Featuredসিলেট থেকে

রাজস্ব বঞ্চিত সরকার: মুখ থুবড়ে পড়েছে জেলা পরিষদের ন্যাচারাল পার্ক

মো. ওলিউর রহমান: প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সিলেট। যে কারণে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটনখ্যাত পুণ্যভূমির এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে শতশত দর্শনার্থী ছুটে আসেন সিলেটে। তবে অমিত সম্ভাবনাময় এই পর্যটন খাতকে সঠিকভাবে কাজে না লাগানোর কারণে একদিকে প্রকৃতি যেমন হারাচ্ছে তার স্বকিয়তা, তেমনি সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব। তেমনি একটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার সম্ভাবনাময় স্থান জেলা পরিষদের মালিকানাধীন সিলেট ন্যাচারাল পার্ক। সিলেট সদর উপজেলার খাদিমনগর ইউনিয়নের বাইশটিলায় (পূর্ব বাইশটিলা) সিলেট এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রানওয়ে সংলগ্ন এলাকায় এর অবস্থান।

সিলেটবাসীর বিনোদনের কথা ভেবে ১৯৬২/৬৩ সালে সদর উপজেলার বড়শালা মৌজার জেএল নং-৫৪, দাগ নং-১৭৫, ১৮১, ১১২২, ১১৪২ (পুরো দাগ) ও আংশিক দাগ নং- ১৯২, ১৫৫৭ দাগে মোট ৬১ একর ভূমি পার্ক স্থাপনের জন্য অধিগ্রহণ করা হয়। পরবর্তীতে বিমানবন্দর রানওয়ের জন্য ১৯ একর ভূমি দিয়ে দেওয়ার পর বর্তমানে ৪২ একর ভূমি নিয়ে পার্কটি রয়েছে। এর পর পেরিয়ে গেছে ৫০ বছরের অধিক সময়। এত দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও পূর্ণতা পায়নি এই ন্যাচারাল পার্কটি। জেলা পরিষদ কর্তৃক একটি সাইনবোর্ডই কেবল পরিচয় বহন করছে এই পার্কের। হাসিম এবং সেলিম নামে দু’জন স্থানীয় কেয়ারটেকার অরক্ষিত এই ন্যাচারাল পার্কটির দেখাশুনা করছেন।

সংশ্লিষ্টদের তথ্য মতে, এই পার্কের ২ থেকে ৩ একর ভূমি বেদখল হয়ে গেছে। সম্প্রতি চাঁন মিয়া, মো. বন্দে আলী, চাঁন মিয়া (২) ও তাদের সহযোগীরা পার্কের ভূমির উপর অবৈধভাবে জোরপূর্বক রাস্তা নির্মাণের চেষ্টা চালান। এসময় কেয়ারটেকাররা বাধা প্রদান করলে তাদের প্রাণে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। যেকারণে গত ২৮ সেপ্টেম্বর জেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হারুন-অর রশিদ মোল্লা বাদি হয়ে এয়ারপোর্ট থানায় একটি সাধারণ ডায়রি (নং ৮৪৮) করেন। এছাড়া আরো ১০/১৫ জন ব্যক্তি জেলা পরিষদের ভূমি দখল করে আছেন বলে সূত্রে জানা যায়। সরকারের এই ভূমি উদ্ধারের জন্য জেলা পরিষদের কর্তৃপক্ষ কতোটা তৎপর তা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন।

সরজমিনে দেখা যায়, পার্কের ভেতরে পাহাড় ঘেঁষে ৪/৫টি দিন মজুর পরিবার কাঁচা ঘর নির্মাণ করে সেখানে বসবাস করছে। তাদের মধ্যে আলী আকবর নামের একজন জানান, জেলা পরিষদের অনুমতি নিয়ে তারা সেখানে বসবাস করছেন। সেই সাথে পার্কটিরও দেখাশুনা তারা করেন। পাহাড় বেষ্টিত এই এলাকা ছাড়াও পার্কের রয়েছে বেশ কিছু ধানী জমি। এর মধ্যে অনেক ভূমি বেদখল ছিলো। জেলা পরিষদের সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান প্রশাসনের হস্তক্ষেপে অভিয়ান চালিয়ে সেগুলো দখলমুক্ত করেন। বর্তমানে কিছু অংশে কেয়ারটেকার হাসিম ও সেলিম কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে চাষাবাদ করছেন বলে জানান। বাকি অংশ পতিত অবস্থায় পড়ে আছে। দীর্ঘ ৫০ বছরেরও অধিক সময় পার্কটি লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকলেও এ সরকারের আমলে নির্মিত বাদাঘাট-বিমানবন্দর বাইপাস সড়কের কারণে সবার নজরে আসে। এই সড়কটি পার্কের টিলার কিছু অংশ কেটে মধ্যবর্তী স্থান দিয়ে নির্মিত হয়েছে। বি¯তৃত এই সড়কটি এখনো চালু না হলেও যারাই এই সড়ক দিয়ে ভ্রমণের উদ্দেশ্যে গিয়েছেন, তারাই শহরতলীর একটি কোনে এমন মনোরম একটি পরিবেশ দেখে থমকে দাঁড়িয়েছেন। পাহাড় ঘেরা আকাশী, সাদা আকাশী গাছ ছাড়াও বনাঞ্চলের আরো অনেক নাম না জানা নানা প্রকৃতির গাছ রয়েছে এই পার্কে। লোকমূখে এই পার্ক এবং সড়কের কথা জেনে অনেকেই বিকেল বেলা সেই এলাকায় ঘুরতে আসেন। সেখানে নারী পর্যটকদের চেয়ে পুরুষ পর্যটকদের সংখ্যাই বেশি থাকে বলে জানান স্থানীয়রা।

তবে সেখানে শিশুদের বিনোদনের কোন ব্যবস্থা কিংবা বসার কোন পরিবেশ না থাকায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই কেবল উপভোগ করেন দর্শনার্থীরা। যে কারণে সম্ভাবনার হাতছানি দিয়েও কর্তৃপক্ষের কোন পরিকল্পনা বা সুদৃষ্টি না থাকায় মুখ থুবড়ে পড়ে আছে ন্যাচারাল এই পার্কটি। অথচ কর্তৃপক্ষ একটু নজর দিলেই পার্কটিকে একটি নান্দনিক পার্কে পরিণত করা যেত বলে জানান স্থানীয়রা। পাহাড়ের পাশ ঘেঁষে ধানী জমির মধ্যখান দিয়ে বয়ে গেছে মঙ্গলী ছড়া। যেটি সিলেট নগরী থেকে প্রবাহিত হয়ে চেঙ্গেরখাল নদীতে গিয়ে মিশেছে। এই স্থানটিকে চট্টগ্রামের ফয়েজ লেক কিংবা ঢাকার হাতিরঝিলের মতো নান্দনিক রূপে গড়ে তোলা যেতো বলে জানান অনেকেই।

এছাড়া চতুর্দিকে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করে পাহাড়ের পাদদেশে মনোরম স্থানে বসার স্থান ও শিশুদের বিনোদনের উপাদান দেওয়া যেত বলেও জানান তারা। যার ফলে যান্ত্রিক জীবনের কিছু অবসর সময় সেখানে কাটাতে পারতেন দর্শনার্থীরা। আর এসবের ফলে দর্শনার্থীদের বিনোদনের একটি সুবিধা যেমন বৃদ্ধি পেতো তেমনি সরকারও এখান থেকে রাজস্ব পেয়ে লাভবান হতো। তাই সকলের দাবী একটি পূর্ণাঙ্গ অত্যাধুনিক পার্ক নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্টরা দ্রুত এগিয়ে আসবেন।

এ ব্যাপারে সিলেট জেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হারুন-অর রশিদ মোল্লা জানান, বর্তমানে কম ভূমি বেদখলে আছে। যেগুলো আছে তা উদ্ধারের জন্য আমাদের কাজ অব্যাহত আছে। সরকারের ভূমি কেউ দখল করে নিতে পারবে না। ৮/৯ বছর আগে এটাকে পার্করূপে প্রতিষ্ঠার জন্য একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিলো। সে সময় তা বাস্তবায়ন না হলেও বর্তমানে একটি অত্যাধুনিক পার্ক নির্মাণের জন্য পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close