অন্য পত্রিকা থেকে

বাংলাদেশের গণতন্ত্র অনিশ্চয়তায়

এমনিতেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি জটিল অবস্থায়- এর সঙ্গে আবার যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রায়। এতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গণতন্ত্র অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে আরও। অনলাইন আল-জাজিরায় প্রকাশিত এক মন্তব্য প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। এর লেখক তালহা আহমেদ একজন শিক্ষক, আইনজীবী, সমাজকর্মী এবং বৃটেনের মুসলিম কাউন্সিলের মেম্বার কমিটির সভাপতি। ‘দ্য পলিটিক্যালাইজেশন অব বাংলাদেশজ ওয়ার ক্রাইমস ট্রাইবুন্যাল’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে বিতর্কিত হিসেবে অভিহিত করা হয়।

এতে বলা হয়, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে তাতে অভিযুক্ত একজন ব্যক্তির জীবনের স্বাধীনতা ও জীবন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বিরোধী দলের আরও একজনকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত করেছে। তিনি প্রবীণ রাজনীতিক ও সাবেক মন্ত্রী। আবদুল আলীম আগের অভিযুক্তদের মতো নন তিনি। রুগ্‌ণ স্বাস্থ্য ও বয়সের কারণে মৃত্যুদণ্ড হয়নি তার। ঢাকার আদালত তাকে ৯টি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেছে। তাকে মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার শাস্তি হতো যথার্থ। কিন্তু সেই শাস্তি কমিয়ে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। এ রায়কে প্রত্যাখ্যান করেছে তার পরিবার। তারা বলেছেন, এ বিচার সুষ্ঠু নয়। যথার্থ নয়। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

তবে এ বিষয়ে তার রাজনৈতিক দল বিএনপি কোন প্রতিক্রিয়া দেখায় নি, যদিও তার দলের এক নেতা ও ঢাকার সাবেক মেয়র এ রায়ের সমালোচনা করেছেন। এর আগে রায় দেয়া হয়েছে আরেকজন প্রথম সারির রাজনীতিকের। তিনি বর্তমান এমপি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী। তাকে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত করেছে একই আদালত। তিনি, তার আইনজীবী ও পরিবারের সদস্যরা এ রায়কে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

তাদেরও দাবি, এ বিচার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তবে এ রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন নির্যাতিত ও তাদের আত্মীয়স্বজন। ওদিকে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নিজ শহর চট্টগ্রামে রায়ের দিন সহিংসতা হয়। বলা হয়, ১৯৭১ সালে যেসব অপরাধ সংঘটিত হয়েছে তা পৈশাচিকতা। এর বিচার হয়নি চল্লিশ বছরের বেশি কাল ধরে। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের অভিযোগ সাধারণ। তারা বলেছেন, নয় মাসের যুদ্ধের সময় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী হিন্দু সমপ্রদায়ের লোকজনকে হত্যা, লুটপাট, নির্যাতন, বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়াসহ নানা অপকর্মে সহায়তা করেছিলেন। বিবাদী পক্ষ থেকে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী সেসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

তিনি বলেছেন, ওই ঘটনার সময় তিনি দেশে ছিলেন না। তিনি ১৯৭১ সালের মার্চের শেষের দিকে বাংলাদেশ ছেড়ে যান। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে দেশে ফিরে আসেন। নিজের পক্ষ সমর্থন করে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী সরাসরি প্রমাণ হিসেবে কয়েক সাক্ষীকে হাজির করার আহ্বান জানান। তিনি এ বিষয়ে বাংলাদেশ ও দেশের বাইরে থেকে সুপরিচিত কিছু সাক্ষীকে আনার কথা বলেন। এর মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের বর্তমান একজন বিচারক এবং পাকিস্তান সরকারের সাবেক মন্ত্রী। সাক্ষী হিসেবে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বর্তমান আওয়ামী লীগের শক্তিধর কয়েক ব্যক্তির নাম প্রস্তাব করেন। প্রসিকিউশন ১৬ সাক্ষীকে হাজির করেন। কিন্তু সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী নিজেসহ মাত্র ৫ সাক্ষী আনার অনুমতি পান।

এখন দেখা যাচ্ছে, তিনি এমন একজন ব্যক্তিকে সাক্ষী হিসেবে আহ্বান করেছিলেন যিনি সুপ্রিম কোর্টের বর্তমান একজন বিচারক। এ বিষয়ে তিনি বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির কাছে চিঠিও লিখেছিলেন। তাতে তিনি দাবি করেন, ঘটনার সময় তার সঙ্গে তিনি পাঞ্জাবে একসঙ্গে পড়াশোনা করেছেন। যখন তিনি বুঝতে পারলেন সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারপতি হিসেবে তার পক্ষে সাক্ষ্য দেয়া কঠিন ব্যাপার, তখন তাকে শুধু একজন সাক্ষী হিসেবে দেখানো হোক।

এতে বোঝা যায়, অভিযুক্ত একজন ব্যক্তির স্বাধীনতা ও জীবন কতটা প্রশ্নের মুখে। যে কারণেই হোক ওই বিচারককে আদালতে হাজির করার অনুমতি দেয় নি কর্তৃপক্ষ। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী যে প্রমাণ হাজির করেছেন তাতে দেখা গেছে তিনি ঘটনার সময় বাংলাদেশে ছিলেন না। তিনি যেসব বিশিষ্ট সাক্ষী দিয়েছেন আদালত তা আমলে নেয়ার প্রয়োজন মনে করেনি। তবে আদালত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে শোনা কথাকে আমলে নিয়েছে। তার মতো আবদুল আলীমের ক্ষেত্রেও আদালত ৩৫ সাক্ষীর মৌলিক কথাকে আমলে নিয়েছে।

এ ক্ষেত্রে বিবাদী পক্ষকে মাত্র তিনজন সাক্ষীকে সাক্ষ্য দিতে অনুমতি দেয়া হয়। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মতো আবদুল আলীমও দাবি করেছেন তিনি ঘটনার সময় আত্মগোপন করেছিলেন। তার অনুপস্থিতিতে যে অপরাধ হয়েছে তার দায়ভার তিনি নিতে পারেন না। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, এর মধ্য দিয়ে ওই আদালতের অনিয়ম, পক্ষপাতিত্ব ও সরকারের সঙ্গে তাদের বোঝাপড়ার বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে গেছে। এসবের মাধ্যমে আদালত কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছে এবং এর যেটুকু বিশ্বাসযোগ্যতা ছিল তা নষ্ট করে ফেলেছে। প্রথমে স্কাইপ কেলেঙ্কারি হয়।

এ ছাড়াও সর্বশেষ যে অভিযোগ রয়েছে তা হলো, আদালত যে রায় দিয়েছে তা লেখা হয়েছে মন্ত্রণালয়ে এবং আদালত শুধু তা পড়ে শুনিয়েছে। এ যুক্তিটি দেয়া হয়েছে, কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে রায় ঘোষণার আগেই ওই রায় অনলাইনে প্রকাশিত হয়েছে। মূল রায়ের সঙ্গে অনলাইনের ওই রায়ের মিল রয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় আদালত একটি তদন্ত কমিশন করেছে। কিন্তু তারা এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়কে কোন জিজ্ঞাসাবাদ করবেন না। এটাও যদি যথেষ্ট না হয় তাহলে বলতে হয় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর এক আইনজীবীর অফিসে তল্লাশি করা হয়েছে। তার সহকারীকে আটক করা হয়েছে। তিনি এখনও পুলিশ রিমান্ডে রয়েছেন। এতে বিবাদী পক্ষের আইনজীবীরা নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। তারা রাষ্ট্রযন্ত্রকে একটি হুমকি হিসেবে দেখছেন।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close