫ সালে বাংলায়‘জীবনের জলসাঘরে’ নামে আত্মজীবনী প্রকাশ হয় জলসার কারিগর মান্না দের। পরে এটি ইংরেজিতে ‘মেমরিজ কাম এলাইভ’, হিন্দিতে ‘ইয়াদেন জি ওথি’ এবং মারাঠী ভাষায় ‘জীবনের জলসাঘরে’ নামে ভাষান্তর হয়। তার জীবনী নিয়ে ‘জীবনের জলসাঘরে’ নামে একটি তথ্যচিত্রও মুক্তি পায় ২০০৮ সালে। মান্নাদে সঙ্গীত একাডেমী তার পুরো আর্কাইভ সংগ্রহ ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করছে। রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ও তার গান সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে।

সংস্কৃতিপ্রেমী বাংলাদেশিরা মান্না দের মৃত্যুতে শোকার্ত, বিহ্বল। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেতা জানাচ্ছেন তাদের শোক। তাতে তারা মান্না দেকে হারানোয় উপমহাদেশের ক্ষতির কথা যেমন বলেছেন তেমনি বলছেন ব্যক্তিগত বেদনার কথাও। পাবলিক বাস, প্রাইভেট কার, অফিসের গাড়িতে বাজছে মান্না দের গান। বন্ধুতে-বন্ধুতে দেখা হলেও মান্না দে’র প্রসঙ্গ। জটলার আলোচনায় মান্না দে। এফএম রেডিওতে মান্না দের গান। মান্নাদের মৃত্যুতে গোটা বাংলাদেশ আজ মান্নাময়।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close