স্বদেশ জুড়ে

খাসিয়া সম্প্রদায়ের বর্ষবরণ কা সেং কুটস্নেম অনুষ্ঠিত

আদিবাসী খাসি সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী নৃত্য-গীতি আর খেলাধুলার অয়োজনে মৌলভীবাজারের মাগুরছড়া পুঞ্জিতে অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। নিজেদের ঐতিহ্যময় কৃষ্টি আর সংস্কৃতি চর্চায় হাসি-আনন্দে পুরাতন দিনগুলিকে বিদায় দিয়ে নতুনকে আহ্বান করে নিলো নৃ-তাত্ত্বিক এই জনগোষ্ঠী।

পাহাড়-টিলার বুকে পান গাছের পরতে পরতে যে নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর জীবনগাঁথা ছড়িয়ে আছে- তারা হলো ‘খাসি’ সম্প্রদায়। প্রচলিত বাংলায় ‘খাসিয়া’ হিসেবে পরিচিতি তাদের। নিজেদের গৎবাঁধা বনবাসী জীবন-সংগ্রামের ফাঁকে কিছু-কিছু সময় তাদের জন্য বিশেষ উৎসবের উপলক্ষ্য নিয়ে আসে। এমনি একটি উৎসব “কা সেং কুটস্নেম” [কঅ ঝঊঘএ কটঞঝঘঊগ- ২০১৩]। খাসিয়া সম্প্রদায়ের নিজস্ব বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ উৎসব।  খাসি সোস্যাল কাউন্সিল ও খাসি স্টুডেন্ট ইউনিয়নের উদ্যোগে কমলগঞ্জ উপজেলার মাগুরছড়া পুঞ্জির টিলাঘেরা উদ্যানে শনি ও রবিবার এ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। আয়োজকরা জানান, স্থানীয় খাসিয়া বর্ষপুঞ্জি অনুযায়ী ১৫০তম বর্ষকে বিদায় ও ১৫১তম বর্ষকে বরণ করা হয়েছে। অনুষ্ঠানের প্রথমদিন শনিবার সাস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা, খেলাধুলা এবং দুু’দিনব্যাপি থাকে মেলার আয়োজন।

খাসিয়াদের বছরের শেষদিন শনিবার সকালে বর্ষবিদায় অনুষ্ঠান উদ্বোধন হয়। উদ্বোধন শেষে অনুষ্ঠিত হয় অলোচনা সভা। এতে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন- মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) প্রকাশ কান্তি চৌধুরী। মাগুরছড়া খাসিয়া পুঞ্জির হেডম্যান আদিবাসী নেতা জিডিসন সুচিয়াং এর নেতৃত্বে সিলেট বিভাগের ৬৫টি খাসিয়া পুঞ্জির হেডম্যান মাথায় পাগড়ি পড়ে ও বর্ণিল সাজে খাসিয়া ছেলে মেয়েরা সকালে ৯টায় আগত অতিথিদের বরণ করে নেয়। এরপর শুরু হয় খাসিয় সম্প্রদায়ের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। পান-জুম চাষের কৌশলের আবহে ‘খাসি নৃত্য’ পরিবেশন করে শিল্পীরা। যুগ-যুগ ধরে বনাঞ্চলে প্রতিকূল পরিবেশের সাথে সংগ্রাম করে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে খাসিয়া জনগোষ্ঠী। তাদের টিকে থাকার গল্প ফুটে উঠে ‘সমর নৃত্যে’। এছাড়াও খাসিয়া ঐতিহ্যের সাথে আধুনিকতার সমন্বয়ে নৃত্য পরিবেশন করেন অনেকে। চলে খাসি ভাষার ব্যান্ড সংগীত।

সংগীতানুষ্ঠানের ফাঁকেই শুরু হয় খেলাধুলার অয়োজন। খাসিয়া সম্প্রদায়ের প্রধান ফসল পান বাজারজাত করনের পূর্ব পর্যন্ত উৎপাদনের প্রক্রিয়াটি মূলত: নারীরাই করে থাকেন। তাই অয়োজন করা হয় “পানগুছি খেলা”। গাছ থেকে তোলা পান বেছে-বেছে গুছিয়ে বড়জে সাজানোর প্রতিযোগিতা হয় এ খেলায়। সেইসাথে থাকে ঐতিহ্যবাহী তীর নিক্ষেপ প্রতিযোগিতা। বিভিন্ন স্থান থেকে আসা তীরন্দাজরা অংশ নেন বিলুপপ্তপ্রায় এ খেলায়।
উৎসবে বাড়তি মাত্রা যোগ করে তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে উঠার প্রতিযোগিতা। অত্যন্ত আকর্ষণীয় এ ইভেন্টে বিভিন্ন বয়সের শিশু-কিশোর অংশ নেয়।

উৎসব শুরু থেকে দু’দিনব্যাপি মেলা বসে মাঠের চারপাশ জুড়ে। মেলায় খাসিয়াদের নিত্যপণ্য ও খাদ্যসামগ্রীর অর্ধশতাধিক স্টল সাজিয়ে বসেন উদ্যোক্তারা। নিয়মিত ব্যাবসায়ীর পাশাপাশি শৌখিন খাসিয়া তরুণ-তরুণীরা স্টল দেন এখানে। দেশের বিভিন্ন পার্বত্য এলাকা থেকেও ব্যবসায়ীরা পসরা নিয়ে আসেন। এসব স্টলে নিজেদের পোষাক, বিভিন্ন জাতের ফলমূল, জুমচাষের উপকরণ ও খাদ্যসামগ্রী বিক্রি হয়। উৎসবে স্থানীয়রা ছাড়াও সিলেট, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রাম থেকে খাসিয়া সম্প্রদায়ের লোকজন অংশ নেয়। তাদের নিজেদের সংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে একত্রে চর্চা করতে পেরে তারাও ভীষণ আনন্দিত।

লাউয়াছড়া পুঞ্জির মন্ত্রী (হেডম্যান) ফিলা পথমি জানান, এ জেলার বিভিন্ন পাহাড়ী অঞ্চলে ৩০ হাজার খাসিয়া সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস। সমকালীন আকাশ সংস্কৃতির প্রভাবে নতুন প্রজন্মে কাছে মূলধারর সংস্কৃতি অপরিচিত হয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া অনেকে পেশাবদল করে চাকুরি ও ব্যবসার সাথে জড়িত হয়ে যাচ্ছে সে কারণে খাসিয়া সংয়স্কৃতির চর্চাটাও অনেকটা কমে যাচ্ছে। তাই  মূলত: তাদের নিজস্ব বর্ণিল ঐতিহ্যকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দিতেই এ আয়োজন।

মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) প্রকাশ কান্তি চৌধরী জানান, খাসিদের এই উৎসব বাঙালি সংস্কৃতির ভাণ্ডারকে আরো ঐশ্বর্য্যমণ্ডিত করেছে। আধিবাসীদের সংস্কৃতি ও ঐহিত্য রক্ষায় এবং তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

আয়োজক ও মাগুরছড়া খাসিয়া পুঞ্জির মন্ত্রী (হেডম্যান) জিডিশন প্রধান সুচিয়ং জানান, নববর্ষে খাসি জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশা-তাদের বর্ণিল সংস্কৃতির সৌরভ ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বময়; সেইসাথে সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং আদিবাসীদের অধিকার বাস্তবায়নে সরকার উদ্যোগী হবে- এমনটাই প্রত্যাশা ভূমিপুত্রদের।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close