Featuredস্থানীয়

সংরক্ষণের উদ্যোগ নেই বড়লেখার বিভিন্ন বধ্যভূমির

জালাল আহমদ, বড়লেখা
মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অযতœ আর অবহেলায় পড়ে আছে বিভিন্ন বধ্যভূমি। স্বাধীনতার ৪৩ বছর পার হতে চললেও বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণ অথবা চিহ্নিত করার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ২০১২ সালের ১৯ ডিসেম্বর বড়লেখা পৌরসভায় অনুষ্ঠিত এক সংবর্ধনা সভায়ও এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়। তবে সে দাবি রয়েছে উপেক্ষিত। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদের পক্ষ থেকে বধ্যভূমির স্থান চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও অদ্যাবধি কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যেও চাপা ক্ষোভ

বিরাজ করছে। একাত্তরের যুদ্ধের সময় টগবগে তরুণ লঘাটি গ্রামের চিত্তরঞ্জন দাস দু:খী, একই গ্রামের মুহিত লাল দাস, মঈন উদ্দিনসহ শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা ক্ষোভ প্রকাশ করে এ প্রতিবেদককে জানান, যারা দেশমাতৃকার লড়াইয়ে পাকসেনাদের হাতে জীবন দিলো আজও তাদের বধ্যভূমি চিহিৃত করা হয়নি। এর চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কি হতে পারে। এ নিয়ে চাপা ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে মুক্তিযোদ্ধা শহীদ পরিবারের মাঝে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বড়লেখা উপজেলার হিন্দু অধ্যূষিত দাসেরবাজার ইউনিয়নে রয়েছে পাকবাহিনীর মানবতা হত্যার বেদনামাখা বধ্যভূমি। দাসেরবাজারের মসজিদের পাশেই এ বধ্যভূমিতে প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মীসহ অনেক বাঙালিকে হত্যা করা হয় নির্মমভাবে। লঘাটি গ্রামের ন্যাপকর্মী কুনু মিয়াকে এ বধ্যভূমিতে পাক সেনারা গুলি করে বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের সূচনা করে। তালুকদারপাড়া গ্রামের গোপেন্দ্র নাথ ও প্রজেশ নাথকেও হত্যা করা হয় এ বধ্যভূমিতে।

একই স্থানে লঘাটি গ্রামের নগেন্দ্র দাসকে চোখ বাঁধা অবস্থায় হত্যা করে চেঙ্গিস খানের বংশধর খান সেনারা। সুনাই নদীর তীরে পাকসেনারা ডা. নৃপেন্দ্র দাসকেও হত্যা করে। উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়নের শাহবাজপুর হাইস্কুল টিলায় রয়েছে আরেকটি বধ্যভূমি। এখানে দৌলতপুর গ্রামের ডা. আব্দুর নূরকে হত্যা করে পাকসেনারা। এ বধ্যভূমিতে রাতের আঁধারে আরো অনেক বাঙালিকে হত্যা করে হানাদাররা। পাশে বিডিআর ক্যাম্পের নিকটে সিলেট জেলার ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার ডা. ফয়েজ আহমদকেও নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।  দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নের খাগালা বধ্যভূমি ও ছোটলেখা চা বাগানের সামনে ঘোলসা গ্রামের হীরেন্দ্র চন্দ্র দাস, কুটিন্দ্র মোহন দাস, বারীন্দ্র মোহন দাস, মনিন্দ্র মোহন দাসসহ অনেককেই হত্যা করা হয়। বড়লেখা সদর ইউনিয়নের হাজীগঞ্জবাজার জামে মসজিদ এলাকায় রয়েছে বধ্যভূমি। বাড়ি বাড়ি হানা দিয়ে ধরে এনে নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয় এখানে। এ ধরণের নৃশংসতার শিকার হয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের নেপথ্য কর্মী ইব্রাহিম আলী ওঝা ও পানিধার গ্রামের জছির আলী। এখানে চলতো বাঙালি হত্যার উৎসব। নরসুন্দর সম্প্রদায়ের ৬ ব্যক্তিকে পাকিস্তানি সৈন্যরা এখানে হত্যা করে।

এ বধ্যভূমিতে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক মন্তজীর আলী। তাকে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। থানা পশু হাসপাতালের দক্ষিণ দিকে একটি বধ্যভূমি রয়েছে। ঘোলসা গ্রামের বলাই দাসকে এখানে এনে হায়েনারা বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। এছাড়া মদনলাল নামের আরেক ব্যক্তিকেও হত্যা করা হয় এখানে। এ বধ্যভূমিতে স্বাধীনতার পর আরো অনেক মৃত মানুষের হাড় ও কঙ্কাল পাওয়া যায় বলে জানা গেছে। এছাড়া উপজেলার নিজবাহাদুরপুর, তালিমপুর, সুজানগর, দক্ষিণভাগ (উত্তর), দক্ষিণভাগ (দক্ষিণ) ইউনিয়নে পাকসেনাদের অস্থায়ী ক্যাম্পের পাশে রয়েছে নাম না জানা অনেক লোকের জীবন বিসর্জনের কাহিনী।

একাত্তরের শহীদ পানিধার গ্রামের জছির আলীর পুত্র সেলিম রেজা ক্ষোভের সাথে জানান, স্বাধীনতার ৪৩ বছর পার হতে চললেও পাকহানাদার বাহিনীর গুলিতে আমার পিতা যে স্থানে শহীদ হলেন সেই স্থানটি আজও সরকারিভাবে চিহিৃত করে বধ্যভূমি নির্মিত হয়নি। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, এটা অপমান ছাড়া কি হতে পারে? বড়লেখা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমাণ্ডার ও উপজেলা চেয়ারম্যান সিরাজ উদ্দিন জানান, সরকারিভাবে কোনো বরাদ্দ নেই এ খাতে। আমাদের সংসদেরও কোনো ফান্ড নেই। তবে পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের ফান্ড রয়েছে। তারা চাইলে এগুলো সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিতে পারে।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close