অন্য পত্রিকা থেকে

বাজেট বাস্তবায়নই সরকারের চ্যালেঞ্জ

চলতি অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নকেই নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়ার তিন দিনের মাথায় বুধবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বিস্তারিত কথা বলেন।

সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে চলতি বছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে সাড়ে নয় হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায় কম হয়েছে। বাকি ছয় মাসেও এ ধারা অব্যাহত থাকবে বলেই মনে হচ্ছে। সে পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে সরকারকে বাজেট কাঁটছাট করতে হবে। যেহেতু আয় কমছে; সে কারণে ব্যয়ও কমাতে হবে। কিন্তু সেটা কীভাবে করা হবে- কোন খাত থেকে নিয়ে কোন খাতে দেয়া হবে। কীভাবে অগ্রাধিকার ঠিক করা হবে- সেটাই এখন অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ বলে আমি মনে করি।

আজিজুল ইসলাম বলেন, একদিক দিয়ে ভালোই হয়েছে। আগের সরকার ও নতুন সরকার একই দলের। প্রধানমন্ত্রী একই; অর্থমন্ত্রীও আগেরজনই। সে কারণে ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দিক দিয়ে কোন সমস্যা হবে না। সমস্যা যেটা হবে, সেটা অর্থায়ন নিয়ে। গত কয়েক মাসে হরতাল-অবরোধসহ ধ্বংসাত্মক কর্মসূচিতে আমাদের অর্থনীতির সব খাতই মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। যার প্রভাব পড়েছে রাজস্ব আদায়ে।

দিনের পর দিন হাট-বাজার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বেচা-কেনা কম হয়েছে। যার ফলে কমেছে ভ্যাট আদায়। একই কারণে কমেছে আয়কর আদায়। এবার ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বাড়িয়েও গত বারের চেয়ে কম রিটার্ন জমা দিয়েছেন করদাতারা। করপোরেট ট্যাক্সও কমবে। আমদানি কমায় শুল্ক খাত থেকেও ট্যাক্স কম আসবে। এ অবস্থায় সরকার যদি ব্যয় না কমায় তাহলে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নিয়ে খরচ মেটাতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

তার মতে, সেক্ষেত্রে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে যাবে, আর যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বিনিয়োগে। ব্যয়ের ক্ষেত্রে কৃচ্ছতা সাধনের পরামর্শ দিয়ে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, এই ছয় মাস (জানুয়ারি-জুন) অনেক হিসাব-নিকাশ করে নতুন সরকারকে চলতে হবে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) থেকে কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাদ দিয়ে জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো বাছাই করতে হবে। রাজস্ব বাজেটের খরচও কমাতে হবে। বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি যথাসম্ভব কমিয়ে আনতে হবে। সরকারি যে প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর লোকসান দিয়ে আসছে- সেগুলোর লোকসান কমাতেও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রসঙ্গটি টেনে বলেন, “আমাদের অর্থনীতির যে ক্ষতি হয়েছে, তা আমাদেরই পূরণ করতে হবে। অন্য কেউ করে দেবে না। বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমেই সে ক্ষতি পূরণ করতে হবে। আর এই বিনিয়োগের জন্য প্রথমে যে কাজটি করতে হবে, সেটি হল- হরতাল-অবরোধে আমাদের অবকাঠামো খাতের (রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ অন্যান্য) যে ক্ষতি হয়েছে তা দ্রুত ঠিক করতে হবে। একইসঙ্গে গ্যাস-বিদ্যুৎ, বন্দর, সড়ক যোগাযোগ খাতে দীর্ঘদিনের যে সমস্যা রয়েছে সেগুলোও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমাধান করতে হবে।

বিনিয়োগের মন্দা পরিস্থিতি তুলে ধরে মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, একটা বিষয় মনে রাখতে হবে- বেশ কিছু দিন ধরে আমাদের বিনিয়োগের অবস্থা খারাপ। এরপর অস্থিরতায় আরও খারাপ হয়েছে। এখন এই দিকেই সরকারকে সবচেয়ে বেশি নজর দিতে হবে। বিনিয়োগ বাড়ানো নতুন সরকারের জন্য অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ বলে আমি মনে করি। নির্বাচনের পর হরতাল-অবরোধের কর্মসূচি না দেওয়ায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, কোন দেশের উন্নয়নের জন্য সবার আগে প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। আমাদের এখানে এটারই বড় অভাব। কোন দলেরই শুভবুদ্ধির উদয় হচ্ছিল না। এবার ব্যাতিক্রম লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একটু শান্তির আবহ পাচ্ছি।

আশা করছি এই আবহ অব্যাহত থাকবে। সরকার-বিরোধী দল একটা সম্মানজনক সমাধানে পৌঁছাবেন। যাতে রাজনীতির চাকায় যেনো আমাদের অর্থনীতি আর পিষ্ঠ না হয়। তিনি বলেন, চলতি ২০১৩-১৪ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ২ শতাংশ। বর্তমান পেক্ষাপটে এটা অর্জন করা সম্ভব নয়। সরকারও কেন্দ্রীয় ব্যাংকও সেটা বলছে। আমাদের এখন একটা লক্ষ্যকে সামনে রেখে এগোতে হবে। কোনভাবেই যেনো প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের নিচে নেমে না আসে। দেশে যদি স্থিতিশীলতা থাকে তাহলে সেটা সম্ভব বলে আমি মনে করি।

সব কিছুই নির্ভর করছে এই ছয় মাস দেশের রানৈতিক পরিস্থিতির উপর। চলতি অর্থ ৫ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্ব ব্যাংক। আইএমএফ বলেছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ হবে।

ব্যাংকিং খাতের দুরাবস্থার কথা উল্লেখ করে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছর অর্থ উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করা আজিজুল ইসলাম বলেন, আমাদের ব্যাংকিং খাতের অবস্থা ভালো নয়। এ খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। এরমধ্যে অনেক কু-ঋণ রয়েছে (যেগুলো আর আদায় করা সম্ভব নয়)। এক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়াতে হলে উদ্যোক্তাদের সুদের হার কমানোসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় দিতে হবে। ব্যাংকগুলোর সংকট আরও বাড়বে। এ বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে। ব্যাংক খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা না গেলে কোন উন্নতি হবে না’ উল্লেখ করে  মির্জ্জা আজিজ বলেন, “এ খাতের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বড় প্রমাণ হলমার্ক কেলেঙ্কারি। এমন অনেক কেলেঙ্কারি আছে- যেগুলো হয়ত মিডিয়ায় আসে না; বা আমরা জানি না।

এ থেকে শিক্ষা নিয়ে ব্যাংকিং খাতে শৃংখলা ফিরিয়ে আনতে এ খাতকে ঢেলে সাজানোর পরামর্শ দেন আজিজুল ইসলাম। একইসঙ্গে দেশের লাখ লাখ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে শেয়ার বাজারের দিকেও নজর বলেছেন পুঁজিবাজার নিয়ণ্ত্রক সংস্থা- বিএসইসি’র সাবেক এই চেয়ারম্যান।

সূত্র: বিডিনিউজ২৪

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close