ইসলাম থেকে

পবিত্র শবেকদরের শিক্ষা

বিচারপতি মোহাম্মদ আব্দুস সালাম: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। ‘ইন্না আনজালনাহু ফি লাইলাতিল কাদরে। ওয়ামা আদরাকা মা লায়লাতুল কাদরে। লায়লাতুল কাদরে খায়রুম মিন আলফে সাহরিন। তানাজ্জালুল মালায়িকাতু ওয়াররুহু ফিহা বিইজনি রাব্বিহিম মিন কুল্লে আমরিন। সালামুন হিয়া হাত্তা মাতলায়িল ফাজরে।’ সূরা কদর ১-৫ আয়াত। ইরশাদ হচ্ছে

১। আমি ইহা অবতীর্ণ করেছি মহিমান্বিত রজনীতে

২। আর মাহিমান্বিত রজনী সম্বন্ধে তুমি কি জানো?

৩। মহিমান্বিত রজনী সহস্র মাস (অর্থাৎ ৮৩ বছর চার মাস) অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।

৪। সে রাতে ফেরেশতাগণ ও রূহ অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক কাজে তাহাদিগকে প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে।

৫। শান্তিই শান্তি, সেই রজনী ঊষার আবির্ভাব পর্যন্ত।

রমজানুল মোবারকের রাতগুলোর মধ্যে একটি রাতকে শবেকদর বলা হয়। এটা বড়ই খায়ের ও বরকতের কল্যাণময় রাত। কালামে পাকে ওই রাতকে এক হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম বলা হয়েছে। এর হাজার মাসে ৮৩ বছর চার মাস হয়। ভাগ্যবান ওইসব লোক, যাদের ওই রাতের ইবাদত-বন্দেগি নসিব হয়। কেননা এই একটি মাত্র রাত যে ব্যক্তি ইবাদতে কাটাল সে যেন ৮৩ বছর চার মাসের চেয়ে বেশি সময় ইবাদতে কাটাল। আর এই বেশির অবস্থায়ও জানা নেই যে এটা হাজার মাস অপেক্ষা কত মাস অধিক উত্তম। প্রকৃতপক্ষে বিশ্ব নিয়ন্তা আল্লাহ পাকের সেরা অবদান শবেকদর।

আল্লাহ পাক সূরা বাকারার ১৮৫ নম্বর আয়াতে বলেছেন, পবিত্র রমজান মাসে কুরআন মজিদকে অবতীর্ণ করা হয়েছে যে তিনি কদরের রাতে কুরআন পাক নাজিল করেছেন। ‘দুররাতুন নাসেহিন’ কিতাবে উল্লেখ আছে, নবী করিম সা: বনি ইসরাইলের সামউন গাজীর কথা উল্লেখ করে বলেন, যিনি এক হাজার মাস পর্যন্ত আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করতেন এবং কাফেরদের বিরুদ্ধে জিহাদের জন্য এক উটের বাহন অস্ত্র সাথে রাখতেন, দিনের বেলা রোজা রাখতেন এবং সারা রাত ইবাদতে কাটাতেন। এর প্রতি সাহাবিগণের মনে ঈর্ষা ও হতাশার ভাব দেখা দিলে আল্লাহ তায়ালা তার ক্ষতিপূরণস্বরূপ কেবল উম্মতে মোহাম্মদীর জন্য সেরা অবদান শবেকদর দান করে সূরা কদর নাজিল করেন।

হজরত আইয়ুব আ:, হজরত জাকারিয়া আ: প্রত্যেকেই ৮০ বছর পর্যন্ত আল্লাহ পাকের ইবাদতে অতিবাহিত করেন, মুহূর্তের জন্যও আল্লাহর নাফরমানি করেননি। কাজেই শবেকদরের একটি বিশেষ রাতে যে ইবাদত-বন্দেগিতে কাটাল, সে যেন মহা সৌভাগ্যবান এবং ওই রাতে যে ব্যক্তি আল্লাহর করুণা ও কল্যাণ থেকে বঞ্চিত থাকে সে সর্বহারা ও চিরবঞ্চিত। ওই রাতে ফেরেশতা ও রূহ আল্লাহর রহমত করুণা নিয়ে জমিনে অবতরণ করেন। ওই রাতে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কেবল শান্তি আর শান্তি এবং ওই রাতে বরকত ও কল্যাণ ভোর পর্যন্ত থাকে। হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত হাদিসে বলা হয়, যে ব্যক্তি মহিমান্বিত শবেকদরের ঈমান সহকারে ও সওয়াবের নিয়তে ইবাদত করার জন্য দণ্ডায়মান হয় তার বিগত জীবনের গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়।

হজরত আয়েশা সিদ্দিকা রা: থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, রমজানের শেষ ১০ দিনের যেকোনো বেজোড় রাতে শবেকদর তালাশ করো। বুখারি শরিফের অপর হাদিসে পাওয়া যায়, রাসূলুল্লাহ সা: সাহাবিগণকে শবেকদরের সুনির্দিষ্ট সংবাদ দেয়ার জন্য বাইরে আসেন। কিন্তু সেই সময় দু’জন মুসলমানের মধ্যে ঝগড়া হচ্ছিল বলে তার নির্দিষ্টতা আল্লাহর তরফ থেকে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে, অর্থাৎ ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে। হাদিসের বিশেষ শিক্ষণীয় এই যে, দু’জন মুসলমানের মধ্যে ঝগড়াবিবাদ কঠিন অপরাধ। এর জন্য কল্যাণ ও বরকত উঠিয়ে নেয়া হয়, পারস্পরিক সুসম্পর্ক সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ আর পরস্পর কলহবিবাদ দ্বীনকে ধ্বংস করে যেমন ুর মাথার চুলকে বিনাশ করে।

হজরত কাব রা: বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর একত্ববাদে অটলভাবে বিশ্বাস স্থাপন করে ওই রাতে তিনবার ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ পড়বে, প্রথমবার পাঠ করার বদৌলতে তাকে ক্ষমা করা হবে, দ্বিতীয়বার পড়ার কারণে সে নরক থেকে পরিত্রাণ লাভ করবে এবং তৃতীয়বার বলার কারণে সে বেহেশতে প্রবেশ করবে। অপর দিকে পিঠে পাহাড় তুলে দিলে যে রকম ভারী মনে হবে মুনাফেক, মুশরেক ও কাফেরের জন্য লাইলাতুল কদর সে রকম ভারী মনে হবে। শবেকদরের শিক্ষা ও মহিমা অপার। এই রাতেই লাওহে মাহফুজ থেকে প্রথম আকাশে কুরআন মজিদ নাজিল করা হয়। ধরাবাসীর কল্যাণ পরিবেশনের উদ্দেশ্যে রুহুল কুদ্দুস তথা হজরত জিব্রাইল আ: অসংখ্য ফেরেশতাসহ আল্লাহর নির্দেশে ধরায় অবতরণ করেন। ওই রজনীতে আধ্যাত্মিক ও জৈবিক উন্নতি ও কল্যাণ বৃদ্ধির এক বর্ষণমুখর রাতে বৃষ্টির ধারার মতো বর্ষণ হতে থাকে। ওই রাতে সংশ্লিষ্ট বছরে সম্পাদনীয় বিশ্বব্যবস্থার যাবতীয় উল্লেখযোগ্য বিধিব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়ে থাকে। ওই রাত শান্তি ও সান্ত্বনার রাত, নিরাপত্তার রাত, আল্লাহর বিশিষ্ট বান্দাগণ ওই রাতে এক অনির্বচনীয় শান্তি ও মাধুর্য উপভোগ করে থাকেন।

বিখ্যাত তাফসিরে কাদেরিতে উল্লেখ আছে যে ইমাম শাফি র: রমজানের ২১ ও ২৩ তারিখ রাতে শবেকদর উদযাপনে বেশি গুরুত্ব প্রদান করেন, বেশির ভাগ আলেম এবং হানাফি মাজহাবে ২৭ তারিখ রাতে শবেকদর উদযাপনের ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়, আরবি লাইলাতুল কদরে ৯টি অক্ষর রয়েছে এবং সূরা কদরে লাইলাতুল কদর কথাটি তিনবার নির্ধারিত রয়েছে। কাজেই (৯´৩)=২৭ অক্ষর ইশারা করা হয়েছে যে, রমজান মাসের ২৭ তারিখ রাতেই শবেকদর পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি এবং মুসলিম বিশ্বে রমজান মাসের ২৭ তারিখ রাতে শবেকদর রাষ্ট্রীয়ভাবে উদযাপন করা হয়ে থাকে।

রমজান মাসে যারা জামাতের সাথে নিয়মিত তারাবির নামাজ, এশার নামাজ ও ফজরের নামাজ আদায় করেন, তারা শবেকদরের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হন না। রমজান মাসের শেষ দশকে যারা সুন্নতে মুয়াক্কাদা কেফায়া হিসেবে মসজিদে ইতেকাফ পালন করেন, তারা অবশ্যই শবেকদরের রাত পেয়ে থাকেন। সব রকম পাপাচার ত্যাগ করে মানবমনের পশুপ্রবৃত্তিকে ও ষড় রিপুকে দমন করে আগের পাপরাশির স্মরণে অনুতপ্ত ও লজ্জিত হয়ে, এই মহান রজনীতে একাগ্রচিত্তে আল্লাহর কাছে পাপের মার্জনা ভিক্ষা করে, আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগিতে ওই রাত অতিবাহিত করা ঈমানদার বান্দাদের মহান কর্তব্য। সর্বপ্রকার পাপকর্ম, পাপ প্রেরণা ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা বিসর্জন দিয়ে দৈহিক ও মানসিক উৎকর্ষ সাধনের জন্য শবেকদরের মহান রাতের সদ্ব্যবহার করা প্রত্যেক ঈমানদার মানুষের একান্ত কর্তব্য এবং এতেই বিশ্বশান্তি ও মানবকল্যাণ নিহিত। আল্লাহ আমাদের শবেকদর রাতের সদ্ব্যবহার করার তৌফিক দিন।

লেখক : বিচারক, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ, ঢাকা

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

আরও দেখুন...

Close
ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close