কালজয়ী

যুদ্ধ দেখিনি, দেখেছি ছবিতে

আসিফ আজিজ: আমরা মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী প্রজন্ম। যুদ্ধ দেখিনি, শুনেছি। ছবিতে দেখেছি যুদ্ধের বীভৎসতা।পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, এদেশী রাজাকার, আলবদর, আলাশামস  বাহিনীর যৌথ সে অত্যাচার, নৃশংসতা বেয়নেটের মতো বিদ্ধ করে আমাদের।

যুদ্ধ দেখিনি। শুনেছি বাবা-মা, চাচা, নানা-নানির মুখে। আজ যখন শুনি মুক্তির গান, দেখি যুদ্ধের নির্মম, নৃশংস, ইতিহাসের জঘন্যতম সব ছবি তখন টগবগ করে ফুটে ওঠে রক্ত, বুকে জাগে সাহস, ইতিহাসের দোসরদের গুড়িয়ে দেওয়ার দৃপ্ত অনুপ্রেরণা।

সাদাকালো ছবিতে যখন দেখি ধর্ষিত ছ্ন্নি-ভিন্ন নগ্ন নারীর দেহ পড়ে আছে মাটিতে, হাত-পা বাঁধা অবস্থায় ঝুলছে খুঁটিতে, কিংম্বা টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে পাঞ্জাবি সৈন্যরা তখন রগ টানটান হয়ে ওঠে, লহু গরম হয়, মুষ্টিবদ্ধ হয় হাত, ঘৃণায়, ক্ষোভে অন্তরে জাগে মানুষ নামক সেই নরপশুদের আস্তাকুঁড় অথবা আগ্নেয়গিরির জ্বলন্ত লাভায় নিক্ষেপের শক্তি। চোখ ঝাপসা হয়, মুহূর্তে পৃথিবীটাও যেন হয়ে যায় এই সাদাকালো ছবির মতো।

যুদ্ধ কত বীভৎসতার জন্ম দিতে পারে তার অংসখ্য উদাহরণ রয়েছে একাত্তরের নানা ছবিতে। যখন দেখি মুক্তিকামী মানুষকে বাধ্য করা হচ্ছে অর্ধগলিত শিশুর লাশ দড়িতে বেঁধে টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে যেতে তখন ভাবি কোথায় ছিল মানবতা, মনুষ্যত্ব? একই সঙ্গে ভাবি, এসব অপরাধে অভিযুক্তদের যখন বিচার হচ্ছে দেশে তখন একদল বিদেশি, মানবাধিকার কর্মী নাকি বলেন, মৃত্যুদণ্ড মানবিক না। তাহলে একাত্তরে যেটা ঘটেছে, পৃথিবীতে বারবার যখন ঘটবে এমন ঘটনা, তখন কি পার পেয়ে যাবে ‘মানবিক’ অমানবিকতার নামে!

যখন দেখি কুকুরে খুবলে খাচ্ছে রক্ত মাংসের কোনো শরীর। যে শরীরের রয়েছে এই কুকুর থেকে হিংস্র প্রাণী পাকিস্তানি সেনাদের নখর, তখন চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে, এদেশ আমার। এসবের বিনিময়ে আমার প্রিয় স্বাধীনতা। লাল-সবুজ প্রাণের পতাকা। আমার দেশের সবকিছুর অধিকার আমাদের। ১৬ কোটি মানুষের।

যখন দেখি মুক্তি সেনার হাতে উদ্যত রাইফেল, মুখে ঝাঁঝালো স্লোগানের ভঙ্গি, চাহনিতে যুদ্ধজয়ের ক্ষুধা, ফুলে ওঠা হাতের পেশিতে দৃঢ়তা তখন পাই বেঁচে থাকার, সামনে এগিয়ে যাওয়ার নতুন প্রেরণা।

কোনো পৌঢ়কে যখন দেখি সন্তানের কাঁধে ঝুলে প্রিয় মাতৃভূমি, ভিটেমাটি ছেড়ে শুধু বেঁচে থাকার তাগিতে চলে যেতে হচ্ছে অন্য দেশের আশ্রয়ে; পাশাপাশি এদেশের বীর নারীরা সব অত্যাচার, নির্যাতন, মান-সম্ভ্রম খুইয়েও অস্ত্র হাতে জাতির পাতাকা হাতে নিয়ে এগিয়ে চলেছে যুদ্ধজয়ে তখন আশাবাদী হই। ভাবি এজন্যই বাঙালি বীরের জাতি।

৯ মাস যুদ্ধের পর যখন বিজয় আমাদের দোরগোড়ায়, তখন ঘটে জাতির সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। জাতি হারায় সব মেধাবীদের। এদেশী দোসরদের সহায়তায় সেদিন পাকিস্তানিরা চেয়েছিল মেধায় বাঙালিকে পঙ্গু করতে। এটাই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় মারণাস্ত্র। অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছিল সেদিন। তবু বাঙালি জাতি মাথা নোয়াবার নয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দিন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলামদের সেসময়ের ছবি যখন দেখি, তখন মনে হয় দেখতে পাচ্ছি জাতির আলো, যে আলো আলোকিত বাংলাদেশ। আর আলোর পিঠের আঁধারে যারা তাদের পতন অবশ্যম্ভাবী।

যখন দেখি কোটি মানুষের মাথার উপর উড়ছে লাল-সবুজের মাঝের বাংলাদেশ, তখন আবারো ভাবি এজন্যই বাঙালি পরিচয়ে বেঁচে আছি আমরা, স্বপ্ন দেখি বিশ্বজয়ের। বুকের ভেতর শুরু হয় সামনে এগিয়ে যাওয়ার তীব্র আলোড়ন।

সেদিন যারা জীবন দিয়েছিলেন দেশের জন্য, সে আমার ভাই, সে আমার বোন, সে আমার জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। আমরা বাঙালি। বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা, আমরা বাঙালি। বিজয়ের কেতন ওড়ানো স্বপ্ন আমার।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close