ফিচার

একাত্তর ভুলি কেমনে!

ফারুক ওয়াহিদ, যুক্তরাষ্ট্র থেকে:

(ক্যানেক্টিকাট, যুক্তরাষ্ট্র): রক্তের আঁখরে লেখা ১৯৭১। পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামে দেশটি যতদিন থাকবে, ততদিন ১৯৭১ সালটি বাঙালির কাছে রক্তের আঁখরেই লেখা থাকবে।

একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারে ঘুমন্ত নিরীহ বাঙালিদের ওপর হানাদার বর্বর নরপিশাচ পাকিস্তানি সেনারা গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুঠতরাজ ও নারী ধর্ষণের উল্লাসে মেতে ওঠে।

নিয়াজী দম্ভ করে বলেছিলেন, ‘ম্যায় ইস হারামজাদে কত্ত্বমকি নাসাল বাদাল দোঙ্গা। ইয়ে মুঝে কিয়া সামাঝতি হ্যায়?’ অর্থাৎ, এই হারামজাদা জাতির আদল আমি বদলে দেবো। তারা আমাকে কী মনে করে?

তিনি তার অধীন সেনাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, বাঙালি নারীদের ধর্ষণ করতে। পাকিস্তানি সেনারা বাঙালিদের ওপর ব্যাপক হারে শুধু গণহত্যাই চালায়নি বরং নিয়াজীর নির্দেশ মতো চার লক্ষাধিক বাঙালি নারীকে ধর্ষণ করেছে।
(সূত্র: হামিদ মির, পাকিস্তানের জিয়ো টিভির নির্বাহী সম্পাদক। প্রথম আলো, ২৪ নভেম্বর-১২)
মুক্তিযুদ্ধের সময় নির্বোধ স্বল্প সাক্ষর বর্বর হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী ও এদেশীয় পাকিস্তানি দালালেরা সব সময় বলতো, ‘মাশরেকি পাকিস্তানমে আদমি নেহি, সেরেফ মিট্টি মাঙ্গতা।’ অর্থাৎ  পূর্ব পাকিস্তানে মানুষ চাই না। শুধু মাটি চাই।

১৯৭১-এর ৭ মার্চ বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা রূপকথার প্রবাদ পুরুষ- শতাব্দীর মহাপুরুষ সংগ্রামী জননেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বজ্রকণ্ঠে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিলেন- ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয়বাংলা।’

সেই নির্দেশ টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার সাড়ে সাত কোটি বাঙালি কেঁপে উঠে একাত্মতা ঘোষণা করে। ২৫ মার্চ একাত্তর কালো রাতে ঘুমন্ত নিরীহ বাঙালির ওপর হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণ করে গণহত্যায় মেতে ওঠে।

২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় মেজর জিয়াউর রহমান কালুরঘাট স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাটি পাঠ করেন এবং ‘জয়বাংলা’ বলে ঘোষণাপত্রটি পাঠ করা শেষ করেন।

শুরু হলো বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ। ‘এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’- সেই মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে বাঙালিরা পৃথিবী কাঁপানো ‘জয়বাংলা’ স্লোগান দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে হানাদার বর্বর পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে।

দীর্ঘ নয়মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর ’৭১ বিকেল ৪টা ৩১ মিনিটে পাপাশ্রয়ী গণধিক্কৃত নারী ধর্ষণকারী কাপুরুষ ৯৩ হাজারেরও বেশি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মিত্র ও মুক্তিবাহিনীর কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করে।

এ সময় পাকিস্তানি ‘চানতারা মার্কা বেঈমান পতাকা’-কে চিরদিনের জন্য নামিয়ে বাংলাদেশের সোনালি মানচিত্র খচিত গাঢ় সবুজের মধ্যে রক্তিম সূর্য সম্বলিত ৩০ লাখ শহীদের রক্তস্নাত বাংলাদেশের নতুন পতাকা উড়িয়ে দেন মুক্তিবাহিনী।

যদিও অনেকে ১৯৭১ সাল উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে আঁতকে ওঠেন এবং তাদের অপকর্মের জন্য সেই সময়টাকে ভুলে থাকতে চান। তারা এই বলে এড়িয়ে যান যে, কী হবে এসব পুরনো কাসুন্দি ঘেঁটে! পাকিস্তানিদের অনেকেই ১৯৭১ সালকে বার বার ভুলে যেতে বাঙালিদের উপদেশ দিয়েছেন। পৃথিবীতে শুধু একটি মাত্র দেশ আছে, যেখানে ইতিহাস নিষিদ্ধ এবং কোথাও ইতিহাস পড়ানো হয় না। সে দেশটি হলো পাকিস্তান। আর যেটুকু ইতিহাস পড়ানো হয়, সে টুকুর ইতিহাসে ১৯৭১ সাল অনুপস্থিত। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ অনুপস্থিত এবং পাকিস্তানিদের গণহত্যা, নারী ধর্ষণ অনুপস্থিত এবং বাংলাদেশে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর কাছে পাকিস্তানি সৈন্যদের শোচনীয় পরাজয় ও নির্লজ্জ নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের ঘটনাও অনুপস্থিত।

বাংলাদেশে যারা পাকিস্তানিদের দোসর ছিল, তারা তাদের ব্যক্তিগত জীবন-বৃত্তান্তেও ১৯৭১ সালকে এড়িয়ে যান। অর্থাৎ পৃথিবীর ক্যালেন্ডারে ১৯৭১ সাল বলতে কিছু ছিল না এবং তারাও নিষ্ঠুর বর্বর অসভ্য পাকিস্তানিদের সুরে বলে থাকে, পেছনে তাকানো যাবে না। চাই সামনে তাকাতে। তাই, বড় দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আক্ষেপ করে বলতে হয়, “এদেশ কি ভুলে গেছে সেই দুঃস্বপ্নের রাত, সেই রক্তাক্ত সময়!”

বাংলাদেশে পাকিস্তানপন্থি অনেকেই বলে থাকেন, মুক্তিযুদ্ধের ৪২ বছর পর এই সব পুরনো ঘটনা টেনে এনে কী লাভ? কিন্তু, আমার তো মনে হয়, মুক্তিযুদ্ধ মাত্র ৪২ দিন আগের ঘটনা। এইতো সেদিনের ঘটনা! স্বচ্ছ আয়নায় একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সবকিছু স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশে আসলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে পাকিস্তানকে ১৯৭১ সালে তাদের কৃতকর্মের জন্য আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাইতে বলেন।

এ সময় পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিনা রাব্বানী একাত্তরের নৃশংস গণহত্যা, নারী ধর্ষণের জন্য অনুতাপ-অনুশোচনা বা ক্ষমা চাওয়া তো দূরের কথা, বরঞ্চ উল্টো বাংলাদেশকে একাত্তরকে ভুলে যাওয়ার জন্য জন্য বলেন।

এত বড় রক্তাক্ত ইতিহাসকে উপেক্ষা করে পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিনা রাব্বানী কী করে বলেন যে, আমাদের অতীত ভুলে সামনে পা ফেলতে হবে।

যারা বর্বর নিষ্ঠুর এবং যারা একাত্তরের গণহত্যা ও নারী ধর্ষকদের সমর্থক, তারাই সাধারণত এ ধরনের মন্তব্য করতে পারে।

হিনা রাব্বানীর এই ধৃষ্টতামূলক বক্তব্যে সারা বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষ হতবাক ও স্তম্ভিত হয়েছিল। কিন্তু, আমি ব্যক্তিগতভাবে হিনার বক্তব্যে একটুও অবাক হইনি। কারণ, তিনি তো একাত্তরে বাংলাদেশে গণহত্যাকারী নারী ধর্ষণকারী দেশেরই মানুষ। তাদেরই বংশধর। তাদেরই প্রতিনিধি এবং তাদেরই রক্ত তার ধমনীতে প্রবাহিত হচ্ছে। 

সে কারণে এতে অবাক হওয়ার কী আছে!

তিনি যদি একাত্তরের অতীত স্বীকার করেন তবে সেই অতীত তার রাষ্ট্রের অর্থাৎ পাকিস্তানিদের মুখোশ উন্মোচন করে দেবে।

হানাদার পাকিস্তানিরা বাংলাদেশে ৩০ লাখ শহীদের তাজা রক্ত পান করে এবং ৪ লক্ষাধিক মা-বোনের সম্ভ্রমহানি করেও ক্ষান্ত হয়নি। রক্তপিপাসুরা এখন একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে চাইছে।

বাংলাদেশের মঙ্গল হোক, পাকিস্তান সেটা কোনোদিনই চাইবে না। কারণ, তাদের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশে একাত্তরের নির্লজ্জ নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ তথা শোচনীয় পরাজয়ের অন্তর্জালা এবং সময়-সুয়োগ পেলেই তারা বাংলাদেশের প্রতি তাদের এদেশীয় দোসর বা এজেন্টের মাধ্যমে সেই পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে চেষ্টা করবেই।
দুঃখ লাগে বাংলাদেশে কিছু সংখ্যক পাকিস্তানপন্থিদের অবস্থা দেখে, যারা বাঙালি হয়েও মনেপ্রাণে পাকিস্তানিদের চেয়েও বেশি পাকিস্তানি। তারাও অতীত বা পেছনের দিকে তাকাতে চায় না এবং তারাও ‘রিয়ার ভিউ মিরর’-এর দিকে না তাকিয়ে গাড়ি চালাতে চায়।

আমাদের রয়েছে ঐতিহ্যময় সুপ্রাচীন গৌরবময় অতীত- অতীতের অনেক রক্তক্ষরণের রক্তাক্ত ইতিহাস তথা একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ।

মুক্তিযুদ্ধ অনিঃশেষ ও অন্তহীন। তাই, মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা চির জাগরুক থাকে। তাই, এটাকে কিছুতেই ভোলা যায় না। আমরা বাঙালি তথা বাংলাদেশিরা সুন্দর দিন গড়ার জন্যই তো অতীতের দিকে তাকাই। অতীতকে ছাড়া তো আমরা আগামী দিনের পথ অতিক্রম করতে পারি না। আমরা ভুলতে পারি না বাঙালির হাজার বছরের গৌরবময় শ্রেষ্ঠ ঘটনা। অতীতকে তথা একাত্তরকে ভুলে গেলে ইতিহাস কোনোদিন আমাদের ক্ষমা করবে না।


লেখক: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধা

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close