অন্য পত্রিকা থেকে

চার যদি তিন বিকল্প

বাংলাদেশের সামনে এখন তিন বিকল্প। কোনটি বেছে নেবে সে? জাতিসংঘের দূত অস্কার ফার্নানদেজ-তারানকোর দূতিয়ালির ‘রাজধানী এক্সপ্রেস’ গতরাতেও পৌঁছায়নি স্টেশনে। সিইসি’র সঙ্গে শেষ দফা বৈঠকের পরে চারটি যদির ওপর বাংলাদেশের রাজনীতির ভাগ্য নির্দেশ করেছেন তিনি- এক. রাজনৈতিক সদিচ্ছা। দুই. নেতৃত্ব। তিন. ছাড় দেয়ার মানসিকতা। চার. শান্তিপূর্ণ সংলাপ।

যে দেশে লাশের মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়, রাজনৈতিক সঙ্কট গভীর থেকে গভীরতর হওয়ার কারণে তারানকো ঢাকায় ছুটে আসেন, সে দেশের প্রেসিডেন্ট চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর থেকে আসতে না আসতে শোক প্রকাশ করতে দক্ষিণ আফ্রিকায় ছোটাছুটি করেন। তারানকো নতুন কিছুর বা বরফ গলার দিকে গতকাল ইঙ্গিতও করেননি। তিনি বলেন, রাজনৈতিক নেতাদের সদিচ্ছা থাকলে, তাদের মাঝে ছাড় দেয়ার মানসিকতা, বিশেষ করে শান্তিপূর্ণ আলোচনায় বসার আগ্রহ থাকলে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। এরকম নীতিকথা হাজার বছর আগেও সঠিক ছিল এবং হাজার বছর পরেও অটুট থাকবে।

তবে ক্ষমতাসীন দল ও তারানকোর প্রতিনিধি দলের কাছে একটি বার্তা খুবই স্পষ্ট হয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে স্বপদে বহাল রেখে সঙ্কটের সুরাহা হবে না। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী তার শর্তে কখনও পদত্যাগের সিদ্ধান্ত ঘোষণা দিলে তাতে দুই বড় দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হবে তা-ও হলফ করে বলা যায় না। ১৯৯৬ সালে বেগম খালেদা জিয়া পদত্যাগ করতে প্রস্তুত ছিলেন। আওয়ামী লীগ তবু তাকে দিয়ে একতরফা নির্বাচন করিয়েছে।

তবে জানা গেছে, বিএনপির সূত্রে তারানকো আভাস পেয়েছেন যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরে দাঁড়ালে বেগম খালেদা জিয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদকে মেনে নিতে পারেন। অবশ্য পর্যবেক্ষকরা একমত যে, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর পরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে তা জোর দিয়ে বলা যায় না। তখন বিএনপি তার অবস্থান বদলে ফেললে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

সাধারণ ভাবে মনে করা হয় যে, শেখ হাসিনা সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানে বেগম খালেদা জিয়াকে দু’বার অপমান করেছেন। বেগম খালেদা জিয়া তাকে একটিবার তা ফেরত দিতে চান। অন্যদিকে কাদের মোল্লাসহ দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির রায় কার্যকর করা বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষেও সহজ নয়। তিনি এটা না পারবেন মানতে, না পারবেন নাকচ করে দিতে। সেদিক থেকে বেগম খালেদা জিয়া এ ধরনের অপ্রিয় কাজ অন্যের দ্বারাই সারতে চান। তাছাড়া, প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হলে এবং সেই নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসন না পেলে তার পক্ষে সংবিধান সংশোধন করা সম্ভব হবে না।

তাছাড়া, আবদুল হামিদের নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি হেরে গেলে কারচুপির অভিযোগ তুলেও খুব একটা ফায়দা হবে না। আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রেখে বিএনপির আরেক মেয়াদে বিরোধী বেঞ্চে বসা পোষাবে না।

দ্বিতীয় বিকল্প হচ্ছে- জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে একটি সাধারণ নির্বাচন সম্পন্ন করা। এখানেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জায়গা হবে না। তৃতীয় বিকল্প হচ্ছে- ১/১১ ধরনের একটা ব্যবস্থা মেনে নিয়ে কতিপয় সংস্কার সাপেক্ষে কিছুটা বিলম্বে সাধারণ নির্বাচন করা। এর মধ্যে কোনটা বেছে নেয়া হবে তা নির্ভর করছে প্রধান দুই রাজনৈতিক দল কি ধরনের সমাধান অনিবার্য করে তোলে তার ওপর।

তবে বাংলাদেশের আশপাশের দেশগুলো থেকে যে ধরনের নির্বাচনী খবরাখবর আসছে তা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মনস্তাত্ত্বিক শক্তি-সামর্থ্যকে চাঙ্গা    করার পরিবর্তে আরও দুর্বল করে দেয়াটাই স্বাভাবিক।
ভারতে কংগ্রেস সরকারের ভবিষ্যৎ টলমল। দিল্লিসহ চারটি রাজ্যের নির্বাচনে বিজেপির উত্থানের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মতো থাইল্যান্ডের মহিলা প্রধানমন্ত্রী কিছু দিনের জন্য অনমনীয়তার পরিচয় দিয়েছিলেন। গতকাল তিনি রণে ভঙ্গ দিয়েছেন। থাইবাসী হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছেন। তিনি সংসদ ভেঙে দিয়ে আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন। যদিও তা সত্ত্বেও প্রায় দেড় লাখ বিক্ষোভকারী থাইল্যান্ডের রাস্তায় রাস্তায় টহল দেয়া অব্যাহত রেখেছে। গত রোববার বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা পার্লামেন্ট থেকে একযোগে পদত্যাগ করেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রা সোমবার ঘোষণা দেন যে, সংসদ ভেঙে দেয়া হবে এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নির্বাচন দেয়া হবে।

থাই রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর একটা ভূমিকা দেখা যায়। সেখানকার বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মতো দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দল হচ্ছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রার লাল শার্ট এবং রাজ পরিবারমুখী হলুদ শার্ট। ২০০৬ সালে থাকসিন ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরে তিনি নেপথ্যে থেকে নিজের ‘ক্লোন’ হিসেবে বোনকে প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসান।

এটা লক্ষণীয় যে, গত কিছুদিনের সংঘাতে সরকারবিরোধী মিছিলে পুলিশ কেবল কাঁদানে গ্যাস, জলকামান এবং রাবার বুলেট ব্যবহার করেছে। এএফপি গতকাল বলেছে, সরকারবিরোধী আন্দোলনে এ পর্যন্ত ৫ ব্যক্তি নিহত এবং ২০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জরুপং বলেছেন- পুলিশের কাছে কেবল লাঠি ও বর্ম রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তারা নিরস্ত্র থাকবে। এমনকি আমরা বাধ্য না হলে কাঁদানে গ্যাসও ছুড়বো না। ছুড়লেও তা হবে খুবই সীমিত। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা সমঝোতার উপর জোর দেব। এএফপি উল্লেখ করেছে, এবারের সরকারবিরোধী আন্দোলনের সূচনা ঘটেছিল একটি দায়মুক্তি বিল পাস করা নিয়ে। এর মাধ্যমে নির্বাসিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিনের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন সুগম করার লক্ষ্য ছিল বলে বিরোধী দল অভিযোগ করে।

ঢাকার রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, নয়া থাই প্রধানমন্ত্রী মাত্র দেড় বছর দেশ চালিয়েছেন। এর মধ্যেই তিনি ক্ষমতা ছাড়লেন। তিনি সাড়ে তিন বছর আগেই মাত্র ৫ জন ব্যক্তির নিহত হওয়ার পটভূমিতে ক্ষমতা ছেড়ে দেয়ার ঘোষণা দিলেন। এটাও লক্ষণীয় যে, থাই প্রধানমন্ত্রী মাত্র কয়েকদিনের জন্য ‘সংবিধান অনুযায়ী’ দেশ পরিচালনার সংকল্প ব্যক্ত করেছিলেন। পদত্যাগের দাবিকে অসাংবিধানিক বলেও প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। কিন্তু থাইল্যান্ডে গণতন্ত্র জয়ী হয়েছে। বিজয়ের মাসে বাংলাদেশ কি পরাজয়ই দেখবে?

সঙ্কট সমাধানে আশাবাদী তারানকো
কূটনৈতিক রিপোর্টার জানান, ‘সমঝোতার মিশন’ নিয়ে ঢাকায় আসা জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত অস্কার ফার্নানদেজ-তারানকো নিজের আত্মবিশ্বাসের জানান দিয়েছেন। মিশনের সমাপনী লগ্নে গতকালই প্রথম মুখ খুললেন তিনি। নির্বাচন কমিশন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ‘আমি আশাবাদী, অচলাবস্থার শান্তিপূর্ণ সমাধানের সম্ভাবনা এখনও আছে। যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে, নেতৃত্ব যদি সঠিক হয়, সমঝোতার মানসিকতা যদি থাকে, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- শান্তিপূর্ণভাবে সংলাপ যদি চালিয়ে যাওয়া যায়।’ আলোচনা এখনও চলছে জানিয়ে জাতিসংঘের রাজনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের রাজনৈতিক সম্পর্ক বিষয়ক সহকারী মহাসচিব পরিস্থিতির উত্তরণে উপরোল্লেখিত ‘যদি’ শর্তযুক্ত চারটি বিষয়ের ওপর জোর দেন।

শুক্রবার ঢাকায় আসা ওই দূত ও তার সহযোগীরা গতকাল সফরের চতুর্থ দিনেও একই গতিতে দৌড়ঝাঁপ করেছেন। জামায়াত নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের মধ্য দিয়ে দিনের কর্মসূচি শুরু করে একে একে কথা বলেছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রতিনিধি দল, প্রধান নির্বাচন কমিশনার, ভারপ্রাপ্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত জন ড্যানি লুইজ এবং ঢাকাস্থ রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে। রাতে বিরোধী দলের নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে দ্বিতীয় দফায় বৈঠকের মধ্য দিয়ে ঢাকায় কর্মব্যস্ত আরেকটি দিন অতিবাহিত করেন তিনি। আজ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিতীয় দফায় বৈঠক করবেন তারানকো। দিনের বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গেও তার আরও বৈঠক হওয়ার কথা। বিকালে তিনি গণমাধ্যমের মুখোমুখি হবেন।

এ প্রসঙ্গে তারানকো নিজেই বলেছেন, ‘আমাদের আরও আলোচনা রয়েছে। ঢাকা ছাড়ার আগে গণমাধ্যমকে ব্রিফ করবো। ওই সময় আপনাদের আরও ভাল তথ্য দিতে পারবো বলে আশা রাখি।’ রাতে ‘ঢাকা মিশন’-এর ফল নিয়ে জাতিসংঘ দূত ও তার সফরসঙ্গীদের নিউ ইয়র্কের পথে রওনা হওয়ার কথা।

নির্বাচনে জামায়াতের অংশগ্রহণ ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে আলোচনা:

এদিকে সকাল ১০টায় অস্কার ফার্নানদেজ-তারানকো’র সঙ্গে বৈঠক করে জামায়াতের একটি প্রতিনিধি দল। দলটির সহকারী  সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের ওই প্রতিনিধি দলে কর্মপরিষদ সদস্য ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, আইন বিষয়ক সম্পাদক জসীম উদ্দীন সরকার ও ডিফেন্স টিমের সদস্য ব্যারিস্টার আরমান আলী ছিলেন।

সোনারগাঁওয়ে তারানকোর হোটেল স্যুটে অনুষ্ঠিত ৪০ মিনিটের ওই বৈঠক সম্পর্কে ব্রিফ করেন প্রতিনিধি দলের নেতা ব্যারিস্টার রাজ্জাক। জানান, সামপ্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, চলমান সংঘাত-সহিংসতা, জামায়াতের নিবন্ধন ফিরে পাওয়া, নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রক্রিয়া-পদ্ধতি, সবাইকে নিয়ে নির্বাচন আয়োজন করতে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিভিন্ন রায় ও মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া দলটির কেন্দ্রীয় নেতা কাদের মোল্লার রায় কার্যকরের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সাংবাদিকদের আবদুর রাজ্জাক বলেন, সবার অংশগ্রহণে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য এবং শান্তিপূর্ণ একটি নির্বাচনের ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে।

চলমান রাজনৈতিক সহিংসতা কিভাবে কমিয়ে আনা যায় সে বিষয়ে রাজনৈতিক নেতাদের উদ্যোগী হওয়ার তাগিদ তারানকো দিয়েছেন জানিয়ে রাজ্জাক বলেন, সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি এবং সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন আয়োজনের  পরিবেশ তৈরি হলেই চলমান সঙ্কট উত্তরণ সম্ভব হবে বলে আমরা জানিয়েছি। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড না হলে সঙ্কট উত্তরণ সম্ভব নয়। অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে বৈঠকটি হয়েছে জানিয়ে রাজ্জাক বলেন, আমরা আমাদের কথা বলেছি। তারা তাদের মতামত দিয়েছেন। কি মতামত দিয়েছে জাতিসংঘ? জানতে চাইলে তিনি বলেন, কিভাবে সবাইকে নিয়ে একটি সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হতে পারে তা নিয়ে তারা কাজ করছেন বলে জানিয়েছেন। চলমান সহিংসতা নিয়ে জাতিসংঘ উদ্বিগ্ন বলেও জানান তিনি।

জামায়াতের নিবন্ধন ফিরে পাওয়া এবং নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ সৃষ্টি বিষয়ে কোন আলোচনা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে রাজ্জাক বলেন, এই সমস্যারও সমাধান সম্ভব। এটাও আলোচনা হয়েছে। দেশের বিগত দিনের সব নির্বাচনে জামায়াত অংশ নিয়েছে এবং সংসদে দলটির প্রতিনিধিত্ব ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, জামায়াত ইজ এ ফ্যাক্টর ইন দিস কান্ট্রি। ওনারাও অ্যাকসেপ্ট করেছেন। জামায়াত কিভাবে নির্বাচনে আসতে পারে তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সহিংসতার দায়-দায়িত্ব প্রসঙ্গে তারানকো কারও প্রতি কোন ইঙ্গিত করেছেন কিনা জানতে চাইলে ব্যারিস্টার রাজ্জাক বলেন, না, না। সুনির্দিষ্টভাবে তিনি কাউকে দায়ী করেন নি। তা বন্ধে সব দলকেই উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন মাত্র। সহিংসতা থেকে বেরিয়ে আসা যায়, এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টির ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।

তারানকোকে উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, ‘তিনি বলেছেন, সহিংসতা কাম্য নয়। আমরাও বলেছি, তা মোটেও কাম্য নয়, এটি কারওই কাম্য নয়।’ আলোচনায় জামায়াত নেতাদের তরফে গত ২৩শে ফেব্রুয়ারি রাজধানীর শাপলা চত্বরে অনুষ্ঠিত শিবিরের সমাবেশে পুলিশকে ফুল দেয়ার ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে জানিয়ে ব্যারিস্টার রাজ্জাক বলেন, আমরা বলেছি, সেদিন সরকার আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছিল বলে সমাবেশকারীদের পক্ষ থেকে পুলিশকে ফুল দেয়া হয়েছিল। সরকার উদ্যোগী হলে এ অবস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করেন জামায়াতের ওই নেতা। বাংলাদেশের যে কোন নির্বাচন উৎসবমুখর এবং শান্তিপূর্ণ হওয়ার ঐতিহ্য রয়েছে জানিয়ে ব্যারিস্টার রাজ্জাক বলেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হলেই সে ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

জাতিসংঘ যুদ্ধাপরাধের বিচার চায়, তবে…: মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রসঙ্গে অস্কার ফার্নানদেজ-তারানকো বলেছেন, জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সমপ্রদায় এ ধরনের অপরাধের বিচার চায়। গতকাল ডিফেন্স টিমের প্রধানের আইনজীবী ব্যারিস্টার রাজ্জাকের সঙ্গে আলোচনায় তিনি তার অবস্থান স্পষ্ট করেন। বৈঠক শেষে রাজ্জাক তা স্বীকারও করেন। তবে বাংলাদেশের বিচার নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন বলে দাবি করেন। ডিফেন্স টিমের প্রধান বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সমপ্রদায় সম্পূর্ণভাবে এ নিয়ে উদ্বিগ্ন। যে বিচার চলছে তা আন্তর্জাতিক মানের তো নিচেই দেশীয় মানেরও নিচে।’ ওই বিচার নিয়ে সমপ্রতি জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার নভি পিল্লাই যে বিবৃতি দিয়েছেন তা নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে বলেও জানান তিনি। সুপ্রিম কোর্টের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে সরকার জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর করতে চায় জানিয়ে ব্যারিস্টার রাজ্জাক এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, আমরা এ নিয়ে আমাদের উদ্বেগ-আশঙ্কার কথা তাদের বলেছি।

মার্কিন ও রাশিয়ার দূতের সঙ্গে বৈঠক: জামায়াতের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকের পর ঢাকাস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূত (ভারপ্রাপ্ত) জন ড্যানি লুইসের সঙ্গে বৈঠকে বসেন অস্কার ফার্নানদেজ-তারানকো। হোটেল স্যুটে তার সঙ্গে দূতাবাসের পলিটিক্যাল এট্যাচে পুস্পিন্দন ডিলন উপস্থিত ছিলেন। সকালে আধ ঘণ্টার মতো স্থায়ী ওই বৈঠকের বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়নি। বেরিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে ভারপ্রাপ্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সাংবাদিকদের সঙ্গে করমর্দন করলেও কোন কিছু বলতে রাজি হননি। উল্লেখ্য, গত শনিবার ঢাকাস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা হোটেলে এসে তার সঙ্গে বৈঠক করেন। মজিনা বর্তমানে হংকং রয়েছেন। এদিকে দুপুরে গুলশানের রাশিয়ান দূতাবাসে যান তারানকো ও তার সফরসঙ্গীরা। তারা প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা সেখানে অবস্থান করেন। কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, ঢাকাস্থ রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার নিকোলায়েভের সঙ্গে জাতিসংঘ প্রতিনিধি দলের বৈঠক হয়েছে সেখানে। এদিকে রাতে বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠকের পর জাতিসংঘ প্রতিনিধি দল ঢাকাস্থ সুইস দূতাবাসে যান বলে জানা গেছে।

আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক: মার্কিন দূতের সঙ্গে বৈঠকের পরে এবং রাশিয়ান দূতাবাসে যাওয়ার আগে দুপুর সাড়ে ১১টা থেকে সাড়ে ১২টা এক ঘণ্টা তারানকো বৈঠক করেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদের সঙ্গে। গুলশান এভিনিউতে প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভীর বাসায় ওই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, দলের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ফারুক খান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠক শেষে আলোচনার বিষয়বস্তু নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কেউই কথা বলতে রাজি হননি। আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাতিসংঘ দূতের এটি তৃতীয় বৈঠক। এর আগে গত শনিবার দলটির ৭ সদস্যের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে এবং রোববার  প্রতিনিধি দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য গওহর রিজভীর সঙ্গে বৈঠক করেন তারানকো। গতকাল সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকের পরও সাংবাদিকরা সৈয়দ আশরাফ ও গওহর রিজভীর কাছে তারানকোর সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে জানতে চান। কিন্তু তারা মুখ খুলতে রাজি হননি।

খালেদা-তারানকো বৈঠক: রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনে সমঝোতা চেষ্টার অংশ হিসেবে বিরোধী নেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গে দ্বিতীয় দফায় বৈঠক করেন জাতিসংঘের দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো। গতকাল সন্ধ্যা ছয়টায় বিরোধী নেতার গুলশানের বাসভবনে ৬ সদস্যের প্রতিনিধি দল নিয়ে যান তিনি। এরপর বিরোধী নেতার সঙ্গে ঘণ্টাব্যাপী দীর্ঘ বৈঠক করেন তারানকো। বৈঠক শেষে সাংবাদিকের সঙ্গে কোন কথা না বলেই বেরিয়ে যান জাতিসংঘের এই দূত। তবে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচন নিয়ে জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিবের সঙ্গে বিরোধী নেতা খালেদা জিয়ার অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আমরা আমাদের বক্তব্য তুলে ধরেছি। তারানকো গুরুত্বপূর্ণ সফরে বাংলাদেশে এসেছেন। তার সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং এই প্রক্রিয়ার অব্যাহত থাকবে।

সদিচ্ছা থাকলে সমাধান সম্ভব-তারানকো: জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নানদেজ-তারানকো বলেছেন, রাজনৈতিক দলের সদিচ্ছা থাকলে শান্তিপূর্ণ সমাধান এখনও সম্ভব। বর্তমান অচলাবস্থার শান্তিপূর্ণ সমাধানের একটি সম্ভাবনা এখনও আছে। নির্বাচনের আগে চলমান সঙ্কটের অবসান ঘটানোর লক্ষ্য নিয়ে ঢাকায় আসা অস্কার ফার্নানদেজ-তারানকো সোমবার দুপুরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিব উদ্দীন আহমেদের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা বৈঠক শেষে তিনি এসব কথা বলেন। বৈঠক শেষে তারানকো সাংবাদিকদের সালাম জানিয়ে বলেন, আসসালামুআলাইকুম! প্রথমে আমি প্রশংসা করছি গণমাধ্যমের গুরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য।

এরপর তিনি সঙ্কট নিরসনে তার এ চেষ্টার প্রতিটি পদক্ষেপে গণমাধ্যমের ‘ইতিবাচক ভূমিকা’র কথা উল্লেখ করে ধন্যবাদ জানান। বলেন, যদি  রাজনৈতিক দলের সদিচ্ছা থাকে, নেতৃত্ব যদি সঠিক হয়, সমঝোতায় আসার মানসিকতা যদি থাকে, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- শান্তিপূর্ণভাবে সংলাপ যদি আমরা চালিয়ে যাই, তাহলেই এটা সম্ভব। বেলা ২টায় নির্বাচন কমিশনে যান তারানকো। ২০ মিনিট বৈঠক করেন সিইসির সঙ্গে। সিইসির সঙ্গে তারানকোর দ্বিতীয় বৈঠকের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনারদের কিছু জানানো হয়নি। বিকালে কমিশনারদের সঙ্গে সিইসির বৈঠক করার কথা থাকলেও সিইসি বৈঠক না করেই কমিশন কার্যালয় ত্যাগ করেন। বৈঠকে কি কথা হয়েছে সে বিষয়ে সিইসির কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, একটা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছে। এখনই আমরা এ বিষয়ে কথা বলব না। দেখা যাক কি হয়। বৈঠকে  সিইসির সঙ্গে কমিশনের সচিব ড. মোহাম্মদ সাদেক উপস্থিত ছিলেন।

সৌজন্য: মানবজমিন

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

আরও দেখুন...

Close
ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close