আলোচিতফিচার

আইনের শাসন বনাম ত্রাস সৃষ্টিতে আইনের ব্যবহার

মাহফুজ আনাম: (ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনামের এই মন্তব্য প্রতিবেদন আজ ওই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। সময়ের এবং বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনা করে লেখাটি হুবহু অনুবাদ প্রকাশ করা হলো। লেখার শেষে ইংরেজি প্রতিবেদনের লিংক দেওয়া হলো। এখানে ক্লিক করে মূল প্রতিবেদনও পড়তে পারবেন।)

বিরোধী দলের রাজনীতিতে সীমাহীন সহিংসতা বেড়েই চলার ঘটনা আমরা প্রত্যক্ষ করছি। হরতালের নামে এসব সহিংসতায় সাধারণ মানুষ আহত হচ্ছে, আগুনে পুড়ছে ও এমনকি মারাও যাচ্ছে। আমরা আরও দেখেছি, এসব ঘটনায় যখন অনেক শিশু নিহত বা গুরুতর আহত হচ্ছে, তখন বিরোধী দলের কোনো নেতা এসব নির্মম ঘটনার নিন্দা জানাননি বা দুঃখপ্রকাশ করেননি। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণহানির দায় তাঁরা এড়িয়ে যেতে পারেন না। এই পত্রিকা (ডেইলি স্টার) এবং এই লেখক এর আগেও এ ধরনের ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।

আজ আমরা ভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাই: জাতীয় নির্বাচনের আগে বিরোধীদের দমনে আইনের ব্যবহার। হত্যার ঘটনায় জড়িয়ে, বিস্ফোরক দ্রব্য, সহিংসতার ঘটনায় জড়িত থাকার কথা বলে যেভাবে বিরোধী দলের নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, এটা কোনো আইনের শাসন হতে পারে না; বলা যায়, আইনের অপব্যবহার করে বিরোধী দলকে সন্ত্রস্ত করা।

আইনের শাসনের সম্পর্কে মানুষের যে প্রচলিত ধারণা তা অবজ্ঞা করে, অবনমন ঘটিয়ে, বিকৃত করে এবং পুরোপুরি অপব্যবহার করছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার। সম্প্রতি হরতালে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতার বিরুদ্ধে জনগণ সরকারের কঠোর পদক্ষেপ দেখতে চায়। আর জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে গিয়ে সরকার বিএনপির নেতা-কর্মীসহ সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে এই আইন প্রয়োগ করেছে। কিন্তু সরকার বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা, যাঁরা কোনো মতেই এর সঙ্গে সম্পৃক্ত নন, তাঁদের বিরুদ্ধেও এই আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছে।

আর এসব কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার একটি বিপজ্জনক উদাহরণ সৃষ্টি করছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে সরকার বেছে বেছে বিরোধীদলীয় নেতাদের আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে হয়রানি, দুর্বল এবং কারাগারে পাঠিয়ে বিরোধী দলকে পঙ্গু করে দিতে চাচ্ছে। ক্ষমতাসীন দল এমন আচরণ করছে যেন কাল বলে কিছু নেই। রাজনৈতিক ক্ষমতারও যেন আর পরিবর্তন হবে না। ভাবখানা এমন যেন এই দিন আর আসবে না, যেদিন তাদের বিরোধী দলের আসনে বসতে হতে পারে।

গতকাল বিএনপির তিনজন শীর্ষ নেতা মওদুদ আহমদ, এম কে আনোয়ার, রফিকুল ইসলাম মিয়া এবং আরও দুজন নেতা শামসুর রহমান ও আবদুল আউয়াল মিন্টুকে দুটি মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আট দিনের রিমান্ডে পাঠানো হয়।

মামলা ১. মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, গ্রেপ্তার হওয়া এই পাঁচ নেতার পরিকল্পনা ও নির্দেশে গত ২৪ সেপ্টেম্বর বিএনপির ৫৪ জন নেতা-কর্মী এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৮০-৯০ জন আইডিয়াল স্কুল ও কলেজের সামনে একটি ঝটিকা মিছিল বের করে। এ সময় তারা জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে ওই পথে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। তারা গাড়ি ভাঙচুর করে ও হত্যার উদ্দেশে চালকদের ওপর হামলা চালায়। মিছিল থেকে পুলিশের ওপরও হামলা চালানো হয় এবং তাদের দায়িত্ব পালনে বাধা দেয়। অভিযুক্ত এই পাঁচজন বিভিন্ন টক শো ও সমাবেশে এই সরকারকে ‘অবৈধ’ বলে উল্লেখ করে সরকারি কর্মকর্তারা যাতে তাঁদের দায়িত্ব পালন করতে না পারেন, সে জন্য উসকানি দিয়েছেন।

মামলা ২. ৫ নভেম্বরের মামলাতেও এই পাঁচ নেতার বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছে। এবার শুধু জায়গাটি ছিল ভিন্ন। গত বছরের এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে যানবাহন ভাঙচুরের অভিযোগে করা মামলায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুলকে (দেশের সুশিক্ষিত রাজনীতিবিদদের একজন) অন্যান্য শীর্ষ নেতার সঙ্গে কারাগারে পাঠানো হয়। এই মামলায় আরও আসামি করা হয় এম কে আনোয়ার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হান্নান শাহ ও সাবেক জ্বালানিমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে।

২০১২ সালের মে মাসে সচিবালয়ের ভেতরে হাতবোমা নিক্ষেপের ঘটনায় ফখরুলসহ অন্যদের অভিযুক্ত করা হয়। এই মামলায় বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের নেতা ও সাবেক মন্ত্রী অলি আহমদ এবং সাংসদ ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থকে অভিযুক্ত করা হয়।

এই নেতারা, যাঁরা বছরের পর বছর রাজনীতিতে আছেন এবং কয়েক বছর মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, অনেকে যাঁরা সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁরা ছিঁচকে গুন্ডা বা সন্ত্রাসী হতে পারেন, এটা কী বিশ্বাসযোগ্য!

সম্প্রতি দায়ের করা দুটি মামলায় রিমান্ড চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। কারণ তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন। কেননা তাঁদের ভবিষ্যত্ পরিকল্পনায় খোলসা করে জানা দরকার, যাতে কিনা সহিংসতা বা ধ্বংসাত্মক বিষয় থাকতে পারে।

পুলিশের প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মওদুদ আহমদের বয়স ৭৩ বছর, এম কে আনোয়ারের ৮১ এবং রফিকুল ইসলাম মিয়ার বয়স ৭১। এটা কি বিশ্বাস্য যে, এই মানুষগুলো এই বয়সে রাজপথে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া সহিংসতার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে নিজ দলের অভ্যন্তরে কোনো ধরনের সন্ত্রাস বা সহিংসতার সঙ্গে জড়িত থাকার পূর্ব রেকর্ড নেই; বরং তাঁরা বিভিন্ন সময় দলের অভ্যন্তরীণ বিবাদ অথবা কোন্দলে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে থাকেন।

উভয় দলের মধ্যেই দুটি স্বতন্ত্র ধারা রয়েছে। আওয়ামী লীগের মধ্যেই একদল রয়েছে, যারা বিরোধী দলের বিষয়ে কঠোর হওয়ার পক্ষে, আরেকটি দল রয়েছে, যারা সমঝোতার পক্ষে। বিরোধী দলের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। বিএনপির আলোচিত এই নেতারা দলে মধ্যপন্থী বলে পরিচিত। তাঁদের গ্রেপ্তার করা এবং এসব ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারীদের আটক না করার ফলে হিংসাত্মক কর্মকাণ্ডের মদদদাতারা আরও শক্তিশালী হবে এবং বিএনপির ভেতরের মধ্যপন্থীরা আরও দুর্বল হয়ে পড়বেন।

আমরা জানি, কাউকে যখন রিমান্ডে নেওয়া হয়, তখন কী ঘটে। তাঁর কাছ থেকে তথ্য বের করার জন্য সব ধরনের (পড়ুন অবৈধ ও সহিংস) পন্থা অবলম্বন করা হয়। এসব পন্থার মধ্যে রয়েছে নির্যাতন এবং আরও এমন সব কাজ, যা নির্যাতনের পর্যায়ে পড়ে। তবে পুলিশ কিংবা সরকার তা কখনোই স্বীকার করে না। এই প্রবীণ রাজনীতিবিদদের যেসব প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হতে পারে তা হলো—দীর্ঘ সময় ধরে ঘুমাতে না দেওয়া, তীব্র আলো, উচ্চমাত্রার শব্দ, অস্বস্তিকর বিছানা ও জানালাবিহীন ঘরে থাকা এবং টয়লেটে যাওয়ার ক্ষেত্রে সীমিত অনুমতি পাওয়া। কিছুদিন আগ পর্যন্তও রাজনৈতিক নেতাদের রিমান্ডে নেওয়ার বিষয়টি অকল্পনীয় ছিল। এখন আর সেই দিনও নেই, যখন কারাগারে রাজনৈতিক নেতাদের বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হতো।

আমরা আমাদের ক্ষমতাসীন দলের বিদ্রূপ প্রত্যাশা করতে পারি, কারণ আমাদের হূদয়ে বিরোধী দলের নেতাদের জন্য রক্তপাত হয় কিন্তু তাঁদের সহিংসতার শিকার অসহায় মানুষদের জন্য হয় না। তাঁরা (ক্ষমতাসীন দল)  আমাদের কটাক্ষ করে বলতে পারেন যখন আওয়ামী লীগ নেতাদের ওপর বিএনপি অন্যায় আচরণ করেছিল, তখন আমাদের রক্তাক্ত হূদয় কোথায় ছিল? তবে কি ক্ষমতায় এসে দলটি আমাদের সে সময়কার তীব্র প্রতিবাদের কথা বেমালুম ভুলে গেল?

আমাদের আজকের প্রতিবাদের কারণ সহিংসতা দমন করার নামে আইনের নির্বাচিত, দলীয় মনোভাবাপন্ন ও বিকৃত ব্যবহারের মাধ্যমে বিরোধী দলকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা। যদি বিরোধী দল বিএনপির নেতৃস্থানীয়দের গ্রেপ্তার না করে বিএনপিতে গা-ঢাকা দিয়ে থাকা সত্যিকারের অপরাধীদের সরকার গ্রেপ্তার করত, তবে আমরা শুধু স্বস্তির নিঃশ্বাসই ফেলতাম না, বরং সেই সঙ্গে সরকারের প্রশংসাও করতাম।

দুঃখজনক ব্যাপার হলো ঘটনা সেটি নয়। ঘটনাটি হলো জোর করে নির্বাচন করার জন্য পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে আইনের ধারার অপপ্রয়োগ ঘটানো। এটি একটি জোরপূর্বক নির্বাচনের ঘটনা, যেখানে সরকারের বিভিন্ন নির্বাহী শাখার ক্ষমতা ধ্বংস করা হচ্ছে, যা ঠিক করতে কয়েক বছর লেগে যাবে (যদি তা সম্ভব হয়) এবং যার জন্য আমাদেরকে ভবিষ্যতে চড়া মূল্য দিতে হবে।

আমরা শুধু রাজনৈতিক অঙ্গনে বিরোধী দলের ভয়াবহ ও দায়িত্বজ্ঞানহীন সহিংসতার এবং বিরোধী দলের এ দায় অস্বীকার করার প্রতি নিন্দা জানাচ্ছি না, বরং এসব সহিংসতার সঙ্গে জড়িত আসল অপরাধীদের গ্রেপ্তার না করে নির্বাচনের আগে বিরোধী দলকে খোঁড়া করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে বিএনপির ঊর্ধ্বতন নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তারের জন্য সরকারেরও নিন্দা করছি।

আইন যখন ন্যায় বিচারের উত্স থেকে দলীয় পক্ষপাতদুষ্ট যন্ত্রে পরিণত হয়, তখন আমরা ভবিষ্যতে কীসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি—তা আমাদের সত্যিকার অর্থেই ভাবিয়ে তোলে।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close