জাতীয়স্বদেশ জুড়ে

দুঃসহ বছর কাটলো বিএনপি কর্মীদের

মান্নান মারুফ:

নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে দুঃসহ বছর কেটেছে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির নেতাকর্মীদের।

দলটির নেতাকর্মীদের অভিযোগ, সরকারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখার কারণে এমনকি রাজপথে সক্রিয় নেতাকর্মীদের পরিবারকেও হয়রানি-হেনস্তা-নির্যাতন সইতে হয়েছে।  এছাড়া তত্ত্বাবধায়কের দাবিতে চলা অবরোধ, হরতাল, বিক্ষোভ-সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে নিহত, আহত, গ্রেফতারকৃত এবং মামলার শিকার নেতাকর্মীদের পরিবারগুলোর বছর কেটেছে প্রশাসনিক হয়রানি-হেনস্তা সয়ে। এখনও অর্থকষ্ট ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে কর্মসূচিতে হতাহত ও ক্ষতিগ্রস্ত নেতাকর্মীদের পরিবারগুলো।

জেলা-উপজেলা পর্যায়ের রাজপথের নেতাকর্মীরা আন্দোলন কর্মসূচিতে বেশি হতাহত ও নির্যাতনের শিকার হলেও ‘নাশকতা ঠেকাতে’ এ বছর বিএনপির অনেক বাঘা বাঘা নেতাকেও কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

মাঠ পর্যায়ের হাজারো নেতাকর্মীর সঙ্গে বর্তমানে কারাগারে আছেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, এম কে আনোয়ার, আ স ম হান্নান শাহ, ভাইস চেয়ারম্যান ও ঢাকা মহানগর শাখার আহ্বায়ক সাদেক হোসেন খোকা, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আব্দুল আউয়াল মিন্টু, মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন, যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী আহমেদ, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী এডভোকেট শামসুল রহমান শিমুল বিশ্বাস, সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম আকবর খন্দকার, সাবেক সংসদ সদস্য সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল, বর্তমান সংসদ সদস্য শাম্মী আক্তার,স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক মীর সরফত আলী সপু, সাংগঠনিক সম্পাদক সফিউল বারী বাবু, ছাত্রদল সভাপতি আব্দুল কাদের ভূঁইয়া জুয়েল, সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রশিদ হাবিব, সিনিয়র সহ-সভাপতি বজলুল করিম চৌধুরী আবেদসহ শীর্ষস্থানীয় অনেক নেতা।

তৃণমূল কর্মী থেকে শুরু করে বাঘা বাঘা নেতাদেরও এখন জেলেই দিন পার করতে হচ্ছে। পারিবারিক কিংবা দলীয়ভাবে আদালতে আবেদন করা হলেও মিলছে না জামিন।

আন্দোলন কর্মসূচিতে হতাহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে বিচার চেয়ে মামলা দায়েরের চেষ্টা করা হলেও উল্টো প্রশাসনের পক্ষ থেকে হয়রানি হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অবশ্য এমন হেনস্তা হওয়ার দাবি করলেও প্রশাসনিক হয়রানির ভয়ে সংবাদ মাধ্যমের কাছে মুখ খুলতে চাইছেন না কেউই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির দায়িত্বশীল এক নেতা বাংলানিউজের কাছে দাবি করেন, বিএনপি এখন দুঃসময় পার করছে। নেতা-কর্মীরা মামলার শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত, গ্রেফতার হলেও সহসাই ছাড়া পাচ্ছেন না তারা। একাধিক মামলার আসামি হয়ে অনেককে মাসের পর মাস কারাগারেই কাটাতে হচ্ছে। সিনিয়র নেতাদের মধ্যে যারা এখনও গ্রেফতার হননি, তারাও আছেন ভয়ে আতঙ্কে, পালিয়ে পালিয়ে। নেতাকর্মীদের পরিবারকেও দিন পার করতে হচ্ছে ভয়ে-আতঙ্কে।

বিএনপির ওই দায়িত্বশীল নেতা আরও বলেন, সরকারের বিরুদ্ধে কথা বললেই গ্রেফতার হতে হয়, মামলার আসামি হতে হয়। এসব ভয়ে প্রায় অনেক নেতাই মিডিয়ার সামনে কথা বলতেও সাহস পাচ্ছেন না।

গ্রেফতারের ভয়ে সারা দেশে পালিয়ে বেড়ানো হাজার হাজার নেতাকর্মীদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতা।

সিনিয়র নেতাদের মধ্যে স্থায়ী কমিটির সদস্য, যুগ্ম মহাসচিবসহ বেশ কিছু নেতা কারাগারে রয়েছেন। কয়েকজনকে গ্রেফতারের পর আত্মগোপনে চলে গেছেন অনেক নেতা। গ্রেফতার-মামলার হয়রানি এড়াতে প্রায় সবাই মোবাইল-ফোন বন্ধ রেখেছেন। সিনিয়র এসব নেতা কোথায় থাকছেন তা স্বয়ং ঘনিষ্ঠজনরাও জানেন না। কোনো কোনো নেতা গ্রেফতারের ভয়ে প্রায় প্রতিদিনই অবস্থান পরিবর্তন করছেন।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, গত এক মাসে ৫ দফায় ২০ দিনের অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে বিভিন্ন মামলায় আসামি করা হয়েছে বিরোধী দলের অন্তত ৭০ হাজার নেতাকর্মীকে। এদের অনেকেই রাজপথের পাশাপাশি ছুটছেন আদালতে। গ্রেফতার করা হয়েছে বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর অন্তত সাড়ে ৬ হাজারের বেশি নেতাকর্মীকে।

এ ব্যাপারে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান বাংলানিউজকে বলেন, উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে, এখনও হচ্ছে। তবে সরকার বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে যতই মামলা দায়ের করুক কোনো লাভ হবে না।

চূড়ান্ত আন্দোলনের মাধ্যমেই তত্ত্বাবধায়কের দাবি আদায় করা হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

নোমান বলেন, গ্রেফতার করলে আর জামিন দেওয়া হচ্ছে না। একের পর এক মামলা দায়ের করা হচ্ছে নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। গ্রেফতারকৃতদের ওপর চরম নির্যাতন চালানো হচ্ছে, যেটা কোনো সভ্য সমাজে চলতে পারে না।

বিএনপির মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন অসীম বাংলানিউজকে বলেন, সারা দেশে লাখো বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীকে সরকার মিথ্যা মামলায় জড়িয়েছে, এখনও জড়াচ্ছে। নেতাকর্মীদের একাধিক মামলার আসামি করা হচ্ছে। গ্রেফতার হলে শত চেষ্টা করেও জামিন পাচ্ছেন না নেতাকর্মীরা।

অসীম অভিযোগ করেন, গ্রেফতারকৃত বা নির্যাতিত পরিবারের সদস্যরা সাহায্য চাইতে গেলে উল্টো আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর  হাতে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

নেতাকর্মীদের গ্রেফতার ও নির্যাতনের ব্যাপারে বাংলানিউজের কাছে বিস্তর অভিযোগ করেন বিএনপির সহ দপ্তর সম্পাদক আসাদুল করিম শাহিন।

তিনি বলেন, ‘এমন একটি দেশে বাস করছি, কোনো কথাই বলা যাচ্ছে না। ন্যায়বিচার পাচ্ছি না আদালতেও। নেতাকর্মীরা গ্রেফতার হলে জামিন পাচ্ছেন না।  বাড়িতে বাড়িতে তল্লাশি চালানোর সময় নেতাকর্মীদের পরিবারের সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহার করা হয়।’

বিএনপির কোনো নেতা খুন হলেও মামলা নেওয়া হচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন শাহিন।

তিনি দাবি করেন, ‘পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মারমুখী আচরণ, দলের নেতাকর্মীদের এক ধরনের বিভীষিকাময় পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দিয়েছে।’

দলীয় সূত্র জানায়, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুলের বিরুদ্ধে আছে ১৪টি মামলা। হরতালে গাড়ি পোড়ানোসহ বিভিন্ন অভিযোগে তার বিরুদ্ধে এসব মামলা করা হয়েছে। এইসব মামলায় একাধিকবার কারাগারেও গিয়েছেন তিনি। তবে বর্তমানে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন ফখরুল।

নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব আমান উল্লাহ আমানের বিরুদ্ধে ১/১১’র সরকারের দায়ের করা এবং বর্তমান সরকারের আমলে দায়ের করা মোট ৩৯টি মামলা ঝুলছে। আত্মগোপনে রয়েছেন তিনিও।

ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও বিএনপির সহ-ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক সুলতান সালাহউদ্দিন টুকুর বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে ৭০টিরও বেশি। তিনি বর্তমানে কারাগারে আছেন।

যুবদল সভাপতি অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যাও শতাধিক। চলতি মাসের প্রথম দিকে তাকে বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের টকশো’তে দেখা গেলেও এখন আত্মগোপনে রয়েছেন তিনিও।

এছাড়া শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, তরিকুল ইসলাম, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, এম কে আনোয়ার, ব্রি. জে. (অব.) আ স ম হান্নান শাহ, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, সাদেক হোসেন খোকা, এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ফজলুর রহমান পটল, যুগ্ম মহাসচিব বরকতউল্লাহ বুলু, অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী আহমেদ, মিজানুর রহমান মিনু, সালাহউদ্দিন আহমেদ, সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন, মজিবুর রহমান সরোয়ার, মশিউর রহমান, বিশেষ সম্পাদক নাদিম মোস্তফা, প্রচার সম্পাদক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদীন ফারুক, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক এহছানুল হক মিলন, নাজিম উদ্দিন আলম, শিল্প বিষয়ক সম্পাদক কেএম মোশাররফ হোসেন, স্বনির্ভর বিষয়ক সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে।

অধিকাংশ জেলার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ সিনিয়র নেতাদের বিরুদ্ধেও রয়েছে একাধিক মামলা।

উল্লেখ্য, সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও বর্তমান সরকারের আমলে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং তার পরিবারের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ২৫টি। এর মধ্যে খালেদার বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছে ৬টি মামলা। বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছে ১৪টি মামলা। এছাড়া, খালেদার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর বিরুদ্ধে রয়েছে ৬টি মামলা। তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোবায়দা রহমানের বিরুদ্ধেও দায়ের করা হয়েছে একটি মামলা।

সরকারবিরোধী আন্দোলনের বাইরে থেকেও বিভিন্ন মামলায় ‍আসামি হয়ে দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে আছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী (যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত), বিএনপি সরকারের সাবেক শিক্ষা উপমন্ত্রী আব্দুল সালাম পিন্টু, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও বিএনপির সহ সাংগঠনিক সম্পাদক নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টুসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close