অন্য পত্রিকা থেকে

অস্তিত্ব সংকটে এরশাদ

সেরাজুল ইসলাম সিরাজ: বারবার গেম খেলতে গিয়ে জটিল সংকটের মধ্যে পড়েছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তার এসব নাটকের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দলকে অক্ষত রেখে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার কোনোই পথ দেখছেন না সিনিয়র নেতারা। অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়ে গেছেন স্বয়ং এরশাদ। নিজের গড়া দলকেও ভাঙনের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন বার বার। উপর্যুপরি ভাঙন দেখা দিলে নিজের পাশে ও মূল দলে থাকার মতো নেতার সংকটের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

জাতীয় পার্টির একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য বাংলানিউজকে জানিয়েছেন, জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠার পর থেকে সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে। এখন যে দিকেই মোড় নিক, দল আর অক্ষত থাকছে না। শুধুমাত্র নেতৃত্ব সংকটের কারণে এরশাদ ‘মুক্তি’র আন্দোলন হালে পানি পাচ্ছে না।

এরশাদকে আটক দাবি করে তার ‘মুক্তির’ দাবিতে ডাকা আন্দোলনের প্রথম দিন  মঙ্গলবার বিক্ষোভ পালনের কিছুটা চেষ্টা হলেও পরের দিন বুধবার ঢাকায় স্মারকলিপি দিতেই যাননি কেউ। খোদ দলটির মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদারকে বুধবার দুপুরে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, খোঁজ নিয়ে দেখেন, কারা যেন স্মারকলিপি দিতে যাচ্ছেন।

একই অবস্থা রাজধানীর বাইরে অনেক জেলায়ও। অনেকে জেলায় কর্মীরা নেতা খুঁজে পাচ্ছেন না। নির্বাচনে থাকবেন নাকি আন্দোলন করবেন এ নিয়েও রয়েছেন দ্বিধায়। কারণ, এরশাদ বর্তমান অবস্থানে অনড় থাকবেন কি-না সে বিষয়েও যথেষ্ট সন্দিহান তারা।

এরশাদ তার আগের অবস্থান থেকে ইউটার্ন নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার ও নির্বাচনে যাওয়ায় এরই মধ্যে কাজী জাফর আহমদের নেতৃত্বে একটি গ্রুপ দল থেকে বের হয়ে গিয়ে আলাদা জাতীয় পার্টি গঠন করেছে। সেই ক্ষত কাটিয়ে না উঠতেই আবারও ভাঙনের আশঙ্কায় পড়েছে সাবেক স্বৈরশাসকের দলটি।

আগের দফায় তৃণমূলে তেমন ধাক্কা না লাগলেও এ দফায় ভাঙন দেখা দিলে রক্তক্ষরণ যে অনেক বেশিই হবে তা সহজেই অনুমেয়। কারণ, বার বার নির্দেশনা দিলেও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মনোনীত প্রার্থীরাই নির্বাচনী মাঠে রয়ে গেছেন। অনেকে আবার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে সংসদে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।

নতুন করে সংকট তৈরি হয়েছে তার নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াবার ঘোষণা দেওয়ায়। আগাগোড়া আওয়ামী লীগ বিরোধী বলে পরিচিত পার্টির সিনিয়র প্রেসিডিয়াম সদস্য রওশন এরশাদ বেঁকে বসেছেন। আর তার পেছনে একাট্টা হয়েছেন অনেকেই।

এর মধ্যে রয়েছেন প্রেসিডিয়াম সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, মজিবুল হক চুন্নু, হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, অ্যাড. সালমা ইসলাম, নাসিম ওসমান, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, এবিএম তাজুল ইসলাম চৌধুরী, একেএম মাইদুল ইসলাম, ফখরুল ইমাম, মশিউর রহমান রাঙা, ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি এসএম ফয়সল চিশতী, সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দিন বাবুল, মহানগর দক্ষিণের সভাপতি কাজী ফিরোজ রশীদ।

এমনকি সদ্য গঠিত জাতীয় যুব সংহতির সভাপতি ও সম্পাদক এবং স্বেচ্ছাসেবক পার্টির সভাপতিও রওশন এরশাদের দলে ভিড়েছেন।

হাতে গোনা কয়েকজন সিনিয়র নেতা ছাড়া প্রায় সকলের ভূমিকাই এখন বিতর্কিত। রওশনের দলে কারা রয়েছেন এমন প্রশ্ন করলে জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাকুর রহমান মোস্তাক বাংলানিউজকে জানান, কে নেই এই হিসেব দেওয়াটা সহজ। কারণ, এই তালিকাটা খুবই ছোট।

মোস্তাক বলেন, সিনিয়র নেতাদের বেশিরভাগের ভূমিকাই প্রশ্নবিদ্ধ। তবে তৃণমূলের কোনো সমস্যা নেই। কর্মীরা সবাই এরশাদের পিছনে একাট্টা রয়েছেন জীবন দেওয়ার জন্য।

জাতীয় পার্টি সূত্র জানায়, রওশন এরশাদ নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রিত্ব গ্রহণে আগ্রহী ছিলেন না। এরশাদের বিশেষ অনুরোধে সর্বদলীয় ওই সরকারের মন্ত্রিসভায় শপথ নেন তিনি। আর মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে এরশাদ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াবার ঘোষণা দিলে বেজায় চটেছেন রওশন। কোনো অবস্থাতেই মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগে রাজি ছিলেন না তিনি।

তার কারণেই জাপার মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের পদত্যাগ করা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। তার পদত্যাগপত্র জমা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় প্রকাশ করেছেন অনেকে। এখনও তার বাড়িতে উড়ছে জাতীয় পতাকা। যে কারণে এই সন্দেহ আরও জোরালো হয়ে উঠেছে।

রওশন এরশাদের নেতৃত্বে বিশাল একটি গ্রুপ নির্বাচনে যাওয়ার জন্য একাট্টা হয়েছে। এরশাদ বারবার নির্বাচনে থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দিলেও অনেক প্রার্থীই এখনও নির্বাচনী মাঠে থেকে গেছেন। সিনিয়র নেতাদের প্রায় সবাই নিয়মিত রওশন এরশাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।

বুধবার রওশন এরশাদের বাসা থেকে বের হয়ে প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) জাতীয় পার্টির সভাপতি কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, তারা নির্বাচনে যাচ্ছেন। তিনি শিগগিরই নির্বাচনী প্রচারণায় নামবেন।

পার্টির চেয়ারম্যানের নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা প্রসঙ্গে বাংলানিউজকে জানান, মন্ত্রীরা রয়ে গেছে। এরশাদের ভাই জিএম কাদের ৫ বছর ধরে মন্ত্রিসভায় রয়েছেন। এরশাদ, জিএম কাদেরসহ অনেক নেতাই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। আমিতো কিছু বুঝি না।

রওশন এরশাদের ঘনিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, এরশাদ কঠোর কোনো সিদ্ধান্ত নিলে তারাও পাল্টা করণীয় ভেবে রেখেছেন। যে কারণে হুঙ্কার দিলেও সহসাই কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না এরশাদ।

আর বহিস্কার করতে হলে তার দলের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। এখন পর্যন্ত সিনিয়র নেতাদের মধ্যে অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন খান ও করিম উদ্দিন ভরসা  ছাড়া আর কাউকেই পুরোপুরি এরশাদের একনিষ্ঠ বলতে চাচ্ছেন না নেতাকর্মীরা।

পার্টির মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার ও জিএম কাদেরের ভূমিকা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে নেতাকর্মীদের মধ্যে। যে কারণে এই জটিলতার থেকে বের হওয়া খুবই কঠিন বলে মনে করছেন জাপার নেতাকর্মীরা।

জাতীয় পার্টির মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সময়ের ব্যবধানে আমার ঐক্যবদ্ধ হবো। নানা রকম কথা বলা হলেও আমরা ঐক্যবদ্ধ রয়েছি।

এ গেলো দলের ভেতরের অবস্থা। অন্যদিকে বারবার স্ট্যান্টবাজির কারণে আওয়ামী লীগও এরশাদকে বিশ্বাস করতে পারছে না। আবার বিএনপিও তাকে বিশ্বাস করতে চাইছে না।

বিকল্পধারা, জেএসডি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগসহ অারও কয়েকটি দল নিয়ে জোট গঠনের ঘোষণা দিলেও হালে পানি পাচ্ছে না এরশাদ। যে কারণে উভয় সংকটে পড়েছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

প্রতিটি বাঁকে বাঁকে দলটির ভাঙ্গন হলেও স্বল্প দিনের ব্যবধানে এ রকম ভাঙন আর ভাঙনের হুমকির মুখে কখনও পড়েনি জাতীয় পার্টি। এর আগে জাফর-মোয়াজ্জেম, মিজান চৌধুরী- আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, নাজিউর রহমান- কাজী ফিরোজ রশীদ আলাদা জাতীয় পার্টি গঠন করেন।

সূত্র: বাংলানিউজ২৪

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close